কলকাতায় বহুজাতিক কম্পানি এলে আমরা ধরে নিই বাহ বাহ ! বেশ অনেকদূর এগোলাম | কিন্তু ইতিহাসের ছাত্রী বলে হয়তো বর্তমান থেকে অতীত বেশি আকৃষ্ট করে আমাকে | কেন জানি না আমার মনে হয় এই শহরের নতুন করে আন্তর্জাতিক হওয়ার প্রয়োজন নেই | কারণ এই শহর এর আগে বহু মাত্রায় বেশি কলোনিয়াল ছিল | ব্রিটিশ কালে কলকাতা যা ছিল‚ তার থেকে বর্তমানের কলকাতা অনেক বেশি ভেতো |

আপনারা আমার উপর রাগ করতেই পারেন | যদি লেখা পড়া বন্ধ করে দেন‚ তাই তাড়াতাড়ি আলাপ করিয়ে দিই ফ্রান্সেস জনসনের সঙ্গে | নাম দেখে পুরুষ ভাববেন না যেন | তিনি একজন মেমসাহেব | 

পৃথিবীর আলো দেখেছিলেন ১৭২৮ সালের ১০ এপ্রিল | করমণ্ডল উপকূলে কাড্ডালোরের কাছে | তাঁর বাবা ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির কর্মী এডওয়ার্ড ক্রোক ছিলেন সেন্ট ডেভিড ফোর্টের গভর্নর | মা ছিলেন পর্তুগালের মেয়ে | নাম ইজাবেলা বেজর |

সেন্ট জোনস চার্চ‚ কলকাতা

সাদা চামড়ার ইউরোপীয়ান হলে কী হবে‚ মাত্র তেরো বছর বয়সে বিয়ে হয়ে গিয়েছিল ফ্রান্সেসের | স্বামীর ঘর করতে এলেন কলকাতায় | ব্রিটিশ স্বামী পেরি পপলার ট্যাম্পলার কর্মরত ছিলেন এই শহরেই |

ফ্রান্সেস এত সৌন্দর্যময়ী ছিলেন যে তাঁকে অনায়াসে ড্যামজেল বলা যায় | প্রায় জঙ্গল কলকাতা শহরে ছোট্ট ইওরোপীয় সমাজে তিনি ছিলেন মক্ষীরানি | অনেক পুরুষই তাঁর স্বামীর ভাগ্যকে ঈর্ষা করতেন |

বেশিদিন অন্যের ঈর্ষার কারণ হতে হল না পপলারকে | ফ্রান্সেসকে বিয়ের পাঁচ বছরের মধ্যে পপলার মারা গেলেন | তার আগে মৃত্যু হয়েছে তাঁদের ফুলের মতো দুই শিশুর | কলকাতার আবহাওয়া সহ্য হয়নি খাঁটি বিলাইতি মানুষদের |

সুন্দরী ফ্রান্সেস কিন্তু বেশিদিন একাকী থাকলেন না | তাঁকে বিয়ে করলেন ধনী ব্যবসায়ী জেমস অ্যালথাম | এমনই কপাল‚ মধুচন্দ্রিমা হয়েছে কি হয়নি‚ জলবসন্ত রোগ হল জেমসের | তিনিও চলে গেলেন সুন্দরী স্ত্রীকে ফেলে |

ফ্রান্সেস এবার অনেক সম্পত্তির কর্ত্রী | তাঁর প্রণয়ে আসক্ত পুরুষের দল মাছির মতো ভনভন করতে লাগল চারপাশে | কিন্তু তিনি চট করে বিয়ে করলেন না | অপেক্ষা করলেন দু বছর |

কুড়ি বছর বয়সে পৌঁছে ফ্রান্সেস বিয়ে করলেন | তাঁর এবারের স্বামী উইলিয়াম ওয়াটস ছিলেন কোম্পানির এজেন্ট | কলকাতাকে অন্ধকার করে ড্যামজেল চলে গেলেন স্বামীর সঙ্গে কাশিমবাজার কুঠিতে |

তৃতীয় বিয়ে কিন্তু পূর্বকার দুটি বিয়ের মতো হল না | লম্বা বিবাহিত জীবনে খুশি ছিলেন দুজনেই | তিনটি সন্তানের জন্মও হল | ১৭৫৭ সালে‚ চতুর্থবারের জন্য ফ্রান্সেস তখন প্রেগন্যান্ট | রে রে করে কাশিমবাজার কুঠি আক্রমণ করলেন নবাব সিরাজউদ্দৌল্লা | কোনও লড়াই না করে আত্মসমর্পণ করলেন করলেন ফ্রান্সেসের স্বামী ওয়াটস |

এদিকে‚ সিরাজের মায়ের সঙ্গে দারুণ সখ্যতা পাতিয়ে ফেলেছিলেন রূপমতী ফ্রান্সেস | তাই তিনি সন্তানদের নিয়ে থাকলেন বেহাত হওয়া কুঠিতেই | সিরাজ ওদিকে কলকাতা দখল করে ফেললেন | ফ্রান্সেস ও তাঁর সন্তানদের পাঠিয়ে দেওয়া হল চন্দননগরে‚ নিরাপদ ও সুরক্ষিত আশ্রয়ে |

ইতিমধ্যে রবার্ট ক্লাইভ বীরদর্পে কলকাতা জয় করে নিলেন সিরাজের দখল থেকে | স্বামীর কাছে ফিরে এলেন ফ্রান্সেস সন্তানদের নিয়ে | তিনি এতই দুই নৌকায় পা রেখে চলতেন‚ যে সিরাজের কাছে তাঁকে দৌত্যগিরির লক্ষ্যে পাঠিয়েছিল ব্রিটিশরা |

এই সময়ে পলাশীর যুদ্ধে লাল হল ক্লাইভের খঞ্জর | বাংলার ইতিহাসে তথা ফ্রান্সেসের জীবনে বন্ধ হল সিরাজ-চ্যাপ্টার | দু বছর পরে‚ ১৭৫৯ খ্রিস্টাব্দে সপরিবারে তিনি চলে গেলেন ইংল্যান্ডে |

১৭৬৪ খ্রিস্টাব্দে সেখানে মৃত্যু হল ওয়াল্টারের | আজন্ম ভারতে থাকা মেমসাহেবের একটুও ভাল লাগল না ইংল্যান্ড | কলকাতাকে ছেড়ে সেখানে হাঁফিয়ে উঠেছিলেন মেমসাহেব | তৃতীয় স্বামীর মৃত্যু হতে আবার জাহাজে চেপে বসলেন তিনি | ছেড়ে যাওয়ার দশ বছর পরে আবার ১৭৬৯ সালে এসে উঠলেন প্রিয় শহরে | বাড়ি নিলেন ১২‚ ক্লাইভ স্ট্রিটে | ৪১ বছর বয়সী ফ্রান্সেস তখন তিন বার স্বামীদের হারিয়েছেন | কিন্তু রূপ-যৌবন-অর্থ সবই ছিল সঙ্গে |

কিন্তু এত সব থাকলেও ফাঁকা ফাঁকা একাকী লাগত ফ্রান্সেসের | একাকিত্ব কাটাতেন রেভারেন্ড উইলিয়াম জনসন | কলকাতার প্রাচীনতম গির্জার একটি সেন্ট জর্জ চার্চের পাদ্রি ছিলেন তিনি | তাই কলকাতায় আসার ৫ বছর পরে‚ ১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে আবার বিয়ে করলেন ৪৬ বছর বয়সী ফ্রান্সেস | চতুর্থ স্বামী উইলিয়াম জনসন তাঁর থেকে ১৬ বছরের ছোট |

কিছু কালের মধ্যেই ফ্রান্সেস বুঝতে পারলেন ভুল হয়ে গেছে | কারণ তাঁর বর্তমান স্বামীর লক্ষ্য যেভাবেই হোক স্ত্রীর সম্পত্তি হস্তগত করা | তেরো বছর এভাবে প্রেমহীন দাম্পত্য বয়ে চলার পর ফ্রান্সেসের মনে হল‚ এনাফ ইজ এনাফ | ডিভোর্স করলেন চতুর্থ স্বামীকে | স্ত্রীর কাছ থেকে মোটা খোরপোষ আদায় করে ইংল্যান্ডের জাহাজে বসলেন ৪৩ বছর বয়সী উইলিয়াম জনসন |

চারজন স্বামীর ঘর করা ফ্রান্সেস তখন ৫৯ বছর বয়সী প্রৌঢ়া | পাঁচ নাতি নাতনির ঠাকুমা-দিদিমা | তাঁর ডাকে ইংল্যান্ড থেকে তাঁর কাছে ভারতে চলে এসেছিলেন চারজন | ৮৩ বছর অবধি জীবিত থেকে জীবনকে উপভোগ করেছিলেন এই পরী | মৃত্যু হয়েছিল ১৮১২-র ৩ ফেব্রুয়ারি |

সমাধির স্থান নিজেই পছন্দ করেছিলেন তিনি | সেন্ট জোনস গির্জায় জোব চার্নকের সমাধির উল্টোদিকেই | তাঁর শেষকৃত্যে যোগ দিয়েছিলেন গভর্নর জেনারেল‚ চিফ জাস্টিসের মতো ব্যক্তিত্ব | সেন্ট জোনস গির্জায় এখনও আছে তাঁর সমাধি | ভাল করে না খুঁজলে চট করে দেখা যায় না | সমাধির উপরে আছে লম্বা এপিটাফ | যার মুখ্য বক্তব্য হল‚ এখানে চিরঘুমে শুয়ে আছেন ‘ Grand Dame of Calcutta ‘ | এভাবেই নিজের পরিচয় দিতে ভালবাসতেন ফ্রান্সেস | যিনি অষ্টাদশ শতকের মেয়ে হয়ে চারবার বিয়ে করেছিলেন | একবার ডিভোর্স করেছিলেন | নিজের মতো করে বেঁচে ছিলেন | অনেক জায়গায় তাঁর নামের আগে বেগম কথাটা দেখা যায় | সম্ভবত সিরাজউদ্দৌলার পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতায় ওই পরিচয় পেয়েছিলেন | কিন্তু তাঁর মতো স্বাধীনচেতা মেয়ে কী করে অত বছর আগে রক্ষণশীল মুসলিম নবাব পরিবারের অন্দরমহলে আদরণীয়া হয়েছিলেন‚ সেটার রেসিপি একমাত্র ড্যামজেল নিজেই জানতেন | 

আরও পড়ুন:  ত্বকের পরিচর্যায় কী ব্যবহার করতেন রানিরা? জেনে নিন ও ট্রাই করে দেখুন

1 COMMENT