স্বপ্নময় চক্রবর্তী
জন্ম ১৯৫২ সালে‚ কলকাতায় | বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এম এ | কর্মজীবন শুরু দেশলাই-এর সেলসম্যান হিসেবে | দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন আকাশবাণীর সঙ্গে | 'হলদে গোলাপ' উপন্যাসের জন্য পেয়েছেন ১৪২১ সালের আনন্দ পুরস্কার |

বৈশাখের মাঝামাঝি       উঠিল মোবাইল বাজি

      ‘পুজো সংখ্যার লেখাটা কী হলো?’

আমি বলি, ‘আ মোলো যা    গরমেতে ঘিয়ে ভাজা

      গরমে কী করে লিখি বলো ।

সবেতো বৈশাখ মাস       শারদ সংখ্যার চাষ

      এখনও তো করি নাই শুরু।’

সম্পাদক উদ্বেগিত         সশঙ্কিত হতচিত

      বলিলেন, শুরু কর গুরু

তাড়াতাড়ি, কুইক কুইক     দিতে পারি তিন উইক

       সময় তো একদম নাই।

আমি বলি, এ কী কথা      কেন কহ এ কু কথা

       হাতে আছে পাঁচ মাস ভাই।’

সম্পাদক আতঙ্কিয়া         ঈষৎ হেঁচকি দিয়া

        কহিলেন, গাড্ডি মেরেছে

চাকরিখানা খাবে শেষে      থাকো বন্ধু কোন দেশে

        দুগগাপুজো এগিয়ে এসেছে

আগেই বলেছি ভাই         মে মাসেই লেখা চাই

        মিটিংএ এটাই ডিসিশন

সব লেখা পেয়ে গেছি        তোমারই রং পিঁয়াজি

        ও কে বস্‌, লিখো না নেক্সট সন’।

তখুনি ত্বরা করি           কহি আমি ভেরি সরি

      ডোন্ট ওরি, ডোন্ট ওরি ভাই।

ডোন্ট পরোয়া অল রাইট        হাউ ডুয়ুডু গুড নাইট

      হয়ে যাবে তোমার যা চাই।

********

সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি,

সারা দিন আমি যেন বাধ্য হয়ে চলি।

আদেশ করেন যাহা সম্পাদক গনে,

আমি যেন সেই কাজ করি ভাল মনে।

সদা যেন হ্যা হ্যা করি, না করি পিঁয়াজি

সম্পাদক যাহা চান হই যেন রাজি।

যদি হই প্লট শূন্য, দেখি সর্ষে ফুল

খামচাই নিজ গাত্র, ছিঁড়ি শীর্ষচুল।

অন্যের আইডিয়া যেন দিতে পারি ঝেড়ে

কেহ যেন নাহি বুঝে, যদি কোনও গেঁড়ে

পয়েন্ট-আউট করে বলে প্লেজিয়ারিজম,

ট্যাক্‌ল করিবারে যেন হই পারঙ্গম।

গোঁফ রেখা উঠে যবে প্রথম যৌবনে,

কাব্য রোগ দেখা দিল কী যে কুক্ষনে।

সিলেবাসে মতি নাই বাজে কাজে দড়,

জ্যামিতি পুস্তক তলে থাকিত বিবর।

হাসি হাসি পরিয়াছি সাহিত্যের ফাঁসি,

আরও পড়ুন:  ছাগল ও চুমু

বাঁচিবার পথ নাই শুন বঙ্গবাসী।

সুজলা সুফলা বঙ্গে বৃক্ষ যত্র তত্র,

তাহারও অধিক জন্মে সাহিত্যের পত্র।

শারদ সংখ্যা ছাপে পত্রিকা সকল,

কেন ছাপে নাহি জানি কি খুড়ার কল।

দেগঙ্গা, গোসাবা, গুমা, বনগাঁ, চাকদা,

পটল হাটি, পাগল বাটি, বগুড়া-বাগদা।

সর্বত্র রয়েছে ভাই সাহিত্য পত্রিকা,

তথা হতে সদা পত্র – দিতে হবে লেখা।

বাঙালি কদলীপ্রেমী, কত কলা জানে,

নাটক কিম্বা ব্যান্ড আছে সব খানে।

কত ড্যান্স্‌ শিক্ষাকেন্দ্রে নৃত্য তিড়িং,

বাচনিক কলা কেন্দ্রে শেখে আঙ্কারিং।

কলকারখানা নাই কী হয়েছে তাতে ?

বাহারে, বাঙালি বেশ আছে কলা-ভাতে।

 

ওগো মাতঃ সরস্বতী       দূর করো এ দূর্গতি

        ব্রেনেতে দাওগো আইডিয়া।

আমার অবস্থা জেনো      নিংড়ানো গামছা যেন

        দুরু দুরু কাঁপে মোর হিয়া।

কী করিয়া সামলামু         কারে আমি কী যে কমু

        কী করিয়া করিমু ম্যানেজ।

মাথা মোর ফাঁকা মাগো       লেখা আর আসে না গো

        লেখা যেন কুকুরের লেজ।

পিছে মোর ফাটা বংশ        অন্তত পাঠাও হংস

         যেন পাড়ে আইডিয়ার ডিম।

এরে তারে দয়া দিলে        কত প্লট বিতরিলে

        মোরে নাহি। বলো, ততঃ কিম ?

বহুদিন ঘসিয়াছি            শুকতলা খসায়েছি

        দন্ত নড়ে, চুল হল পক্ক।

এতদিনে কমার্শিয়াল         কাগজের অফিসিয়াল

        মোর দিকে করেছেন লক্ষ্য।

ওরা কটা টাকা দেয়        অন্য সব ফাঁকা দেয়

        ওখানে লেখা দিতে আশ

অন্য সম্পাদকগণ          আমারে ইঙ্গিতে কন

        হয়ে গেছে প্রতিষ্ঠান- দাস।

এ কলঙ্ক মুছিবারে        কত চেষ্টা বারে বারে

       লিখিতেছি জাগরিয়া নিশি।

অর্জন করিনু ব্যাধি      অম্বল অজীর্ণ আদি

       জমা হল ওষধের শিশি।

একটা লেখার শেষে       আবার অর্ডার আসে

      শেষ হইয়া না হয় গো শেষ।

যদি বলি পারিব না        ওরা বলে ছাড়িব না

        রি-প্রিন্ট চলিবে না, ফ্রেশ।

পয়সা দিব না বলে           ‘পার্বোনা’ বলতে পেলে

আরও পড়ুন:  মিউজিক্যাল চেয়ার

       হয়ে গেছ পুরো বানিজ্যিক,

ঠিক আছে, হবে না দিতে      বড় ব্যাথা পেনু চিতে

       বুঝি, এতে উহ্য আছে ‘ধিক’।

এ ‘ধিক’ মুছিবা লাগি         কত আমি রাত্রি জাগি

        স্পন্ডেলিসিস হ’ল ঘাড়ে

নিজের টেবিলে বসি         লিখি আবর্জনা রাশি

        এ দুঃখ জানাই কাহারে।

******

 

 লিখিবার চাপে আমি তুলি না রেশন

ল্যাপ্‌স হয়ে যায় কার্ড পূজার সেশন।

ট্যাক্সো দিতে বাকি পড়ে, হয় জরিমানা

সাহিত্য সেবক আমি, কেয়ার করি না।

পেন্ডিং পড়ে থাকে ইলেকট্রিক বিল

দুপুরে ঘুমোলে একটু, ভুতে মারে ঢিল।

নাটক সিনেমা আসে রাখি না খবর,

টিভির কোন্দল মিস জবর জবর।

জানিনা কোন আঁতেল গেল কোন ঝোপে,

সারদার মজা গেল শারদীয় কোপে।

আত্মীয়-স্বজন গৃহে নাহি হয় যাওয়া,

ভোজ খাওয়া নাহি হয়, নাহি হয় যাওয়া।

‘গায়ে বড্ড গন্ধ হচ্ছে’ গৃহিণী কহিল

লোকে যাহা বলুক গে, আমার কী গেল।

আত্মীয়রা ভাবে কত পয়সা কামাই ,

উহাদের আমি ভাই কী বুঝাব ছাই ?

কার্ত্তিক ঠাকুর যথা, যত তার ঠাঁট।

কার্ত্তিক আর কুমোর জানে পিছে ঢোকা কাঠ।

কী আর কহিব ভাই এ ভাবেই আছি,

নমো নমো করে এই পুজো গেলে বাঁচি।

মাঝে মাঝে ভাবি সব করি নয় ছয়

লেখকের খেদ কথা কহে স্বপ্নময়।

2 COMMENTS

এমন আরো নিবন্ধ