শঙ্খদীপ ভট্টাচার্য
নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনের প্রাক্তন ছাত্র। অঙ্ক নিয়ে পড়াশোনা। কলেজ ম্যাগাজিন থেকে লেখালিখির হাতেখড়ি। আমেরিকা অথবা ভারত ভ্রমনের অভিজ্ঞতা ঝুলিতে থাকলেও ভালোবাসেন কলকাতাকে। বর্তমানে সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার রুপে কর্মরত।

ভ্যাটিকান সিটিতে কি আদৌ হকারের উৎপাত আছে? ক্যারিবিয়ানদের মধ্যে দরাদরি করার  ঝোঁক কতখানি?অতশত আমি জানিনা বাপু তবে দেশের ফুটপাথে ছোট বড় ক্রেতা বিক্রেতার নাগরিক লেনদেনের দুচারটি টক ঝাল কথা মন খুলে অবশ্যই বলতে পারি।

     বড় রাস্তার লেজুড় এই ফুটপাথে আমাদের দৈনন্দিন হেঁটে চলা।এই হেঁটে চলার নিত্যসঙ্গী ভুঁইফোড় হকারের নরম হাঁকডাক। এই হকারবাহিনী শুধু ফুটপাথ নয় বাজারে বন্দরে স্টেশন চত্বরে যেখানেই সুচাগ্র জমির খোঁজ পেয়েছে জাঁকিয়ে বসে ব্যাগ ,বই,জামরুল , গয়না, গামছা নিয়ে রমরমিয়ে দেদার হাঁক পেরেছে। প্রকৃত প্রস্তাবে প্রোমোটারের থাবার গোড়ায় এবং পুলিসের জিভের ডগায় পরিমাণ মত নুনচিনি ছড়িয়ে তবেই কিন্তু অমন হাঁক। চাট্টিখানি কথা নয়! সবাই অবশ্য হাঁকেন না।অনেকেই ঘুঘুচোখে মক্কেল কাস্টোমারের ইতিউতি খেয়াল রাখেন। এই খেয়াল রাখার খেলায় হকারের চাহুনিতে ফুটে ওঠে দুঁদে জ্যোতিষীর মনস্ততাত্ত্বিক জ্ঞান। মোদ্দা কথা বাহান্ন টাকার মাল সাড়ে আটশো টাকায় বেচতে হবে। এই হলো হকারের রোজকার সাধনা। ‘বাহান্ন টাকার মাল সাড়ে আটশো টাকায়’  শুনতে একটু ইয়ে ইয়ে লাগে বটে কিন্ত গীতায় হাত রেখে একবার বলুন দেখি , না হে আজ অব্দি অতটা আমি ঠকিনি। পারবেন না। কারণ সাড়ে আটশো টাকার পাকাপোক্ত মনোরম মালটির জন্মস্থান এবং তার ছেলেবেলার কথা কালো টাকার মতই মিথ হয়ে উড়ে বেড়ায় এই ফুটপাথেই।

হকার আমাদের জন্যই হাঁকেন। কেউ কেউ সেই ডাকে আকৃষ্ট হন। কেনাকাটি করেন। অনেকে বিশেষ কোনও ফুটপাথের বিশেষ হকারের কাছ থেকেই জিনিসটি কিনবেন বলেই বের হয়েছেন।

ক্রেতা এবং হকারের সম্পর্ক এক কথায় প্রকাশ করা অসম্ভব। ‘টাগ অফ ওয়ার’ খেলাটার কথা মনে করুন। দড়ির দুপ্রান্তে ক্রেতা বিক্রেতার মজবুত হাত। ক্রেতা পছন্দ করলেন। ভুরু নাচিয়ে হকারকে বললেন , কত? হকার এতক্ষনে ঠিক বুঝে নিয়েছেন আখেরে কত হাঁকবেন।ক্রেতার স্ট্যাটাস দামের হেরফের ঘটায়। ক্রেতা কোন শ্রেণীর তা বোঝার সহজপাঠ হকার জীবন সংগ্রামেই সেরে ফেলেছেন।দাম রাষ্ট্র হওয়ার পরেই শুরু হয় টাগ অফ ওয়ার। ধরা যাক একটি ল্যাপটপ ব্যাগ। হকার ভূমিকায় বললেন, এসব জিনিস এই দামে পাবেন না।এসব আমাদের নিজের হাতে কারখানায়(?) তৈরি। পুরো সেন পারসেন গেরান্টি মাল। হাতে নিয়ে দেখুন একবার। পুরো মাখন ব্যাগ আছে দাদা। ক্রেতা হাতে হরগিস নেবেন না। পাছে কিনতে হয়। ক্রেতা সন্দেহের চোখে বললেন, কতোয় দেবে বলো?হকারের হক কথা। ছশ আশি। ক্রেতা ভেবেছিলেন সাতশর কমে এই ব্যাগ পাওয়া যাবে না। কম ঘুরেছেন এই একটা ব্যাগের জন্য। কিন্তু মুখে ‘আহা এই ব্যাগটাই তো আমি খুঁজছিলাম রে’ আহ্লাদী ভাবটা ফোটালে খেলাটাই যে মাটি। ক্রেতা রাশ টেনে বললেন, এই সামান্য ব্যাগের এত দাম! ছাড়ো আমি অন্য দোকান দেখি। এই বলে কিন্তু তিনি চট করে অন্য দোকানে চলে যান না।দামের দ্বিতীয় কিস্তি এবার আসবে তিনি জানেন। হকার বুঝলেন ক্রেতা ঘাগু। দড়ি হাল্কা টেনে বললেন, কত দেবেন বলুন না। ক্রেতা অমনি দড়িতে হ্যাঁচকা টান। একশো পঞ্চাশ।হকার আপাতত হাল ছাড়লেন।দড়ি কিন্তু আলগা করলেন না। বড়জোর মাথা নেড়ে বোঝালেন, পারলাম না দাদা। ক্রেতা যেই না মুখ ফিরিয়ে পাশের দোকানে উঁকি মারবেন মারবেন করছেন, পেছন থেকে ভেসে এল দামের তৃতীয় কিস্তি। শুরু হল টাগ অফ ওয়ারের থার্ড রাউণ্ড। লাস্ট কত দেবেন বলুন। হকার ব্যাগটায় চাটি মেরে বললেন। ক্রেতা উৎসাহ দেখালেন না। হকার উৎসাহ টানতে আবার বললেন, পাঁচশ হলে নিয়ে যান দাদা।লাস্ট দাম। ক্রেতা বুঝলেন, দাম নিম্নগামী। আশা আছে। হাল্কা দড়ি ছেড়ে বললেন, দুশো লাস্ট। দিতে হলে দিন নইলে ছাড়ুন। হকার বুঝলেন,দাম ঊর্ধ্বগামী।মুখে কিছু বললেন না। শুরু হল চতুর্থ রাউন্ড ।এবার খেলা আগাগোড়া মনস্তাত্ত্বিক। আসলে ক্রেতা ঠিক করেই নিয়েছেন ব্যাগটা উনি বাগাবেন।এদিকে হকারকে বেশি পাত্তা দিলে মুশকিল।আবার অবজ্ঞাও করা যায় না।অতএব ক্রেতা দোকানটিকে কেন্দ্র করে এদিক ওদিক ঘোরেন। আড়চোখে একবার ব্যাগ আর একবার হকারের দিকে তাকান। হকারও ঠিক তাই করেন তবে নতুন কাস্টোমার সামলে। মিনিট পাঁচেক এই খেলা চলার পর আচমকা ক্রেতা বুক ফুলিয়ে হকারের কাছে গিয়ে প্রায় শাসানোর ভঙ্গিতে বলেন, দুশো পঞ্চাশ। দাও দেখি ব্যাগটা। হকার প্রস্তুত ছিলেন। অত কমে হয় না দাদা। চারশ দিন।

আরও পড়ুন:  উজান স্রোতে সাঁতার ! দেবী দুর্গার মুখ দেখেন না মহিষাসুরের বংশধররা

ছাড়ো।বাদ দাও।

দাঁড়ান দাঁড়ান দাদা। আর পঞ্চাশ দিন।একটুও লাভ থাকবে না।

এক পয়সা আর বেশি নয়।

কুড়ি। আচ্ছা দশ টাকা দিন।

শেষমেষ ছশ আশি টাকার ব্যাগ দুশো ষাট টাকায় রফা। ক্রেতা বিক্রেতা দুজনেই খুশি। ব্যাগ নয় যেন বিশ্বজয় করে ফিরলেন ক্রেতা।

অনেক ক্রেতাই আছেন যারা দরাদরিতে তেমন পটু নন।ইনিয়েবিনিয়ে বড়জোর কুড়ি ত্রিশ টাকা কমাতে পারেন। হকারদের ওখানেই লাভ। অনেকে হকারের হাঁককে ফিক্সড প্রাইস ভেবে বসেন। এরাই হকারদের শ্রেষ্ঠ কাস্টমার । কালেভদ্রে এরা আসেন । বিদেশ থেকে এলে তো কথাই নেই। তখন লাভেরও কোনও লিমিট নেই। হকারদের কিছু টিপিকাল টেকনিক আছে। যেমন কাস্টমারকে দাম বলার সময় বললেন, এমনিতে এসব মাল আমরা তিনশোর নিচে বেচিনা তবে আপনার জন্য পেসাল পাইস দুশো। অনেকে আবার কাস্টোমারকে আপন করে প্রায় কানের কাছে গিয়ে ফিসফিসিয়ে বলেন, লাস পিস পড়ে আছে দাদা । বেশি বলছিনা দেড়শ টাকা।

  মহিলাদের সামলানো হকারদের কাছে অগ্নিপরীক্ষার সামিল। দরাদরি মহিলাদের একটা সহজাত ক্ষমতা।ফুটপাথে গলার হার কিনতে হার মেনেছেন এমন উদাহরণ মেলা ভার। বিশেষত গয়না বা মেয়েলি পোশাকের দোকানে মহিলারা নিজেদের সামলাতে পারেন না। এটা দেখি ওটা দেখি করে হকারকে হাড়ে হাড়ে ব্যস্ত রাখেন। অনেক সময় ধরে খুঁটিয়ে দেখে সদ্য বিবাহিতা এক মহিলা  দুটো পেন্ডেন্ট বাছেন। হকার ভারী খুশি।এক ঢিলে দুই পাখি। বললেন , একদম লেটেস্ট মাল দিদি।কালই এসছে। আপনাকে দারুন মানাবে। প্যাক করে দি।দিদি নাক কুঁচকে বললেন ,  না না।  এই দুটোর কম্বিনেশনে কিছু দেখাতে পারেন মানে এইটার ডিসাইন আর ওটার রং। হকার কিন্তু দমলেন না।এমন আজব কম্বিনেশন আর কোথাও না থাকুক হকারের সংগ্রহে থাকবেই। খুঁজে ঠিক বার করলেন দিদির সাধের সেই জিনিস।

ফুটপাথে বইপত্তর নিয়েও হাঁকডাক শোনা যায়।একের পর এক পুরনো বইয়ের সারি সারি দোকান বইপ্রেমীদের স্বর্গরাজ্য। কালিদাসের কুমারসম্ভব থেকে হাল আমলের কমিক্স সবই এক ছাদের নিচে।কী বই বলুন না। ঠিক এই কথাটাই তারা ছুঁড়ে দেন পথচলতি মানুষদের দিকে। কারও ডাকের তীব্রতা এতই বেশি যে সে ডাকে সাড়া না দিলে মনে হতেই পারে রাতবিরেতে একা পেয়ে মাথায় লোহার রড মারবে না তো অবহেলিত এই বই বিক্রেতা।খুব কাছাকাছি এইসব দোকানের পাশ দিয়ে হাঁটলে জামায় হালকা টান অনুভব করার আশঙ্কাও থাকে। ও দাদা কী চাই বলুন না। জামায় আলতো খোঁচা। অনবরত এই ডাকে কতক্ষণই বা মুখ ফিরিয়ে থাকা যায়। যারা প্রথম এসেছেন এই পথে তারা কমপক্ষে দস্তুরমত একটা সপ্তম শ্রেণীর জীববিজ্ঞানের বই কিনেও বাড়ি ফেরেন। আমাকে এক বন্ধুর সঙ্গে বিশেষ কাজে বইপাড়ায় যেতে হয়েছিল।বন্ধু প্রবাসী বাঙালি কিন্তু বেশ জাঁদরেল গোছের। সে বই ভালবাসে না। কানের কাছে লাগাতার অহেতুক বই কেনার আমন্ত্রণে হঠাৎ সে দাঁড়িয়ে পড়ল। বিক্রেতা বললেন, হ্যাঁ দাদা বলুন না একবার কী বই খুঁজছেন?গলায় এমনই ভাব যেন ন্যাশনাল লাইব্রেরির বিপুল সম্ভার বিলিয়ে দেওয়ার ছাড়পত্র পেয়েছেন এই মাত্র। বন্ধু কড়া মেজাজে বলল, স্যার আইস্যাক নিউটনের ফিলসফি ন্যাচারালিস প্রিন্সিপিয়া ম্যাথেমেটিকা আছে? অরিজিনাল কপিটা চাই।

আরও পড়ুন:  আগমনী গান ও তার পট-বদল

ফিলো…ন্যচা…দেখছি দাঁড়ান। এই বলে বিক্রেতা চট করে পাঁচ থেকে বারো ক্লাসের সমস্ত বই হাতড়ালেন। না পেয়ে বললেন, অঙ্কের বই স্যার? কোন ক্লাসের?

জানি না।

একটু দাঁড়ান। আসছি।

দু চারটে পাশের দোকান ঘুরে এসে বললেন, আজ হচ্ছে না স্যার। আপনি সোমবার আসুন একবার।পেয়ে যাবেন। আইস্যাক আসিমভ আছে। চলবে দাদা।

যারা শপিং কমপ্লেক্সে যেতে পারেন না তাদের জন্য এই হকারবাহিনী নিরলস কাজ করে চলেছেন। ক্রেতার সঙ্গে হকার মানুষটির কোনো মনে রাখার মত সম্পর্ক গড়ে না উঠলেও লেনদেনের সময়টুকুর একমুঠো কথা বিনিময় মানবিক আদান প্রদানে এক নতুন মাত্রা যোগ করে বৈকি। আপনি যেটুকু ঠকেছেন সেই অংশ দিয়ে সে নির্ঘাত চাল ডাল কিনবে। সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়াই যায়। ঠকে যাওয়া অংশ একটু বেশি হলেও তা নিয়ে আফশোষ করাটা মোটেই মহৎ কাজ নয়। ধরে নেওয়া যাক সেই লাভের টাকায় সে সপরিবারে হঠাৎ বেরিয়ে  কাছেপিঠে কোনো নদীর তীরে বসে ছেলে মেয়ের প্রথমবার  বার্গার আইসক্রিম খাওয়ার আনন্দ চেটেপুটে নিচ্ছে। সে অর্থে আপনিও তো এই আনন্দের সামিল।

ভুলে যাবেন না জিনিসটি বিক্রি হওয়ার পর যা বেঁচে থাকে সেখানে কিন্তু বাণিজ্য নেই। হকার হাসিমুখে বলে ওঠেন ,আবার আসবেন দাদা। আবার আসবেন দিদি। আপনিও তৃপ্ত মনে নিশ্চয়ই বলেন,আসব। 

18 COMMENTS

  1. Onekdin por ato sundor akta ramya rachana porlam. Bastobota ke hasyarasher maddhyame koto sundor bhabe tule dhora jaay ta ei lekha porle bojha jaay. Onek shubhechha tomake Shankhadeep. Tomar lekha aro porte chai. Keep up the creative writing. Best of luck.

  2. দারুন লেখা , দেশ এ আপনার একটা লেখা পড়ে ছিলাম। খুব মনে ধরেছিল। এই লেখাটি ও মনে থাকবে। হাসির সাথে মানবিক দিকটির প্রকাশ মুন্সিয়ানা দাবি করে। আপনার আরও লেখা পড়তে চাই।

  3. Hokar der sathe onek lenden hoye chhe. Tai lekhatar sathe nijeke darun relate korte parchi. Sesher ongshotuku khub sundor. . Hokarder onno chokhe dekhbo. Onek dhonyobaad apnake. ..

  4. গরিয়াহাট , হাতিবাগান, ধর্মতলা র ফুটপাত — সব চোখের সামনে জ্বল জ্বল করছে। নিত্য দিনের যাতায়াতের পথে অপরিহার্য
    অঙ্গ কিন্ত এত সুক্ষ চিত্রায়ন মন ভরিয়ে দিল । মনে হল
    এখুনি আরেকবার ঘুরে আসি । খুব সুন্দর লেখা । অনেক শুভেচ্ছা
    এবং আরো অনেক এরকম আবেগ বহুল রচনা যেন পাই খুব তারাতারি।

  5. ভুলে যাবেন না জিনিসটি বিক্রি হওয়ার পর যা বেঁচে থাকে সেখানে কিন্তু বাণিজ্য নেই। হকার হাসিমুখে বলে ওঠেন ,আবার আসবেন দাদা। আবার আসবেন দিদি। আপনিও তৃপ্ত মনে নিশ্চয়ই বলেন,আসব।
    Osadharon. ..

  6. হকার হাসিমুখে বলে ওঠেন ,আবার আসবেন দাদা। আবার আসবেন দিদি। আপনিও তৃপ্ত মনে নিশ্চয়ই বলেন,আসব।

    Osadharon. . Onobodyo. ..

  7. বেশ লেখা। আইজ্যাক নিউটনের বদলে আইজ্যাই আসিমভ! ফাটিয়ে। দেবাশিস দেবের আঁকাটাও।

  8. Bhalo laglo…

    porer bar gariahat gele protidwondi shohoje jite jabe na bhablam….tobe sesher oi hnashimukh aar puri ba digha te ice cream khaowa poribar er cchobi ta porei abar durbolota grash korlo…

  9. Osadharan!! Onekdin por esplanade, gariahat ar college street chokher samne bhase uthlo…
    Seser liner modhye diye manobikatar dik tao khub sundor phute utheche. Good writing keep it up

  10. Khoncha ache.. buddhir chhap ache.. romyo rochonati besh laaglo.. porer lekha porar opekkhay thaklam..