সুপ্রিয় চৌধুরী
জন্ম ও বেড়ে ওঠা উত্তর কলকাতার পুরোনো পাড়ায়। বহু অকাজের কাজী কিন্তু কলম ধরতে পারেন এটা নিজেরই জানা ছিল না বহুদিন। ফলে লেখালেখি শুরু করার আগেই ছাপ্পান্নটি বসন্ত পেরিয়ে গেছে। ১৪২১ সালে জীবনে প্রথম লেখা উপন্যাস 'দ্রোহজ' প্রকাশিত হয় শারদীয় 'দেশ' পত্রিকায় এবং পাঠকমহলে বিপুল সাড়া ফেলে। পরবর্তীতে আরও দুটি উপন্যাস 'জলভৈরব' (১৪২২) এবং 'বৃশ্চিককাল' (১৪২৩) প্রকাশিত হয়েছে যথাক্রমে পুজোসংখ্যা আনন্দবাজার এবং পত্রিকায়। এছাড়া বেশ কিছু প্রবন্ধ এবং দু চারটি ছোটগল্প লিখেছেন বিভিন্ন পত্রপত্রিকা আর লিটিল ম্যাগাজিনে। তার আংশিক একটি সংকলন বই আকারে প্রকাশিত হয়েছে 'ব্যবসা যখন নারীপাচার' শিরোনামে। ২০১৭ সালে পেয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি পুরস্কার।

ডালভাত

হাইওয়ে থেকে হলদিয়া মোড় ঘুরে দীঘা যাওয়ার রাস্তায় মঠচণ্ডীপুরের মুখে বাঁদিকে বাঁক নিলো আমাদের গাড়িটা। গন্তব্য নন্দীগ্রাম। সন্ধ্যে প্রায় সাতটা। শহুরে কাজকম্মো ফেলে ভর সন্ধ্যেবেলায় কেন ছুটেছি ওই অজগাঁয়ে সেটা খোলসা করে বলি এবার। ২০১৪। ৭ই মার্চ। গুলি চললো নন্দীগ্রামে। মারা গেলেন একাধিক গ্রামবাসী। গুরুতর আহত অনেকে। প্রতিবাদে উত্তাল হলো কোলকাতা। রাস্তায় নামলো মানুষ। চিরকেলে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো সেই আমিও লাফ দিয়ে নেমে পড়লাম মানুষের ভিড়ে। দিনে দিনে উত্তাল হয়ে উঠলো আন্দোলন। মহাশ্বেতা দেবী, আন্দোলনের অবিসংবাদিত সেনাপতি, আহ্বান জানালেন নন্দীগ্রামে তৎকালীন শাসকদল আর তাদের পুলিশের গুলিতে আহত মানুষদের জন্যে একটি দাতব্য স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়ে তোলা হোক। মহাশ্বেতাদির আহ্বানে সাড়া দিয়ে নন্দীগ্রামে সোনাচূড়ায় একটি প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়ে তুললেন মানবদরদী কয়েকজন ডাক্তারবাবু। সেই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিকিৎসা সরঞ্জাম আর প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র নিয়ে এই মুহূর্তে নন্দীগ্রাম চলেছি আমরা কজন। নন্দীগ্রামে ঢোকার মুখেই কেটে রাখা হয়েছে রাস্তা। ঘুটঘুটে অন্ধকার চারদিকে। গাড়ির সামনে এগিয়ে এলেন কয়েকজন গ্রামবাসী। সকলেই ভূমিরক্ষা কমিটির সদস্য। একজনের হাতে বড় একটা টর্চ। আলো ফেললেন গাড়ির মধ্যে। পরমুহূর্তেই আমাদের মধ্যে দুয়েকজনকে চিনতে পেরে “ওঃ, দাদা আপনারা!” বলে উঠলেন সোল্লাসে। “এই পোল নামিয়ে দে জলদি। দাদারা যাবেন”। চেঁচিয়ে উঠলেন সঙ্গীদের উদ্দেশ্যে। বড় বড় কয়েকটা মজবুত কাঠের তক্তা কাটা রাস্তার ওপর ধরাধরি করে নামিয়ে দিলো সঙ্গীরা। রাস্তা পেরিয়ে গেলো আমাদের গাড়ি। এই একইভাবে অজস্র জায়গায় কেটে রাখা রাস্তা, প্রত্যেকবারই ধরাধরি করে নামিয়ে দেওয়া কাঠের তক্তা … খানাখন্দের হার্ডল টপকাতে টপকাতে রাত সাড়ে দশটা নাগাদ গিয়ে পৌঁছালাম সোনাচূড়া। আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে সোনাচূড়া স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দোতলায়। সোনাচূড়া ময়দানের ঢিলছোড়া দূরত্বে তেখালি বাজার। ভাঙ্গাবেড়া ব্রিজ। এখান থেকেই গুলি চলেছিল ১৪ই মার্চ, সকালবেলা। ব্রিজের ওপারেই খেজুরি। স্থানীয় মানুষের ভাষায় ‘হার্মাদ’ বা তৎকালীন শাসকদলের ক্যাডারদের ঘাঁটি। স্বাভাবিকভাবেই বিপদজনক জায়গাটা, মানে আমরা যেখানে আছি আর কি। আমাদের ঘিরে রয়েছেন ভূমিরক্ষা কমিটির দশ বারোজন সদস্য। নিচুগলায় কথাবার্তা বলছেন নিজেদের মধ্যে। তাঁর টুকরোটাকরা ভেসেও আসছে কানে। “বর্ডারে কজন সোলজার আছে?” চিন্তিত গলায় প্রশ্ন করলেন একজন, পাশে বসা সঙ্গীকে। “চিন্তা করিস না। অন্তত দশজন। গাইবাছুর আছে সবার কাছে। এছাড়া দু বস্তা নাড়ু … এক নম্বরি মুশুর ডাল আর ভাত দিয়ে বানানো”। জবাব দিলেন সঙ্গী। “যাক নিশ্চিন্ত হলাম। দাদারা রয়েছেন … কিছু ঘটে গেলে মুখ দেখানোর জায়গা থাকবে না একেবারে”। একটা স্বস্তির সুর প্রশ্নকর্তার গলায়। শুনতে শুনতে প্রচণ্ড কৌতূহল হলো। উত্তরোত্তর লাফ দিয়ে বাড়ছিলো সেটা। আর থাকতে না পেরে গুটি গুটি পায়ে গিয়ে বসলাম ওদের সামনে। “এই গাইবাছুর ও ডালভাত … মানে এই ব্যাপারগুলো কি?” জিজ্ঞেস করলাম একটু আমতা আমতা করেই। আমার প্রশ্নের উত্তরে ওই একইরকম দ্বিধার ভাব সবার চোখে। নিজেদের মধ্যে কিছুক্ষণ মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলেন সবাই। অতঃপর ওদেরই মধ্যে একজন, গলাখাঁকারি দিলেন একটু, “আরে দাদারা তো আমাদের নিজের লোক, ওদের কাছে লুকোনোর কি আছে”। ওনার কথায় একটু একটু করে মুখ খুলতে শুরু করলেন সবাই। ওদের মুখেই শুনেছিলাম এখানে রাইফেল, মাস্কেট বা একনলা-দোনলা বন্দুকের কোডনেম ‘গাই’ আর রিভলবার, পিস্তল, ওয়ান শটার বা পাইপগান হলো ‘বাছুর’। ‘মুশুরডাল’ আর ‘ভাত’ যথাক্রমে পটাশ আর ম্যাগনেসিয়াম (মোমছাল)। হাত বোমা বানানোর প্রধান দুটি উপকরণ। অতঃপর হাত বোমা মানে যে ‘নাড়ু’ সেটা নিশ্চয়ই এতক্ষণে বুঝে ফেলেছেন সবাই। আরও জেনেছিলাম নন্দীগ্রাম – খেজুরির সীমানাকে ‘বর্ডার’, ভূমিরক্ষা কমিটির সশস্ত্র জঙ্গি সদস্যদের ‘সোলজার’ আর শাসক দলের ক্যাডারদের ‘হার্মাদ’ বলে ডাকা হয় এখানে। শুনতে শুনতে একঝটকায় মনটা পিছিয়ে গেছিল বছর চল্লিশেক আগে। সাতের দশক। আগুন মাখা ঝোড়ো সময়। দেয়ালে লেখা হচ্ছে – ‘৭০ দশককে মুক্তির দশকে পরিনত করুন’। কোড ল্যাঙ্গুয়েজ বা সাংকেতিক ভাষার ছড়াছড়ি চারদিকে। পটাশ আর ম্যাগনেসিয়ামের কোডনেম ‘লাল’ আর ‘সাদা’। রাইফেল জাতীয় বড় আগ্নেয়াস্ত্র ‘হনুমান’ বা ‘বড় রড’। পাইপগান বা ওয়ান শাটার পরিচিত ‘যন্তর’ বা ‘ছোট রড’ নামে। পিস্তল বা রিভলবারের সাংকেতিক নাম ‘মেশিন’, ‘চেম্বার’ বা ‘কালো বিচ্ছু’। আজ এই মুহূর্তে নন্দীগ্রামে যেটা ‘নাড়ু’ সেই হাতবোমা তখন ‘পেটো’, ‘গ্যানা’ বা ‘ছোটমাল’ অলিতেগলিতে, পাড়ার মোড়ে রোগা রোগা, রাগী রাগী চেহারার সব ছেলেছোকরাদের হাতে হাতে … ভাবতে ভাবতে নস্টালজিক হয়ে পড়েছিলাম বেশ খানিকটা। পিছিয়ে যাওয়া অনেকখানি সময়। অদৃশ্য কোন টাইমমেশিনে চেপে … নন্দীগ্রাম থেকে সত্তর দশক। একইরকম উত্তাল সময়। একইরকম দম চাপা, নাছোড়বান্দা, মরণপণ লড়াই। একই যুদ্ধাস্ত্রের পাল্টে যাওয়া কোডনেম … তফাৎ শুধু মাঝখানে বেশ কয়েকটা বছরের। এই যা।

আরও পড়ুন:  ডুগডুগি (পর্ব ১৬)

ক্যাসেট

সেটা দু হাজার আট কি নয় হবে। সোনাগাছিতে যৌনকর্মীদের স্বশাসিত একটি সংস্থার অ্যান্টিট্রাফিকিং বা পাচারবিরোধী প্রজেক্টের সঙ্গে রয়েছি বেশ কিছুদিন হলো। পদ – প্রজেক্ট কো-অরডিনেটর। সোনাগাছি সহ গোটা বাংলার নিষিদ্ধপল্লীগুলোয় নাবলিকা বা অনিচ্ছুক মহিলাদের পাচার করে নিয়ে আসা রুখতেই বছর কয়েক হলো শুরু হয়েছে প্রজেক্টটা। সংস্থার যৌনকর্মী সদস্যা, বিশেষত যারা এই প্রজেক্টের সঙ্গে যুক্ত, সারাদিন ঘুরে ঘুরে নজরদারি চালান এলাকায়। পাচার হওয়া মহিলা, বিশেষত কোন নাবালিকা মেয়ের খোঁজ পেলেই হানা দেন সেই বাড়িতে। মেয়েটিকে উদ্ধার করে নিয়ে আসেন প্রজেক্ট অফিসে। কিছুদিন সংস্থার নিজের শর্ট স্টে হোমে রেখে কাউন্সেলিং করেন। তারপর নিজেরা মেয়েটিকে পৌঁছে দেন তাঁর বাড়িতে। মেয়েটি একান্তভাবেই বাড়ি ফিরতে রাজি না হলে সংস্থার নিজের দায়িত্বে তাকে পাঠানো হয় কোন বেসরকারি হোমে। যেখানে মেয়েটি বিভিন্ন ধরনের হাতের কাজ অথবা লেখাপড়া শিখে ভবিষ্যতে যাতে স্বনির্ভর হতে পারে। এ ধরনের প্রচণ্ড ব্যস্ততাপূর্ণ একটা প্রজেক্টের কো-অরডিনেটর, ফলে নিজের কর্মব্যস্ততাও যাকে বলে তুঙ্গে। সকাল থেকে সোনাগাছি, রামবাগান, কালীঘাট, বৌ-বাজার, খিদিরপুর … সারাদিন টইটই কোলকাতার রেড লাইট এরিয়াগুলো জুড়ে। মাঝেমাঝেই দৌড়ানো বাংলার জেলায় জেলায়। বাড়ি ফেরা হয় না প্রায়ই। মনে আছে এরকমই এক দুপুরে তিনটে বাংলাদেশি মেয়েকে নিজেদের দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করে সবে এসে টিফিন বক্সটা খুলে বসেছি প্রজেক্ট অফিসে, দৌড়োতে দৌড়োতে এসে হাজির কমলাদি। “শিগগির চলুন দাদা। তিনটে নেপালি মেয়ের খোঁজ পেয়েছি ছিনতাই গলিতে (সোনাগাছির এই গলিটা এনামেই পরিচিত এলাকায়, কারণ যে টাকার কথা বলে খদ্দেরকে ঘরে ঢোকানো হয় এখানে তার চেয়ে অনেক বেশি টাকা দাবি করা হয় পরবর্তীতে। না দিতে চাইলে ধমকধামক, গালাগাল, প্রয়োজনে শারীরিক বলপ্রয়োগ পর্যন্ত ীড়ায় ব্যাপারটা।) মঞ্জু বাড়িওয়ালির ঘরে। এক্ষুনি যেতে হবে ওখানে”। কমলাদি। বয়েস পঞ্চাশের কোঠায়। পোড়খাওয়া প্রাক্তন যৌনকর্মী। এলাকার ঘাঁতঘোত নখদর্পণে। একইসঙ্গে প্রচণ্ড লড়াকু এবই সাহসী। গুরুত্ব দিতে হবে দিদির কথাগুলোকে। টিফিন ফেলে ছুটলাম দিদির পিছুপিছু। সঙ্গে আরও দুতিনজন প্রজেক্টের মেয়ে।

অবিনাশ কবিরাজ রো আর সোনাগাছি লেনের মোড় থেকে সোজা রবীন্দ্র সরণীর দিকে এগোতেই হাতের ডানদিকের গলিটা (সরকারি নাম একটা থাকলেও স্বাভাবিক কারনেই সেটা আর উল্লেখ করছি না এখানে)। তিন-চারটে বাড়ির পরই মঞ্জু বাড়িওয়ালির বাড়িটা। মেয়েদের নিয়ে দৌড়ে বাড়ির মধ্যে ঢুকে গেল কমলাদি। সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠবার মুখেই সামনে দাঁড়ানো মঞ্জু বাড়িওয়ালি। বয়েস বছর চল্লিশেক। ভারী ভারী কয়েকটা সোনার গয়না কানে, গলায়, হাতে। ম্যাক্সির ওপর দোপাট্টা। খরখরে ধারালো চেহারা। একদৃষ্টে মাপছে কমলাদিকে। “ক্যাসেট কোথায় রেখেছিস?” মঞ্জুর চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করলো কমলাদি। আমি তো শুনে হাঁ। তবে যে বললো নাবালিকা উদ্ধার করতে যাচ্ছে। কৌতূহলটা চেপে রেখে এগিয়ে গেলাম সামনে। “কোথায় রেখেছিস ক্যাসেট? শিগগির বল…”। ফের তাড়া লাগালো কমলাদি। “সক্কাল সক্কাল কি ফালতু আন্ডসান্ড বকছ? কোন ক্যাসেটফ্যাসেট নেই আমার কাছে”। তেড়িয়া জবাব দিল মঞ্জু। শোনামাত্র রোঁয়া ফোলানো রোঁয়া ফোলানো বনবেড়ালির মত ফ্যাঁশ করে উঠলো কমলাদি – “দ্যাখ মাগি! এই শেষবারের মত বলছি, ক্যাসেট বের করবি কিনা। নইলে … কমলাদির চণ্ডিমূর্তির সামনে এবার কেমন যেন একটু গুটিয়ে গেল মঞ্জু বাড়িওয়ালি। “তোমাদের জ্বালায় তো আর এলাকায় ধান্দা করে খাওয়া যাবে না দেখছি। এসো”। বলে গজগজ করতে করতে দুমদুমিয়ে সিঁড়ি ভেঙে উঠে গেল দোতলায়।

দোতলার শেষপ্রান্তে একটা ঘর। তালাবন্ধ। এগিয়ে গিয়ে তালাটা খুলে দিলো মঞ্জু। হুড়মুড়িয়ে ঘরে ঢুকে পড়ল কমলাদি। ঘরের দুদিকে অন্তত গোটাচারেক আলমারি। “ডাব্বা খোল”। মঞ্জুর দিকে তাকিয়ে চোখ নাচাল কমলাদি। একে একে খোলা হলো আলমারিগুলো। তিন নম্বর আলমারিটার একধারে লম্বা একমানুষ সমান একটা খোপ। সেখানে ভয়ে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বছর চোদ্দ-পনেরোর একটা নেপালী মেয়ে। মেয়েটিকে বের করে আনলো প্রজেক্টের দিদিরা। বাকি সবকটা আলমারি ঘেঁটে ঘেঁটে তল্লাশি চালালো কমলাদি। তারপর ফের ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো মঞ্জু বাড়িওয়ালির দিকে। “বাকি দুটো ক্যাসেট কোথায়?” বিশ্বাস করো দিদি। আর একটাও ক্যাসেট নেই আমার কাছে”। মিনমিন করে বললো মঞ্জু। কথাবার্তার মাঝখানেই চোখ গেল মেঝেতে পাতা কার্পেটের ওপর। “কাগজ হাটা”। ধমকের সুরে বলল কমলাদি। নিমপাচন খাওয়া মুখ করে কার্পেটটা সরিয়ে দিলো মঞ্জু। তোলা মাত্র বিস্ময়ে জমে পাথর হয়ে গেলাম আমি। মেঝের মাঝখানে হাতল লাগানো চৌকোনা একটা কাঠের পাল্লা। “গাব্বা খোল”। দলের মেয়েদের নির্দেশ দিলো কমলাদি। প্রজেক্টের অল্পবয়েসি  দুজন গিয়ে হ্যাঁচকা টান মেরে খুলে ফেললো পাল্লাটা। হাতদশেক লম্বা আর হাত চারেক উঁচু একটা অন্ধকার চোরকুঠুরি। তার মধ্যে গুড়িসুড়ি মেরে বসে থাকা আরও দুটি নেপালী মেয়ে। আগের মেয়েটারই বয়েসি। চোখে ভয়ার্ত দৃষ্টি। “উপর আও, কই ডর নেহি”। হাত বাড়িয়ে দিলো কমলাদি। কাঁপতে কাঁপতে উঠে এলো মেয়েদুটো। চোখে জল। মঞ্জুর দিকে তাকিয়ে একটা ত্যারচাটে হাসি হাসলো কমলাদি। “কিরে ঢেমনি? এতো এতো একদম সোনি সিরিজের মাল তুলে এনেছিস দেখছি। যাকগে সবকটা ক্যাসেট উদ্ধার হয়েছে, তাই অল্পের অপর দিয়ে ছেড়ে দিলুম। পরের বার ক্যাসেটের কারবার করলে কিন্তু সিধে লালবাজার। অ্যান্টিট্রাফিকিং সেকশন। কথাটা মনে থাক যেন।চলুন দাদা। চল সক্কলে”। বলে সবাইকে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল গটগটিয়ে।

আরও পড়ুন:  মিউজিক্যাল চেয়ার

শর্ট স্টে হোমে মেয়ে তিনটেকে রেখে ফিরে এসেছিলাম প্রজেক্ট অফিসে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আর ফর্ম ফিল-আপের ফাঁকে ফাঁকে কমলাদির কাছেই শুনেছিলাম গল্পটা। অন্ধকার পাচার জগতের কাহিনী আর সাংকেতিক ভাষা। পাচারকারী বা তাদের খদ্দেরদের ভাষায় নাবালিকা মেয়ের কোডনেম “ক্যাসেট”। একদিক লম্বা, বিশেষভাবে তৈরি আলমারির নাম “ডাব্বা”। কার্পেট আর চোরকুঠুরির নাম যথাক্রমে “কাগজ” আর “গাব্বা”। সুন্দরী নাবালিকা মেয়ে, যাকে বেশি দামে বিক্রী করা যাবে, আদিম এই নারীমাংসের বাজারে সে হলো “সোনি সিরিজের ক্যাসেট”। তুলনামূলকভাবে সাধারণ বা সাদামাটা মেয়ে (ক্রয় বা বিক্রয় মূল্য দুটোই কম) পাচার দুনিয়ায় পরিচিত “টি সিরিজ ক্যাসেট” নামে। দ্রুত যুগ পাল্টাচ্ছে। বিশ্বায়নের জেটগতি পরিবর্তনশীল বাজারে ক্যাসেট এখন ইতিহাসের পাতায়। তার বদলে সি ডি। সেও প্রায় বাতিলের খাতায়। এখন শুধু পেন ড্রাইভ আর ডাউনলোড। প্রজেক্টের কাজটা শেষ হয়ে গেছে অনেক দিন। শুনেছি কমলাদিও নাকি ছেড়ে দিয়েছে সংস্থার কাজটা। নানা কারণে যাওয়া হয়ে ওঠেনি ওদিকটায় খুব বেশি একটা। ফলে জানা হয়নি ট্র্যাফিকাররাও তাদের কোড ল্যাঙ্গুয়েজ ক্যাসেট থেকে পেন ড্রাইভ আর ডাউনলোডে বদলে নিয়েছে কিনা।

কাটিং – চায়

এখনও স্পষ্ট মনে আছে সালটা ছিল উনিশ শো সাতানব্বই। একটা নামী সোশ্যাল রিসার্চ অর্গানাইজেশনে চাকরি করি তথন। সিনিয়র রিসার্চ একজিকিউটিভ। বেশ কয়েকটা আন্তর্জাতিক সামাজিক সংস্থার তরফ থেকে বড় একটা কাজের বরাত পেল আমাদের অফিস। অনেক টাকার প্রজেক্ট। প্রজেক্টের নাম  – ভালনারেবিলিটি অফ এইচ আই ভি অ্যান্ড এইডস অ্যামঙ্গ মাইগ্রান্ট লেবারস। দিল্লী, কোলকাতা, মুম্বই, চেন্নাই – এই চারটি শহরে পরিযায়ী শ্রমিকদের সঙ্গে সাক্ষাতকারের ভিত্তিতে তথ্য সংগ্রহ হবে। কোলকাতা থাকতে মুম্বইয়ের জন্য আমাকেই কেন অফিস ‘ছাই ফেলতে ভাঙ্গা কুলো’ হিসেবে বেছে নিয়েছিল সেটা আজও অসীম রহস্য আমার কাছে। যাইহোক, কনসাইনমেন্টটা হাতে পাওয়ার পর বাক্সপ্যাঁটরা গুছিয়ে নিয়ে তো পৌছালাম মুম্বই। আমার কাছের এলাকা ধারাভি আর লেবার লাইন। এশিয়ার বৃহত্তম দুই বস্তি অঞ্চল। প্রচুর পরিমানে পরিযায়ী তামিল শ্রমিকের বসবাস এখানে। ধারাভি। বিখ্যাত (নাকি কুখ্যাত?) আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন বরদারাজন মুদলিয়রের (কমল হাসান অভিনীত নায়কন আর বিনোদ খান্নার দয়াবান সিনেমা দুটি এই চরিত্রটি অবলম্বনে তৈরি) ঘাঁটি এলাকা। বরদারাজন আর নেই। তাসত্ত্বেও এলাকাটা যথেষ্ট বিপদজনক এখনও। ঘিঞ্জি বস্তি এলাকা। ওখানকার ভাষায় ঝোপড়পট্টি। কয়েকদিন ঘোরাফেরা করলাম আশপাশ দিয়ে। ভিতরে ঢোকার সাহস হলো না। মুম্বাই অফিস থেকে আমার সঙ্গে যাকে জুড়ে দেওয়া হয়েছিল, এক মহা ফাটকাবাজ মুম্বাইয়া ছোকরা, দুদিন বাদেই “ইয়ে লফড়াওয়ালা কাম হামসে নেহি হোগা”। বলে চলে গেল অন্য একটা প্রজেক্টের বাহানা দেখিয়ে। আমি পড়লাম অথৈ জলে। কিন্তু জেদ চেপে গেল মনে মনে। বের করে আনতেই হবে কাজটা। অগত্যা শরণাপন্ন হলাম আমার ঘনিষ্ঠ এক বন্ধুর। ও তখন মুম্বইয়ে ফ্রিলান্স জার্নালিস্ট। অনেকগুলো নামী সংবাদপত্রের সঙ্গে যুক্ত। সব শুনেটুনে আমাকে বললো “তুই এক কাজ কর। বাংগালি দাদার কাছে চলে যা। নাম জে দে। মিড-ডে পত্রিকায় কাজ করেন। মুম্বাইয়ের একনম্বর ক্রাইম রিপোর্টার। গিয়ে আমার রেফারেন্স দিস। মনে হয় তোর কাজ হয়ে যাবে”। অতঃপর ডুবন্ত মানুষের মত খড়কুটো থুড়ি বন্ধুর রেফারেন্সটুকুকেই আঁকড়ে ধরে রওনা দিলাম বাংগালি দাদার বাড়ি। অন্ধেরিতে আটতলা হাইরাইজ। সম্ভবত দোতলায় ছিল ফ্ল্যাটটা। দরজায় নেমপ্লেটে লেখা – জ্যোতির্ময় ন্যাপিয়েন দে। বাবা প্রবাসী বাঙ্গালী। মা গোয়ানিজ ক্রিশ্চান। একবর্ণ বাংলা জানেন না। দরজা খুললেন নিজে। টানটান মেদহীন চেহারা। বয়স মাঝ চল্লিশের কোঠায়। “ক্যা চাহিয়ে?” প্রশ্ন চোখে। বন্ধুর রেফারেন্স দিতে ঢুকতে বললেন ঘরে। আমার কাছে পুরোটা শোনার পর ভ্রু কুঁচকে ভাবলেন কয়েক মুহূর্ত। তারপর তাকালেন আমার দিকে। “ইনফরমেশন চাহিয়ে তুম কো। এক কাম করো। ইহা সে সিধা ধারাভি চলা যাও। উহা যাকে কৃষ্ণান কা নাম বোলনে কা। কোই ভি বতা দেগা। পুছনে সে বোলনা বাংগালি দাদা নে ভেজা। তুমহারা কাম হো যায়গা”।

আরও পড়ুন:  সাগর আই লাভ ইউ (পর্ব ১১)

ধারাভি। নোংরা ঘিঞ্জি রাস্তা। কাঁচা নর্দমা থেকে উঠে আসা গা গোলানো উৎকট গন্ধ। সার সার ঝুপড়ি বস্তি। চারদিকে ছড়ানো প্লাস্টিক আর আবর্জনা। সন্দেহজনক লোকজনের ঘোরাফেরা চারপাশে। সরু সরু গলি তস্য গলি। এর ওর গায়ে মিশে কোথায় যে গিয়ে শেষ হয়েছে জানা নেই। সেই গোলকধাঁধার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিলাম আমি। স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম এলাকায় ঢোকার পর থেকেই নজরে রাখা হচ্ছে আমাকে। এটা চলতে দেওয়া যাবে না বেশিক্ষণ। বিপদ হতে পারে। সামনে অ্যাসবেসটাসের চাল লাগানো একটা ক্লাবঘর মত। ভিতরে বিশাল একটা ক্যারাম বোর্ডের সামনে ভিড় করে দাঁড়িয়ে থাকা জনা দশ বারো ছেলে। এগিয়ে গিয়ে কৃষ্ণানের নাম বলতেই তিড়িং করে কুঁচকে গেল সবার চোখের ভুরু। “ভাই সে ক্যায়া কাম হ্যায়?” তেরিয়া গলায় প্রশ্ন করলো একজন। বাধ্য হয়ে জে দে-র রেফারেন্স দিতে হলো। শোনার পর একটু যেন নরম হলো সবার চোখমুখের চেহেরা। “আপ ইহা ঠ্যাহেরো” বলে ঘর থেকে বেড়িয়ে গেল দু-তিনজন। মিনিট দশেক বাদে দরজা দিয়ে ঢুকলো একজন। দেখামাত্র ছোটবেলায় ‘ছবিতে মহাভারত’ বইয়ে দেখা একটা চেহারাই ভেসে উঠলো চোখের সামনে। ঘটোৎকচ। ধবধবে সাদা হাফশার্ট আর দক্ষিনী কায়দায় ভাঁজ মারা লুঙ্গি। গাত্রবর্ণ আলকাতরাকেও লজ্জা দেবে। দুহাতে সসেজের মত আঙুলগুলোয় আটটা পাথর বসানো আটটা আংটি। গলায় গোটা দুয়েক সোনার হার। কুকুর বাঁধা চেনের মত মোটা। রক্তলাল চোখে আমার দিকে তাকালো লোকটা। “ম্যায় কৃষ্ণান। ক্যা মাঙ্গতা হ্যায়?” ফলে সবিস্তারে আরেকবার বলতে হলো ব্যাপারটা। শোনার পর গরিলার মত হাতের পাঞ্জায় আমার কাঁধে সস্নেহ একটা থাবড়া মারলো কৃষ্ণান “বাংগালি দাদা নে ভেজা আপকো। আপুন (আমি) বহত ইজ্জত করতা হ্যায় উসকা। আপকো কাটিং-চায় চাহিয়ে। মিল যায়গা”। বলে তাকালো পাশে দাঁড়ানো সহচরদের দিকে। “ইহা আশপাশ যিতনা কামগারলোগ (শ্রমিক) হায়, সবকো যাকে বোল কৃষ্ণাভাই নে বুলায়া। কাটিং চায়ওয়ালা কাম হ্যায়”। ঘাড় নেড়ে মুহূর্তে ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে গেল কয়েকজন। আমার তো চাই তথ্য কিন্তু কাটিং-চায় বস্তুটা কি? ভয়ে ভয়ে কথাটা জিজ্ঞেস করতেই জালার মত গুমগুমে গলায় হেসে উঠল কৃষ্ণান। অতঃপর ওর মুখ থেকেই শুনেছিলাম গল্পটা। মুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের কোডভাষায় ‘কাটিং-চায়’ মানে ইনফরমেশন আদান-প্রদান বা শেয়ার করা। আমাদের এখানে এক কাপ চা দুজনে ভাগ করে খাওয়ার মত। ওদের ওখানে অনেক সময়ই এইসব গোপন তথ্যগুলোর আদানপ্রদান হয় এলাকার ইরানি চায়ের হোটেলগুলোয়। আন্ডারওয়ার্ল্ডের লোকজন আর ইনফর্মাররা তো বটেই পুলিশের লোকেরাও এই কোডভাষাটা ব্যবহার করে থাকেন হরবখত।

অতঃপর কৃষ্ণানের প্রত্যক্ষ সহায়তায় পরিযায়ী শ্রমিকদের কাছ থেকে তথ্য পেতে কোন অসুবিধেই হয়নি। ঘণ্টাদেড়েক ইন্টারভিউয়ের পর আরও ঘণ্টাখানেক জমজমাট আড্ডা হয়েছিল কৃষ্ণান আর তার দলবলের সঙ্গে। কথাবার্তার মাঝখানেই পেয়ে গেছিলাম এরকম আরও অনেক ‘টপোরি বোলি’ বা কোডভাষার সন্ধান। যেমন ‘পেটি’ মানে লাখ। ‘খোকা’ মানে কোটি। ‘ঘোড়া’ মানে আগ্নেয়াস্ত্র। ‘ক্যাপসুল’ মানে বুলেট। ‘খোলি’ মানে ঘর। ‘কালা সাবুন’ মানে আর ডি এক্স। ‘আনার’ (বেদানা) মানে গ্রেনেড। ‘সুপারি’ মানে ভাড়াটে খুনি। ‘লোচা’-র অর্থ ছোটখাটো ঝামেলা। ‘লাফড়া’ মানে বড়সড় গণ্ডগোল। ‘আইটেম’ অর্থাৎ সুন্দরী মহিলা। ‘পটাকা’ মানে সেক্সি। ‘টপকানা’, ‘গেম বাজানা’ বা ‘খাল্লাস’-এর অর্থ খুন … ইত্যাদি ইত্যাদি। শেষে যেটা সবচেয়ে মর্মান্তিক, যার ঐকান্তিক সহযোগিতা ছাড়া ওরকম একটা আঁধারি দুনিয়ার মধ্যে ঢোকাটা কখনোই আমার পক্ষে সম্ভব হতো না, সেই প্রবাদপ্রতিম ক্রাইম রিপোর্টার জ্যোতির্ময় ন্যাপিয়েন দে, বছরখানেক বাদে অজ্ঞাত আততায়ীর বুলেটে বুলেটে ঝাঁঝরা হয়ে গেছিলেন প্রকাশ্য দিবালোকে খোলা রাস্তার ওপর। তদন্তে ঘটনার পিছনে উঠে এসেছিল কুখ্যাত আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন ছোটা রাজনের নাম। শেষ পর্যন্ত সেই তদন্তের কি পরিনতি হয়েছিল সেটা অজানা। জে দে আর নেই। কিন্তু সেদিন ওর নিঃস্বার্থ উপকারের কথাটা ভুলবো না কোনদিন।

1 COMMENT

  1. অসাধারণ অনায়াস লিখন যা আমাদের এক লহমায় পৌঁছে দেয় অজগতের অলিগলিতে।

এমন আরো নিবন্ধ