গৌরচন্দ্রিকা

 

আমি এই গল্পে কোথাও নেই | মানে, এই গল্পটা আমাকে নিয়ে নয় | এবার এই গল্প যাদের নিয়ে, তারা তো কোথাও একটা থাকে | সেই জায়গাটা, ধরা যাক, একটা পাড়া । আর ঘটনাচক্রে, সেই পাড়ায় আমিও থাকি | কিন্তু থাকলেই কি লেখা যায়   ? এই গল্প যাদের নিয়ে, সেই বিড্ডু, সঞ্জয়, প্রতীক, আকাশনীল, জিকো, অনুরাগ, ডাকু – এমন কী করেছে, যাতে ওরা হয়ে উঠতে পারে গল্পের চরিত্র, হাইজ্যাক করে নিতে পারে যে কোনও সহৃদয় পাঠকের পঁচিশ-তিরিশ মিনিট? আচ্ছা, ওরা যাদের প্রতি, ওদের অনেকের ভাষায়, ‘ইন্টারেস্টেড’, সেই শ্রেয়সী, মহুয়া, গুড্ডি, সংঘমিত্রা’রা কেউ কি ওদের দিতে পারে সেই প্রয়োজনীয় লিফট, যাতে কোনও একটা ঘটনা ওদের ভিতর থেকে একটি বা দুটি জুটিকে নিয়ে সাঁ করে উঠে যাবে আকাশপানে, নিদেনপক্ষে দশতলায়! আর আমরা টের পাব যে, না একটা ঘটনা ঘটল বটে? দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, বোধহয় না | ওই সাইকেল, বড়জোর বাইক; কোনও লেক-ফেক কিংবা এখনও বেঁচে থাকা দু’একটা বড় মাঠের অন্ধকার; ক্কচিৎ-কদাচিৎ ভালো রেস্তরাঁ আর মাঝে মাঝে শহরের কোনও ঝাঁ চকচকে মলে শপিং | থুড়ি, জানলা শপিং | তো, এই নিয়ে আর নতুন কী-ই বা গল্প হবে যতক্ষণ পর্যন্ত না অম্বালিকা জড়িয়ে যাচ্ছে ওদের জীবনের সঙ্গে। বালিকা ? না, অম্বালিকা | সে তো সাধারণ নয় যে উপেক্ষা করা যাবে, স্বপ্ন নয় যে রাত পোহালেই ভুলে যাওয়া যাবে, ভূত নয় যে স্মৃতিতে রেখে দেওয়া যাবে, ভবিষ্যত নয় যে অপলক তাকিয়ে থাকা যাবে | সে লঙ্কার সেই অতুলনীয় ঝাল, খাবারের ভিতরে থাকলে যা খাবারের স্বাদ বাড়িয়ে তোলে অনেকটা, কিন্তু সরাসরি জিভে এসে লাগলে অ্যাক্সিডেন্ট | কিংবা একটা গল্প | যা এখন শুরু হতে চলেছে |

 

স্বপ্ন ও সকাল

 

ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে আকাশনীল যে স্বপ্নটা দেখছিল সেটা ও এখন ফি হপ্তায় তিন-চারবার দ্যাখে| নতুন কোনও রান্নার স্বপ্ন | তবে এবারে ঠিক রান্না নয়, গরম গলতে থাকা  চিজে স্ট্রবেরি, আনারস, আপেল ডুবিয়ে নতুন যে থিম ডেজার্ট শহরের বড় বড় হোটেলের মেনু-কার্ডে জায়গা করে নিয়েছে, তাতে ছোট-ছোট মিষ্টি পাঁউরুটির স্লাইস জুড়ে দিলে স্বাদ বাড়বে না কমবে, তাই নিয়ে বসের সঙ্গে তর্ক চলছিল আকাশনীলের। ওর বসের ধারণা, ওই গলন্ত চিজে কোকো ঢেলে দিলে ব্যাপারটা অনেক আকর্ষণীয় হবে | কিন্তু আকাশনীলের বক্তব্য, কোকো দিলে জিনিসটা চকোলেটের এলাকায় ঢুকে যাবে | চিজের চিজত্ব আর থাকবে না |আর সেটা না থাকার মানে, আকাশ্নীল থেকে ‘আকাশ’ বাদ দিয়ে দেওয়া।

আকাশনীলের আকাশ অবশ্য বহুদিনই চার দেওয়ালের মধ্যে ঢুকে গিয়েছে, বিশেষ করে দ্বিতীয় সেমেস্টারে প্রচন্ড চাপ শুরু হওয়ার পর থেকে! ও হোটেল ম্যানেজমেন্ট পড়ে কোনও বিশেষ শখ থেকে নয়, জয়েন্ট এন্ট্রান্স দিয়ে পায়নি, তাই | কিন্তু চাপটার ভিতরে ঢুকে চাপটাকে, ভয় না পেয়ে, ভালোবাসতে চেষ্টা করে যারা, আকাশনীল তাদের দলেই। তাই ও বুঝে গিয়েছে, এই পেশায় মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে গেলে রান্নাটা জানতেই হবে | নইলে শুধু অর্ডার নিতে-নিতে আর খাবার সার্ভ করতে-করতেই বেলা বয়ে যাবে | রিসেপশন কিংবা অ্যাকাউন্টসে যাওয়াই যায়, কিন্তু তা হলে আর হোটেলে আসা কেন?

 

সে যাই হোক, সামান্য বেলা করে ঘুম থেকে উঠে আকাশনীল শুনল যে, অম্বালিকা ওর খোঁজে ওদের বাড়িতে এসেছিল | অম্বালিকা! আকাশনীল অবাক হয়ে গেল খানিকটা | আগে যখন এই কোর্সটায় ঢোকেনি, তখন অনেকদিন ও দাঁত মাজতে-মাজতে বাইরের গেটের সামনে দাঁড়াত আর দেখত হাঁটু পর্যন্ত ফিনফিনে স্কিন কালার মোজা পরে অম্বালিকা গটগট করে হেঁটে যাচ্ছে রাস্তা দিয়ে | ঘাড়টা সামান্য উঁচু, সামান্য বাঁকানো | স্পর্ধায় নাকি তাচ্ছিল্যে? ওর মনে বহুবার এই প্রশ্ন জেগেছে, তবে উত্তর খুঁজবে কার কাছে ? অম্বালিকা তো এয়ার হোস্টেসের ট্রেনিং নিতে শুরু করার পর আশপাশের কাউকে আর মানুষ বলেই মনে করত না! আকাশনীল যে তাতে কিছুটা হার্ট হয়নি, তা নয়! তবে মেয়েদের ব্যাপারে ওর মনের মধ্যে একটা ইগো ক্রিয়াশীল | একবার অষ্টমীর সন্ধ্যায় মহুয়া ওর হাত থেকে ধুনুচিটা প্রায় কেড়ে নিয়ে বিড্ডুকে বলেছিল, ‘বিড্ডু ভীষণ ভালো নাচে | তুই একটু বসে যা প্লিজ |’ মনে-মনে সেদিনই ও মহুয়াকে বসিয়ে দিয়েছিল একদম | এইচএসের পর একসঙ্গে একটা সিনেমা দেখার জন্য মহুয়া ঝুলোঝুলি করছিল | কিন্তু মন তো আর ব্ল্যাকবোর্ড নয় যে, বারবার মোছা যাবে, লেখা যাবে আবার | মহুয়া তাই আর কোনওদিনই পাত্তা পায়নি ওর কাছে | কিন্তু অম্বালিকার ব্যাপারটা আলাদা | ও সেই ডিজাইনার কড়াইটার মতো, যেটাতে বসিয়ে রাঁধলে যে কোনও রান্নারই স্বাদ খুলে যেতে বাধ্য | অথচ খুব যে টানা-টানা চোখ, টিকলো নাক তা কিন্তু নয়, রংটাও ঝকঝকে ফর্সা না| বরং  নরম হলদেটে একটা আভা ! কিন্তু না ছোট, না বড় চোখ, একটু চাপা নাকের সঙ্গে ওই নরম রংটা এত অসামান্য জেল করে গিয়েছে যে, দশে দশ ছাড়া আর কিছু দেওয়ার নেই | আসলে আম্বালিকার অ্যাপিয়ারেন্স এমনই যে, প্রত্যেকটা ব্যাপার খুঁটিনাটি তলিয়ে দেখার অবকাশ পাওয়া যায় না | একটা দমকা ঝড়ে ওলটপালট হয়ে যায়   সবকিছু | ওর স্বভাবের কাঠিন্য আর চেহারার পলি মিলেমিশে এমন একটা কন্ট্রাস্ট তৈরি করে, যার সামনে এসে অনেক মাতব্বরই তুতলে যাবে!

 

আকাশনীল তোতলায় না | কারণ ও কথাই বলে না | অবহেলা করার সুযোগই দেয় না অম্বালিকাকে। | আর তাছাড়া ওরই বা সময় কোথায়? একটু বেলাবেলি বেরিয়ে সেই রাত করে ফেরা | আর সারাটা দিন একটা ঘরের মধ্যে কাটানো | ইতালিয়ান  থেকে ইথিওপিয়ান রান্না – ওর স্পেশালাইজেশনের প্রত্যেকটা জানলা খুললেই ভেসে আসে নানারকম মশলার গন্ধ, নরম, কড়া নানারকম আগুনের আঁচ | বেশি কিছু এখনও না বুঝলেও আকাশনীল টের পায়, তাওয়ায় পড়লে তবে মশলার আসল গন্ধ খোলে | অবশ্য তাওয়ার নীচে যদি আগুনের ছোঁয়া থাকে | ঘুম থেকে উঠে আম্বালিকার আসার খবরটা শুনে মনে হল, ও সেই ছোঁয়াটা পেয়েছে | অনেকটা মশলার গন্ধর মতোই ভাসতে-ভাসতে ও অম্বালিকার বাড়িতে গিয়ে পৌঁছল | বাড়িতে নেই শুনে অপেক্ষা করল কিছুক্ষণ | ওর মায়ের দেওয়া কফি খেল |  আর অধৈর্যভাবে বেজে ওঠা কলিংবেলটা শুনেই বুঝল দরজার বাইরে কে দাঁড়িয়ে আছে ! কিন্তু অম্বালিকার মা দরজাটা খুলতেই বিস্ময়ে বোবা হয়ে গেল আকাশনীল | কেটে ফেলেছে? সামনের অত সুন্দর লকস দুটো কেটে ফেলেছে?

 

ওরা চারজন

 

বিড্ডু বলল, মাইরি কাল রাতের খবরটা শোনার সময়ও বুঝতে পারিনি, এতবড় একটা ধামাকা হতে যাচ্ছে |

সঞ্জয় সিগারেটের কাউন্টারটা অনুরাগের থেকে ছিনিয়ে নিয়ে, চাপা উল্লাসের গলায় বলল, কেন, টিভিতে একদম স্পষ্ট করে জানাল তো, একসঙ্গে অনেককে ছাঁটাই করে দিয়েছে।

অনুরাগ বরাবরই একটু চাপা | কিন্তু এই ব্যাপারটা এমনই যে, কৌটোর ঢাকনা না খুলে উপায় নেই | ও একটু নিচু গলায় বলল, এরকম দুম করে চাকরি খেয়ে নেওয়াটা একদমই উচিত নয় | যার যায়, সে-ই বোঝে কী হয় |

বিড্ডু খিঁচিয়ে উঠে বলল, আহা রে! তোর যে দরদ উথলে উঠল দেখছি | চাকরি গিয়েছে বেশ হয়েছে, উচিত শিক্ষা পেয়েছে |”

  • যেমন দেমাক ছিল, তেমনি দড়াম করে পড়ল মাটিতে | এবার দ্যাখ কেমন লাগে। সঞ্জয় ফোড়ন কাটল |

অনুরাগ ওদের দিকে তাকিয়ে অল্প একটু হাসল শুধু | কিছু বলল না | ও জানে বিড্ডু আর সঞ্জয়ের কেন রাগ অম্বালিকার ওপর | আচ্ছা রাগ কি ওর নিজেরও একটু নেই? সেই যে পড়তে আসত ওর কাছে, একবছরের মাত্র ছোট হওয়া সত্ত্বেও খুব যত্ন করে ‘দাদা’ ডাকত আর সেই ডাকটা একটু নুনকাটা, একটু থ্রিলিং করে তুলত মাঝে-মধ্যেই, সেসব ভাবলে আজও কি গায়ে কাঁটা দেয় না অনুরাগের? দেয়| কিন্তু আর একটা কথা মনে পড়লেই সমস্ত শরীর যেন চিড়বিড় করে ওঠে রাগে | কেন বলেছিল ও সংঘমিত্রার কাছে ওরকম একটা কথা?

প্রতীক ওর হাঁটুতে একটা চাপড় মেরে বলল, কী হল বস, অম্বালিকার চাকরি যাওয়াতে তুমি মনে হচ্ছে ভীষণ মুষড়ে পড়েছ?

অনুরাগ আবারও কিছু না বলে হাসল |

বিড্ডু জিজ্ঞেস করল, ‘অম্বালিকা’ নামটা যেন আসলে কার?

প্রতীক কত কী পড়েছে, একটু বলতে ভালবাসে | ও তাড়াতাড়ি শুরু করে দিল মহাভারতের প্রসঙ্গ | ‘অম্বা’, ‘অম্বিকা’ আর ‘অম্বালিকা’ | এরা তিন বোন, এদের মধ্যে ভীষ্মের বিয়ে করার কথা ছিল…

 

অন্যদিকে কথাটা ঘুরে যেতে হাঁপ ছাড়ল অনুরাগ | কিন্তু মনের মধ্যে খচখচানিও একইসঙ্গে বাড়তে থাকল | ওই যে ভীষ্মের কথা বলছে প্রতীক, ভীষ্ম তো একটা প্রতিজ্ঞা করেছিল! ততটা জোরালো না হলেও অনুরাগেরও একটা প্রতিজ্ঞা ছিল | সেদিন জন্ম নিয়েছিল প্রতিজ্ঞাটা যেদিন সংঘমিত্রা ওকে এসে বলেছিল, তুমিও নাকি ছক করার চেষ্টা কর অম্বালিকাকে? সাহস নেই বলে মুখ ফুটে কিছু বলতে পার না! শুধু হাবেভাবে বোঝানোর রাস্তা খোঁজো?

অপমানে নীল হয়ে গিয়েছিল অনুরাগ | দাঁতে-দাঁত চেপে জিজ্ঞেস করেছিল, কে বলল?

আরও পড়ুন:  সাগর আই লাভ ইউ (পর্ব ১১)

– কে বলতে পারে ? চোখ ছোট করে তাকিয়েছিল সংঘমিত্রা |

– হেঁয়ালি কোরো না | কে বলেছে সেটা বলো |অনুরাগ রেগে গিয়েছিল।

– অম্বালিকাই বলেছে | আবার কে বলবে ? খিলখিল করে হেসে উঠেছিল সংঘমিত্রা।

 

অনুরাগ সেদিন রাতেই ঠিক করে নিয়েছিল যে অম্বালিকার সঙ্গে আর কোনও কথা নয় | কোনও যোগাযোগই নয় আর। ঠিক করে নিতে নিতে শাওয়ারের জলে অনেকটা চোখের জল মিশিয়ে দিয়েছিল নিজের | লোকে যাকে বলে, ‘ফিলিং’ | আর লাটাইয়ের সুতোর মতো গুটিয়ে নিয়েছিল নিজেকে, পরদিন থেকেই | এমনভাবে গুটিয়ে নিয়েছিল যাতে অম্বালিকা কিছু বুঝতে না পারে | তবু ও হয়তো বুঝতে পেরেছিল কিছুটা | ফোন করে জিজ্ঞেস করত মাঝে-মাঝে, অনুরাগ ওর ওপর রেগে আছে কি না।

-চটাচটি করার মতো সময় নেই রে। অনুরাগ এমন একটা উত্তর দিত, যাতে সিগন্যাল সবুজ হয়ে যায়, কিন্তু কুয়াশা কাটে না |

কেন কাটাবে কুয়াশা? অম্বালিকা ভেবে দেখুক, ও কবে কোন অন্যায় করেছে   অনুরাগের সঙ্গে | ভেবে তল না পেলে, আবার ভাবুক | যদি অবশ্য অনুরাগের মুখ ঘুরিয়ে নেওয়ায় ওর বিন্দুমাত্র কষ্ট হয়! অবশ্য কষ্ট হলেও অনুরাগের আজ আর কিছু করার নেই | ও আজ অন্য একটা মেয়ের সঙ্গে…

 

অনুরাগ জানে, সেই মেয়েটার প্রতি ওর একটা দায়বদ্ধতা আছে | আজকের ব্যাপারটা ওকে বলে দেওয়া উচিত! কিন্তু কীভাবে বলবে সেই কুয়াশাটার কথা, যার পিছনে একটা মুখ আজও অসম্ভব স্পষ্ট?

 

একটি কুঁড়ি, দুটি পাতা

 

-মনে আছে তো গুরু, আমাদের সঙ্গে কী লাফড়া হয়েছিল? কতদূর গিয়েছিল কেসটা?বিড্ডু সঞ্জয়কে বলল|

-মনে আবার নেই | কিন্তু যাই বল, কেসটা কিচাইন হয়ে গেল শুধু তোর জন্য | নইলে…

– আচ্ছা, এখন যত দোষ নন্দ ঘোষ! তুই ডেকে আনতে বলিসনি অম্বালিকাকে?  বিড্ডু রেগে গেল |

সঞ্জয় একটা সিগারেট ধরিয়ে বলল, বলেছিলাম | কিন্তু আনার সময় হাত তো ধরতে বলিনি |

সে তো রাস্তায় সাঁ-সাঁ করে লরি ছুটছিল, যদি একটা অ্যাকসিডেন্ট হয়ে যায়, সেই ভয়ে ধরেছিলাম | ওটাই বড় হল?  বিড্ডু অভিমানভরা গলায় বলল |

 

-বড় হল, না ছোট হল তার ফল তো আমরা হাতেনাতেই পেলাম! শ্রেযসীর মা রিপোর্ট দিল যে, তুই নাকি অম্বালিকার হাত ধরে টানতে-টানতে রাস্তা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলি। শুনে, গুড্ডি আর আরও দুটো মেয়ে রিহার্সাল থেকে বেরিয়ে গেল | পুরো নাটকটাই চৌপাট হয়ে গেল আমাদের |

-শুধু নাটক বলছিস কেন, আমাদের গ্রুপটাই তুবড়ে গেল, নীল-ফিলরা আমাদের মতো ছেলেদের সঙ্গে রিলেশন রাখবে না বলল; পাড়ার মেয়েমহলে ফালতু ছোট হয়ে গেলাম আর অম্বালিকা আমাদের সাপোর্টে একটা কথা পর্যন্ত বলল না |

-চুপ কর | এগেনস্টেই বা ক’টা কথা বলেছে? যদি সবটা বলে দিত, তুই আমি পাড়ায় থাকতে পারতাম?

 

বিড্ডু চুপ করে গেল | চোখ বন্ধ করলে এখনও সেই ষষ্ঠীর রাত | পাড়ার ছেলে-মেয়েরা একসঙ্গে মিলে নাচের প্রোগ্রাম | সলিল চৌধুরী দিয়ে শুরু, ভাংড়া দিয়ে খতম। পুরো ককটেল | কিন্তু ধুনকি লাগার আগেই বিড্ডুর হঠাৎ মনে হল, ও নাচবে আর অম্বালিকা থাকবে না স্টেজে? পাড়ার সবচেয়ে ভাল ডান্সার নাচবে আর সবচেয়ে স্মার্ট মেয়েটাকে কেউ খুঁজে পাবে না ধারেকাছে? হয়? হোক বা না হোক, বিড্ডুর মনে হওয়াটা মনেই ছিল | কিন্তু বাক্সে দেশলাইটা ঘষে দিল সঞ্জয় | ঘুরে-ঘুরে বলতে থাকল, অম্বালিকাকে ডেকে নিয়ে আসতে | আগুন তো সংক্রামক | একসময় দপ করে জ্বলে উঠল বিড্ডুর মাথায় | তখন, ‘কে মালিক কে সে রাজা’, বিড্ডু স্ট্রেট অম্বালিকাকে গিয়ে বলল, একটা মেয়ের পায়ে হঠাৎ চোট লেগেছে, তোমাকে ওর জায়গায় একটু পারফর্ম করে দিতে হবে |

অম্বালিকা একইরকম সোজাসাপটা ভাবে বলল, আমি পারব না গো। আর কথাটা শুনে বিড্ডু চলে যাচ্ছে দেখে বলল, যাওয়ার আগে আমার একটা উপকার করো প্লিজ। একটা কোল্ড ড্রিঙ্কস এনে দিয়ে যাও!

বাক্সর দেশলাইটা মাথার ভিতরে জ্বলে উঠেছে তখন | বিড্ডু রাস্তার ধারের স্টল থেকে কোল্ডড্রিঙ্কসটা কিনে একটু আড়ালে গিয়ে আলগা করে খেয়ে নিল দু’ঢোঁক | তারপর ওর পকেটের ছোট্ট বোতলটায় যে পানীয়টি ছিল, সেটার প্রায় পুরোটাই ঢেলে দিল কোল্ডড্রিঙ্কসের ফাঁকটুকু ভরাতে | তারপর স্ট্র সমেত বোতলটা নিয়ে গেল অম্বালিকার কাছে আর একটু দূরে দাঁড়িয়ে দেখল মেয়েটা কীরকম দু’চুমুকে সেটা শেষ করে | শেষ করার পাঁচ মিনিটের মধ্যেই অম্বালিকা বিড্ডুর কাছে এসে বলল, চলো, তোমাদের যেখানে রিহার্সাল হচ্ছে সেখানে আমাকে নিয়ে চলো |

ওর কথা শুনে বিড্ডুর ভিতরে একটা ধুকপুকুনি শুরু হল, কিন্তু তখন তো আর পিছিয়ে আসার উপায় নেই!

ওদের পাড়ার পুজোমণ্ডপ থেকে ওদের নাচ-গানের রিহার্সালের জায়গাটা একটু দূরে | সদ্য প্রোমোট হওয়া একটা বাড়ির ফাঁকা একতলাটাই রিহার্সাল রুম হিসেবে ব্যবহার হত। তো, সেখানে যাওয়ার পথে মাঝে-মাঝেই টাল খেয়ে যাচ্ছিল অম্বালিকা | সামলেও নিছিল অবশ্য। সেভাবেই একবার সামলে উঠে বিড্ডুকে জিজ্ঞেস করল, তুমি কোল্ড ড্রিঙ্কস-এর নাম করে আমায় কী খাওয়ালে?

বিড্ডু ভয় পেয়ে তাড়াতাড়ি ওর হাত চেপে ধরে বলল, অল্প, খুব অল্প একটু…

 

বিড্ডুর থেকে ব্যাপারটা শুনে একটু থম মেরে গিয়েছিল সঞ্জয়। তারপর গল্পটা পুরো ঘুরিয়ে দিয়ে বলেছিল, বিড্ডু তোমায় কোল্ড ড্রিঙ্কসই খাইয়েছে অম্বালিকা | তার ভিতরে কী ছিল, সেটা দোকানদার জানে | ওর জানার কথা নয় |

 

তার একটু পরেই আকাশনীলরা চলে এসেছিল অম্বালিকাকে পুজোমণ্ডপে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে আর ওদের অপমান করতে | সঙ্গে শ্রেযসীর মা | কিন্তু অম্বালিকা ওই কোল্ড ড্রিংকের ভিতরের ব্যাপারটা নিয়ে মুখ খোলেনি কোথাও |

 

বিড্ডুও একটা ব্যাপার কখনও কোথাও ফাঁস করেনি | সঞ্জয়ের কাছেও নয় | সেদিন রাতে ওই টালমাটাল অবস্থায় ওর সঙ্গে হাঁটতে-হাঁটতে অম্বালিকা ওদেরই গ্রুপের একটা ছেলের কথা বারবার জিজ্ঞেস করছিল। সেই ছেলেটার নাম ‘আকাশনীল’ হলে বিড্ডু অবাক হত না | কিন্তু সেই ছেলেটার নাম ‘আকাশনীল’ নয় |

 

বড় ভয় করে

 

-দেখেছিস, কাগজে ছবিটা দেখেছিস? একসঙ্গে দু’টো লবঙ্গ মুখের মধ্যে পুরে গুড্ডি বলল |

– দেখব বলেই তো আমি আজ তিনটে কাগজ কিনেছি | দু’টো ইংরেজি আর একটা বাংলা |” সংঘমিত্রা গদগদ গলায় বলল |

– মোট চারটি কাগজে বেরিয়েছে,” গুড্ডি সবজান্তা গলায় বলল |

– তুই কী করে জানলি? সংঘমিত্রা উৎসুক |

– হুঁ হুঁ বাবা, খবর রাখতে হয়। গুড্ডি সোর্সের নাম ঠিকানা বলল না |

সংঘমিত্রাও ঘাঁটাল না | বরং খুশি খুশি গলায় বলল, শেষ পর্যন্ত একদম গাছতলায় বসিয়ে দিল এয়ারবাস থেকে!

-শুধু বসে থাকলে তবু কথা ছিল! কপালে হাত দিয়ে বসে আছে। গুড্ডি একটা লবঙ্গ চালান করল সংঘমিত্রার হাতে |

-তা হলে কপাল পুড়ল বল অম্বালিকার?

-মুখ পুড়ল। গুড্ডির গলায় ঝাঁঝ |

-পোড়াই উচিত | সেবারে তুই এইচএসএ হায়েস্ট পেলি গোটা পাড়ায়, আর অম্বালিকা শুধু ফার্স্ট ডিভিশন পাওয়াতেই ওকে নিয়ে কী মাতামাতি!

-ও তো মডেল তাই না? পাড়ার রাস্তাগুলো তো ওর জন্য রাস্তা নয়! ওগুলো সব র‍্যাম্প! ও হাঁটলে যা এফেক্ট হবে, আমি হাঁটলে তাই হবে কেন বল?

– কিন্তু যাই বল, ও তোকে একটু সমঝে চলে | সেই যে তুই ওর সঙ্গে একসঙ্গে নাচিসনি…

– কেন নাচব? আমরা সবাই পনেরো-কুড়িদিন ধরে রিহার্সাল দিলাম, আর উনি হঠাৎ করে হুট বলতে ছুট হয়ে এসে স্টেজে উঠবেন? কেন ও কে? দীপিকা না ক্যাটরিনা কাইফ?”

-নিজেকে সেরকমই কিছু ভাবে বোধহয়। সংঘমিত্রা ঠোঁট বেঁকাল |

– ভাবে না, ছেলেগুলো ভাবায় | ওই আকাশনীল, বিড্ডু, অনুরাগ, ওরাই তো সব ওকে লাই দিয়ে দিয়ে মাথায় তুলেছে |

– অনুরাগ নয় রে, অনুরাগ অন্যরকম। সঙ্ঘমিত্রা বলে উঠল।

– তুই তো বলবিই | তুই এখন ওর সঙ্গে প্রেম করছিস যে।

–  না, আমার সঙ্গে রিলেশন আছে বলে বলছি না, অনুরাগ সত্যি আলাদা | তবে আমি না একটা ব্লান্ডার করে ফেলেছি, জানিস।

– কী ব্লান্ডার করেছিস?

– ইন ফ্যাক্ট আমি অম্বালিকার নাম দিয়ে কতগুলো বাজে কথা অনুরাগকে বলেছি | কিন্তু আসলে তো অম্বালিকা কথাগুলো ওর সম্পর্কে বলেনি | আমিই পুরোটা বানিয়ে বানিয়ে…

– কেন?

– আসলে তখন ওর প্রেমে পাগল হয়ে উঠেছিলাম একেবারে…

– প্রেমে নয় সংঘমিত্রা, তুই অম্বালিকার উপর হিংসেয় পাগল হয়ে উঠেছিলি |

– নট এগজ্যাক্টলি | অনুরাগকে আমার ভাল লাগতই | আর ওর অম্বালিকার প্রতি   একটু দুর্বলতা আছে দেখেই আমি মিথ্যেগুলো বলেছিলাম |

– অনুরাগের যদি আমার প্রতি দুর্বলতা থাকত, তা হলে তুই কথাগুলো বলতি?

– ধ্যাত, তুই তো আমার বন্ধু | আর তা ছাড়া…

  • আমাকে দেখলেই ছেলেদের মাথা ঘুরে যাওয়ার একদমই কোনও আশঙ্কা নেই কী বল?
  • ঠিক তাই | কিন্তু না | মানে, আমি এটা বলতে চাইনি |”
  • তুই কী বলতে চাইছিস, আমি খুব ভাল বুঝতে পেরেছি | আর তার জন্য আমি তোর ওপর একটুও রাগ করিনি | আমি শুধু একটা আত্মসমীক্ষা করছিলাম |
  • কী পেলি সেই সমীক্ষা থেকে?
  • দ্যাখ, ছেলেরা অন্য একটা ছেলের ভিতরের ক্ষমতাটাকে ভয় পায় | একজনের পোটেনশিয়ালের সঙ্গে অন্য একজনের পোটেনশিয়ালের লড়াই হয় | কিন্তু আমরা মেয়েরা মোস্টলি অন্য একটা মেয়ের অ্যাপিয়ারেন্সকে ভয় পাই, তাই না?
  • ওই অ্যাপিয়ারেন্সই তো বাজি মেরে দেয় রে গুড্ডি! নইলে তোর মতো এত ব্রিলিয়ান্ট একটা মেয়ে পাড়ায় থাকতে ছেলেরা ওকে নিয়ে লাফায় কেন?
  • আর অনুরাগ যতই অন্যরকম হোক, শেষমেশ, ওদের দলেরই একজন, কী তাই তো?
  • আফটার অল অনুরাগও একটা ছেলে | কিন্তু আমি ভাবছি, অনুরাগের সামনে গিয়ে যদি ন্যাকা কান্না কাঁদে এখন, তাহলে কীর্তিকলাপ ফাঁস হয়ে গিয়ে আমি তো একদম ডুবে যাব রে?
  • অনুরাগ তো ওর সঙ্গে কথাই বলে না, অ্যাট লিস্ট আমি তো সেরকমই জানতাম!
  • বলত না তো | কিন্তু আজ চাকরি খোয়ানোর সঙ্গে-সঙ্গেই ডাইনিটা অনুরাগকে মেসেজ পাঠিয়েছে |
  • হোয়াটস অ্যাপ করেছে না এসএমএস? সে যাই করুক, কী লিখেছে?
  • সেটাই তো অনুরাগ বলল না | কিছুতেই না | আর তাই আমি ভয়ে কাঁটা হয়ে আছি | আমি তো তোর মতো আত্মসমীক্ষাও করতে পারি না | আমার কী হবে রে গুড্ডি?”
আরও পড়ুন:  আরিব্বাস, জাল ডাক্তার!

 

সামনে পেয়েও

 

জিকো জীবনে একটা লাথিও মারেনি ফুটবলে | বরং ওর নামটাই ওকে লাথি মারতে-মারতে নিয়ে যাচ্ছে এদিক থেকে ওদিকে | আর ওর কাজটাও হয়েছে একেবারে তেমনই | ছাত্র ইউনিয়নের অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল সেক্রেটারি | সারাদিন ছাত্র-ছাত্রীদের অভিযোগ শোনা আর রাতে জেনারেল সেক্রেটারি এবং আরও বড় নেতাদের গালিগালাজ সহ্য করা | উফ অসহ্য! জিকো ঠিকই করে নিয়েছে, সামনের বছর যদি কলেজের জেনারেল সেক্রেটারি মানে জিএস হতে পারে তো তোফা, নইলে   গুডবাই পলিটিক্স!

মন্দের ভাল হল, জিকোর একজন পার্সোনাল সেক্রেটারি আছে। না, মেয়ে নয়। ছেলে| ছোটবেলায় বাবা মারা যাওয়ায় খুব বেকায়দায় পড়ে গিয়েছিল যখন বাচ্চাটা, তখন জিকোর বাবা-মা’ই ওর অনেকটা ভার নেন | সেই সময় থেকেই ছেলেটি জিকোর সঙ্গে আঠার মতো লেগে থাকত | আর এখন তো বিনে মাইনের সেক্রেটারি | কেউ-কেউ বলে, কৃতজ্ঞতা | কিন্তু জিকো ভেবে দেখেছে, একটা সময়ের পর কৃতজ্ঞতা আর ভালবাসাকে আলাদা করা যায় না | অনেকটা ওর আর ডাকুর মতোই |

তো এহেন ডাকু সকাল সকাল এসে ঘুম ভাঙিয়ে নিজের মোবাইলটা জিকোর কানে ধরিয়ে দিল | আর জিকো মাথাভর্তি ঘুম নিয়েও মুহূর্তে বুঝল, ওর চোখ-মুখ জলের ঝাপটা ছাড়াই ফ্রেশ হয়ে যাবে আজ |

  • আমাকে তোমাদের কলেজে ভর্তি করিয়ে দেবে? অম্বালিকা দু’বার বলল|
  • কিন্তু তুই তো এয়ারহোস্টেস | কলেজে কী করবি?
  • তুমি টিভি দ্যাখো না? খবরের কাগজ পড়ো না? অম্বালিকা একটু চিবিয়ে-চিবিয়ে বলল |
  • না রে, টিভি দেখার সময় নেই | আর ডাকু হকারি শুরু করার পর থেকে আমি খবরের কাগজ পড়া ছেড়ে দিয়েছি |”
  • বেশ করেছ | নইলে জানতে পারতে, কেন ফোন করেছি। অম্বালিকা হতাশ গলায় বলল |

জিকো ততক্ষণে ডাকুর বাড়িয়ে দেওয়া কাগজটার হেডলাইন দেখে নিয়েছে | ও খুব অবাক গলায় বলল, এ তো সর্বনাশ করে দিয়েছে রে | একসঙ্গে হাজার- বারোশো কর্মীকে ছাঁটাই!  বলতে-বলতে জিকো ডাকুর বাড়ানো আর-একটা কাগজে অম্বালিকার গাছের নীচে কপালে হাত দিয়ে বসে থাকা ছবিটাও দেখে নিল | দেখতেই থাকল |

  • আমি এখন কী করব বলতে পারো?

অম্বালিকার গলাটা খুব টেন্সড শোনাল | জিকো বলতে যাচ্ছিল, আর যাই কর       গাছতলায় মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকিস না | কিন্তু সেটা কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে হয়ে যাবে ভেবে বলল, অত ঘাবড়াচ্ছিস কেন? আমি তো আছি |

  • থ্যাঙ্ক ইউ | তোমার উপর সেই ভরসাটুকু আছে বলেই আমি ডাকুকে ধরেছিলাম |

জিকো মনে-মনে বলল, সোজা আমাকেই ধরতে পারতিস! মুখ দিয়ে শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল |

  • একটা উপকার করবে? আমাদের চাকরি ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে আজ একটা মিছিল আছে | এইসব পলিটিক্যাল ব্যাপার স্যাপারে আমি কখনও যাইনি, অথচ এটাতে না গেলেও নয়! তুমি কি আমার সঙ্গে একটু এয়ারপোর্টে যাবে?
  • আমার আজ দুপুরে একটা জরুরি মিটিং আছে বুঝলি, তাও আমি দেখছি। জিকো একটুও না তুতলে বলল |
  • তুমি না গেলে আমি খুব অসুবিধেয় পড়ে যাব | প্লিজ একটু দ্যাখো! আমি আমার কাগজপত্র নিয়ে তোমার বাড়িতে যাব একবার? তোমার তো বড় লেভেলে যোগাযোগ।অনেক লিডার-টিডার চেনা আছে নিশ্চয়ই।অম্বালিকা কীরকম একটা মরিয়া গলায় বলল |
  • বাড়িতে আসবি? আয় !জিকো সহজ গলায় বলল |

কিন্তু ওর মাথার ভিতরে তখন জটিল একটা সিঁড়িভাঙা অঙ্ক চলছে | মহুয়া বেশ কিছুদিন ধরেই ওর ওপর টাল্লি খেয়ে রয়েছে, ও বুঝতে পারে! ধুনোও দেয় ব্যাপারটায় | কারণ দজ্জাল আর ঠোঁটকাটা বলে মহুয়ার একটা ভাল ফ্যান ফলোয়িং আছে মেয়েদের মধ্যে | জিএস হতে গেলে ওদের সবার ভোটই চাই জিকোর | আর চাই বলেই জিকো এখন চটাতে পারবে না মহুয়াকে | কিন্তু অম্বালিকার সঙ্গে ও মিছিলে হাঁটতে গিয়েছিল শুনলে মহুয়া আগুন লাগিয়ে দেবে একদম | তা হলে এখন কী করণীয়?  ব্যাপারটা সংক্ষেপে ডাকুকে বলে একটা পরামর্শ চাইল জিকো |

ডাকু বিড়বিড় করে বলতে থাকল, তিন, চার, তিন |

  • কী ফালতু তিন, চার, তিন করছিস ?” জিকো চটে গেল |
  • গুনছি, পাড়ার কোন মেয়ে আজ ক’টা পেপার কিনেছে | মহুয়া তিনটে |
  • এতগুলো পেপার কিনেছে কেন?”
  • তোমার বালিকার গাছতলায় মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকার ছবি কালেক্ট করবার জন্য এটুকু ইনিশিয়েটিভ নেবে না?

জিকো হতাশ গলায় বলল, আমার বালিকা নয় রে | পলিটিক্সের জন্য আমার   কাছে আসতে চাইছে |

ডাকু একটু হেসে বলল, তা তুমি একটু কাছে গিয়েই পলিটিক্স করো না |

  • মুশকিল হল, ওকে কাছ থেকে দেখলেই আমার যে পলিটিক্স ছেড়ে দিতে ইচ্ছে করে। জিকো ফিসফিস করে বলল, ডাকু শুনতে পেল না |

 

মাফ করো

 

বিজয়া সম্মিলনী উপলক্ষে একটা ছোটখাটো খাওয়াদাওয়া হয় পাড়ায় | আর তার প্রায় যাবতীয় দায়িত্ব থাকে, ইয়ং ব্রিগেডের ওপরেই | বাজার করা থেকে নেমন্তন্ন পর্যন্ত |

  • অম্বালিকাকে নেমন্তন্ন করতে যাবি নাকি আজ? শ্রেয়সী কথাটা হওয়ায় ভাসিয়ে দিল |
  • গিয়ে কী বলব? প্রতীক জিজ্ঞেস করল |
  • বলবি যে, দেখলাম তোর  চাকরি-ফাকরি এখন নেই, মন খারাপ করে ঘরে বসে থাকবি কেন, আয় আমাদের সঙ্গে একটু এনজয় কর |
  • শাট আপ শ্রেয়সী, মহুয়া ঝাঁঝিয়ে উঠল। “আফটার অল মেয়েটার সঙ্গে একটা বড় দুর্ঘটনা ঘটে গেছে আজ | ওর জায়গায় নিজেকে বসিয়ে দ্যাখ তো!
  • ওর জায়গা যদি আমি নিতে পারতাম তা হলে এই এত বড় থলিটা আমাকে দিয়ে বওয়াত না কেউ! শ্রেয়সী খুব অভিমানের গলায় বলল |

বিড্ডু তাড়াতাড়ি ওর হাত থেকে থলিটা ছিনিয়ে নিয়ে বলল, আগে বলবি তো!

শ্রেয়সী মহুয়ার ঝাড়টা বিড্ডুর উপর উপুড় করে দিয়ে বলল, তোকে সব কিছু বলে বোঝাতে হবে কেন? তুই না বললে কিছু বুঝতে পারিস না?

বিড্ডু আলতো করে পাশে দাঁড়ানো সঞ্জয়কে বলল, যেমন মা তেমন মেয়ে | জিভে এলাচ দাঁড়াবে না |

  • যাই বল, মা ওরকম ঝাড়টা দিয়েছিল বলেই কিন্তু মেয়ে সিমপ্যাথি গ্রাউন্ডে তোর প্রেমে পড়ল। সঞ্জয় ফিসফিসিয়ে বলল |
  • অ্যাই তোরা এত কী গুজগুজ ফুসফুস করছিস রে? মহুয়া একটা স্টেশনারি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে হাঁক পাড়ল |
  • না, আমি বলছিলাম অম্বালিকাকে ডাকতে প্রতীককে পাঠালে কেমন হয় ?” সঞ্জয় বলটা পুরো গুগলি করে দিল |

প্রতীক নিজের মনে কী যেন একটা ভাবছিল | আঁতকে উঠে বলল, আমি? কেন, আমি কেন?

  • তুই হলে অসুবিধে কী ? বিড্ডু আর সঞ্জয় একসঙ্গে বলল |
  • আমি যদি যাই, তবে আকাশনীলকে সঙ্গে নিয়ে যাব। প্রতীক একটা প্রতিরোধের গলায় বলে উঠল |
  • আকাশনীল কেন? শ্রেয়সী জিজ্ঞেস করল |
  • ও বোধহয় চাইছে, ওদের দু’টো গ্রুপেরই রিপ্রেজেন্টেশন থাক।  মহুয়া বিজ্ঞের ভাব করে বলল |
  • না, না ওসব গ্রুপ-ফুপ এখন আর এগজিস্ট করে না। প্রতীক মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে বলল। আমি আকাশনীলকে চাইছি, কারণ অম্বালিকা ওকেই যা হোক একটু …

ওকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বিড্ডু আর সঞ্জয় কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু তার আগেই মহুয়া ফোন করে কাউকে একটা জানাতে থাকল যে, ওরা ঠিক কোথায়, আর মিনিটখানেকের মধ্যেই সংঘমিত্রা উল্কার মতো আছড়ে পড়ল ওদের মধ্যে | সঙ্গে ডাকু |

  • অম্বালিকা ছক করছে | আবারও অনুরাগকে ছক করছে | ডাকু ওকে আর অনুরাগকে সিনেমাহলের সামনে একসঙ্গে দেখেছে। সংঘমিত্রা ঘাবড়ে যাওয়া গলায় বলল |
  • কী যা তা বলছিস! অনুরাগ আর অম্বালিকার মধ্যে কোনও কেমিস্ট্রি কখনও হতে পারে ?” প্রতীক অবিশ্বাসের গলায় বলল |
  • কেমিস্ট্রি, ফিজিক্স, বায়োলজি সবই হতে পারে | সেবার পুজোর সময় অম্বালিকা বারবার জিজ্ঞেস করছিল, অনুরাগ রিহার্সাল রুমে আছে কি না | আর যে অবস্থায় জিজ্ঞেস করছিল, সে অবস্থায় লোকে চট করে মিথ্যে কনসার্ন দেখায় না,” বিড্ডু একনিশ্বাসে কথাগুলো বলল |

সঞ্জয় অবাক চোখে ওর দিকে তাকাল | – তুই আগে আমাকে এই ইন্সিডেন্টটা বলিসনি তো?

বিড্ডু মনে মনে বলল, সব কথা সব সময় বলা যায় না | আর ওকে চুপ করে থাকতে দেখে ডাকু বলে উঠল, তা হলে আমার দেখার ওপরে আর কারও সন্দেহ রইল না আশা করি?

আরও পড়ুন:  মিউজিক্যাল চেয়ার

মহুয়া হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, জিকো আজ দুপুর থেকে কোথায় রে? ফোনে পাচ্ছি না কেন?

ডাকু একটা ঢোঁক গিলল | জিকো কোথায়, কার সঙ্গে, সে ব্যাপারে কোনও প্রশ্ন যাতে না ওঠে তাই তো ও একটু কায়দা করেই অনুরাগের ব্যাপারটা উসকে দিয়েছে।   থ্রিলারটাকে একমুখী করানোর জন্য অম্বালিকার সঙ্গে যে আকাশনীলও ছিল সেই তথ্যটাই গোপন করে গিয়েছে | এসবই তো একজন সেক্রেটারির কাজ | বুঝবে না, ওরা বুঝবে না |বোঝার দরকার নেই। কিন্তু এখন মহুয়ার প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলেই যে ঘেঁটে যাবে সব!

মহুয়া আবার একই প্রশ্ন করল আর সংঘমিত্রা এবার খুব রাগের সঙ্গে বলে উঠল, তোরা খালি উলটোপালটা বকে যাচ্ছিস | অনুরাগকে ওই অম্বালিকার খপ্পর থেকে ছাড়িয়ে আনবে কে?

– ছাড়াতে গেলে তোকেই ছাড়াতে হবে | তোদের পার্সোনাল ব্যাপারে আমরা কেন ইন্টারফেয়ার করতে যাব? মহুয়া শান্ত গলায় বলল |

– তোর নিজের সঙ্গে ব্যাপারটা ঘটলে তুই এরকম বলতে পারতিস?” সংঘমিত্রা কান্না-ভেজা গলায় প্রশ্ন করল |

মহুয়া গুম হয়ে গেল প্রশ্নটা শুনে | আর ওই গুম হয়ে যাওয়া ব্যাপারটা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল সবার মধ্যে |

প্রতীক আলতো করে বলল, আমরা সবই চাই সাইক্লোনটা অন্য রাজ্য, অন্য দেশের উপর দিয়ে চলে যাক, তাই না?

শ্রেয়সী বলল, কিছু যদি বাঁচবে, তবে নিজের ঘরটাই বাঁচুক |

ওদের কথোপকথন কেউ শুনল না! শুনেও শুনল না!

 

নোবেল প্রাইজ

 

মধ্যিখানে ওই বিড্ডু-সঞ্জয়দের জন্য একটু ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল, কিন্তু এমনিতে বরাবরই আকাশনীলের সঙ্গে অনুরাগের সম্পর্ক ভাল! একবার অনুরাগের থেকে একটা বই পড়তে নিয়েছিল ও | নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন, এমন অনেকের জীবনী | তিন-চারদিন পরেই বইটা ফেরত দেওয়াতে অনুরাগ জিজ্ঞেস করেছিল ওর এত তাড়াতাড়ি বইটা পড়া হয়ে গেল কী করে | ওদের সামনে দিয়ে তখন রিকশায় চেপে একটা দারুণ দেখতে মেয়ে পাস করে যাচ্ছে | আকাশনীল সেদিকে তাকিয়ে বলেছিল, আমার কাছে নোবেল প্রাইজ পাওয়া হচ্ছে এরকম একটা মেয়ের সঙ্গে প্রেম করা, মেয়েটার হাত ধরে হাঁটা | আজ যখন সিনেমাহলের সামনে ওর আর অম্বালিকার সঙ্গে অনুরাগের হঠাৎ করে দেখা হয়ে গেল, আকাশনীলের একবার ইচ্ছে হল হাত বাড়িয়ে অম্বালিকার হাতটা ছোঁয়।অনুরাগকে দেখিয়ে ওর সঙ্গে এক-দু’পা হাঁটে। কিন্তু নিজেকে সংযত করে ও জিজ্ঞেস করল, কোত্থেকে ?

  • ও আবার কোথায় যাবে? নিশ্চয়ই কোনও লাইব্রেরি-টাইব্রেরি থেকে ফিরছে।  অম্বালিকা বলল।

অনুরাগ কোনও জবাব না দিয়ে হাসল |

আর আকাশনীলকে কিছুটা চমকে দিয়ে অম্বালিকা অনুরাগকে জিজ্ঞেস করল, আমার মেসেজটার জবাব কখন পাব?

  • যখন সময় হবে। কথাটা বলে অনুরাগ ওদের ছেড়ে এগিয়ে গেল |

হলে ঢুকতে-ঢুকতে, হলে ঢুকে অম্বালিকার হাতটা নিজের হাতের মধ্যে নিয়েও   আকাশনীলের বারবার মনে হচ্ছিল, কী মেসেজ পাঠিয়েছে অম্বালিকা? কোন মেসেজের জবাব চাইছে ও অনুরাগের থেকে?

  • মাল্টিপ্লেক্স ছাড়া এখন আর সিনেমা দেখতে পারি না | ভীষণ আনকমফর্টেবল লাগে। অম্বালিকা পাঁচ মিনিট অন্তর বলছিল |

ইন্টারভ্যালের পরপরই ওকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল আকাশনীল | অম্বালিকা বলল, আজ খুব টায়ার্ড লাগছে জানিস তো! দুপুরে অতক্ষণ মিছিলে হেঁটেছি | অভ্যেস নেই না?

আকাশনীল বলল, “আমি ট্যাক্সি ডাকছি |

  • ছেড়ে দে, আমি অটো করেই বাড়ি চলে যাই বরং |”

আকাশনীল বলার চেষ্টা করল ওর অত ঝামেলা করে নেওয়া ছুটি, ওদের একসঙ্গে রাতে রেস্তোরায় খাওয়ার প্ল্যান কিন্তু কিছুই বলতে পারল না | বলতে না পেরে ও ফেরার পথে সামনে পেয়ে গেল অনেকটা অন্ধকার | ওর আঙুলের তারে বেজে ওঠা অম্বালিকার আঙুল |

শ্যাম্পু করা চুলের ভিতর থেকে যে গন্ধটা এসে আছড়ে পড়ছিল ওর উপর, আকাশনীলের মনে হচ্ছিল, সেই গন্ধটা ও সদ্য উনুন থেকে নামানো বিরিয়ানির ভিতরেও পেয়েছে | গন্ধের উৎসটাকে বাঁ হাতের মুঠো দিয়ে সরানোর সময় অম্বালিকা মোবাইলটা খুটুর-খুটুর করছিল | আকাশনীল ওর মুখটা ডান হাতের তালু দিয়ে উঁচু করে তুলে ধরার সময় অম্বালিকা বলল, বদ কোথাকার |

  • কে আমি? জানি তো। আকাশনীল হাসল |
  • না, তুই কেন হবি! রাজীব মেহেরোত্রা। অম্বালিকা বলল |
  • রাজীব মেহেরোত্রা? সে কে?
  • আমাদের ডেপুটি ম্যানেজার, অপারেশন্স | ড্রাঙ্ক অবস্থায় আমাকে জড়িয়ে ধরে কিস করল | আমি চুপচাপ হজম করে নিলাম। আর এখন আমার চাকরি গেছে বলে ফোন করলেও ধরছে না |”

আকাশনীলের মনে হল ওর মাথায় কেউ একটা আধলা ইট মারল | ও    কোনওমতে বলল, তুই প্রোটেস্ট করলি না একবার?

  • বাবা অনেক টাকা ইনভেস্ট করেছে রে আমার পিছনে! আমি কোনও ব্যাপার নিয়ে কেস করে চাকরির জায়গায় জটিলতা বাড়াতে চাইছিলাম না | কিন্তু দ্যাখ শেষ পর্যন্ত সেই …

আকাশনীল চুপ করে রইল | অম্বালিকাও কথা বলছিল না | রাতের একটা নক্ষত্র গুটিগুটি হেঁটে যাচ্ছিল আর একটা নক্ষত্রের দিকে | অম্বালিকার খোলা চুল, অল্প খোলা ঠোঁট, আকাশনীল বুঝতে পারছিল, নোবেল প্রাইজ ওর সামনেই | কিন্তু আজ   আর ও নোবেল প্রাইজটা নিতে পারবে না | কিছুতেই না |

 

সেই তো আবার

 

“আমার আর চাকরি নেই | আমাকে নতুন করে পড়াশোনা শুরু করতে হবে | তোমার হেল্প ছাড়া আমি এক পা’ও এগোতে পারব না | তুমি হেল্প করবে তো আমায়”?

অনুরাগ মেসেজটা পড়ল | দু’বার, তিনবার | গতকালের মেসেজ | তারপর পড়তে শুরু করল অম্বালিকার আজ সকালে পাঠানো মেসেজটা |

“উপস! আপাতত আর পড়াশোনার দরকার নেই | আমি আমার চাকরিটা ফেরত পেয়েছি | ইন ফিউচার কখনও কোনও দরকার হলে তোমায় নিশ্চয়ই জানাব। টেক কেয়ার।”

দুটো মেসেজই ডিলিট করার আগে অনুরাগ পাঁচ সেকেন্ড থমকাল | ভাবল, সংঘমিত্রাকে একবার দেখিয়ে নেবে কি না! কাল রাতে খুব কাঁদছিল মেয়েটা | ভয়ের কান্না | সেই ভয়টা ভেঙে দিলে ভাল হয় না? কিন্তু ওর মন বলল, একটা ছেলে আর একটা মেয়ের মুখ যখন ঘন হয়ে আসে, তখন ওই দু’টো মুখের একটাই ছায়া পড়ে | কিন্তু সেই ছায়াটা দু’টো মুখের থেকে আলাদা কিছু | সম্পর্কের থেকে সম্পর্কের ধারণা যেমন আলাদা | ওটা আলাদা হয়েই থাক! ওটাকে রোদ্দুর দিয়ে ক্ল্যারিফাই করা ঠিক হবে না |

মেসেজ দুটো ডিলিট করে দিল অনুরাগ |

সকালে উঠে বেশ কিছুটা ঝরঝরেই লাগছিল আকাশনীলের | কাল রাত বারোটা নাগাদ ওকে ফোন করেছিল অম্বালিকা | বলেছিল যে, ও একটু আগে ওই রাজীব মেহেরোত্রার এসএমএস পেয়েছে | ওদের এয়ারলাইন্সে যাদের চাকরি গিয়েছিল, তারা সবাই চাকরি ফেরত পাচ্ছে | একটু পরেই টিভিতে ব্রেকিং নিউজ আসবে |

আকাশনীল শুধু বলল, কনগ্র্যাটস!

অম্বালিকা বলল, থ্যাঙ্কস! কিন্তু মাইনে বোধহয় অনেকটা কমিয়ে দেবে রে! তোকে আমার যে সিভি.-টা দিয়ে এসেছি, সেটার কথা একটু মাথায় রাখিস | বড় কোনও হোটেল হলে তোর সঙ্গে আমিও ইন্টারভিউ দেব | তারপর যারটা লাগে |

ঘুম থেকে ওঠা ইস্তক আকাশনীলের মনে হচ্ছিল, কী একটা যেন বাকি থেকে গিয়েছে। ও চোখ বন্ধ করে বলল, জীবনের সর্বত্র, সব সময় আমার আগে তোরটা লাগুক।   বলার সঙ্গে-সঙ্গে শরীরের ঝরঝরে ভাবটা বেড়ে গেল আরও | ও চেঁচিয়ে ব্রেকফাস্ট চাইল মায়ের কাছে |

কালরাতে উত্তেজনায় ভাল ঘুম হয়নি জিকোর | উত্তেজনা কারণ, অম্বালিকা ওর সঙ্গে ওর নেতাদের ঘরে ঢোকায় জিকোর কদর বেড়ে গিয়েছে | সুখবরটা যখন ও টিভিতে দেখে, তখন রাত দেড়টা | তখন তো আর ফোন করা যায় না! তাই সকাল হতেই ও ফোন লাগালো অম্বালিকাকে | বেশ খানিকক্ষণ কসরতের পর লাইন পেল।

  • কী রে আমাদের বিজয় মিছিলে আজ আসছিস তো? আই মিন তোদের বিজয় মিছিলে?
  • খেপেছ? আমি এখন রেডি হচ্ছি | আমার আজ দুপুরের ডিউটিতে রিপোর্ট করতে হবে। অম্বালিকা বলল |

ডাকু ভোরের কাগজ নিয়ে ঘরে ঢুকে অবাক হয়ে দেখল, জিকো জেগে বসে আছে |   ও চোখের ইশারায় জানতে চাইল, কী ব্যাপার এত তাড়াতাড়ি?

জিকো গম্ভীর মুখে বলল, আচ্ছা ডাকু, আমার সঙ্গে কথা বলে তোর কি কখনও মনে হয়, আমি খেপে গেছি?

ডাকু ধাক্কা দিয়ে জানলাটা খুলতে-খুলতে বলল, চাকরি ফেরত পাওয়ার আনন্দে পাগল হয়ে গিয়ে তোমাকে পাগল বলেছে | ওতে রাগ করে না গো, ওইটুকুতে রাগ করতে নেই |

 

পরিশিষ্ট

গল্প থেকে বেরিয়ে এলে গল্পের চরিত্রদের আর চিনতে নেই! কিন্তু রাস্তায়, ফুটপাথে, বাস-অটোর লাইনে, ক্লাবের চাতালে, কোচিং সেন্টারের বারান্দায় ওদের না চিনে আমার উপায় থাকে না! কানে আসে জটলার মধ্যে ওদের একজন আর একজনকে বলছে, আচ্ছা ওই যে প্লেনটা অত উঁচু দিয়ে উড়ে যাচ্ছে, ওর ভিতর থেকে নিচের লোকজন, ঘরবাড়ি সবকিছুকে খুব ছোট লাগে তাই না?

যাকে বলা হল, সে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে | তারপর বলে, তোর কি মনে হয় চাঁদটা আদতে ওইটুকু? নিচ থেকে দেখলে উপরের জিনিসগুলোকেও ছোটই লাগে |”

কথাটা শুনে আমার খুব ইচ্ছে করে একটা বাহবা দিই! কিন্তু বাহবা দিতে গেলেই ওদের গল্পটার ভিতর আমাকে ঢুকতে হবে | সেটা ঠিক হবে কি?

 

 

2 COMMENTS

  1. অসম্ভব একটা ভাল লেখা আমাদের উপহার দিলেন।

  2. Binayak Da, Tomar anek lekha porechi, khub valou lagey. Tabe tomar beshirvaag lekhar sesher ei Line gulor bar bar use……… আচ্ছা ওই যে প্লেনটা অত উঁচু দিয়ে উড়ে যাচ্ছে, ওর ভিতর থেকে নিচের লোকজন, ঘরবাড়ি সবকিছুকে খুব ছোট লাগে তাই না? …… Sudhu Plane keno tomar Pakhi hoye urte ichche hoy na?

এমন আরো নিবন্ধ