(ভাব লিখন – তন্ময় দত্তগুপ্ত)

আমার ছোটবেলা । বয়স কত? না, আজ আর মনে নেই । খুব ছোট ছিলাম তো তাই স্মৃতির চারপাশটা ধোঁয়াটে । হ্যাঁ, ঠিক তখনই বাবা-মা’র সঙ্গে জীবনের প্রথম ভ্রমণ । জায়গাটা মনে নেই । চারপাশটা কেমন ছিল তাও মনে নেই । শুধু মনে আছে গুটি গুটি পায়ে ঘুরতে গিয়েছিলাম । বয়স বাড়ল । বুঝতে শিখলাম । জানলাম নিজের নাম । চিনলাম শৈশবের অস্তিত্ব । আরো কিছু বুঝলাম । আমি শুধু একা নই । আমার সঙ্গে আছে বাবা-মা ।

একটা ঘটনা স্পষ্ট মনে আছে । আমি ক্লাস সিক্সে পড়ছি । আমার স্কুলের নাম জি ডি বিড়লা । একদিন শুনলাম স্কুল এস্কাকারশন থেকে আমাদের দীঘা নিয়ে যাওয়া হবে । আপনারা ভাবছেন দীঘার সমুদ্রের কথা শুনে আমি আনন্দে আত্মহারা হয়ে গিয়েছিলাম । সত্যি বলছি,আমার তেমন কোনও অনুভূতি হয় নি । সমুদ্র কিংবা বা তার সৌন্দর্য ঠিক কী তখন জানতাম  না । সমুদ্রকে জেনেছিলাম শুধু বইয়ের পাতায় । দীঘার সমুদ্র আমার চেতনায় আলো ফেললো । চোখে দেখা সমুদ্রের দিগন্ত বিস্তৃত রূপ আমাকে চমকে দিলো । কেন জানেন? জীবন আমাকে এতো বড় উপহার দেবে সেটা আগে বুঝিনি । সকলেই জানেন আমার পেশা অভিনয় । অভিনয়ের প্রয়োজনে নানা জায়গায় যেতে হয়েছে । পাহাড়,জঙ্গল,গ্রাম —আরো অনেক । সমুদ্রের বহুমুখী রূপ আমি দেখেছি । সামুদ্রিক হাওয়া,হাওয়ার শীতল স্পর্শ,গন্ধ,পরিবেশের নতুনত্ব বদলে দিয়েছে আমার জীবনের স্থাপত্য । এক ধরনের রঙিন ছবি মনের পর্দায় ফুটে উঠেছে ।

সমুদ্রের বালির ওপর হাঁটলে পায়ের ছাপ পড়ে । কেউ আবার সেই বালির ওপর কিছু লেখে । নিজের নাম অথবা তার জীবনসঙ্গীর নাম । ঢেউয়ের প্রবল জলরাশি সেই সমস্ত নামের ওপর আছড়ে পড়ে । কোনও নাম ধুয়ে যায়,কোনও নাম থেকে যায় । হয়ত আবছা । তবু পড়া যায় । সমুদ্রের বালিয়াড়ি দিয়ে হেঁটে যায় লাল কাঁকড়া । সে এক কবিতার মতো দৃশ্য । আমার কল্পনার ডালপালা প্রসারিত হয় । আমি বুঝি শেষ বলে কিছু নেই । এক সৌন্দর্যের শেষে অন্য সৌন্দর্যের সূচনা । চোখ মেললেই আদিগন্ত সমুদ্র । আকাশ আর সমুদ্রের মিলন মেলায় মনে হয় ওইখানেই সব শেষ । কিন্তু না । ওখানে শেষ নয় । সমুদ্রের শুরু আমি দেখেছি । শেষ দেখিনি ।

আরও পড়ুন:  জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমায় স্নানযাত্রার পরে একপক্ষ পুরীর মন্দিরে গোপন ঘরে থাকেন জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রা

দীঘা ছাড়া আমি পুরী গিয়েছি । পুরীর সমুদ্রের জল নীল । দীঘার সমুদ্র নীল নয় । ঘোলাটে । পুরীর বালির বিচ অনেক সুবিন্যস্ত । সাজানো । ওখানে সমুদ্রিক হাওয়ার জোর অনেক বেশি । দুটো সমুদ্রের পাড়েই ছড়িয়ে থাকে অসংখ্য ঝিনুক । ওই সমস্ত ঝিনুক নিয়ে অনেকেই মালা তৈরি  করেন । সে সব দেখার মতো । আমি আন্দামানেও গিয়েছি । সেখানেও দেখেছি অনেক ঝিনুক । ভাগ্যিস বিপদে পড়িনি । বিপদের নাম সুনামি । সুনামির সেই ভয়াবহ বিপর্যয়ের আগে আমি আন্দামান দ্বীপে গিয়েছিলাম । ওখানে বড় বড় নারকেল পাওয়া যায় । নারকেলের ভেতরের শাঁসটা এত পুরু যে একজন খেয়ে শেষ করতে পারে না । সামুদ্রিক মাছ আমি খাই ঠিকই । কিন্তু সব সামুদ্রিক মাছ খাই না । ঘুরতে গিয়ে খাবারকে আমি বেশি প্রাধান্য দিই না । আন্দামানের সমুদ্র আবার অন্যরকম । ওই জলের রং সবুজ ।

সব সমুদ্র একরকম হয় না । সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সমুদ্রের রূপ পাল্টাতেই থাকে । দুপুরের ঝলসে যাওয়া রোদে সমুদ্রের অকল্পনীয় রূপ চোখে পড়ে । সমুদ্রের জলে যেন সূর্যের সাঁতার । দুপুর পেরিয়ে বিকেল । রোদের তেজ আস্তে আস্তে কমছে । সমুদ্রের সর্বাঙ্গে তখন ছায়ার প্রলেপ । সে আর এক দৃশ্য । বিকেল রাতের দিকে হাত বাড়ায় । রাতের সমুদ্র । এবার নিস্তব্ধতা । ভিড়ের আওয়াজ নেই । নেই গাড়ির শব্দ । শান্তি সর্বত্র বিরাজমান । নিস্তব্ধতার মাঝে জেগে ওঠে সমুদ্রের কণ্ঠস্বর । ঢেউয়ের শব্দ । মনে হয় সমুদ্র কথা বলছে । খোঁজ নিচ্ছে লক্ষ কোটি ঢেউয়ের । ঢেউ ঢেউ আর ঢেউ । ঢেউয়ের মিছিল । আমার সমুদ্র স্নান হয়েছিল এভাবেই । আমার মার পাহাড় খুব ভালো লাগে । ছোটবেলায় আমার সমুদ্র বেশ ভালো লাগত । শৈশবের চঞ্চলতা আর সমুদ্রের উত্তাল চঞ্চল স্বভাব মনে হয় একই রং তুলির রহস্যময় প্রকাশ । পাহাড় আর সমুদ্রের মধ্যে কোনটা বেশি ভালো লাগে সেটা ঠিক বলতে পারব না । পাহাড় খুব শান্ত । যেন প্রচুর ঝড় তার ওপর দিয়ে বয়ে চলেছে,তবুও সে অনড়,অটল । একটা স্থিরতা, স্থিতাবস্থা পাহাড়ের মধ্যে দেখতে পাই । মাথা উঁচু করে পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে । দাঁড়িয়ে আছে যুগ থেকে যুগান্তে ।

আরও পড়ুন:  ডুগডুগি (পর্ব ৮)

শুটিংয়ের প্রয়োজন আমি শান্তিনিকেতনে গিয়েছি অনেকবার । প্রথম শান্তিনিকেতনে যখন যাই,তখন আমার পরিণত বয়স । বলতে গেলে আমি একটু দেরিতেই  শান্তিনিকেতনে গিয়েছি । একটা প্রত্যন্ত গ্রামের ভেতর আমাদের শুটিং হচ্ছিল । সেখানে শুধু মাটির বাড়ি । মাটির সঙ্গে খড়ের মিশেলে তৈরি  হয়েছিল অপরূপ শিল্প । সেই সঙ্গে ছিল অত্যাশ্চর্য সব আলপনা । আমার মনে হয়েছিল এই গ্রাম সৌন্দর্যের সঠিক ঠিকানা । শান্তিনিকেতন মানেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রিয় পুণ্যভূমি । আম্রকুঞ্জ,কাচ মন্দিরের প্রার্থনা সঙ্গীত,ছাতিম তলা, বিশ্বভারতী — এই সবের ভেতর ছিলেন রবি ঠাকুর । যেদিকে চোখ যায় সেদিকেই কবিগুরুর স্পর্শ । শান্তিনিকেতনের মুক্ত বাতাসে মিশে আছে কবির নিঃশ্বাস । আমার  রোমকূপে শিহরন জাগে । এক ধরনের পিন পতন স্তব্ধতার মাঝে আমি শুনি ঝরা পাতার শব্দ । মনে পড়ে গানের কিছু কলি —“আমার মুক্তি আলোয় আলোয়/এই আকাশে”। আজ শান্তিনিকেতনের কথা ভাবলে মনে মেঘ জমে । বিষাদের মেঘ । নীরবতা থেকে বহু দূরে সরে গেছে শান্তিনিকেতন । আজ আর শান্তিনিকেতনে তেমন শান্তি নেই ।

সৃজনশীলতার সঙ্গে ভ্রমণের নিবিড় সম্পর্ক । চির পরিচিত জায়গা থেকে অচেনা জায়গায় পাড়ি দিলে মনের প্রসার ঘটে । নিত্য নতুন চিন্তার জন্ম হয় । খুলে যায় মনের দরজা । প্রবেশ করে গভীরতা । এই গভীরতা থেকেই শিল্পের জন্ম হয় ।

বিদেশ নিয়ে আমার আলাদা করে কোনও হৈ চৈ ব্যাপার নেই । ঘটনাচক্রে আমাকে সুইজারল্যাণ্ড,আমেরিকা,ব্যাংকক,সিঙ্গাপুর,প্যারিস যেতে হয়েছে । দেশে যেমন সুন্দর সুন্দর জায়গা দেখেছি তেমন বিদেশেও দেখেছি অনেক সুন্দর জায়গা । বিদেশের একটা বিষয় উল্লেখ করার মতো । বিদেশের পরিচ্ছন্নতা শৃঙ্খলা শিক্ষণীয় । আমেরিকার বিশ্ববঙ্গ সম্মেলনে আমার ‘যদি লাভ দিলে না প্রাণে’ ছবিটা গিয়েছিল । ছবির স্ক্রিনিং ওখানে হয়েছিল । আমি আমেরিকার ফ্লোরিডায় গিয়েছি । খুব সুন্দর জায়গা । আমেরিকার প্রবাসী বাঙালিদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ হয়েছে । তাদের সঙ্গে এখনও যোগাযোগ আছে । আশ্চর্যের বিষয় আমাদের থেকে প্রবাসী বাঙালিরা কলকাতার কালচার নিয়ে বেশি আগ্রহী । বাংলা সাহিত্য,কবিতা,সিনেমা সম্পর্কে প্রবাসীরা খোঁজ করেন । আমার কোন ছবি এখানে রিলিজ করছে,সেটা আমি জানার আগে প্রবাসীরা জেনে যান । ওরা বাংলা ছবি দেখার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে ।

আরও পড়ুন:  পড়াশোনা ফ্রি স্কুলে, মাত্র ২৩ বছর বয়সেই অধ্যাপক হয়েছিলেন এই বিস্ময় প্রতিভা !

ভ্রমণের আর একটি দিক আছে । সেটা অবশ্যই  মনস্তাত্ত্বিক দিক । হাসি কান্না নিয়েই সমস্ত সম্পর্কের সহবাস । অশান্তির সময় জটিলতার আবর্তে মন ঘুরপাক খায় । তখন প্রকৃতির কাছে গেলে মনের মালিন্য দূর হয় । আমার সামগ্রিক ভ্রমণ কাহিনী বললেই একটা গান ভেসে আসে —“বিশ্ব বীণা রবে বিশ্বজন মহিছে/স্থলে জলে নভতলে বনে উপবনে।/নদী নদে গিরি গুহা পরবাসে/নিত্য জাগে সরস সঙ্গীত মধুরিমা/নিত্য নৃত্যরস ভঙ্গিমা”।

 

- Might Interest You

NO COMMENTS