৫০-এর দশকে নীলাঞ্জন রায়চৌধুরী শিশু শিল্পী হিসেবে কাজ করেছিলেন বাংলা সিনেমায় | বড় হয়ে আর কল্কে পেলেন না | ব্যাঙ্কে সামান্য চাকরিতে বৌ-মেয়েকে প্রতিপালন | দমদমের নিম্নবিত্ত পাড়ায় থাকতেন তিনি | নিজে নাচ জানতেন | মেয়েকেও শেখাচ্ছিলেন | যদি কোনওদিন নায়িকা হতে পারে |

মেয়েকে দিয়ে স্বপ্ন পূর্ণ করতে চেয়েছিলেন | তার জন্য কী করেননি নীলাঞ্জন! ধরেছিলেন সুচিত্রা সেনের ব্যক্তিগত মেক আপ ম্যানকেও | ততদিনে মেয়ের পড়াশোনায় ইতি | সংসার টানতে ক্লাস এইট অবধি পড়া কিশোরী পাড়ায় পাড়ায় হিন্দি গানের সঙ্গে নেচে উপার্জন করত সংসারের জন্য |

অবশেষে শিকে ছিঁড়ল | কিশোরী চোখে পড়ে গেলেন সন্ধ্যা রায়ের | সুযোগ পেলেন তরুণ মজুমদারের সিনেমা শ্রীমান পৃথ্বীরাজ-এ | নায়িকা বলে কথা !সন্ধ্যা রায় নিজের হাতে গ্রুমিং করলেন কিশোরীর | শেখালেন অভিনয় | তরুণ মজুমদার নাম পাল্টে দিলেন | শিপ্রা থেকে কিশোরী হয়ে গেলেন মহুয়া |

বাংলা চলচ্চিত্র পেল নতুন মুখ‚ মহুয়া রায়চৌধুরী |

উত্তম-পরবর্তী যুগে যে কয়েকজন শিল্পী ইন্ডাস্ট্রির হাল ধরেছিলেন মহুয়া তাঁদের মধ্যে একজন | খুব ভাল নাচ জানতেন | সে সময়ের নায়িকারা বিশেষ নাচ জানতেন না | তাই মহুয়ার ক্ষেত্রে সেটা ছিল প্লাস পয়েন্ট | একটা সময় এমন ছিল‚ শুধু মহুয়ার নামে সিনেমা চলত |

কিন্তু তাঁর ঊর্ধ্বমুখী কেরিয়ার গ্রাফেও এসেছিল স্থবিরতা | উত্তম কুমারের সঙ্গে সেই চোখ বা বাঘ বন্দী খেলা-তে অভিনয় করেও সুবিধে হয়নি তাঁর | আবার কেরিয়ারে দমকা হাওয়া লাগে ১৯৮০ সালে‚ মুক্তি পায় তরুণ মজুমদারের দাদার কীর্তি |

১৯৭২ সালে মুক্তি পেয়েছিল শ্রীমান পৃথ্বীরাজ | মহুয়া তখন ১৪ বছরের | ১৯৭৬ সালে তিলক চক্রবর্তীকে বিয়ে করলেন তিনি | কেরিয়ারের পক্ষে যা মোটেও সুখকর হয়নি |

বিয়ের সময় মহুয়া তখন কেরিয়ারের তুঙ্গে | রঞ্জিত মল্লিক‚ তাপস পাল‚ চিরঞ্জিত‚ সন্তু মুখার্জি‚ শমিত ভঞ্জ‚ কার বিপরীতে না নায়িকা হয়েছেন তিনি | পাশের বাড়ির মেয়ের ভাবমূর্তির সঙ্গে জড়তাহীন বলিষ্ঠ অভিনয় | জনপ্রিয় নায়িকা হওয়ার পথে এটাই ছিল মহুয়ার তুরূপের তাস |

প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় একবার ছোটবেলার কথা বলতে গিয়ে বলেছিলেন‚ তাঁদের মা খুব কষ্ট করে বড় করেছিলেন তাঁদের | স্টুডিওতে ঘুরে ঘুরে শাড়ি বিক্রি করতেন | একদিন তাঁকে ওই অবস্থায় দেখে মহুয়া রায়চৌধুরী সব শাড়ি একবারে কিনে নিয়েছিলেন |

এরকমই ছিলেন মহুয়া | নিজের অতীত ভুলতেন না |

অতীতও তাঁকে ছাড়ত না | বিবাহিত মহুয়ার পরিবারেই থাকতেন বাবা নীলাঞ্জন | যদিও মা পড়ে ছিলেন দমদমেই‚ এক নিম্নবিত্ত পাড়ায় | মহুয়া-তিলকের সঙ্গে নীলাঞ্জন থাকতেন বেহালায় |

১৯৮৪ সালে মহুয়া অভিনয় করেন তপন সিনহার টেলিফিল্ম আদমি অউর অওরত-এ | অমল পালেকরের বিপরীতে তাঁর কাজ প্রশংসিত হয় | সবে যখন কেরিয়ারের পালে নতুন হাওয়া লাগছে‚ তখনই আকস্মিক বিদায় এই প্রতিভাময়ী অভিনেত্রীর |

১৯৮৬ সালের ১২ জুলাই | প্রতিবেশী পরিচালক অঞ্জন চৌধুরীর বাড়িতে পার্টি ছিল | গভীর রাতে বাড়ি ফেরেন মহুয়া-তিলক | মাটন গরম করবেন বলে স্টোভ জ্বেলেছিলেন মহুয়া | স্টোভ বার্স্ট করে অগ্নিদগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন |

দশ দিন হাসপাতালে লড়াই করার পরে হার মেনেছিলেন | ইন্ডাস্ট্রির একাংশ একে দুর্ঘটনা বলে মানতে পারেনি | কিন্তু মহুয়া নিজে মৃত্যুকালীন জবানবন্দিতে বলে গেছিলেন সেটা ছিল দুর্ঘটনা | বন্ধ হয়ে যায় তদন্ত | পরে আবার নতুন করে তা শুরু হয় | কিন্তু মৃত্যুর কারণ রহস্যে ঢাকাই রয়ে গেছে |

অনেকেই অভিযোগের আঙুল তুলেছিলেন তাঁর বাবা ও স্বামীর দিকে | বড়ির কাজের লোকরা বলেছিল‚ সেদিন অনেক রাত অবধি ঝগড়া করেছিলেন মহুয়া-তিলক | রান্নাঘরের বাসন দিয়ে একে অন্যকে আঘাতও করেছিলেন | মহুয়ার দেহে আঘাতের চিহ্নও ছিল | ঘনিষ্ঠ জনরা বলে থাকেন‚ এর আগেও মহুয়া আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেছিলেন |

১৯৮৬-র ২২ জুলাই প্রয়াত হন অগ্নিদগ্ধ মহুয়া | ছেলে তমাল তখন সাত বছরের |

প্রতিভাময়ী এই অভিনেত্রীর মৃত্যু রহস্য কুয়াশাবৃতই থেকে যাবে | তাঁর নেশায় সম্পূর্ণ আমোদিত হতে না দিয়েই চলে গেলেন মহুয়া | চরণ ধরেও রাখা গেল না দাদার কীর্তির সরস্বতীকে |

আরও পড়ুন:  বোঝো কাণ্ড ! এই তিন ঠাকুমা-দিদিমার কীর্তি দেখুন একবার

NO COMMENTS