জমজমাট ‘বাগা’ বিচ

‘কালাংগুট’ সি-বিচের প্রায় নাকের ডগায় পছন্দমতো একটা থাকার জায়গা পেয়ে যাব বেশ সুবিধেজনক দামে এটা ভাবতেই পারিনি | বিচের ওপর হোটেল বলতে এখানে একটাই – গোয়া টুরিজমের কালাংগুট রেসিডেন্সি – তবে শহরের একটু ভিতরে ঢুকে এলেই বিস্তর লজ/ভাড়াবাড়ি/রিসর্ট কী নেই! কিন্তু খামোখা সমুদ্র থেকে দূরে থাকতে মন চাইছিল না – এদিকে রেসিডেন্সিতে ঘর খালি নেই – গাড়িটাকেও এবার ছেড়ে দেওয়া উচিত – কারমালি রেল স্টেশন থেকে পানাজি হয়ে কালাংগুট নিয়ে আসার কথা ছিল – এখানকার ড্রাইভাররা ভালো বলে হাসিমুখে এ হোটেল সে হোটেল ঘুরিয়েছে – এদিক ওদিক তাকাচ্ছি – হঠাৎ নজরে এল উল্টো ফুটে একটা সাদা দোতলা বাড়ির গায়ে লেখা ‘হোটেল লোরেলি’স’ | এবার গাড়ি থেকে তাতুকে নামালাম – আমার বউয়ের হোটেল ভাগ্যটা চিরকাল ভালো – হলোও তাই – এক কথায় ঘর পেয়ে গেলাম – ছোট কিন্তু ছিমছাম পরিচ্ছন্ন হোটেল –এমনকী দোতলায় যে ঘরটা দিল তার বারান্দায় দাঁড়িয়ে গাছের ফাঁক-ফোকর দিয়ে এক চিলতে সমুদ্রও দেখা যায় |

হোটেল লরেলি’স
হোটেল লরেলি’স

মার্চ মাসের থার্ড উইকে ছেলের মাধ্যমিক পরীক্ষা সবে শেষ হয়েছে – সুতরাং চলো গোয়া | এখানে মে থেকে নিয়ে গোটা বর্ষাকালটা অফ-সিজন | আর খ্রিস্টমাসের ক’দিন ‘পিক সিজন’ – এছাড়া বাকি সবটাই হলো ‘সিজন’ | গোয়ায় যত বিচ আছে তার মধ্যে এই কালাংগুটেই টুরিস্টের ভিড় সবথেকে বেশি – দিনভর যত রকমের Beach Activity আর Water Sports – সেই সঙ্গে বালির ওপর ঝুপড়ি বা ‘Shack’গুলোতে গভীর রাত পর্যন্ত চলতে থাকে খানাপিনা আর গানবাজনার জমজমাট আসর | আশেপাশের ‘বাগা’ বা ‘আনজুনা’ও এ ব্যাপারে কিছু কম যায় না | নির্জনতা খুঁজতে গেলে সাউথ গোয়ার বিচগুলোতে যাওয়াই ভালো |

কালাংগুটে রোদ পোয়াচ্ছে এক বিদেশিনী
কালাংগুটে রোদ পোয়াচ্ছে এক বিদেশিনী

গোয়ান খাবারের চারদিকে খুব নামডাক – যদিও আমাদের দৌড় ওই ভিন্দালু অবধি – প্রথম রাতে সেটাই ট্রাই করা হলো | প্রায় অন্ধকার বিচে জলের কাছকাছি বসে পর্ক ভিন্দালু খাবার অভিজ্ঞতাই আলাদা | এখানে নানা ধরণের সমুদ্রের মাছ পাওয়া যায় বেশি – আর কাঁকড়া | ‘টিপসি’ Shack-এ আমরা যে ক্র্যাব স্যালাডটা খেয়েছিলাম তার স্বাদ এখনও মুখে লেগে আছে | গোয়ায় এলে রাজধানী পানাজি শহরটা অবশ্যই ঘুরে দেখতে হবে | বিখ্যাত সমস্ত গির্জা – পুরনো দিনের ঘরবাড়ি, স্মৃতিবিজড়িত ‘ডোনা পাওলা’ কিংবা নদীর বুকে স্টিমার ভ্রমণ – কোনোটাই বাদ দেওয়া চলে না | আমরাও ব্রিজিট ফার্নান্দেজের গাড়ি করে বেরিয়ে পড়লাম সক্কাল সক্কাল | পথে পর্তুগিজদের তৈরি আগুয়াডা ফোর্ট দেখে সোজা পানাজি | পরিষ্কার, ঝকঝকে শহর – এক পাশে মিরামার বিচ আর মাঝখান দিয়ে বয়ে চলেছে মান্ডভী নদী | গাড়ি-ঘোড়া, লোকজন, দোকান-বাজার সবই রয়েছে অথচ কোলাহল নেই – একটা ভদ্র-শান্ত পরিবেশ | ব্রিজিট প্রথমে নিয়ে গেল পুরানো শহরের দিকটায় – দেখলাম সেন্ট অগাস্টিন গির্জার ধ্বংসাবশেষ | ১৬০২ খ্রিস্টাব্দে তৈরি এই স্থাপত্যের এখনও যে ঘন্টা-গম্বুজটা শুধু খাড়া আছে তার উচ্চতা মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট – গোটা গির্জাটা দেখলে কী হতো কে জানে! এখানকার সব থেকে বিখ্যাত গির্জা হলো ‘ব্যাসিলিকা দ্য বম জেসাস’ –যেখানে একটা সুন্দর কারুকার্য করা রুপোলি বাক্সের মধ্যে শোয়ানো আছে সেন্ট জেভিয়ারের দেহ |

আরও পড়ুন:  বাঃ! তাজপুর
পুরনো গোয়ার ঘরবাড়ি
পুরনো গোয়ার ঘরবাড়ি

ব্রিজিটকে বলে রেখেছিলাম কিছু পুরানো পাড়া দেখব – ও সেইমত গাড়িটাকে বিশেষ একটা অঞ্চলে নিয়ে গিয়ে পার্ক করে সামনের একটা রাস্তা দেখিয়ে বলল “ওখান দিয়ে হেঁটে ঘুরে আসুন |” দেওয়ালে দেখলাম একটা ফলক লাগানো ‘সেন্ট সেবাস্টিয়ান রোড’ | রাস্তাটা কিছুটা গিয়েই ছোট ছোট গলিতে ভাগ হয়ে গেছে – দু’পাশে টালির চালওয়ালা বাড়ি – রঙিন কাচের ওপর ডিজাইন করা জানলা – কাঠের কাজ করা রেলিং – সামনে কিছুটা গাছপালা | কোনও বাড়ির বারান্দা আর ভিতর মিলিয়ে ছোট ছোট বার-কাম-রেস্তোরাঁ, কোথা থেকে একটা যেন গিটার বাজিয়ে গানের আওয়াজ ভেসে আসছে | সব মিলিয়ে মনে পড়ে যায় পর্তুগিজরা এখানে সাড়ে চারশ বছর ধরে রাজত্ব করে গিয়েছে | দিনের শেষে ‘মান্ডভী’তে ‘রিভার ক্রুজ’ হলো | স্টিমারের ডেকে সারি সারি চেয়ার পাতা – সামনে একটা স্টেজ – যেখানে ছেলে মেয়েরা কস্টিউম পালটে পালটে বিভিন্ন রকমের নেচে গেয়ে সবার মনোরঞ্জন করলো – গান বাজছে – যেমন খুশি নাচো – ধীরে ধীরে যত সন্ধে হয়ে আসছে নদীর দু’ধারে ততই ঝিকমিকে সব আলো জ্বলে উঠে শহরটাকে একটা স্বপ্নপুরী বানিয়ে তুলছে – ক্রুজ করা সত্যিই সার্থক |

কোলভা বিচ
কোলভা বিচ

আগে থেকেই ঠিক ছিল কালাংগুট আর কোলভা এই দুটো জায়গায় ভাগ করে থাকব – কিন্তু কালাংগুটে মজে গিয়ে এইখানেই চারদিন কেটে গেল ফলে কোলভার জন্য রইল মোটে একটা দিন – তাই সই – সাউথ গোয়াটা দেখা তো হবে – তাছাড়া ডাবোলিম এয়ারপোর্টটা কোলভার খুব কাছে |

ঘড়ি ধরে সকাল সাতটায় বেরিয়ে পড়েছিলাম – গাড়ির চালক হ্যারি হাসিখুশি ছেলে | যেখানেই ছবি তোলার জন্য বলছি হাসিমুখে গাড়ি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে | মাঝে মাঝে নিজে থেকে সাজেশন দিছে এই গির্জাটা নাও – ওই আকাশের রংটা দেখ |

কোলভায় প্যারাগ্লাইডিং
কোলভায় প্যারাগ্লাইডিং

কোলভা পৌঁছতে ঘন্টাখানেক লাগল – সরকারি টুরিস্ট লজেই গেলাম – রাস্তা পেরলেই বালি শুরু হয়েছে – সব ঘর থেকে সমুদ্র দেখা যায় – কী ভাগ্যি ঘরও  পেয়ে গেলাম – বিচের ওপর বব’স শ্যাক – ওখানে গিয়েই হাত-পা ছড়ালাম – কোলভার জীবনযাত্রা অনেক ঢিলেঢালা ফলে যেখানে খুশি বসে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দিন – নো প্রবলেম |

আরও পড়ুন:  বাঃ! তাজপুর
বব’স শ্যাক
বব’স শ্যাক

জামাকাপড় রেখে সমুদ্রে নামুন সন্দীপ এসে ছবি তুলে দেবে | ঝকঝকে স্মার্ট এই ছেলেটি অন্ধ্র থেকে এসে বব’স-এ কাজ করছে | অনেকক্ষণ ধরে এক সাহেব বিয়ার-এ চুমুক দিতে দিতে বই পড়ছিল – আমি অন্য টেবিল থেকে সেটা এঁকে ফেললাম – সন্দীপ অমনি ছোঁ মেরে খাতাটা আমার হাত থেকে নিয়ে সাহেবকে দেখাল – উনি আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে আমাকে ধন্য করলেন |

সাহেবের বই পড়া আর বিয়ার পান চলছে
সাহেবের বই পড়া আর বিয়ার পান চলছে

সাহেবের ছবিটা এঁকেছিলাম দুপুর বারোটা নাগাদ – আড়াইটের সময় জল থেকে উঠে দেখি বইটা শেষ হয়নি বটে কিন্তু চার চারটে বিয়ারের বোতল শেষ, পাঁচ নম্বরটা খোলা হচ্ছে | টুরিস্ট লজের পিছন দিকটায় বিশাল ফুলের বাগান – অনেকটা সময় দিব্যি কাটানো যায় – তবে একটা সতর্কবার্তা – নিজের ঘরে ঢোকার আগে একেবারে নিশ্চিত হয়ে নেওয়া দরকার – যে কোনও বড় হোটেলে এই ভুলটা হওয়া স্বাভাবিক,তবে গোয়ার ব্যাপার-স্যাপার কিঞ্চিত আলাদ কি না | খেয়াল করিনি ১০৬ ভেবে ১০২তে বেল টিপেছি | পুরুষ কন্ঠে কী একটা ইংরিজি কথা ভেসে এল – ভাবলাম বুবুল হয়তো টিভি দেখছে – আবার বেল, এবার দরজা হাট করে খুলে গেল – সামনে স্রেফ তোয়ালে জড়ানো অবস্থায় জলজ্যান্ত বন্ড ফিল্মের নায়িকা – গা থেকে তখনও টুপটুপ করে জল পড়ছে – মুখে মৃদু হাসি – “ইয়েস”| অচেনা লোক বলে এতটুকু সংকোচ নেই – দাঁড়িয়েই রয়েছেন – শেষে পালাতে হলো আমাকেই | এ ক্ষেত্রে না হয় ব্যাপারটা মিটল কিন্তু গোয়া থেকে পালানোটা কি অতই সহজ | খালি মনে হচ্ছিল মাত্র এই ক’টা দিনে কিছুই তো বিশেষ দেখা হলো না – আরও কত সুন্দর সুন্দর বিচ – ভালো খাবার আর আনন্দ উপকরণগুলো যে উপভোগ করা বাকি থেকে গেল |

- Might Interest You

NO COMMENTS

এমন আরো নিবন্ধ