দীপান্বিতা রায়
বাংলা সংবাদ চ্যানেলের দায়িত্বপূর্ণ চাকরি সামলে নিয়মিত কলম ধরেন শিশু-কিশোর পাঠকদের জন্য | বঞ্চিত হন না সাবালক পাঠকমহলও | উল্লেখযোগ্য বই ‘রূপকথার অরূপরতন’, ‘গুপীবাঘার পোলাপান’, ‘বাহনের বায়নাক্কা’ এবং ‘স্বপ্নে বাঁচা’ |

গল্প হলেও ঘোর বাস্তব
———————

সকাল থেকেই আজ মন ভাল তনুশ্রীর | অফিসে আসার সময় গাড়িটা অন্তত দুবার জ্যামে ফাঁসল | তবু বিরক্তি লাগেনি | ইচ্ছে করেনি স্টিয়ারিং ছেড়ে লাফ দিয়ে নেমে ট্রাফিক পুলিশটাকে গালাগালি করতে | অফিস আসার পর কাজগুলো যেন কেমন গড়গড়িয়ে হয়ে যাচ্ছে বসের সঙ্গে নতুন প্রজেক্ট নিয়ে মিটিংটাও মোটামুটি ভালই হল | এমনিতে তার বস‚ মানে শ্রীমান শুভ্রদীপ বোসের যেরকম চ্যাটাং চ্যাটাং কথা‚ তাতে যে কোনও মিটিংয়ের পরই মুখটা কেমন যেন তিতকুটে লাগে তনুশ্রীর | আজ কিন্তু তেমন কিছুই হল না | নিজের কিউবিকলে ফিরে কফির কাপে চুমুক দিতে মিষ্টিই লাগল | আসলে তনুশ্রীর যে আজ মন ভাল | অবশ্য মন ভাল হওয়ার কারণও আছে | তনুশ্রী আজ অফিস ফেরতা নাটক দেখতে যাবে | নাটক দেখতে তনুশ্রী ভারী ভালবাসে | করতেও ভালবাসত | বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরোনর পরও নাটক করেছে নিয়মিত | কিন্তু তারপর বিয়ে-থা‚ চাকরি‚ পাঁচ বছরের তিন্নি সব মিলে নাটক করায় ইতি পড়েছে | কিন্তু ভালবাসাটা মরে যায়নি এখনও | নাটক দেখার নামেই তার মন ভাল হয়ে যায় | আর আজ‚ সে নিজে যে দলে নাটক করত সেই ‘অর্বাচীন’ -এর নতুন নাটকের ফার্স্ট শো | তনুশ্রীকে তো যেতেই হবে |

অবশ্য ইচ্ছে হলেই যে চলে যাওয়া যায় সেরকম ঠিক ব্যাপারটা নয় | প্রথমত অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বেরোতে হবে | তবে সেটা তেমন কিছু কঠিন ব্যাপার নয় | সিনসিয়ার বলে অফিসে তনুশ্রীর নামডাক আছে | শুভ্রদীপের মত খুঁতখুঁতে লোকও সহজে ভুল বার করতে পারে না | কাজে ফাঁকি দেওয়াটা তার স্বভাবও নয় | ফলে সব কিছুই আপ-টু-ডেট থাকে | এহেন তনুশ্রী যদি একদিন একঘণ্টা আগে অফিস থেকে বেরোতে চায়‚ তাহলে যে কারওর আপত্তি হবে না তাতে কোনও সন্দেহ নেই | তাই ও নিয়ে চিন্তা ছিল না তনুশ্রীর | আসল সমস্যা হল বাড়ির কাজের লোক এবং অবশ্যই তিন্নি | রান্নার লোক বেলামাসিকে কাল রাতেই সবকিছু গুছিয়ে বলে রেখেছে | এমনকী নীলাদ্রির জন্য কটা রুটি হবে‚ সেগুলোকে কীভাবে পাতলা কাপড়ে মুড়ে ক্যাসারোলে রাখতে হবে,তাও | কিন্তু তিন্নিকে রাখার তো একটা ব্যবস্থা করতে হবে | তার আয়ামাসি কাজ সেরে চলে যায় রাত আটটায় | নাটক দেখে ফিরতে তনুশ্রীর খুব কম করেও সাড়ে নটা |

আরও পড়ুন:  চাঁদের মাটিতে ভারতের পতাকা‚ স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে ইসরো'র স্বপ্নের ছবি

একটু কিন্তু কিন্তু করেই নীলাদ্রিকে আটটার মধ্যে ফিরতে বলেছিল তনুশ্রী | নীলাদ্রি নাটক দেখতে ভালবাসে না | তাই তার যাওয়ার কোনও আগ্রহ নেই | তবে তনুশ্রীর নাটক দেখা নিয়ে আপত্তিও নেই কোনও | তনুশ্রী যদি বন্ধুদের সঙ্গে কিংবা একলাও নাটক দেখতে যায়‚ তাহলে নীলাদ্রি কখনই তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে না | তবে সাধারণত এরকম ক্ষেত্রে মেয়েকে নিজের মায়ের কাছেই রেখে যায় তনুশ্রী | এবারও সেরকমই প্ল্যান ছিল | কিন্তু দুদিন আগে মায়ের হঠাৎ ভাইরাল ফিভার হয়ে যাওয়ায় সে আশায় ছাই | বাধ্য হয়েই গতকাল রাতে বরকে কথাটা বলতে হল তনুশ্রীকে | এহেন প্রস্তাবে প্রথমে বেশ খানিকটা হকচকিয়ে গেলেও শেষপর্যন্ত রাজি হয়ে গেল নীলাদ্রি | আর তারপর থেকেই তনুশ্রীর মনের জানলায় ফুরফুরে দখিনা বাতাস |

ঘড়ির কাঁটায় তখন প্রায় চারটে | আর এক ঘণ্টার মধ্যেই বেরোতে হবে | তনুশ্রী তাই দ্রুত হাতের কাজগুলো গুছিয়ে নিচ্ছিল | মোবাইলের স্ক্রিনে নীলাদ্রির নম্বরটা দেখে তাড়াতাড়ি ধরল‚

‘ শোনো আজ আমি তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে পারছি না | বস বলছে একজন ক্লায়েন্ট আসবে | আমিও থাকলে ভাল হয় | তুমি আজ একটু ম্যানেজ করে নিও প্লিজ |’

আচমকা কথাগুলো শুনে কয়েক সেকেন্ড স্তম্ভিতের মতো চুপ করে থাকে তনুশ্রী | মাথার ভিতর সব কেমন যেন গণ্ডগোল পাকিয়ে যায় | তার দিক থেকে কোনও সাড়া না পেয়ে, মৌনতাকে সম্মতির লক্ষ্মণ ধরে নিয়ে নীলাদ্রি বলে,

‘ঠিক আছে, রাখছি তাহলে | আমার ফিরতে সাড়ে নটা হবে |’

কোনওরকমে নিজেকে সামলে ঠান্ডা গলায় প্রশ্ন করে তনুশ্রী,’বসকে তুমি বলোনি, যে তোমার আজকে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরার কথা?’

‘কী আশ্চর্য, এমন আনপ্রোফেশনালের মতো কথা বল তুমি! বস বলছেন আমি থাকলে ভাল হয়, আর আমি বলবে যে আমার বউ আজ নাটক দেখতে যাবে তার জন্য আমাকে তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে? এরকম আজগুবি কথা কখনও বলা যায়!’

‘নীলাদ্রি, তোমার বোন যখন আমেরিকা থেকে এসেছিল, তখন তার সঙ্গে শপিং করার জন্য আমাকে একদিন ছুটি নিতে হয়েছিল | তুমিই বলেছিলে নিতে | তখন কিন্তু তোমার প্রস্তাবটা মোটেই আজগুবি মনে হয়নি |’

আরও পড়ুন:  শাক্ত মতে দেবী কৌষিকী ও পুণ্যতিথি কৌষিকী অমাবস্যা এত গুরুত্বপূর্ণ কেন ?

‘কী মুশকিল! তুমি তো শপিং করতে ভালবাস!’

‘শপিং করতে ভালবাসা আর তোমার বোনের শপিং-এর জন্য ছুটি নেওয়া নিশ্চয়ই এক ব্যাপার নয় | বিশেষ করে তখন আমার অফিসে কাজের চাপ চলছিল | ছুটিটা নিতে আমার যথেষ্ট অসুবিধে হয়েছিল |’

‘তুমি একটা সামান্য ব্যাপার নিয়ে কিন্তু ঝামেলা করছ তনু | নাটকটার তো আরও শো হবে | পরে কোনও একদিন দেখে আসবে | আর ঝুমার সঙ্গে বেরোনোর জন্য তোমার অত অসুবিধে হয়েছিল সেটা বললেই পারতে | তাহলে বলতাম না ছুটি নিতে |’

‘বলিনি, তার কারণ আমার মনে হয়েছিল যে আমি ছুটিটা নিলে তুমি খুশি হবে | আর নাটকের যে আরও শো হবে সেটা আমি জানি | কিন্তু আমার আজ নটকটা দেখতে যাওয়ার ইচ্ছে হয়েছে | আমি সকাল থেকে তার জন্য মানসিক ভাবে প্রস্তুত হয়েছি | সেটা নিয়ে তুমি কনসার্ন নও দেখে খারাপ লাগছে | ঠিক আছে | আমার এ ব্যাপারে কিছু বলার নেই | তুমি তোমার সময়েই বাড়ি ফিরো |’

ফোনটা কেটে দেয় তনুশ্রী | কান-মাথা সব ঝাঁ ঝাঁ করছে | বোতল থেকে খানিকটা জল খায় | তারপর ল্যাপটপটার সামনে চোখ বন্ধ করে বসে |

বন্ধ চোখের পাতায় ভেসে উঠছে একের পর এক দৃশ্য | ক্লাস সেভেনে পরীক্ষার ফল খারাপ হয়েছে | রেজাল্ট হাতে নিয়ে একটুখানি চুপ করে থেকে মা বলল,
‘ভাল করে পড় তনু | ভাল রেজাল্ট না করলে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবি না | আমার মতো চিরকাল হাঁড়ি ঠেলতে হবে | দেখছিস কীরকম তোর বাবার হাত তোলা হয়ে থাকতে হয় | নিজে রোজগার করলে নিজের মতো স্বাধীনভাবে থাকতে পারবি |’

চাকরি পেয়েছে তনুশ্রী | মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে ভাল চাকরি | বাড়িতে আনন্দের হাওয়া | বাবা বলছে‚’ আর আমাদের কী চিন্তা‚ আমাদের স্বাধীন‚ রোজগেরে মেয়ে | এবার আমরা পায়ের ওপর পা তুলে পেনশনের টাকায় আরাম করে থাকব |’

কোম্পানি থেকে বিদেশ যাওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে | ছ’মাসের ট্রেনিং | ফিরে এলেই প্রোমোশন | যেতে পারল না তনুশ্রী | শাশুড়ি হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন | মুম্বইয়ে নতুন চাকরির অফার | নেওয়া গেল না | তিন্নি বড্ড ছোট | নীলাদ্রি যাবে না | অত ছোট বাচ্চা নিয়ে তো আর একা থাকা যায় না |

 মোবাইলটা বাজছে | চটকা ভেঙে ধরল ফোনটা | রেকর্ডেড মেসেজে | স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে সবাইকে শান্তি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার আবেদন মুখ্যমন্ত্রীর | ঘড়ির দিকে একবার তাকাল তনুশ্রী | এখনও যথেষ্ট সময় আছে | দ্রুত ব্যাগ গুছিয়ে নেমে গেল নিচে | গাড়িটা বার করে সোজা বাড়ি | রাস্তা থেকেই ফোন করে বলে দিয়েছিল তিন্নিকে রেডি করে রাখতে | মেয়েকে সামনের সিটে বসিয়ে সিট বেল্ট আটকে ফোন করল অনসূয়াদিকে‚‘আমি কিন্তু আজ মেয়েকে নিয়েই নাটক দেখতে যাচ্ছি | ধারের দিকে দুটো সিট রেখ প্লিজ |’

আরও পড়ুন:  পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে গোপনে রাখা আছে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের হৃদয় ?

ঘড়িতে প্রায় নটা চল্লিশ | নাটক শেষ হওয়ার পর সবার সঙ্গে একটু কথাবার্তা বলে সবে গাড়িতে স্টার্ট দিতে যাচ্ছে তনুশ্রী‚ ফোনটা বাজল | ধরতেই নীলাদ্রির উত্তেজিত গলা‚’কী ব্যাপার, তখন থেকে বেল বাজাচ্ছি‚ দরজা খুলছ না কেন?’

‘বাড়িতে কেউ নেই তো কে দরজা খুলবে ?’ তনুশ্রীর গলায় ঠাট্টার আভাস |

‘তার মানে ?’

‘মানে, আয়াকে ছুটি দিয়ে দিয়েছি আর আমি নাটক দেখতে এসেছি |’

‘তুমি নাটক দেখতে গেছ ! আর তিন্নি ?’

‘তিন্নি আমার সঙ্গে আছে |’

নীলাদ্রি কয়েক সেকেন্ড চুপ | তারপর বেশ ধারাল গলায় বলে,’বুঝেছি | কিন্তু আমি তাহলে এখন বাড়ি ঢুকব কী করে ?’

‘ঢুকবে না | অপেক্ষা কর | আমার ফিরতে মিনিট কুড়ি লাগবে | কাল তো ১৫ আগস্ট | ছুটি আছে | একটু দেরি করে শুলে অসুবিধা হবে না |’

ফোনটা রেখে দেয় তনুশ্রী | তিন্নি জিজ্ঞাসা করে‚

‘কাল তোমারও ছুটি মাম্মা ?’

‘হ্যাঁ | কাল তো স্বাধীনতা দিবস | তাই আমারও ছুটি|’

‘স্বাধীনতা মানে কী, মাম্মা ?’

গাড়িতে স্টার্ট দেয় তনুশ্রী | তারপর পাঁচ বছরের মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলে‚ ‘স্বাধীনতা মানে‚ ইচ্ছে মত বাঁচা |’

তনুশ্রীরা এরকমই | আধুনিকা | রোজগেরে | কিন্তু অর্থনৈতিক স্বাধীনতা থাকলেও তারা জীবনে সবসময় ‘স্ব’-এর অধীন থাকতে পারে কই ? তবু এভাবেই তারা চেষ্টা করে পরবর্তী প্রজন্মের মনের কোণে নিজের ইচ্ছেমতো বাঁচার বীজ বুনে দিতে |

(পুনর্মুদ্রিত )

Sponsored
loading...

NO COMMENTS