অমর্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায়
জন্ম – ১৯৯২, কলকাতায়। ২০১৪-এ পশ্চিমবঙ্গ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইলেকট্রনিক্স এঞ্জিনিয়রিং-এ স্নাতক, পরে আইআইইএসটি, শিবপুর থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ ২০১৬-এ। বর্তমানে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষক। নেশা বলতে বই আর বেড়ানো। শখের তাগিদে নানারকম বিষয়ে লিখে থাকেন। পছন্দ বলতে পরিবেশ আর মানুষের গল্প বলা।

পরিচালক অনীক দত্ত তাঁর ছবি “ভূতের ভবিষ্যত”-এর একটি সংলাপে বলেছিলেন, “আহা, ভূত হলেই বা কি – বাঙালি তো, সকালবেলা বাজারে গিয়ে কানকো টিপে মাছ না কিনলে ঠিক স্বস্তি হয় না”। আজকালকার বাঙালি বাজার-করিয়ে-দের মধ্যে কয়জনের সেই দক্ষতা অবশিষ্ট আছে বলতে ভরসা নেই। কানকো টিপে মাছ কেনবার দিন গিয়েছে, বরং বাঙালি এখন বেশি ভয় করে পেট্রল-পাম্প কিংবা ট্রাক-মালিক, ট্রাক-চালকদের – অনির্দিষ্টকালের হঠাৎ ধর্মঘটকে, কারণ – অন্ধ্রপ্রদেশ-উড়িষ্যা থেকে আসা চালানি মাছের জোগান তখন বন্ধ হয়ে যায়। পুকুরের ল্যাটা-পুঁটির ‘লোকাল’ আমদানিতে রোজের খাওয়া চলে না, রূপনারায়ণের ইলিশ কোলাঘাটের তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের হাড়িকাঠে ‘বলিপ্রদত্ত হইয়াছে’। এখন অন্ধ্রপ্রদেশ-উড়িষ্যার ট্রাক-ভর্তি হয়ে আসা, বরফ-চাপা রুই-কাতলাতেই বাঙালির রোজের রসনা-তৃপ্তির ব্যবস্থা। বিপদ সেখানেও।

আমাকে বোধকরি খুব শিগগিরিই আপনারা ‘বিপজ্জনক’ লেখক তকমা দিয়ে বসতে পারেন। গত দুইমাসে যে দুইটি প্রবন্ধ আপনাদেরকে শুনিয়েছি – সে দুইটি জুড়েই কেবল বিপদ আর বিপদের গন্ধ। আসল কথা বোধহয় সেইটিই, আমরা যতই এগোচ্ছি, যতই আধুনিক আদব-কায়দায় নিজেদেরকে পরিশীলিত করে তুলছি – ঠিক ততই বোধহয় আমরা সবকিছুকেই ‘এক্ষুণি’ আর ‘এখনি’র গন্ডিতে ফেলে দিতে দিতে চলেছি। যা কিছুই হবে, তা হোক এক্ষুণি, এই মুহূর্তেই। অন্দরের গুণাগুণ বিচারের সময় নেই, বাইরের চাকচিক্যটি বেশ পাকা করে ধরা চাই।

চালানি মাছের সমস্যার কথা বলছিলাম। এসব মাছের ক্ষেত্রে প্রধান যে সমস্যাটি দেখা যাচ্ছে যে, ভিনরাজ্য থেকে আমদানির সময়ে, অনেক ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট দিনের চেয়ে বেশিদিন সময় লাগছে। এই সময় জুড়ে মাছকে তাজা রাখাটা ব্যবসায়ীদের পক্ষে অসম্ভব। উপায় হিসাবে তাঁরা বেছে নিচ্ছেন ফর্ম্যালিন। বিজ্ঞান বা ডাক্তারির, ছাত্র বা ছাত্রীরা, আতঙ্কিত হবেন না। হ্যাঁ, হলই বা ফর্ম্যালিন মর্গের মতো জায়গায় ব্যবহৃত, শব-সংরক্ষণের জন্য উপযোগী রাসায়নিক – তবু মাছগুলিকে তো ‘তাজা’ বলে চালানো গেলো। ক্রেতা বন্ধুও ভাবলেন, আহা চমৎকার মাছ – একেবারেই ‘টাটকা’ বলে মনে হচ্ছে যেন।

আরও পড়ুন:  ‘জ্যোতির্ময়ী জগন্মাতার আগমন বার্তা’

রসায়নের কচকচিতে যাবো না, অ্যালডিহাইড যৌগগুলির ভিতরে, তাদের সবচেয়ে সহজ রূপটিই হলো ফর্ম্যালডিহাইড, যার তরল অবস্থাটিকেই আমরা ফর্ম্যালিন বলে থাকি। প্রধানত এটি ব্যবহার হয় সংরক্ষক হিসাবে, ডাক্তারি গবেষণাগারে এবং জীবাণুনাশক হিসাবে। এছাড়াও মৎস্যচাষের ক্ষেত্রে পরজীবী ও ছত্রাকনাশক হিসাবে ফর্ম্যালিন ব্যবহার হয়ে থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মৎস্যচাষের কাজে ফর্ম্যালিন ব্যবহার আইনসম্মত। অথচ ইওরোপ ও জাপানে, সেই একই ক্ষেত্রে ফর্ম্যালিন ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মাছের শরীরে ক্যান্সার এবং টিউমার সৃষ্টিকারী হিসাবে, ফর্ম্যালিনের প্রভাব খতিয়ে দেখবার পরেই জাপান এবং ইওরোপের অধিকাংশ দেশে – মৎস্যচাষ বা তার সঙ্গে জড়িত যে কোনও বিষয়েই ফর্ম্যালিনের ব্যবহার বেআইনি বলে ঘোষিত হয়। ২০০৪ সালে আন্তর্জাতিক ক্যান্সার গবেষণা সংস্থা ফর্ম্যালডিহাইডকে গ্রুপ১-কারসিনোজেন হিসাবে চিহ্নিত করে। গবেষণায় এও জানা যাচ্ছে যে, ফর্ম্যালডিহাইড-যুক্ত মাছ যাঁরা খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করবেন কেবল তাঁরাই নয়, যে অসাধু ব্যবসায়ীরা এ ধরণের কাজে যুক্ত – দীর্ঘ সময় ধরে ফর্ম্যালিনের সংস্পর্শে আসার কারণে ভবিষ্যতে তাঁদের শরীরেও ক্যান্সারের প্রকোপ আসতে পারে।

একাধিক বিদেশী গবেষণাপত্রে এই নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশ এবং ভারতবর্ষ-সহ বিভিন্ন নদীমার্তৃক দেশে যেখানে মাছ এবং মৎস্যজাত খাদ্যদ্রব্যের চাহিদা বেশি – সে সমস্ত জায়গাতেই এ ধরণের বিপজ্জনক রাসায়নিক ব্যবহার করে মাছ-সংরক্ষণের প্রবৃত্তি ক্রমেই বেড়ে চলেছে। ২০১১ সালের একটি রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে যে, পঞ্জাব ও অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে আমদানিকৃত ‘বাসা’ মাছের দেহে দিল্লীর স্বাস্থ্যমন্ত্রকের আধিকারিকেরা ফর্ম্যালিনের উপস্থিতির প্রমাণ পেয়েছেন। কাঁটাবিহীন ও নরম এই ‘বাসা’ প্রজাতির মাছই কিন্তু বর্তমানে সবচেয়ে বেশি করে উঠে আসে – বিবাহ ও অনুষ্ঠানবাড়িতে ফিশ-ফ্রাই পদটিতে ভেটকির বিকল্প হিসাবে। ‘মাছে-ভাতে’ বাঙালির রোজকার পাতে যেন সত্যি সত্যিই আজ অশনি-সংকেতের আভাস পাচ্ছি।

এ সমস্ত কিছু লেখবার পর, পাঠকবন্ধুরা একটা প্রশ্ন ছুঁড়তেই পারেন – “মশাই, তাহলে বলতে পারেন – এখন কী খাওয়া উচিত ?” মুড়িতে ইউরিয়া, বিরিয়ানিতে রং, রোজের শাকসবজিতে তুঁতে, পাতের রুইয়ের টুকরোতেও ফর্ম্যালিন – সাধু হতে বলছেন ? সমস্যা সত্যিই জটিল। এমন ভয়ানক ব্যস্ত জীবনে আমরা ক্রমশই নিজেদেরকে ‘মানিয়ে’ ফেলছি যে – রোজের আনাজটুকুও আমরা এখন আর বাজারে গিয়ে কিনি না। ট্রলিতে ঠেলে, বহুজাতিক কোম্পানির ছাপ-মারা, প্যাকেটজাত ঠাণ্ডা সংরক্ষিত সবজিতেই আমরা আমাদের রসনা‘তৃপ্তি’ ঘটাই। সেগুলি যে ঠিক কোন বিশেষ প্রক্রিয়ায় ‘সংরক্ষিত’ বা ‘প্রক্রিয়াকরণ’ করা হয়েছে আমরা দেখতেও যাইনা। ‘দর্শনধারী’ হওয়া ভালো, তবু – নিজের স্বাস্থ্যের দিকটুকুকে খেয়াল রাখতে চাইলে বোধহয় আমাদের অল্প অল্প করেও ‘গুণবিচারী’ হওয়া উচিত। বেঁচে থাক আমার বারুইপুর লোকাল, আনাজের ঝুড়ি আর নামখানা-ডায়মন্ডহারবার লাইনের রোজকার মাছের আড়তদারেরা। তাঁরা যদ্দিন থাকবেন, আমরা অন্তত আমাদের সামান্য আশাটুকুকেও হয়তো বা জিইয়ে রাখতে পারবো। মহাভারতের বনপর্বে যক্ষের প্রশ্নের জবাবে যুধিষ্ঠিরের উত্তরটুকুই আজ মনে পড়ছে হঠাৎ, “দিবসস্যাষ্টমে ভাগে শাকং পচতি যো নরঃ, অনৃণী চাপ্রবাসী চ স বারিচর মোদতে” – অর্থাৎ কিনা, “হে জলচর বক, যে লোক ঋণী ও প্রবাসী না হয়ে দিবসের অষ্টম ভাগে শাক রন্ধন করে সেই সুখী”। (সৌজন্যে : কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাসকৃত মহাভারত, সারানুবাদ – রাজশেখর বসু।)

আরও পড়ুন:  সতীর মস্তিষ্ক পড়ার পৌরাণিক বিশ্বাস থেকেই জন্ম মরুতীর্থ হিংলাজের

NO COMMENTS