বাংলালাইভ রেটিং -

সত্যি বলতে কি, বিশ্বাস হচ্ছিল না যেন! এরকমটাও হতে পারে নাকি কখনো? স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক আছড়ে ভেঙে টুকরো হয়ে ছিটিয়ে পড়ছে স্ক্রিনে। রাতের মশারি পট বদলে হয়ে উঠছে খুন করবার যুদ্ধক্ষেত্রের মতো। আর সেটা দেখে খিক-খিকিয়ে জমিয়ে হাসছে লোকজন সব বসে? ইনসেনসিটিভ চটুল সব কমেন্ট পাস তো আছেই!

কলকাতার সেরা একটা হল-এর ব্যালকনিতে বসে আমি তো বেবাক থ! উইক-এন্ডের সন্ধেবেলা বলে লোক তো হয়েছে মন্দ না! কিন্তু এই এঁরা সবাই আসলে কেমনতর লোক?

মানুষের যেটা হয়, সবসময় চারপাশটা সে মাপতে চায় নিজের মত করে। নিজের ছাঁচে ফেলে। সেটা করতে গিয়ে বারবার তাই কূল পাচ্ছিলাম না কোন। ছবিটা যদি এতই মজার হবে, মনে হচ্ছিল, আমি সেই মজার কিছুই টের পাচ্ছি না কেন?

আমার মধ্যেই কি তাহলে গোলমাল হল কোন?

কয়েকটা সিনে ডায়ালগের মধ্যে ডার্ক হিউমার লুকনো আছে, সেটা টের পেয়েছি ঠিকই। ইন্দ্রের (ঋত্বিক চক্রবর্তী) সঙ্গে বারবার ওই চেলুর (দিব্যেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়) দেখা হয়ে যাওয়া আর তার পরের রিয়্যাকশনগুলোতে তো ভরপুর নিটোল মজা ঠাসা। বা সেই যখন ইন্দ্রকে দৌড়ে পালাতে দেখে সনাতনী (পৌলমী দাস) এসে জানতে চাইবে মিতুনের (পাওলি দাম) কাছে, ‘এরকম দৌড়ে দৌড়ে কোথায় চলে গেলেন উনি?’ আর উত্তরে মিতুন খুব রসিয়ে একটা স্পার্ক ছাড়বে এই বলে যে, ‘ওনার হঠাৎই একটু পটি পেয়ে গেছে’! মুচমুচে ফানের এই মোমেন্টগুলো নিয়ে সত্যি আমার বলার কিছু নেই। কিন্তু তাই বলে বিষাক্ত সব ঝগড়া দেখেও লোকের মুখে উথলে উঠবে হাসি?

নাকি পাশের বাড়ির হাজব্যান্ড ওয়াইফ ঝগড়া করলে তাতে যায় আসে না কিচ্ছু, তাদের মারপিট হলে জমিয়ে সেটা এনজয় করাই রীতি?

চ্যাপলিনের সেই খুব ফেমাস একটা কোটেশন আছে না? ‘লাইফ ইজ আ ট্র্যাজেডি হোয়েন সিন ইন ক্লোজ-আপ, বাট আ কমেডি ইন লং শট’। মনে হচ্ছিলো, এখানেও ঠিক সেরকম কিছু হয়ে যাচ্ছে কিনা। সুমনের তৈরি সিনেমা যতই মরমী আখ্যানের গল্প বলুক না কেন। অদৃশ্য লেন্সটা হয়তো এমন ক’রে ফিট হয়ে আছে যে, পুরোটা হয়ে দাঁড়িয়েছে সুপার-লং শটের মতো। কলকাতার এই পাবলিকের অন্তঃস্থল ছুঁতেই পারছে না সেটা! মনে হচ্ছে না একবারও যে স্ক্রিনের এই অসহায় লোকটা তো কাল আমিও হতে পারি।

ইন্দ্রের ভূমিকায় ঋত্বিককে একেকবার মনে হয় যেন সুনীলের নীললোহিতের মতো

না হলে মেঘের চাদরে মুড়ে দেওয়া এমন একটা ছবি, সেটার লাস্ট সিনে ইন্দ্র যখন মোবাইলের টাওয়ার ধরার জন্যে একটু একটু করে একটা ঢালু খাদের দিকে নেমে যাবে, আর কেউ একজন ওকে সাবধান করবে এই বলে যে, ‘বাবু ওই জঙ্গলে এখনও চিতা বেরোয় – যাবেন না’ তখন শিস মেরে অস্ফুটে পাশ থেকে কেউ এটা বলবে কেন যে, ‘যাহ শালা – তোর এখন ওই চিতার খোরাক হওয়াই ভালো’।

কিংবা ওপাশ থেকে অন্য কেউ আবার নিজের মনেই ওর পর এমন একটা ধরতাই দেবে কেন যে, ‘কিউ কি চিতা ভি পিতা হ্যায়’। তার মানে কি পুরো সিনেমাটা আসলে এইরকম যে, হালফিলের বাঙালি মনে সেটা বড়জোর ‘মাউন্টেন ডিউ’-এর একটা অ্যাড ক্যাম্পেন চলকে দিতে পারে, তার বেশি আর কিচ্ছু নয়!

সিনেমা শেষ, পর্দায় তখন এন্ড ক্রেডিটের নামগুলো উঠে যাচ্ছে একের পর এক। আমার তখনও ঘোর কাটে নি, চুপচাপ বসেই রয়েছি সিটে। বান্ধবীর কোমর জড়িয়ে বেরতে বেরতে বছর কুড়ির একজনকে বলতে শুনলাম, ‘এই সিনেমাটাকে তুই বলেছিলি ফাটাফাটি? তাই জোর করে দ্যাখাতে নিয়ে এলি আমায়?’ শুনে মেয়েটা শরীর মুচড়োল অদ্ভুত একটা হিল্লোল তুলে যেন। মনে হলো, হঠাৎ ক’রে খুব অকওয়ার্ড ফিল করছে বোধহয় ও। ‘দ্যাখ্‌- ফাটাফাটি কিন্তু বলি নি কখনও আমি। ভাল হয়েছে বলে শুনেছিলাম – ব্যাস। এরকম ছিরির হবে যে, আগে থেকে জানবো কী করে বল্‌?’ খিলখিল আদুরে হাসিতে ও আলতো করে মাথা ছোঁয়াল ওর ছেলে বন্ধুর কাঁধে।

আরও পড়ুন:  সেক্স কিংবা বিয়ের জন্য তাড়াহুড়ো নয়, প্লিজ!

যত দেখছি, যত শুনছি, অবাক হচ্ছি তত। আচ্ছা, এটাই তো সেই যাকে বলে মাল্টিপ্লেক্স ফিল্ম। আর আরবান এই ছেলে-মেয়েগুলোই তো শুনি নাকি অমন ফিল্মের ভিউয়ার। তবু তাহলে কেন এদের সঙ্গে একটুখানিও ‘কানেক্ট’ করলো না ছবিটা? এটা কি ছবিটার জন্য হল, নাকি শীর্ষেন্দুর যে উপন্যাসের অংশ থেকে এই ছবিটা তৈরি, সেটাও কিছুটা দায়ী? এই কোন কিছু বুঝতে না পারার, কমিউনিকেট না করতে পারার বীজ আসলে সেটার মধ্যেই আছে?

মূল লেখাটার নাম ‘আশ্চর্য ভ্রমণ’। হ্যাঁ, চলুন এবার সেটার কাছে যাই।

বহুকাল আগে আনন্দবাজারের পুজোসংখ্যার জন্যে লেখাটা লেখেন তিনি। সেটা বহুকাল আগের পৃথিবী –তা প্রায় হাফ সেঞ্চুরি আগের কথা হবে। তখন ইন্টারনেট নেই, হোয়াটসঅ্যাপ নেই আর মুহুর্মুহু সেলফি তোলার নার্সিসিস্ট হিড়িকও হয় নি শুরু – সেই তখন, সেই তখনও কি সেই লেখাটা আদৌ বুঝতে পারতো লোকে?

পরে একটা উপন্যাস সংকলনে সেটা নিয়ে লিখতে গিয়ে স্বয়ং লেখক কী লিখছেন, শুনুন। ‘…(‘আশ্চর্য ভ্রমণ’ পড়ে) রমাপদ চৌধুরী (সেসময় আনন্দবাজার রবিবাসরীয় আর পূজাসংখ্যার নির্বাহী সম্পাদক) তেমন কোন মন্তব্য করেন নি। কিন্তু এই গোলমেলে উপন্যাসটি যে অনেকেই বুঝতে পারেন নি, তা টের পেতে দেরি হল না। আমার মধ্যে যে না-ছোড় পাগলের বাস, সে মাঝে মাঝে আগল ভেঙে বেরিয়ে কাগজে-কলমে তার প্রলয়-নাচন নেচে যায়। আমার কিছু করার থাকে না। ‘আশ্চর্য ভ্রমণ’ তারই কীর্তি।… লোকে ভালবেসে পড়ল না হয়তো, কিন্তু আমার অনেক চোখের জল, অনেক আনন্দের বিচ্ছুরণ যে ওতে মিশে আছে। অবহেলিত এই বইটির মধ্যে ছত্রে ছত্রে আমি মিশে আছি। অবহেলিত হই, তুচ্ছ হই, সামান্য হই, আমাকে এ বইয়ের আনাচে-কানাচে পাওয়া যাবে, যদি কেউ কখনও খোঁজে।… ‘আশ্চর্য ভ্রমণ’ যদি কেউ নাও পড়ে, ক্ষতি নেই। মুদ্রিত রয়ে গেল, এটুকুও তো সান্ত্বনা!’ (উপন্যাস সমগ্র ২য় খণ্ড, আগস্ট ১৯৯৬, পুস্তক বিপণি)।

এবার বুঝলেন তো ব্যাপার? যে, ‘অসমাপ্ত’ দেখে কিছু বুঝতে না পারার এই ইনসেনসিটিভিটি একেবারেই হালের অসুখ নয়। এটা তো সেই পঞ্চাশ বছর আগেও ছিল, আজও কাট-পেস্ট একই রকম আছে। লাস্ট পঞ্চাশ বছরে বন্ধু, গুচ্ছের নয়া গ্যাজেট এসেছে ঘরে। কিন্তু গড়পড়তা বাঙালি মগজ একই আছে হরে-দরে!

হ্যাঁ, আর পাঁচটা লেখার সঙ্গে ‘আশ্চর্য ভ্রমণ’ মিলিয়ে মিলিয়ে পড়তে গেলে হোঁচট খাবেন, ঠিকই। যেমন আর পাঁচটা ছবির সঙ্গে মিলিয়ে মিলিয়ে দেখতে গেলে হয়তো খুঁজে কূল পাবেন না ‘অসমাপ্ত’ ছবির।

রাকেশ শর্মার ভূমিকায় নাইজেল। দুপুরে গোপনে এর ঘরেই টুকি প্রেম করতে যায়

যেমন ধরুন, বাজারে একটু আঁতেল কাটিং বাংলা ছবি মানেই তো তার মধ্যে চাটনির মতো সেক্স। মোটর বাইকের অ্যাডও যেমন মেয়ে না দ্যাখালে বাজারে তার কাটতি হয় না, হালের আরবান প্যান্তাখ্যাচাং বাংলা ছবিরও তো কতকটা ঠিক তেমনপনাই দশা! এখন সেই প্যাটার্ন মেপে এই ‘অসমাপ্ত’ দেখতে ঢুকলে তো সত্যি একটা কেস হয়ে যাবে পুরো! সাহসী দৃশ্য ক’রে ক’রে ফেমাস হয়েছে এমন দু-দুটো নায়িকা হাজির স্ক্রিনে। অথচ পুরো সিনেমাটাতে সেক্স করা তো দূরের কথা, পোশাক একটু আলগা করার সিন অবধি নেই?

বুঝতে পারছেন, বাজারের চালু ব্যাকরণ কী ভাবে আছড়ে ভাঙল ছবিটা?

বরকে লুকিয়ে দুপুরবেলা নিজের গোপন আশিকের সঙ্গে সেক্স করতে যায় টুকি। আর ধরা পড়ে যায় নিজের বরের কাছে। বাংলা বাজারের নামী-দামি সব গুণীর হাতে এমন একটা সিকোয়েন্স গেলে শুরু হয়ে যেত রগরগে সব সিন সাজানোর ভিড়। কাণ্ড দেখুন, সেই গাড়লপনা, হ্যাংলামি আর আদেখলামো থেকে সুমনের এই স্ক্রিপ্ট কিনা প্রায় একশো হাত দূরে! রিলেশনে তুমুল সব বিপর্যয়ের মোমেন্টগুলোও স্ক্রিপ্টে এখানে এমনভাবে আসে, যে বাজারি সিনেমা দেখতে দেখতে মরচে ধরা মনে যেন ঠাস করে এসে লাগে!

আরও পড়ুন:  মিঠুনের সঙ্গে প্রেম তরতাজা রাখতে কাকে রাখী পরিয়েছিলেন শ্রীদেবী !

হাফ সেঞ্চুরি আগে লেখা মূল উপন্যাসটা দার্জিলিংয়ের গল্প। কিন্তু এই ছবির জন্য যে রহস্যময় নির্জনতা চাই, তা কি আর আজকের ওই ক্যাঁচর-ম্যাচর দার্জিলিংয়ে আছে? ওই শহরটাকে এড়িয়ে গিয়ে ছবির শুট তাই লাভা-লোলেগাঁওতেই সেরে নিয়েছেন সুমন। আর তার সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন সিকিম সিল্ক রুটের চোখ ঝলসানো সব সিন।

জুলুক যাওয়ার পথের সেই জিগজ্যাগ রোড – ছবিতে বারবার দ্যাখা গেছে

থাম্বি ভিউ-পয়েন্ট থেকে জুলুকের জিগজ্যাগ রোডের যে নয়নাভিরাম রূপ, গোপী ভগতের ক্যামেরা সেটা সেঁচে এনে বসিয়ে দিয়েছে ছবিতে। ছবির এক্কেবারে শুরুতেই পাহাড় জুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই পথ-প্রবাহের দ্যুতি। তার খানিক মেঘে ঢাকা, আর খানিক রোদের আলোয়। ঠিক করেছেন সুমন, আর কিছু বলতে হল না আপনাকে, জাস্ট এক সেকেন্ডে এটাই যেন সেট করে দিল বাকি এই গোটা ছবির লুক এবং ফিল।

লুকিয়ে লুকিয়ে অভিনেতাদের পেছনে দাঁড়িয়ে মেশিন দিয়ে তৈরি করা মিথ্যে কুয়াশা না। এ ছবির পুরো শরীর জুড়ে ছড়িয়ে রইলো সত্যিকারের মেঘ। দিনের বেলা চোখের নিমেষে গাঢ় সাদা বাষ্পে চতুর্দিক নিথর হওয়ার, ভ্যানিশ হওয়ার সিন। কুয়াশা বলে এটাকে যেন ভুল করবেন না প্লিজ। পাহাড়ের শরীর জুড়ে কুয়াশা নয়, এটা মায়াবি মেঘের খেলা।

চারপাশে কী নির্জনতা আর আদিম সব মহাদ্রুমের সারি। তার মধ্যে ছটফটাচ্ছে ইন্দ্র কিনা দাঁতের ব্যথার চোটে! এই বন, এই পাহাড়, এই মেঘের মধ্যে হেঁটে হেঁটে শেষ অবধি কিনা ডেন্টিস্টের চেম্বারে পৌঁছে যাওয়ার পালা! বলুন তো, এ যদি স্বপ্ন না হয়, স্বপ্ন তবে কী! আর হ্যাঁ, স্বপ্ন বলেই তো এই একটু আগে স্টেশনে বসে মলয়ের (ব্রাত্য বসু) বৌয়ের ডাকনামটা শুনতে পেয়েও, মলয়ের বৌয়ের সামনে দাঁড়িয়ে সেই নামটাই আবার দেখছি পুরো ভুলে মেরে দিল ওই ইন্দ্র!

সময়-সুযোগ থাকলে শীর্ষেন্দুর মূল উপন্যাসটাও পড়ে দেখবেন ভাই! দেখবেন সেটাকেও ভ্রমণ না ভেবে দীর্ঘ একটা স্বপ্ন-কথন ভাবলেও অসুবিধে নেই কিছু!

শীর্ষেন্দুর স্বপ্ন-কথনের মগ্ন সেই প্যাটার্নটাকে সিনেমায় প্রায় হুবহুএনে বসিয়ে দিলেও গল্পের বাকিটা কিন্তু ওই বইয়ের সঙ্গে এক ভাববেন না যেন। টুকি (অভিনয়ে স্বস্তিকা মুখার্জি) মানে মলয়ের বৌয়ের ক্যারেক্টারটাই তো চুরমার করে ভেঙে নিজের মতো সাজিয়ে নিয়েছেন সুমন। শীর্ষেন্দুর লেখায় এই টুকি প্রায় ধ্বস্ত এক গৃহবধূর মতো। মদ্যপ স্বামীর সব অত্যাচার মুখ বুজে হজম করে স্বামী সেবা করে যাওয়াটাই যার ব্রত। আর এখানে? আগেই লিখেছি না যে, যখন বাড়ির মধ্যে লেপমুড়ি দিয়ে নেশা করে যায় বর, টুকি তখন বেরিয়ে পড়ে পাড়ার কোন বয়ফ্রেন্ডকে নিয়ে।

পঞ্চাশ বছর আগে লেখা সেই বাঙালি বধূ এক ঝটকায় অনেকখানি পালটে গেছে যেন!

ঋষিখোলায় গিয়ে অসীমের সঙ্গে বসে নিভৃত সেই প্রেম

টুকির বয়ফ্রেন্ডের সংখ্যা হচ্ছে দুই। প্রথমজনের বয়স একটু বেশি, রাকেশ শর্মা (নাইজেল) নাম। টুকি এর বাইকে চেপে ঘোরে। আর রাকেশ জিদ্দিপনা করার পর সেক্স করতে লুকিয়ে ওর বাড়িতে গিয়ে ওঠে। টুকির সেকেন্ড আশিক অসীম (ভেদ সিনহা) কিনা আবার ওর বরেরই এক স্টুডেন্ট! সে টুকিকে ঋষিখোলায় বেড়াতে নিয়ে যেতে চায়। শেষ অবধি এই বেড়ানটা সত্যি সত্যি হয়ও। টুকির বর মলয় আর ওদের গেস্ট ইন্দ্রও থাকে সঙ্গে। আর ওদের প্রেজেন্স কেয়ার না করে নির্জনে এক কোণায় বসে সেই নবীন কিশোর ছেলের সঙ্গে নদীর জলে পা ভেজানোর খেলায় মাতে টুকি।

রাকেশ-টুকি-অসীম, ত্রিকোণ এই প্রেমের ঈর্ষা ক্রমে এমন হিংস্র আকার নেয় যে যৌন-ক্রোধ আছড়ে পড়ে টুকির ঘর-জানালার কাচে! জেলাসিতে জ্বলতে জ্বলতে অসীম তো এটাও না বলে আর পারে না যে, ‘আর কটা লোকের সঙ্গে প্রেম করবেন আপনি?’ হাটে হাঁড়ি ভাঙল বলে ঠাসিয়ে তখন সেই অসীমকে এক চড় মেরে দ্যায় টুকি!

আরও পড়ুন:  ক্যাটরিনাকে সরিয়ে দীপিকাকে নিল লরিয়েল‚ কিন্তু কেন?

বলেছি না, শীর্ষেন্দুর লেখাতে কিন্তু টুকির এই স্বৈরিণী রূপ নেই!

সেখানে সেই উপন্যাসে এই টুকি কেমন, শুনুন! ‘নাকটা লম্বা। নাকের হাড় একজায়গায় ভাঙা। মুখে অজস্র ছিটে-তিল থাকার জন্য চামড়ার রং সব জায়গায় সমান নয়। ওর বাঁ ভ্রূ-তে একটা চুল অনেকখানি লম্বা হয়ে কপালে উঠে আছে। ওপরের পাটির দাঁত সামান্য উঁচু হওয়ায় ওর নাকের নীচের দিকের গড়নটা ভাল নয়।’ (অধ্যায় ১)

মলয়ের ভূমিকায় এ ছবিতে ব্রাত্য বসুর অসামান্য অভিনয় – মলয় যেন তাঁকে ভেবেই লেখা হয়েছিল

ঠিকই যে, এখানে সেই ঘরোয়া টুকি ভ্যানিশ! টুকি এখানে সবসময়েই ফুল মেক-আপ অন করে নিয়ে থাকে! ভুরু নিখুঁত ভাবে প্লাক করা আর ঠোঁটেও তাঁর চড়া লিপস্টিক টানা! নেশারু বর চার্জ করলে অক্লেশে বলে, ‘আমার ছেলে লাগে। এই ঠাণ্ডায় গরম গা মন্দ লাগে না’। সেক্স-স্টার্ভড হতে হতে কি একটা মেয়ের এমনই চরম হাল?

তবে অনেকগুলো জিজ্ঞাসার উত্তর নেই কোন। প্রেম করে ইলোপ করে বিয়ে করে যে রিলেশনটার শুরু, সেটা এমন তুবড়ে গেল কেন? যে বৌ দোকান খুলে বসে থেকে নিত্যিদিন নতুন নতুন ছেলে খুঁজতে যাবে? আর যদি এমনটাই হবে, তবে আবার তারপরে সেই বরের পাশেই শুয়ে তার হাতের ওপর ভর রেখে টসটসিয়ে কেঁদে ভাসায়ই বা কেন টুকি?

ব্যাখ্যা বোধহয় এটাই। যে, জীবনের সব রিলেশন কি নিটোল হয়ে থাকে, নাকি তার সবকটার কার্যকারণ এক দুই করে ব্যাখ্যা করা যায়? নিজের জীবন থেকেই না হয় মিলিয়ে দেখুন প্লিজ!

পাহাড়ি পথের মাঝবরাবর একটি পুরুষ একটি নারীর এমন দৃশ্য মনে করিয়ে দ্যায় ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’কে

পাহাড়ি বাঁকে হঠাৎ করে পুরনো প্রেমিকা মিতুনের সঙ্গে দ্যাখা। তার সঙ্গে তখন আবার বর সুব্রত (অনিন্দ্য পুলক ব্যানার্জি) প্লাস ননদ সনাতনী, এই দুজনও হাজির। ইন্দ্রের মনে উপচে এল সনাতনীকে বিয়ে করার সাধ! উপন্যাসটা পড়তে গিয়ে মনে হয় নি কো কিছু। এখন সিনেমায় সেটা দেখতে গিয়ে মনে হল, এর মধ্যে নিঃসাড়ে কোথায় যেন লুকিয়ে আছে সত্যজিতের ছবি। মিলিয়ে দেখুন, ‘আশ্চর্য ভ্রমণ’ লেখার বছর কয়েক আগেই কিন্তু ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ (১৯৬২) এলো!

অবশ্য শুধু তো ওই একটা ছবিই নয়। সেভাবে খুঁজতে গেলে তো এর মধ্যে আরও অনেক ছবিই আছে। একটা ভালো লেখার মধ্যে যেমন লুকিয়ে থাকে আরও অনেক লেখা!

ইন্দ্রের সঙ্গে বসে চেলু ওরফে পবন সিং যখন রাতের বেলা লায়লা নামে সেই মেয়েটার গল্প করতে থাকে। যখন বলতে থাকে এই কথা যে, ‘দুনিয়াকে হর এক মর্দ কে পাশ লাইলি একবার জরুর আয়ে গি। আপকে পাশ ভি আয়ে গি। ইন্তেজার কিজিয়ে।’ তখন যেন চমকে উঠি, মনে হয় এটা সেই বুদ্ধদেবের ‘লাল দরজা’ (১৯৯৭) না? এই লোকটা যেন ইন্দ্র নয়, আর ওই লোকটাও নয় চেলু। এ যেন হল ‘লাল দরজা’র সেই দাঁতের ডাক্তার নবীন দত্ত আর ও হল তার সেই ড্রাইভার দীনু! ভুল বললাম, বলুন? ড্রাইভার বা কুলির থেকে ভালবাসার স্বরূপ জানার চিরায়ত সেই সিন!

যাঁরা এই ছবিকে স্লো বলছেন, বোরিং বলছেন, তাঁদের অনুভূতিকে প্রণাম। কী জানি, ‘ধুম সিক্স’ গোছের কিছু দ্যাখার আশা ছিল বোধহয় তাঁদের!

ছবি দেখে বেরিয়ে এসেছি বাইরে। হঠাৎ করে কেন কে জানে, মনে পড়ল থিও অ্যাঞ্জেলোপুলস-এর কথা! দুজনের স্টাইলে হয়তো মিল-টিল নেই কিছু! তবু!

বাংলা সিনেমার দুনিয়া তো এখন মোটের ওপর অশিক্ষিত আর গামবাট সব ফেরেববাজে ভরা। তবে হ্যাঁ, কেউ কেউ তো ব্যতিক্রমও আছেন। ‘অসমাপ্ত’ বানিয়ে বোধহয় সুমন মুখোপাধ্যায় বুঝিয়ে দিলেন সেটাই।

3 COMMENTS

  1. দারুন ! উপন্যাসটি আগেই পঠিত, ছবিটি যে কবে দেখব !