দেবীপক্ষ শেষ | কিন্তু পৌরাণিক খলনায়ক আছেন অগণিত | একবার শুরু করেছি যখন‚ তাঁদের নিয়ে বলেই নিই যতটা সম্ভব | তারপর আবার ফিরে যাব পূর্ব প্রসঙ্গে | এই পর্বের খলনায়ক হিরণ্যকশিপু | 

বিষ্ণুর বৈকুণ্ঠধামে দ্বাররক্ষক ছিলেন জয় ও বিজয় | চার কুমারের অভিশাপে তাঁদের বারবার স্বর্গচ্যুত হয়ে মর্ত্যধামে জন্মাতে হয় | বিষ্ণুর চরম শত্রু হিসেবে | প্রতিবারই মুক্তিলাভ ঘটে বিষ্ণুর হাতে মৃত্যুতে |

সংস্কৃতে হিরণ্য শব্দের অর্থ স্বর্ণ | কশিপু হল নরম কাপড় | এখানে হিরণ্য স্বর্ণ ছাড়াও কাম ও যৌনতার প্রতীক | হিরণ্যকশিপু কথার অর্থ হল নরম কাপড়ের মতো স্বর্ণাবৃত বা লোভাবিষ্ট |

ভাগবৎপুরাণ অনুযায়ী ঋষি কাশ্যপ ও তাঁর স্ত্রী দিতির পুত্র হিরণ্যকশিপু | দিতির পুত্র বলে তাঁদের নাম দৈত্য | কাশ্যপ ও দিতি গোধূলিলগ্নে যৌন সঙ্গমে মিলিত হয়েছিলেন | যা মোটেও যৌনাচারের আদর্শ ক্ষণ নয় | তাই দিতির পুত্ররা দৈত্য | বেদবিরোধী অশুভ |

বিষ্ণুভক্ত দ্বাররক্ষক জয় জন্মালেন হিরণ্যকশিপু হয়ে | আর এক রক্ষী বিজয় হলেন তাঁর ভাই হিরণ্যক | অভিশাপের জেরে দুজনেই মানবজন্মে চরম বিষ্ণুদ্বেষী |

বিষ্ণুর বরাহ অবতারে মৃত্যুতে মোক্ষলাভ করলেন হিরণ্যক | কিন্তু এতে বিষ্ণুর প্রতি অত্যন্ত ঘৃণাপ্রবণ হয়ে পড়লেন বড় ভাই হিরণ্যকশিপু | বিষ্ণুকে পরাস্ত করতে ব্রহ্মার দ্বারস্থ হলেন | শুরু করলেন কঠোর তপস্যা ও যজ্ঞ |

তাঁর সাধনায় পরিতুষ্ট হলেন পরম পিতা ব্রহ্মা | তাঁর কাছে অমরত্বের বর চাইলেন হিরণ্যকশিপু | কিন্তু তা সম্ভব নয়‚ জানালেন ব্রহ্মা | পরিবর্তে অন্য বর প্রার্থনা করতে বললেন | 

বহু ভাবনা চিন্তার পর হিরণ্যকশিপু চাইলেন‚ তাঁকে যেন ব্রহ্মার সৃষ্ট কোনও জীব হত্যা করতে না পারে | কোনও গৃহে‚ বা গৃহের বাইরে‚ সকালে বা রাতে‚ ভূমিতে বা আকাশে যেন তাঁর মৃত্যু না হয় | সকল মানুষ প্রাণী এবং অস্ত্রের সামনে তিনি যেন অবধ্য থাকেন | কোনও দেবতা‚ উপদেবতা‚ সর্প‚ জীবিত বা মৃত কোনও সত্ত্বাই যেন তাঁর মৃত্যুর কারণ না হন |

তথাস্তু বলে বর মঞ্জুর করলেন ব্রহ্মা |

শিবপুরাণ ও বায়ুপুরাণেও আছে তাঁর বরপ্রার্থনার আখ্যান | মহাদেবের কাছ থেকে হিরণ্যকশিপু বর পান‚ শুকনো বা আর্দ্র কোনও অস্ত্র‚ বজ্রবিদ্যুৎ‚ বৃক্ষ‚ ব্রহ্মাস্ত্র কোনওকিছুতেই তিনি নিহত হবেন না |

এর ফলে ত্রিলোকের অধীশ্বর হয়ে বসলেন হিরণ্যকশিপু | লক্ষাধিক বছর ধরে রাজত্ব করলেন | 

একবার তিনি তপস্যারত | তখন আক্রমণ করলেন দেবরাজ ইন্দ্র | হিরণ্যকশিপুর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী কায়াধুকে রক্ষা করলেন নারদ | তাঁর আশ্রয়েই পুত্র প্রহ্লাদের জন্ম দেন কায়াধু | ফলে জন্মের আগে থেকেই নারদের সান্নিধ্যে প্রহ্লাদ বিষ্ণুভক্ত হয়ে ওঠেন |

পুত্র প্রহ্লাদের বিষ্ণুভক্তি দেখে ক্রোধোন্মাদ হয়ে পড়লেন হিরণ্যকশিপু | পুত্রকে হত্যা করতে উদ্যত হলেন | যতবারই হত্যা করতে যান‚ বিষ্ণুর কৃপায় রক্ষা পান প্রহ্লাদ | একবার হোলিকার কোলে ছেলেকে বসিয়ে আগুনে নিক্ষেপ করলেন হিরণ্যকশিপু | হোলিকা বর পেয়েছিলেন তিনি আগুনে পুড়বেন না | কিন্তু দেখা গেল‚ হোলিকা ভস্মীভূত হয়ে গেছেন | বিষ্ণুনাম করে অক্ষত আছেন পরম ভক্ত প্রহ্লাদ | হোলিকাবধ থেকেই হোলি উৎসব |

আর উপায় না দেখে প্রহ্লাদকে থামে পিষ্ট করে বধ করতে চাইলেন হিরণ্যকশিপু | বললেন‚ তোমার বিষ্ণু যদি সর্বভূতে বিরাজমান হন তবে এসে তোমাকে রক্ষা করুন |

সে সময়েও বিষ্ণুনামরত প্রহ্লাদ অবিচল থাকলেন | 

এ বার পাথরের থাম থেকে নৃসিংহ অবতারে আবির্ভূত হলেন ভগবান বিষ্ণু | 

ব্রহ্মার বর অনুযায়ী দেবতা‚ মানুষ বা পশু কোনওটাই নন নৃসিংহ | তিনি হিরণ্যকশিপুকে তুলে নিজের থাইয়ের উপর রাখলেন | কারণ তাঁর বধ ভূমি বা শূন্যে কোথাও করা যাবে না | প্রাসাদের উঠোনের চৌকাঠের উপর পা রাখলেন নৃসিংহ | কারণ বাড়ির ভিতরে বা বাইরে হিরণ্যকশিপু অবধ্য | এ বার নখ দিয়ে চিরে দিলেন হিরণ্যকশিপুর পেট | কারণ কোনও অস্ত্রই তো তাঁকে হত্যা করতে সক্ষম নয় | সময়টা তখন গোধূলি | না দিন‚ না রাত | এখানেও পালিত হল ব্রহ্মার প্রদেয় বর | দিন বা রাত কোনও সময়েই বধ হলেন না হিরণ্যকশিপু | 

আরও পড়ুন:  স্ত্রী‚ ছেলেমেয়েকে ফেলে বম্বেতে নতুন সংসার...দীর্ঘদিন সেই আগুনে দগ্ধ হয়েছে পিতা-পুত্র সম্পর্ক

NO COMMENTS