বাংলালাইভ রেটিং -
আঞ্চলিক তেলুগু ইন্ডাস্ট্রি বানিয়ে ফেলল ভারতের সর্বকালের সর্ববৃহৎ ব্লকবাস্টার

সেটা প্রায় বছর দশেক আগের কথা। বলিউড হঠাৎ করেই ক্ষেপে উঠেছিল বিশেষ একটা সিনেমা বানাবে বলে। না ঠিক একটা নয়, বরং একটা গল্প তিনভাগে ভেঙে সেখান থেকে একটার পর একটা মোট তিনটে ছবি বানানোর প্ল্যান। মানে যাকে ট্রিলজি ছবি বলে।

হলিউডে এর ঢের আগেই তো ট্রিলজি হয়ে গেছে। কিন্তু আটঘাট বেঁধে প্ল্যান করে নিয়ে ‘ট্রিলজি’ কিন্তু বলিউডে আর তৈরি হয় নি কখনও।

এই ট্রিলজি ছবির ডিরেকশনের ভার সেবার দেওয়া হয়েছিল মণিরত্নমের হাতে। আর গোটা সিরিজটা প্রোডিউস করবেন বলে ঠিক হল নামী প্রোডিউসার ববি বেদী। মণিরত্নমের পরিচয় নিয়ে তো নতুন করে কিছু লিখতে হবে না বোধহয়। ববি বেদী’র নাম শুনে কিছু মনে না পড়লে মনে করিয়ে দিই ওঁর প্রোডিউস করা খানকয়েক অন্য ছবির কথা। দস্যু রানির জীবন নিয়ে সেই ‘ব্যান্ডিট কুইন’ (১৯৯৪) দেখেছেন তো? কিংবা দুই জা’য়ের সেক্স লাইফ নিয়ে বিতর্কিত ‘ফায়ার’ (১৯৯৬)? ‘সাথিয়া’ (২০০২) কিংবা ‘মকবুল’ (২০০৩) থেকে ‘মঙ্গল পাণ্ডে’র (২০০৫) মতো হৈ-চৈ ফ্যালা ছবি। এর সব কটা ছবিই ছিল ওই ভদ্রলোকের প্রযোজনাতেই তৈরি। 

কিন্তু একটা ছবি বানানোর বদলে হঠাৎ করে আগের থেকেই কেন ট্রিলজি বানানোর প্ল্যান? এর উত্তরটা খুব সহজ। যে গল্পটা বাছা হয়েছিল, সেটা এত বড় আর এত জটিল, যে একটা ছবিতে আঁটাতে গেলেই বিগড়ে যেত টেস্ট।

ঠিক ধরেছেন। তিন পর্বে ভেঙে ভেঙে সেবার ছিল ‘মহাভারত’ তৈরির কথা।

কপাল দেখুন। শুধু সেবার নয়, তারপরেও যতবার বড় পর্দায় মেগা স্কেলে মহাভারত নিয়ে কাজ করার প্ল্যান হয়েছে, বিগড়ে গেছে সব। তা সে এর কয়েক মাস পরে রবি চোপড়ার প্ল্যান করে রাখা দু-পর্বের ছবিটা বলুন কিংবা ‘মহাভারত’কে অ্যাডাপ্ট করে খনি মাফিয়াদের নিয়ে কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের বাংলা ভাষার ছবি।

‘মহাভারত’ নিয়ে একের পর এক প্রোজেক্ট যখন ঘেঁটে ঘণ্ট হচ্ছে জাস্ট, মনে মনে তখন থেকেই এই এপিক নিয়ে অন্য লেভেলে একটা কিছু করার প্ল্যান বোধহয় এঁটে ফেলেছিলেন তাঁরা। তাঁরা মানে তেলুগু সিনেমার সেই অবিস্মরণীয় বাবা-ছেলে জুটি।

বাবা মানে বলতে চাইছি কোদুরি বিশ্ব বিজয়েন্দ্র প্রসাদের কথা। আপনি হয়তো নাম শোনেন নি তাঁর। কিন্তু ফিল্ম দুনিয়ায় এক কথায় সবাই তাঁকে কে ভি বিজয়েন্দ্র প্রসাদ নামে চেনে। তিনি নিজেও ছবি করে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন ঠিকই, তবে মূলত গল্প-লেখক হিসেবেই তাঁর খ্যাতি। শুধু চোখ ধাঁধানো রূপ-কাহিনী নয়, ‘বজরঙ্গী ভাইজান’-এর মত চমকে দেওয়া রিয়্যাল স্টোরিও এই লোকটারই লেখা।

অপ্রতিদ্বন্দ্বী সেই বাবা-ছেলের জুটি

আর তাঁর ছেলে হলেন কোদুরি শ্রীশৈল শ্রী রাজামৌলি। ছোট করে যাঁর নামটাকে সবাই এস এস রাজামৌলি বলে জানে। তেলুগু ছবিতে একের পর এক ম্যাজিক দেখিয়ে এসেছেন এই ইনিও। সাউথের ছবি বলে যতই নাক সিঁটকোন না কেন। এখনও অবধি যে এগারখানা ছবি বানিয়েছেন রাজামৌলি, তার সবকটাই যে ব্লকবাস্টার হিট!

আর তার বেশিরভাগেরই গল্প ওই রাজামৌলি’র বাবা কে ভি বিজয়েন্দ্র প্রসাদের লেখা। একটার পর একটা হিট গল্প লিখে চলেছেন বাবা, আর সেগুলোর থেকে মেগা স্কেলের সব সিনেমা বানিয়ে যাচ্ছেন ছেলে, এরকম উদাহরণ ভারতে আর আছে কিনা, খুব মুশকিল বলা।

এই অবধি পড়ার পর এই কৌতূহল তো আসতে বাধ্য যে, হোক না সাউথের ছবি, এই বাবা-ছেলে জুটির আর কোন সিনেমা এর আগে কি সুযোগ হয়েছে দ্যাখার। আপনি দেখেছেন কিনা, জানি না। তবে বক্স অফিসে তুলকালাম ব্যবসা করার পর রাইটস কিনে আমাদের এই বাংলাতেও রিমেক হয়েছে এঁদের বেশ কয়েকটা ফিল্ম।

‘ছত্রপতি’ (২০০৫) ছবিটা যেমন হরনাথ চক্রবর্তী রিমেক করেছিলেন ‘রিফিউজি’ (২০০৬) নাম দিয়ে। বিক্রমার্কুরু (২০০৬) বাংলায় রিমেক হল ‘বিক্রম সিংহ’ (২০১২) নামে। ‘মগধীরা’-র (২০০৯) রিমেক কপিতে নাম রাখা হল ‘যোদ্ধা’ (২০১৪)। আর ‘মর্যাদা রামান্না’ (২০১০) বাংলায় রিমেক হল ‘ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে রে’ (২০১১) এই নাম দিয়ে।

আরও পড়ুন:  'বাহুবলী' প্রভাসের সঙ্গে তুমুল ঝগড়া হয়েছে কঙ্গনার!!

এরপর রিলিজ করলো ‘ঈগা’ (২০১২)। যেটার হিন্দি ভার্সনের নাম হল ‘মক্ষি’। কোন স্টার-ফার নয়, স্রেফ একটা মাছিকে নিয়ে যে এভাবে পুনর্জন্ম আর শোধ-প্রতিশোধের গল্প ফাঁদা যায়, সেটা দেখে থ’ হয়ে গেল লোকে।

দমে কুলোবে না বলেই বোধহয় এই ছবিটা রিমেক করার আর রিস্কে যায় নি কেউ।

আর ঠিক তার পরেই এই ‘বাহুবলী’র প্ল্যান। লেখার শুরুটা ‘মহাভারত’ দিয়ে করেছি কেন, জানেন? ওই বাবা-ছেলে জুটির আসল টার্গেট তো মেগা স্কেলে সেই এপিক সিনেমা করা। সেই যে প্ল্যানটা অনেক আগে ববি বেদী’র করা। তিন পর্বে গ্র্যান্ড স্কেলে পুরো মহাকাব্যটা বলা। পুরো প্রোজেক্টটার মূল কাণ্ডারি হিসেবে এবার খোদ আমিরকে রাখার প্ল্যান। সোজা গিয়ে তাই আমির খানের সঙ্গে প্রাথমিক কথা বলেও এসেছেন রাজামৌলি নিজে।

কিন্তু হুট করে অত বড় স্কেলে ‘মহাভারত’ বানাতে শুরু করার আগে তো সবকিছু পরখ করা দরকার। যে, এসব কেসে বাজারের রেসপন্স ঠিক কেমন ধারা হয়। মহা-সিনেমা মহাভারত বানাতে গিয়ে হয়তো হাজার কোটি খরচ হয়ে যাবে। বাজার থেকে অন্তত তার দ্বিগুণ টাকা তুলতে হবে তো! সত্যি কি ভারতের মুভির বাজার ওই চাপটা এখন নেওয়ার জন্যে তৈরি হয়ে আছে?

বলতে গেলে, সেই প্রশ্নের উত্তর পেতেই এই ‘বাহুবলী’ ছবি তৈরি। যে, হাতে-কলমে দেখেই নিই আগে। স্পেশ্যাল এফেক্টস মুড়ে দিয়ে তৈরি করা রূপকথার গল্প পাবলিক খাবেটা কিনা আদৌ। ফেরত আসবে কিনা ইনভেস্ট করা কয়েক শো কোটি টাকা।

‘বাহুবলী’ পুরোটা দেখে তলিয়ে একটু ভাবুন। টের পাবেন কী ভাবে ‘মহাভারত’ থেকে এলিমেন্ট নিয়ে তৈরি হয়েছে ‘বাহুবলী’র প্লট। দেখতে দেখতে একেকবার মনে হচ্ছিল, এতো সিনেমা নয়, পুরো একটা ইউনিক বিজনেস মডেল যেন। আসল প্রোডাক্ট লঞ্চ করার আগে শুধু মার্কেট টেস্ট করার জন্য সেই প্রোডাক্টের এলিমেন্টস দিয়ে নতুন প্রোডাক্ট লঞ্চ!

কিন্তু মহাভারত থেকে প্লট বলুন, ক্যারেকটার বলুন, নেওয়ার ব্যাপার শুনতে যত ইজি, বাস্তবে ঠিক অতটা ইজি নয়! আসল চ্যালেঞ্জটা কোথায় আছে জানেন? যেহেতু এটা নিয়েই পরেই আবার গ্র্যান্ড লেভেলে ছবি করার প্ল্যান। তাই ‘মহাভারত’-এর মোটিফগুলো ‘বাহুবলী’তে ফিট-ইন করার আগে এটা তো ভেবে নিতেই হবে যে লোকে এটা দেখে যেন না চিনতে পারে একদম সেই ‘মহাভারত’ বলে।

চিনতে পারলে তো কেলেঙ্কারি, ভাই! লোকে এখন এটা দেখবে ঠিকই, কিন্তু ভবিষ্যতে ‘মহাভারত’ তৈরি হলে তখন সেটাকে আর দেখতে যাবে কী! কে জানে, হয়তো ওটাকে এখনকার এই ‘বাহুবলী’র রিমেক বলে ভাববে!

সিংহাসন আর নারী – এই দুইয়ের দখল নিয়ে দুই ভাইয়ের এপিক যুদ্ধ

মহাভারতে যেটা হস্তিনাপুর, এখানে তাই সেটা পালটে হয়ে গেল মাহিষ্মতী। জন্মান্ধ ছিলেন বলে বয়সে বড় হয়েও সারা জীবনে কোনদিন রাজা হওয়ার সুখ পান নি ধৃতরাষ্ট্র। মিলিয়ে দেখুন, এখানেও কাট পেস্ট সেই ব্যাপারটাই আছে, শুধু জন্মান্ধ না করে বিজ্জলদেব-এর (অভিনয়ে নাস্‌সার) বাঁ হাতটা পুরো পঙ্গু দ্যাখান হল। মিলিয়ে দেখুন, অন্য হাতে আবার তাঁর ঠিক ধৃতরাষ্ট্রের মতোই লৌহ-সম বল। যে ধাক্কা মেরে ভেঙে দিতে পারেন রাজবাড়ির লৌহকঠিন থাম!

বংশ পরম্পরায় ওই কাটাপ্পা (অভিনয়ে সত্যরাজ) তো নাকি রাজপরিবারের দাস! কিন্তু মজা হল কেন কবে কী কারণে ওর পরিবারের দাস-জীবনের শুরু, তার একটা কোথাও ব্যাক স্টোরি নেই কোন। আসলে এত ডিটেল দিতে গেলে আড়াই-তিন ঘণ্টার ছোট্ট স্প্যানে ব্যাপারটা যে জটিল হবে বড্ড! আর এই ক্যারেকটারটা গড়াই হয়েছে স্বয়ং ভীষ্মের আদলে। চোখের সামনে একটার পর একটা অন্যায় দেখেও স্রেফ শপথ করেছে বলে যাকে কুরুদের হয়ে হাতে অস্ত্র তুলতে হয়। কোলে-পিঠে করে মানুষ করেছে যাকে, তাঁর শরীরেও তরোয়াল গেঁথে দিতে তৈরি থাকতে হয়।

আরও পড়ুন:  ফের দাদু-দিদা হতে চলেছেন ধর্মেন্দ্র-হেমা‚ ইশার কোল আলো করে আসছে সন্তান

কখনও আবার একটা ক্যারেকটারের জীবনের একেকটা পর্বে এসে মিশেছে মহাভারতের আলাদা আলাদা ক্যারেক্টারের ছায়া।

রাজার ঘরে রাজার বংশে জন্ম নিয়েও নদীর জলে ভেসে ভেসে শেষ অবধি বড় হতে হল কিনা সো কল্‌ড নীচ জাতিদের ঘরে। এই যে প্লট পয়েন্ট দিয়ে ‘বাহুবলী’র প্রথম পর্ব শুরু। এই মোটিফ তো আমি না বলে দিলেও বুঝতে পারবেন যে কর্ণের জীবন থেকে নেওয়া।

কিংবা রাজ্যাভিষেক হওয়ার আগে এই যে ঘুরে ঘুরে নিজের দেশ নিজের রাজ্যকে চিনতে থাকার প্রোগ্রাম। সেখানে ঘুরতে গিয়ে প্রেম ভালবাসা আর মন দেওয়া নেওয়া শুরু। মনে পড়ছে না একা অর্জুনের দীর্ঘ বছর দূর প্রদেশে ঘুরে ঘুরে একের পর এক রাজ্যে গিয়ে একের পর এক বিয়ে করে রাজনৈতিক শক্তি-বৃদ্ধির কথা?

হঠাৎ দেখলে মনে হবে অর্জুন আর চিত্রাঙ্গদা বলে

গল্পের হিরোইনদের দেখুন। কি সেই অবন্তিকা (তামান্না) বলুন কিংবা রাজকন্যা দেবসেনা (অনুষ্কা শেঠি)। অস্ত্রবিদ্যায় সবাই শুধু তুখোড় নয়, তার চেয়েও এক কাঠি করে বেশি! অরণ্যচারী পুরুষকে নিজের জীবনে গ্রহণ করতে এঁদের আপত্তি নেই কোন, শুধু শর্ত হচ্ছে শস্ত্র চালনায় পুরুষটিকে আরও বেশি তুখোড় হতে হবে। মনে হচ্ছে না, এই রোলগুলো লিখতে গিয়ে মডেল হিসেবে সামনে ছিল চিত্রাঙ্গদার ছবি?

আবার চিত্রাঙ্গদা’কে ভেবে যে ক্যারেকটার লেখা, একটু পরে তাতেই আবার দ্রৌপদীর পাঞ্চ! রাজকূলবধূকে সবার সামনে অপমান করে তাঁর শরীর যখন লালসার হাতে ছুঁতে চাইছে সেনানায়ক সেতুপতি, আর তারপর যখন পূর্ণগর্ভা দেবসেনাকে টেনে এনে খাড়া করা হচ্ছে রাজসভাতে সবার ওই নিলাজ চোখের সামনে। তখন দেবসেনার খর-প্রখর তেজটা দেখুন শুধু। মনে পড়বে একবস্ত্রা রজস্বলা সেই কূলবধূকে, রাজসভাতে হিঁচড়ে আনার পরেও যে রুখে দাঁড়িয়ে জানতে চায়, যুধিষ্ঠির পাশাখেলায় নিজে আগে হেরেছেন, নাকি আগে হেরেছেন তাঁকে!

বাবা-ছেলের জুটির জন্য শাবাস শাবাস শাবাস! একেকবার তো মনে হতে পারে নিজেরাও এঁরা বোধহয় বাহুবলী সেই বাবা-ছেলে অমরেন্দ্র আর মহেন্দ্র-র মত!

একটা দুটো খুচরো মোটিফ নয়, পুরো বাহুবলীর আগাপাস্তলা জুড়ে এমন অগুন্তি সব আছে। কুন্তল রাজ্যে গিয়ে সেই যে বুনো শুওর শিকার করার সিন। রামভীতু কুমার বর্মার (অভিনয়ে সুব্বারাজু) রথে উঠেছে অমরেন্দ্র বাহুবলী (প্রভাস), আর যতবার কাঁপা কাঁপা হাতে লক্ষ্যভেদ করার চেষ্টা করছে কুমার, ততবার তার হাত একটু বেঁকিয়ে দিয়ে বাহুবলী নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে লক্ষ্যভেদের ভার। দুনিয়া দেখছে, তির ছুটছে কুমার বর্মার থেকে, কিন্তু আসলে তো তাঁর আড়ালে অন্য মহাবীর। কী মনে হয়, বলুন? মোটিফটা এখানে পুরো শিখণ্ডী আর অর্জুন স্টোরি না?

আরও বলছি শুনুন। নকল পরিচয় নিয়ে কুন্তল দেশের রাজপ্রাসাদে লুকিয়ে আছে বাহুবলী, আর রসুইঘরে বসে বসে রান্না করছে শুধু। এর মধ্যে দেখতে পাবেন বিরাট রাজ্যে অজ্ঞাতবাসে লুকিয়ে থাকার ফ্লেভার। তারপর হঠাৎ করে মধ্যরাতে যখন অ্যাটাক করবে পিণ্ডারি দস্যুদল এসে, আর গোটা রাজ্যকে বাঁচানোর ভার একা নিজের হাতে তুলে নেবে অমরেন্দ্র বাহুবলী স্বয়ং। মিলিয়ে দেখুন এটা আসলে সেই বিরাট রাজ্য কুরুসেনার আক্রমণের সিন। ভয়ে থরথরিয়ে কাঁপতে থাকা কুমার বর্মা এখানে ঠিক বিরাট-রাজকুমার উত্তর-এর রোলে!

বলিউডের মেনস্ট্রিম নয়, নিছক একটা আঞ্চলিক ছবি। এই সেদিনও যেটার নামে বঙ্গ-জনতা বেশির ভাগ মুখই ব্যাঁকাত শুধু। সেই তেলুগু ভাষার ছবিতে এমন একটা এক্সপেরিমেন্ট যে আদৌ করতে পারা যায়, আগে আর ভাবতে পেরেছে কেউ?

এপিককে নতুন করে সাজিয়ে নিয়ে তৈরি এই রূপকথাটি চরম ভাবে লার্জার দ্যান লাইফ একটা স্টোরি। এখানে তাই সব ঘটনার ইঞ্চি মেপে হিসেব করতে যাবেন না ভাই, প্লিজ।

‘বাহুবলী’র সেকেন্ডপার্টের শুরুর সিনটাই ধরুন। রাক্ষস-দহন উৎসবে মাথায় আগুন নিয়ে মাইলের পর মাইল হেঁটে মন্দিরে যাচ্ছেন রাজমাতা শিবগামী দেবী (রামিয়া কৃষ্ণণ)। তখন হঠাৎ ভয়ংকর ক্ষেপে উঠলো রাস্তার এক হাতি। আর ঠিক সেই সময়েই ভয়ানক ওই হাতি সামলাতে সুবিশাল এক দরজা-বন্ধ পুরীর দরজা ভেঙে তার ভেতর থেকে গণেশের রথ টানতে টানতে বাহুবলী সেখানে হাজির হল কী করে, সেই কোশ্চেন তো এমন ছবিতে তুলতে যাওয়াই বৃথা!

আরও পড়ুন:  প্রত্যেকেই পরকীয়ার কথা বলে : অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়
উন্মাদ হাতিকে শান্ত করে তার পিঠে চড়ে বসার রেফারেন্স পাওয়া যায় কৃষ্ণ-কথা থেকে

পাগল হওয়া ওই হাতিটাই বাহুবলীর সামনে এসে শান্ত সুবোধ হয়ে কেন তাঁকে মাথায় তুলে নিল, সেই উত্তর কৃষ্ণ-কথায় আছে। মথুরায় এসে পৌঁছেছেন কৃষ্ণ আর তাঁকে মারার জন্যে খুনে হাতি পাঠিয়ে দিয়েছেন কংস। তারপরে কী হল সেটা আবার না হয় পড়ুন!

দ্রৌপদীকে পাওয়ার যে চরম ইচ্ছে দুর্যোধনের ছিল। দেবসেনাকে পাওয়ার জন্যে ভল্লালদেবের (রানা ডগ্গুবাতি) কামনাও ঠিক এক। অপমানের শোধ তুলতে বুক চিরে রক্ত খাওয়ার রেফারেন্সটাও তো একটা সিনে এসে যাচ্ছিল প্রায়!

একেকসময় মনে হচ্ছিল থরে-থরে সিন বোধহয় বাদ গিয়েছে শুটিং করার পরে, ফাইনাল এডিট করতে বসার সময়। না হলে কোথাও কোথাও ঘটনা এমন খাপছাড়া টাইপ কেন? সেই যে সেই সিনটা, জলে ভাসছে অগুন্তি সব লাশ। কাটাপ্পা’র থেকে বাহুবলী শুনতে পেল এই দুরাচার নাকি পিণ্ডারি দস্যুদলের কাজ। তারপর জুৎসই রিয়্যাকশন কই তার, পরের সিনেই ওই ভয়ানক হত্যালীলার রেশটা পুর ধুয়ে-মুছে সাফ?

তারপর মাঝরাতে কুন্তল রাজপ্রাসাদে পিণ্ডারি দস্যু আক্রমণের সিন। কে পাঠাল তাদের, ওটা কি ভল্লালদেবের প্ল্যান? আভাস থাকলেও খুব স্পষ্ট করে কোথাও বলা হয় নি কিছু। অথচ লজিক দিয়ে ভাবতে গেলে মনে তো হতেই পারে, যে দস্যুরা নিরীহ পথচারীকে লুঠ করবে, এটা না হয় ঠিক। কিন্তু সশস্ত্র রাজপুরী কি এভাবে তাদের আক্রমণের প্ল্যানে থাকে? 

ছবির বড় গণ্ডগোল অবশ্য এইটে নয়, অন্য।

যেটা নিয়ে সবাই খুব ধন্য ধন্য করছে, সবচেয়ে বড় গোলমাল তো সেই খানেতেই আছে। ছবির গ্রাফিক্স বলুন, অ্যানিমেশন বা ভিএফএক্সের কাজ। সব এমন কাঁচা রয়ে গেল কেন?

আরে, আজ থেকে চব্বিশ বছর আগে জুরাসিক পার্কের মতো সিনেমা হয়েছে, সেখানে অ্যানিমেশনে তৈরি ডাইনোসর দেখে একবারও তো মনে হয় নি নকল দেখছি বলে! আর এখানে এই এতদিন পরে ষাঁড়গুলোকে দেখে কিনা মনে হবে, যাহ এতো মেশিনে আঁকা ষাঁড়! পার্ট ওয়ানে নদীর মধ্যে শিবগামী দেবীর সেই সদ্যোজাত শিশু হাতে তুলে ধরে নিয়ে যাওয়ার সিন। বা পার্ট টু-তে দেবসেনাকে নিয়ে ময়ূরপঙ্খী চড়ে কুন্তল দেশ থেকে মাহিষ্মতীতে ফেরত আসার সিন। আমার মত আনাড়ি চোখেও সব তো ধরা পড়ছে নকল আর সাজিয়ে রাখা বলে।

ভারতীয় সিনেমায় আইকন হয়ে যাওয়া দৃশ্য… কিন্তু কম্পিউটার গ্রাফিক্স এখানে মানত্তীর্ণ নয়

এই জায়গাটা তাই কেমন যেন ধাঁধার মত লাগে। এত শো কোটি বাজেট দিয়ে তৈরি ছবি এটা। তারপরেও ফার্স্ট ক্লাস ভিএফএক্স দ্যাখার সুযোগ নেই? এই গল্পটাই যদি আজ হলিউডের কোন ছবিতে হতো? এই লেভেলের খুঁত সেখানে থাকতো নাকি আদৌ? অতি-মানবিক যুদ্ধ নিয়ে সেই যে ‘ট্রয়’ (২০০৪) কিংবা ‘থ্রি হানড্রেড’-এর (২০০৬) মত ছবি। ওর একটা ফ্রেম দেখেও মনে হবে, গ্রাফিক্স দিয়ে সাজানো হয়েছে বলে?

হলিউডের ওই লেভেল থেকে ‘বাহুবলী’ এখানে পিছিয়ে পড়লো কেন?

নাকি ওই স্ট্যান্ডার্ডে বানাতে গেলে সময় লাগতো আরও বেশি? টাকা লাগতো আরও? ‘মগধীরা’ বা ‘বাহুবলী’র মতো চোখ ঝলসানো ছবি বানাতে পারছেন যে রাজামৌলি, প্রি-প্রোডাকশনের সময় এই খুচরো হিসেবগুলো রাখতে পারছেন না তিনি?

কোন একটা ইন্টারভিউতে পড়লাম, ‘বাহুবলী’ শেষ করে একটু অন্য স্বাদের ছবি বানাতে চান এবার। আর স্বপ্নের প্রোজেক্ট ‘মহাভারত’ নিয়ে কাজ শুরু করবেন একটা ভাল মতো গ্যাপ দিয়ে।

বেশ, সেই অপেক্ষাতেই থাকি। ভরসা আছে, ‘বাহুবলী’ দেখতে গিয়ে যে সব জায়গায় মন খুঁতখুঁত করেছে যাহ্‌ এ কী হয়ে গেল বলে, মহাভারতে সেরকম কিছু দেখতে পাব না আর।

- Might Interest You

NO COMMENTS