১৯৬৮-৬৯ সালে কলকাতায় কয়েকটি ডাকাতির ঘটনা ঘটেছিল‚ যার কিনারা করতে কালঘাম ছুটে গিয়েছিল পুলিশের | ধরি মাছ না ছুঁই পানি কায়দায় পুলিশকে বোকা বানাত অপরাধীরা | এতদিনে প্রকাশ্যে এল সেই ডাকাতির পিছনে মূল চক্রীর নাম | তিনি হলেন বিপ্লবী অনন্ত সিং | ১৯৩০-এ চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন মামলায় মাস্টারদা সূর্য সেনের অন্যতম সহযোগী | অগ্নিঝরা দিনগুলোর স্মৃতিচারণা করেছেন অনন্ত সিং-এর ঘনিষ্ঠ সঙ্গী ব্রজ রায় | টাইমস অফ ইন্ডিয়ায় |

ফিরে যাওয়া যাক …

১৯৩০ সালে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুঠ কাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে অনন্ত সিং-সহ ৫২ জনকে গ্রেফতার করা হয় | যথেষ্ট প্রমাণাভাবে মুক্তি পান রাজপুত বংশীত অনন্ত | কিন্তু স্বাধীনতা সংগ্রামী হওয়ার মাশুল তাঁকে দিতে হয় | ১৯৩২-এ আন্দামানের সেলুলার জেলে তাঁর দ্বীপান্তর হয় | সেখানেই কমিউনিস্ট ভাবাদর্শে অনুপ্রাণিত হন |

স্বাধীনতা উত্তর কালে কলকাতায় তিনি যোগ দেন CPI দলে | কিন্তু সেখানে তাঁর ভাল লাগেনি | ততদিনে স্বাধীনতা নিয়েও তাঁর মোহভঙ্গ হয়েছে | বহু কষ্টার্জিত স্বাধীনতা নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হচ্ছে বলে তাঁর মনে হয়েছিল | ১৯৬২ সালে তিনি স্থাপন করেন নতুন দল‚ Revolutionary Communist Council of India বা RCCI |

এই দলের জন্য তিনি ফান্ড রেইজ করতে ডাকাতি করতেন | কলকাতার বেশ কয়েকটি ব্যাঙ্ক এবং পোস্ট অফিসে হানা দিয়ে তাঁরা লুঠ করেছিলেন তখনকার দিনে প্রায় ৪ লাখ টাকা | লুঠের আগে তাঁরা বলে দিতেন‚ তাঁরা নিছক ডাকাত নন | বরং বিপ্লবী | দল চালনার জন্যই ডাকাতি করছেন | এবং তাঁদের হানায় কোনও মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতেন না |

ডাকাতির ধরন দেখে পুলিশের সন্দেহ তাঁর দিকেই গিয়েছিল | কিন্তু এত নিখুঁত ভাবে প্রমাণ মুছে ফেলা হত‚ পুলিশ সন্দেহ হলেও ধরতে পারত না অনন্ত সিং-কে | ব্রজ রায় জানিয়েছেন‚ তাঁরা ফোনে সাঙ্কেতিক ভাষায় কথা বলতেন | ফলে ফোনে আড়ি পেতেও পুলিশ কিছু করত পারত না | ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল বা ব্রিগেড গ্রাউন্ডে হাঁটতে হাঁটতে তাঁরা পরিকল্পনা করতেন | কেউ কাছে এসে গেলেই পাল্টে ফেলতেন আলোচনার বিষয় | তখন কথা বলতেন সিনেমা বা ক্রিকেট নিয়ে |

আরও পড়ুন:  পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে গোপনে রাখা আছে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের হৃদয় ?

নিজের পরিচয় ঢেকে রাখতে ১৯৬০ থেকে ১৯৬৬ অবধি বিভিন্ন পেশায় থেকেছেন অনন্ত সিং | তাঁর মধ্যে আছে সিনেমা প্রযোজনাও | জনপ্রিয় বাংলা সিনেমা ‘যমালয়ে জীবন্ত মানুষ ‘ তাঁর প্রযোজিত সিনেমার মধ্যে অন্যতম | পরিবহণ ব্যবসাতেও হাত পাকিয়েছিলেন | তবে এত ক্যামোফ্লেজেও শেষরক্ষা হয়নি | ১৯৬৯-তে গ্রেফতার হন অনন্ত সিং এবং সঙ্গীরা |

তবে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল‚ যুক্ত ফ্রন্ট-সহ বেশ কিছু সংস্থার চাপে তাঁদের মুক্তি দেওয়া হয় | এরপর এই ঘটনা ক্রমে ধামাচাপা পড়ে যায় | মুছে যায় অনন্ত সিং-এর স্মৃতি | ১৯৭৯ সালে ২৫ জানুয়ারি প্রয়াত হন অনন্ত সিং |

রাজপুত বংশীয় অনন্ত সিং-এর পূর্বসূরীরা বাইরে থেকে এসে পূর্ব বাংলার চট্টগ্রামে থাকতে শুরু করেছিলেন | আজীবন দেশকে ভালবেসে স্বার্থত্যাগ করে গেছেন অনন্ত সিং | বিপ্লবকে সার্থক করতে ‘ডাকাত’ পরিচয় গ্রহণেও পিছপা হননি | অথচ তাঁর কৃতিত্ব এখন বিস্মৃতির অতলে |

(পুনর্মুদ্রিত)

Sponsored
loading...

NO COMMENTS