বাংলালাইভ রেটিং -

রিলিজের ঠিক পরদিন – শনিবার, সন্ধেবেলার শো। শহরের নামী সিনেমা হলে ‘বেগম জান’ দেখবো বলে ঠিক করে রেখেছি আগেই। শুধু একটা চিন্তা হচ্ছিল ঠিকঠাক টিকিট পাব কিনা। ঠাসাঠাসি ভিড় হবে হয়তো। বেশ্যাবাড়ির গল্প, তার সঙ্গে আবার দেশভাগের খাট্টা-মিঠা পাঞ্চ! সাবজেক্ট আর প্যাকেজিং তো সৃজিত মন্দ বাছে নি! আবেগ তো পুরো ফেটে পড়ার কথা। এর ওপর সিনেমায় যে মশালাদার সেক্স রয়েছে সেটা তো ট্রেলার থেকেই দেখতে পেয়েছে লোকে। আগে থেকে কনফার্মড টিকিট কাটার জন্যে ‘বুক মাই শো’ মার্কা সাইটগুলো ইউজ করতে হবে কিনা, ভাবছিলাম সেটাও।

দুরু-দুরু বুকে সিনেমা হল-এ পৌঁছে যাবার পর অবশ্য এই ভয়-টয় সব উধাও। কাউন্টারের লোকটা যখন জানতে চাইছে, কোন সিট আমার পছন্দ, সামনে ফেলে রাখা বুকিং চার্ট দেখে আমার চোখ তো ছানাবড়া হয়ে গেছে প্রায়। আর আধ ঘণ্টা পর শো শুরু, লোক কোথায় ভাই হল-এ? পুরো হল যে প্রায় ফাঁকা ময়দানের মতো পড়ে!

সিনেমা যখন শুরু হচ্ছে, তখন শেষ দিকের গোটা চারেক রো’তে লোকজন ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে। বাকি হল পুরো খালি। সেটা দেখছি আর ভাবছি, তবে যে সৃজিত ফেসবুক পোস্ট দিল এইমাত্র, বাংলার বাইরেও দিল্লি আর চেন্নাইতেও শো হাউস ফুল হচ্ছে ব’লে! 

আমি অবশ্য দিল্লিতে নয়, রয়েছি আরও কিছুটা দূরে। ‘বেগম জান’ ছবির গল্পে ঘটনাটা ঠিক যে জায়গায় ঘটে, তার অনেকটাই কাছে। হ্যাঁ, এটা হল পঞ্জাবের সেই ভারত-পাক বর্ডার। সবে দেখে এসেছি আটারি-ওয়াঘা সীমানা, যেখান থেকে পাকিস্তানের লাহোর আর কয়েক কিলোমিটার মোটে। তা সেখানে তো দেখলাম বর্ডার নিয়ে ঘোর আবেগে ফেটে পড়ছে লোকে। মাঝ দুপুরের হিংস্র রোদেও কুচকাওয়াজ দেখার জন্য লক্ষ মাথার ভিড়। দেশাত্মবোধক গান শুরু হলে আরও তুঙ্গে উঠছে প্যাশন। অথচ বর্ডারের ওই তুমুল আবেগ সীমান্তের লাগোয়া শহর অমৃতসরের সিনেমা হল-এ ছিটেফোঁটাও পৌঁছল না কেন এসে?

অমৃতসরের রাস্তায় বেগমজানের পোস্টার, সঙ্গে সিনেমা হল-এর নাম

বর্ডার নিয়ে মশলা মেখে তৈরি ছবি রিলিজের ফার্স্ট উইকেই ফুস?

নাকি ট্রেলার দেখেই বুঝতে পেরেছে লোকে যে পুরো সিনেমাটাই ঢপের চপের মতো। অনেক কিছু থাকবে বলে প্রমিস আছে, কিন্তু কোন কিছুই সাজানো নেই যেন। যেন অগোছাল হাতে এটা-ওটা পুরে কোনমতে এক বস্তা বোঝাই থলে। দেশভাগকে ইউজ করে যেন-তেন ভাবে বক্স অফিসটা গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা। তার ওপর কোথাও যেন এমন একটা অহংবোধও আছে, যে আমার নাম হচ্ছে এই, আর আমার জাতীয় পুরস্কারের কাউন্ট হল এই। এখন কাগের ঠ্যাং বগের ঠ্যাং যা বানাবো, পাবলিক তাই সোনামুখ করে চেটেপুটে নিয়ে খাবে!

ছবি ঠিক শুরুর আগে পর্দায় অ্যাকনলেজমেন্টের কার্ড থেকেই তো আহাম্মকির শুরু। ঝাড়খণ্ডের মন্ত্রীকে থ্যাংকস জানাচ্ছেন ঠিক আছে, তাই বলে এটাও সটান সেই কার্ডে লিখে দেবেন যে এ ছবির শুট আসলে ঝাড়খণ্ডেই করা! এমন একটা কথার পর বাকি সিনেমাটা কী করে আর পঞ্জাবের গল্প বলে মানতে পারি, বলুন?

ঝাড়খণ্ডে শুট করে সেটা পঞ্জাব বলে চালাতে যাওয়া সিনেমা-লাইনে দোষের নয় কিছু। কিন্তু সেটা করতে যাওয়ার আগে পঞ্জাবের টোপোগ্রাফি একটু মেপে নেবেন না ভাই? ঝাড়খণ্ড যেমন মালভূমি দিয়ে ঘেরা, তাই সেখানে এখানে ওখানে পাহাড় এবং টিলা। পঞ্জাব বর্ডারও কি ঠিক তেমন হবে নাকি? পঞ্চনদের রাজ্যটি তো উর্বর আর শস্য-শ্যামলা দেশ। সেটার লুকটা পালটে গিয়ে ঝাড়খণ্ডের ঊষর মালভূমি হলটা কেন শুনি?

পঞ্জাবে নয়, ছবির শুটিং হল ঝাড়খণ্ডে

একে ভারতের এই মুল্লুকে শুট করে সেটাকে ও মুল্লুকের সিন বলে চালাতে চাওয়ার চেষ্টা। তার ওপর ছবি শুরু হতে না হতেই সেই ‘রাজকাহিনী’ (২০১৫) থেকে কাট-পেস্ট একের পর এক শট। সেই ভারত ভাগ হওয়ার যে সিনগুলো ‘রাজকাহিনী’র জন্য আগেই শুট করেছিলেন সৃজিত। সেই কোর্টের সিনগুলো কিংবা পেছনে হাতে আঁকা সেট টাঙানো দাঙ্গা। আর কাঁটাতারের ওপর সেই ছোট্ট শিশুর আবেগপ্রবণ হিসু। সেগুলো আর নতুন করে নতুন কম্পোজিশনে শুট করার ব্যাপারই নেই কোন। ভাট কোম্পানির প্রোডাকশন হাউস থেকে অর্ডার বোধহয় দেওয়াই ছিলো, যতটা পারো, শর্টে সারো। তাই ওই সিন-টিন বেমালুম সব ‘রাজকাহিনী’ থেকেই কপি করে এনে চিপকানো হল হেথা।

কিন্তু বাঙালিরা তো আগের থেকেই ‘রাজকাহিনী’ দেখে বসে আছে সাহেব! এরকম বেলাগাম টুকলিবাজি দেখে তো গোড়া থেকেই তাঁদের টেস্ট বিগড়ে যাওয়ার কথা। মনে হচ্ছিল, এটা তো ঠিকঠাক রিমেকও হলো না সৃজিত, এটা তার চেয়েও খারাপ কিছু হল। ঠিক যেন বলিউডের সেক্স আর অ্যাকশন মাখা সি-গ্রেড একটা ছবি, মফস্বলের হল-এ যেগুলো হামেশাই দুপুর শো-তে চলে।

আরও পড়ুন:  ইছামতীর কোলে প্রাচীন এই জনপদের নাম 'বসিরহাট' হল কেন ?

কোন একটা ইন্টারভিউতে শুনলাম, এই খাস্তা লেভেলের রিমেকটাকে আপনি দিব্যি চালিয়ে দিচ্ছেন ‘রাজকাহিনী’র ‘অ্যাডাপটেশন’ বলে! আপনার জ্ঞান-বুদ্ধিকে প্রণাম করি দাদা! ‘জুলফিকার’কে (২০১৬) অ্যাডাপটেশন মানতে পারি না হয়। কিন্তু তাই বলে এটা?

ভালো সিনেমার হিসেব-নিকেশ গুলিয়ে দিচ্ছেন বুঝতে পেরেছি বেশ। শব্দের মানেগুলোকে আর এভাবে ঝুলিয়ে দেবেন না প্লিজ।

ছবির শুরুতেই মস্ত বড় ধাঁধা। ঠেসেঠুসে ছবির মধ্যে দিল্লি রেপ সিনের মতো একটা কিছু ঢুকিয়ে রাখা আছে। কেন করতে গেলেন এটা দাদা? ছবিটা অনেক স্মার্ট হয়ে গেল এতে? নাকি মানী-গুণীরা ওইটে দেখে কেয়াবাৎ বলে ছিটকে উঠল দেখে? আমি শুধু বলতে পারি, সিনটা দ্যাখার পর আমার মতো এক মামুলি লোকের কী মনে হল, সেই কথাটুকু। মনে হল, এই সিনটা ক্রিয়েট করেছে যে, তার মাথায় গণ্ডগোল নেই তো কোন?

সিনটা এরকম, দিল্লির কনট প্লেসে নির্জন বাসে একটা মেয়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার টার্গেট করেছে লুচ্চা লাফাঙ্গা গুণ্ডার দল। সৃজিত দেখাচ্ছেন, বাস থেকে কোন মতে নেমে দৌড়ে পালাচ্ছে মেয়েটা। তাড়া করেছে দু’জন গুণ্ডা, ধরেও ফেললো প্রায়। ঠিক তক্ষুনি মেয়েটাকে গার্ড করে সামনে দাঁড়ালো থুত্থুড়ে এক বুড়ি। এখন গুন্ডাদের নর্মাল রিয়্যাকশন কী হওয়া উচিৎ বলুন তো? এক ঝটকায় ধাক্কা মেরে তারা ফেলে দেবে ওই বুড়িটাকে, তাই তো? আর এখানে কী হল শুনুন। আশি বছরের বুড়িটাকে দেখে গুণ্ডারা যেন কয়েক হাত দূরেই থমকে গেল হঠাৎ। এগনোর সাহস হচ্ছে না আর, শুধু মিনমিন করে সরতে বলছে বুড়িটাকে। আরে আমি তো এই অবধি দেখে ভাবছি, ওই মহিলা বোধহয় সুপার-উওম্যান কোন। জাস্ট একটা লুক দিলেই সামনে থাকা বজ্জাতেরা ছিটকে সরে শেষ।

পরে দেখি, ওসব কিচ্ছু না, সবেধন নীলমণি মহিলার একটা জিনিষই আছে। নিজের নগ্ন শরীর। আস্তে আস্তে গুন্ডাগুলোর সামনে নিজের পোশাক খুলে ফেললেন তিনি। আর বুড়ি মানুষের নগ্নতা সহ্য করতে না পেরে কচি মেয়েটার দিকে আর হাত না বাড়িয়ে বাবাগো-মাগো বলতে বলতে উলটো দিকে দৌড় দিল ডাকুরা।

আমি তো দেখে হাঁ!

‘দ্রৌপদী’ নাটকে প্রতিবাদ হিসেবে নগ্নতাকে ব্যবহার করেছেন অভিনেত্রী সাবিত্রী হেইসনাম অনেক আগেই

এরকমটা কি হয় কখনও সৃজিত? নগ্নতাকে প্রতিবাদ করে ইউজ করা যায়, জানি। মণিপুরের মহিলারাই তো সবার সামনে করে ছেড়েছেন সেটা। ‘দ্রৌপদী’ নাটকে সেই প্রতিবাদ দেখিয়ে দিয়েছেন সাবিত্রী হেইসনামের মতো বর্ষীয়ান গুণী অভিনেত্রী নিজেও। কিন্তু প্রতিবাদ করা একটা ব্যাপার, আর অস্ত্র হিসেবে নগ্নতাকে ব্যবহার তো আলাদা ব্যাপার পুরো! দুটো আপনার গুলিয়ে গেলটা কী করে শুনি?

সিনেমার স্ক্রিপ্ট লিখতে বসার আগে এবার থেকে একটু ক্যারেক্টার স্টাডি করার হ্যাবিট করুন প্লিজ। তাহলে আস্তে আস্তে বুঝতে শিখবেন যে, কোথায় কোন থুত্থুড়ে মহিলা ন্যাংটো হয়ে দাঁড়াল না দাঁড়াল, তাতে রাস্তার লুম্পেন ক্লাসের আদৌ যায় আসে না কিছু। বৃদ্ধার নগ্নতা দেখে নাটুকে ভাবে কুঁকড়ে গিয়ে উঃ আঃ করার ওই রিফাইনড আর্বান ন্যাকামোটা আর যাই হোক, ওদের মধ্যে নেই।

আর সত্যি করে বলুন তো, বয়স্ক মহিলার রেপ হয়ে যাওয়ার খবর এর আগে নিউজ পেপারে কখনও পড়েন নি নাকি আপনি? নাকি সেসব পড়েও এই সিনটা লিখতে গিয়ে পেন কোথাও আটকে যায় নি আদৌ?

ছবির সিকোয়েন্সগুলো ভেবেছেন যিনি, একেকসময় তাঁকে মনে হচ্ছিল আস্ত বেহেড বলে। এ কী হচ্ছে রে ভাই? দিল্লি পঞ্জাব এসব জায়গায় গরমে তো পঞ্চাশ ডিগ্রি ছুঁই ছুঁই হিট হয়ে যায় জানি। আর ছবিতে কিনা গরম নিয়ে কোথাও একটা শব্দ নেই কোন। অথচ চারদিক খোলা তেপান্তরের মাঠের মধ্যে বেশ্যাকুলের ঘর – চরাচর জুড়ে তেতে ওঠা রোদ! কোথায় তারা দিন যাপনের যন্ত্রণাতে ছটফটাবে রাগে। তার বদলে দেখি অজ পাড়া গাঁয়ের বেবুশ্যেকুল এমনভাবে গানের সঙ্গে হোলি খেলতে লাগলো যে, বলিউডের নামী কোরিওগ্রাফার এসে স্টেপসগুলো সব দেখিয়ে গেছেন যেন!

হোলি খেলার দৃশ্যের সঙ্গে বাকি ছবির গল্পের কোন যোগসূত্র নেই, এটা যেন আইটেম সংয়ের মতো

হোলির গানটা শুরুও হলো হঠাৎ করে, শেষও হলো হঠাৎ। আগে পরে গল্পের সঙ্গে লিংক নেই আর কিছু। আচ্ছা, চক্ষুলজ্জার খাতিরে ছবিতে আইটেম সং রাখা গেল না বলে কি হোলির লাচা-গানা দিয়ে সেটাই পুষিয়ে দেওয়ার চেষ্টা? গানের মধ্যে এক চামচ আবার লেসবিয়ানিজমও আছে। সত্যি সৃজিত, ধন্য আপনি, ধন্য আপনার মশলা ভেজে সিনেমা রাঁধার বুদ্ধি, আর ধন্য আপনার স্ক্রিপ্ট!

আরও পড়ুন:  মা অমৃতা সিং-এর কথায় হর্ষবর্ধন কপূরের সঙ্গে সব সম্পর্ক চুকিয়ে দিলেন সারা আলি খান!?

তবে যতটা শুনেছি, দেশ স্বাধীন তো আগস্ট মাসের কবে একটা হয়েছিল যেন ভাই। দোল খেলার দৃশ্য ওই টাইম ফ্রেমটার পিঠোপিঠি এলটা কী করে শুনি? দোল কিংবা হোলি তো শুনেছি সেই বসন্ত কালে হয়! নাকি রিসার্চ করে জানতে পেলেন ওই বছরে হোলির মাতন আগস্ট মাসেই ছিল?

সত্তর বছর আগের অজ পাড়া গাঁ’র মুখ্যু-সুখ্যু মেয়ে। ‘দেশ’ শব্দটার মানে কী তাঁদের আদৌ জানা থাকবার কথা? সেই তারাই কিনা রেডিওতে স্বাধীনতা নিয়ে জওহরলালের ইংরেজি ভাষণ শুনে আহ্লাদেতে ভাসে! এরপর দেশ স্বাধীন হওয়ার চোটে যখন ওদের বাজি পুড়িয়ে, চরকি জ্বালিয়ে, ফানুস উড়িয়ে আমোদ করতে দেখি, তখন মুগ্ধ নয়নে ভাবতে থাকি, যদিচ এরা পাক বর্ডারের পতিতালয়ে থাকে, তথাপি এরা বালিগঞ্জ প্লেসের শীলিত মনন মেনটেন করে রাখে!

ছবির ডায়ালগ কতটা তালজ্ঞানহীন হয়ে লেখা, এবার সেটার উদাহরণ দিই। ধরুন ওই সিনটার কথা। পুলিশের কাছে বেগম জানের রেনডিখানা নিয়ে অভিযোগ করতে গেছে কে যেন। অভিযোগটা হল, বেশ্যালয় থাকার জন্য ওখানে পরিবেশ নাকি এত খারাপ যে, ওই বাড়ির পাশের রাস্তা দিয়ে হাঁটা অবধি যাচ্ছে না! এখন আপনি বলুন, যে বেশ্যাবাড়িটার ঠাঁই হয়েছে ধু-ধু করা তেপান্তরের মাঠে, যার ত্রিসীমানায় একটা কোন লোক বসতিও নেই, তার পাশের রাস্তা দিয়ে হাঁটতে পারছে না লোকে – উদ্ভট এই অভিযোগ এক এই মুখুজ্যেদার সিনেমা ছাড়া আর কোথায় কোন পাগলে করে?

‘মান্ডি’ ছিল শহরের মাঝখান থেকে বেশ্যাদের উৎখাত করার গল্প। ‘রাজকাহিনী’ বা ‘বেগম জান অবশ্য কোথাও ঋণ স্বীকার করে নি এ ছবির কাছে

অবশ্য হতে পারে এটা সেই শ্যাম বেনেগালের ‘মান্ডি’ (১৯৮৩) থেকে কপি-পেস্ট টুকতে গেছেন তিনি। সেটা তো ছিল শহরের মাঝখান থেকে বেশ্যাবাড়ি উৎখাত করার গল্প। সেখান থেকে টুকতে গেলে এখানে যে জায়গা মতো পালটে নিতে হবে, ওঁর বোধহয় খেয়াল ছিল না সেটা।

শুধু ডায়ালগগুলোই না। সিনগুলোর বেশিরভাগও তো নড়বড়ে আর চরম যুক্তিহীন। আচ্ছা, উদাহরণ দিই ফের। সালিম মির্জার (সুমিত নিঝাওয়ান) সঙ্গে যে কুকুরদুটো সর্বক্ষণ থাকে, তাদের ধরে, মেরে, কেটেকুটে একটাকে গাছে ঝুলিয়ে দিল দুষ্টু লোক কবীর (চাঙ্কি পাণ্ডে), আর অন্যটার মাংস রান্না করে বেগম জানকে খাইয়ে দিল সোজা। কিন্তু যতক্ষণ না পোস্ট অফিস থেকে ধু-ধু করা তেপান্তরের মাঠের মধ্যে বেশ্যালয়ে কবীরবাবুর পোস্টকার্ড না এল, বাড়ির কেউ ধরতেই পারলো না যে অস্বাভাবিক একটা কিছু হয়েছে? একবারও মনেই হল না কারুর যে কুকুর দুটো গেল কোথায় বলে? কুকুর মেরে রান্না করে খাওয়ানোর সঙ্গে পোস্টকার্ড এসে পৌছনোর সময়টাও কি ম্যাচ করা যায় আদৌ?

ছবিতে রিসার্চের হালও অবশ্য তথৈবচ, দাদা! নইলে সস্তা বাজারু বেশ্যার সঙ্গে লখনৌয়ের নামী তওয়াইফ – সব কিছু একসঙ্গে এক বাড়িতে এভাবে কখনো মিলিয়ে গুলিয়ে যায়! আসলে কাকে বলে ‘তওয়াইফ’, কাকে বলে ‘বাই’ আর কাকে বলে ‘জান’, সেই রিসার্চ আর পড়াশুনোর মধ্যে বোধহয় ঢুকতে চান নি সৃজিত। ইসমত চুগতাইয়ের লেখা ‘লিহাফ’ নামের গল্পটা থেকে ‘বেগম জান’ নামটা তুলে নিয়ে নিজের ছবিতে বসিয়ে দিয়েছেন শুধু! নৃত্য-গীত-সাহিত্য-সংস্কৃতিপটীয়সী অভিজাত ঘরানার ‘জান’ জাস্ট মেয়েমানুষের মাংস বেচতে বেশ্যালয়ের বাড়িওয়ালি মাসি সেজে বসতে পারেন কিনা আদৌ, কে তলিয়ে ভাবতে যাবে অত, ধুস?

এবার শুনুন এ ছবির সেট-এর কনটিন্যুইটির হাল। ইন্টারভ্যাল হওয়ার ঠিক আগের সিন, বেগম জানের (বিদ্যা বালন) কোঠায় হরিপ্রসাদ (আশিস বিদ্যার্থী) আর ইলিয়াস (রজিত কাপুর) এসেছে কোঠাবাড়ি খালি করার জন্য ফাইনাল হুমকি দেবে বলে। এই সিনে কোঠাবাড়ির উঠোনটার মেঝেটা দেখে চমকে যাবেন আপনি। বড় বড় লালচে পাথর দিয়ে শান বাঁধিয়ে যত্ন করে পালিশ করা যেন। স্ক্রিন জুড়ে চকচকে ওই মেঝেটা দেখে হাঁ হয়ে ভাবতে থাকবেন, মেঝের কালার এমন হল কেন, এর আগে কিংবা পরের আর বাকি সিনে তো ওই মেঝের অমন রং নেই! সে সব সিনে ওই মেঝের রং তো হলদে, ঘষা ঘষা ধুলো আর মাটি মাখানো যেন!

লাল চকচকে মেঝেটা ফের ফেরত এলো লাস্ট সিনে, সারা বাড়ি যখন আগুন লেগে জ্বলছে। তো, ব্যাপারটা কী হল তাহলে? দুটো সিনের জন্যে একরকমের মেঝে, আর বাকি সিনগুলোয় মেঝের কালার অন্য? 

আরও পড়ুন:  তিনি ছিলেন বনি কপূরের প্রথম স্ত্রী‚ আজও জন্মদিনে মা মোনাকেই সবচেয়ে মিস করেন অর্জুন

বুঝুন শুটের ছিরি! ভাবছি, এডিটে বসেও এই গলতিটা কি ধরতে পারে নি কেউ?

আরেকটা মজার জিনিষ ‘রাজকাহিনী’তেও দেখেছিলাম, এবার এই ‘বেগম জান’এও দেখলাম। রাজামশাইয়ের (নাসিরুদ্দিন শাহ) ইনট্রোডাকটরি সিনটা মনে আছে তো? লং শটে অনেকখানি জায়গা ধরা, নদীর পাড়ে রাজার সঙ্গে মেলা লোকজন চলেছে, দূরে সেতুর ওপর দিয়ে একটা ট্রেন চলে গেল। একটু চেষ্টা করে দেখবেন তো এই ট্রেনের কটা কামরা আছে, সেটা গুণে উঠতে পারেন কিনা। ১৯৪৭ সালে ভারতে ক’কামরার ট্রেন চলত, আমার আইডিয়া নেই কোন। তবে যত কামরার ট্রেনই চলুক না কেন, এই ট্রেনটাকে মনে হয় অনন্ত বগিসহ পৃথিবীর দীর্ঘতম ট্রেন বলে। চলছে তো চলছেই, শেষ আর হয় না! গ্রাফিক্স দিয়ে ট্রেন এঁকে ছবির মধ্যে চিপকে দিলেন যিনি, বেশ করেছেন! কিন্তু একটা ট্রেনে কটা বগি থাকতে পারে, সেই আক্কেলটা তো রাখবেন?

সত্যি বলতে গেলে কী, ‘রাজকাহিনী’ বলুন আর কী এই ‘বেগম জান’, এর বেসিক গল্পটাকেই বুঝতে পারি না আমি। একটা কোঠাবাড়ি, সেখানে বারো-পনের জন বেশ্যা মেয়ের বাস। সঙ্গে একটা মোটে পাহারাদার লোক আর একটা দালাল গোছের ছেলে। এই কটা লোককে তাড়াতে গিয়ে ফেল মেরে গেল শক্তিশালী রাষ্ট্র? এমন কি পুলিশ এসেও করতে পারলো না কিছু? ওরা কি সুলতানা রাজিয়া আর ঝাঁসির রানির কমবো স্কোয়াড নাকি?

ওই কটা মেয়েকে তাড়াতে শেষে কিনা হিংস্র এক গুন্ডা ডেকে খান পঁচিশেক ডাকাত দিয়ে নিশুত রাতে হামলা করতে হল! তাও আবার বোমা গুলি বন্দুক আর মশাল নিয়ে হাতে?

আরও কাণ্ড শুনুন! গুণ্ডাদের সঙ্গে গুলির লড়াই লড়তে লড়তে হঠাৎ করে সবকটা বেশ্যা মিলে ঠিক করে ফেলল যে এবার তারা সবাই মিলে জহরব্রত করবে? নিজেদের মধ্যে এটা নিয়ে মিনিমাম কোন কথা অবধি হল না? দেখে-শুনে কে বলবে এরা নিছক ভাড়া খাটা মেয়েমানুষের দল? দেখে মনে হবে তো এরা সবাই সতী রানি পদ্মাবতী বলে!

সত্যি করে বলুন তো ভাই, এটা গল্প নাকি ফুল ভলিউম গাঁজা?

ছবির লাস্ট সিনে আবার কিছুটা ‘জুলফিকার’ এফেক্ট আছে, টপাটপ করে সবাই একের পর এক মরছে। দেখে কুলকুল করে হাসি আসছে শুধু। বেগম জানের টিম তো আগেই মরেছে আগুনে। এবার দেখি ইলিয়াসও ফটাস করে নিজের মাথায় গুলি ঠুকে দিল আর হরিপ্রসাদ তো বোধহয় মাল টানতে টানতে পগার পার। আর দুষ্টু পুলিশ অফিসার শ্যাম (রাজেশ শর্মা) পর্যন্ত একটা ন্যাংটো বাচ্চা মেয়ে দেখে ফ্যালার শকে পুলিশি ছেড়ে সাদা ড্রেস পরে বিবাগী হল দিব্যি!

বেগম জানের সারা বাড়িটা পুড়ে ছারখার হয়ে গেল, শুধু কাঠের সদর দরজায় একফোঁটা আগুন ধরল না। ধরবে কেন, বলুন? ওখানে আগুন ধরলে জহর ব্রত পালনের জন্যে সিনেমা-সিনেমা স্টাইলে মহা-কেতা মেরে সেই দরজা বন্ধ করবে কী করে বেগম শুনি? তাই তো গ্রাফিক্স দিয়ে ছবির ফ্রেমে ফ্রেমে আগুন এঁকেছেন যিনি, বুদ্ধি করে কাঠের দরজায় তিনি আর আগুন ধরতে দ্যান নি।

ও হ্যাঁ, ছবির এই এন্ড পোর্শনটা যখন হচ্ছে ততক্ষণে হল-এ যে কটা লোক ছিল সব কিন্তু এক্কেবারে ফাঁকা। লাস্ট ঝাড়পিট অবধি কোন মতে থেকে, সেটা হতে না হতেই সকলে মিলে দুদ্দাড়িয়ে ধাঁ!

সৃজিত এদিকে তখন স্ক্রিন জুড়ে জাতীয় পতাকা ওড়াচ্ছেন, আর সঙ্গে গান না কি যেন একটা হচ্ছে। আর হল-এ শুধু একলা আমি বসে। ঝাড়ুদারেরা পরের শো-য়ের আগে হল সাফ করতে ঢুকেও পড়েছে দিব্যি।

আমার তখন কী মনে হচ্ছে, জানেন?

ওয়াঘা বর্ডারে একরকম ফেরিওয়ালা দেখেছি, টুপি আর ছাতায় জাতীয় পতাকার রং লাগিয়ে বিক্রি করাটা যাঁদের পেশা। ‘বর্ডার’ নিয়ে যে ইমোশন, সেটা ভাঙিয়ে ভাঙিয়ে নিজেদের পেট চালাচ্ছেন তাঁরা।

সৃজিতকে তখন দেখতে পেলাম বিলকুল যেন বর্ডারের সেই টুপিওয়ালার রূপে। ফারাক বলতে ওঁর হাতে শুধু টুপির বদলে সিনেমা।

এখন আপনি সেই ফেরিওয়ালার খদ্দের হবেন কিনা, সেটা ঠিক করা তো পুরো আপনার হাতে, ভাই।

- Might Interest You

NO COMMENTS