অম্লানকুসুম চক্রবর্তী
অম্লানকুসুমের জন্ম‚কর্ম‚ধর্ম সবই এই শহরে|বাংলা ছোটগল্পের পোকা|একেবারেই উচ্চাকাঙ্খী নয়‚অল্প লইয়া সুখী|

স্কুলজীবনে ইংরিজি পরীক্ষায় প্রশ্ন আসত—টেলিগ্রাম লিখ। টেকনিকটা জানা থাকলে এমন প্রশ্নের উত্তর দেওয়ায় খাটনি কম ছিল, নম্বর উঠত বেশি। একটা অনুচ্ছেদে দেওয়া ঘটনা পড়ে কোনও আত্মীয় বা পরিজনকে টেলিগ্রাম লিখতে হবে। নির্যাসটা বজায় থাকবে, কিন্তু বাড়তি শব্দ খসবে না। আজকের ফোরজি আর আনলিমিটেড ডাউনলোডের যুগে এসব প্রশ্ন যাদুঘরে ঠাঁই পেয়েছে।

তবে কথায় আছে না, জীবনের ধন কিছুই যায় না ফেলা! ধুলো কিচকিচ গ্রামোফোন রেকর্ড মাইক্রো এসডির যুগে যেমন দশগুণ দামে বিকোয়, প্রাচীন দু’পয়সার খরিদ্দার যেমন ভরদুপুরে উজিয়ে আসে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সামনে, ফেলে দেওয়া রদ্দি যেমন হঠাৎ করে হয়ে ওঠে আর্কাইভ কিংবা কালেক্টরস এডিশন, ঠিক তেমনভাবেই ছোটবেলায় শেখা টেলিগ্রাম কিংবা প্রেসির প্রয়োগ চলে আসে খবর কাগজের শ্রেণীবদ্ধ বিজ্ঞাপনে, বিশেষ করে পাত্র চাই-পাত্রী চাই কলামগুলিতে। প্রতিটি বিজ্ঞাপন হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল, এবং যত বেশি কথা যত কম ক্যারেকটারে বাতলে দেওয়া যায় তারই যেন প্রতিযোগিতা চলে এমন পাতার প্রতিটি এন্ট্রিতে। এটা যেন অনেকটা কোনও রাগের আস্ত আলাপ ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা একটি হিক্কায়। ত্রিনয়ন, ও ত্রিনয়ন, একটু জিরোর সন্ধান করতে ফেলুদা যে কটি চারমিনার খসিয়েছিল, বলা যায় না, হয়ত তার থেকে ঢের বেশি ধোঁয়ার রিং উড়ত এখনকার কিছু মার্কামারা বিজ্ঞাপনের আসল মানে উদ্ধার করতে। আর উদ্ধার করা হলে লালমোহনবাবু বলতেন, হাইলি সাসপিশাস, কালচার করতে হচ্ছে মশাই।

এমন কিছু বিজ্ঞাপন নিয়েই একটু কালচার করা যাক। রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের আশীর্বাদ মাথায় নিয়ে বেশ কিছু বিজ্ঞাপনের সারাংশ থেকে আসল ব্যাপারটা কখনও কখনও উদ্ধার করা যায়, অনেক সময়ই আবার সেটা যায় না। সঃচাঃ/উঃবেঃসঃচাঃ/সঃ/উঃঅসঃ পাত্র চাই বললে বোঝা যায় সরকারি চাকরি কিংবা উচ্চ বেসরকারি চাকরি, স্ববর্ণ অথবা উচ্চ অসবর্ণ পাত্রের খোঁজ করা হচ্ছে। এগুলি অপেক্ষাকৃত সোজা হিসেব। একটি বিজ্ঞাপনের কথা মনে পড়ছে। তাতে লেখা ছিল পিতা উরিআআ, মাতা প্রশি। লোভ সামলাতে না পেরে তলায় দেওয়া ফোন নাম্বারটি ঘুরিয়েছিলাম। জানা গিয়েছিল, বাবা উচ্চপদস্থ রিটায়ার্ড আয়কর আধিকারিক আর মা প্রধান শিক্ষিকা।  ভদ্রলোক বলেছিলেন, ‘দুর্দিনের বাজার, একটু মেপে তো খরচ করতে হয়। শব্দ ব্রহ্ম।’ আরেকটি বিজ্ঞাপনের কথা মনে পড়ছে। লেখা ছিল– পাত্রী সংস্কৃতিমনস্কা, রসুনপ্রাণা, নিরামিশাষী। পড়ে ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। মগজাস্ত্রে শান দিয়ে ধারনা করতে পেরেছিলাম রসুনপ্রাণা বলতে বোঝানো হচ্ছে রবীন্দ্র-সুকান্ত-নজরুলে পাত্রীর মতি রয়েছে।  

আরও পড়ুন:  ডুগডুগি (পর্ব ১২)

খুন-ধর্ষণ-চিট ফান্ড-খাবারে ভেজাল-মত্ত স্টিয়ারিংয়ে রক্তের থেকে অনেকটা বাইরে খবরের কাগজের সাপ্তাহিক এই তিন চারটি পাতা যেন অন্য এক দেশ। ঘরের মধ্যে অন্য এক ঘর। এক স্বঘোষিত ‘উদারমনস্ক’ পরিবার ছেলের হবু বৌয়ের সন্ধান করতে গিয়ে লিখেছিলেন বিয়ের পরে পাত্রীর চাকুরি এবং ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থাকা চলিবে না। এক ঘরজামাই সন্ধানী পাত্রীপক্ষের চাহিদা ছিল নেশাহীন, পেশাহীন, দাবিহীন ও দাড়িহীন পাত্র। একটি বিজ্ঞাপনে দেখেছিলাম, পাত্রী ঘরকুনো, কলি একান্ন। একান্ন ব্যতীত অন্য পিনকোডের যোগাযোগ নিষ্প্রয়োজন।

ডিভোর্স ব্যাপারটা সুখকর নয়। কিন্তু এই বিষয়টা গৌন প্রমাণ করার জন্য যেভাবে কথার মারপ্যাঁচ করা হয় তা মাঝেমধ্যে হাস্যকর হয়ে দাঁড়ায়। ইংরিজির যে কোনও শব্দে কিউর পরে যেমন আসে ইউ, ঠিক তেমনই ডিভোর্সী লেখা হলেই তার আগে অবধারিতভাবে যে শব্দটি আসে তা হল ‘নামমাত্র’। নামমাত্র বিবাহে ডিভোর্সী। লোকজন ডেকে সানাই শুনিয়ে চিকেন মটন খাইয়ে একটি বিয়ে কি করে নামমাত্র হয়ে যায় তার ব্যাখ্যা আজও খুঁজে পেলাম না। যৌনতার পবিত্রতা দেখানোর জন্যই কি এই চেষ্টা! না হলে কিছু বিজ্ঞাপনে এ কথা কেন লেখা থাকে—ফুলশয্যা হয়নি। একটি বিজ্ঞাপন হুবহু তুলে দেওয়া যাক। ‘সম্ভ্রান্ত পরিবারের অত্যন্ত ভদ্র পাত্র স্মার্ট ও সংগত কারণে বিনা ফুলশয্যায় ডিভোর্সড। নির্ঝঞ্ঝাট পাত্রী চাই।’ এই ‘স্মার্ট ও সংগত’ কারণের মানে করে নেওয়াটা পাত্রীপক্ষের হাতে! আরও একটি বিজ্ঞাপনের কথা মনে পড়ছে। এমন সত্যবক্তা এ যুগে লাল রং ছাড়া রাঙা আলু কিংবা ইউরিয়া ছাড়া মুড়ির মত, বিরল। বিজ্ঞাপনে লেখা হচ্ছে, পূর্ব বিবাহ ভেঙে যাওয়ায় মানসিক গ্লানিতে পাত্রর যৌনক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। তবে চিকিৎসায় ভাল হয়ে যাবে।

শতকরা নিরানব্বই ভাগ পাত্র ফর্সা পাত্রী চান। তা সে যতই কালো হোক কিংবা কালো মেয়ের আলোর নাচন—এসব এফএমে থাকে, কানে হেডফোনে। প্রগতিশীল, প্রোগ্রেসিভ বলে দাবি করা পরিবারও কিন্তু বাড়িতে শ্যামলা পাত্রী আনার কথা ভাবলে খাবি খায়। নতুন বৌকে হতেই হবে ফেয়ার অ্যান্ড লাভলির মডেল মার্কা। অন্য দিকে নজর দিলে দেখবেন, পাত্র ‘উচ্চপদস্থ’ চাকুরে না হলে তার কোনও মূল্য নেই। সাধারন মানের ছেলেরা কি করে পাত্রীস্থ হয় এটাই একটা মস্ত আশ্চর্যের বিষয়। একটা চেনা কিন্তু ওজনে ভারি কথা আছে। অধিকন্তু ন দোষায়। বিজ্ঞাপনগুলো ঘাঁটলে এমনটিও চোখে পড়বে—পাত্রী মাধ্যমিক (ব্যাক)। সুন্দরী। আইএএস / আইপিএস পাত্র চাই। মিলুক না মিলুক, হাঁক পাড়তে ক্ষতি কি!

আরও পড়ুন:  সাগর আই লাভ ইউ (পর্ব ৯)

পাত্র পাত্রীর শ্রেণীবদ্ধ বিজ্ঞাপনগুলো যেন চলতি সময়ের গ্রাফ। মানুষের আশা-আকাঙ্খা-বাজারদরের নিলামমঞ্চ। আজ থেকে বছর কয়েক আগেও বিজ্ঞাপনে লেখা থাকত, ‘আইটি অগ্রগণ্য’। সে দিন গিয়াছে চলিয়া। হালে ট্রাম্প ভুরু কুঁচকেছেন। তাঁর সন্দেহ আর রক্ষণশীলতার সুতো ভরা পাগলা লাটাইয়ে টান পড়েছে এ দেশেও। তাই দেরি না করে বিজ্ঞাপনও বদলেছে। এখন অনেক পাত্র চাই-তেই দেখি, আন্ডারলাইন করে লেখা, ‘আইটি কাম্য নয়’। তবে অতি সাবধানীরাও আছেন। সম্প্রতি একটি বিজ্ঞাপনে চোখে পড়ল, ‘পাত্র আইটি হলে লাস্ট অ্যাপ্রাইজাল রিপোর্ট সহ যোগোযোগ বাঞ্ছনীয়।’

দিন বদলায়, সমস্যাও। রামবাবুর ফেলে দেওয়া চিকেন বিরিয়ানির ঠ্যাং পরের দিন পড়ে যাচ্ছে শ্যামবাবুর পাতে। এখন বাহাদুর রেস্তোরাঁও ভিলেন। এ সপ্তাহের একটি বিজ্ঞাপনে উল্লেখ আছে দেখলাম, ‘বৈদ্য পাত্র চাই। প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী কাম্য, রেস্তোরাঁ বাদে।’ এক ডাক্তার পাত্রীর তরফ থেকে পাত্র চাই বিজ্ঞাপনে লেখা হয়েছিল—বত্রিশ অনূর্দ্ধ মার না খাওয়া জুনিয়র ডাক্তার কাম্য। ঠিক একই রকম ভাবে কর্মরতা পাত্রী চাইলে পাত্রপক্ষ অনেক সময় বিজ্ঞাপনে লিখে দেন—কল সেন্টার, রিসেপশানিস্ট চলবে না। ‘শাশুড়িবন্ধু পাত্রী চাই’, এমন রত্নমোড়া বিজ্ঞাপনও চোখে পড়েছিল। সুন্দরী আর প্রকৃত সুন্দরীর তফাৎটা আজও বুঝে উঠতে পারলাম না। এক পাত্রপক্ষের দাবি ছিল, ‘ঝিনচ্যাক ফোনের ঝকমারি সেলফি নয়, পেশাদার ফোটোগ্রাফার দিয়ে তোলা ছবিই পাঠান। ফোটোশপ ভুলেও না, পাত্রের নিজস্ব স্টুডিও।’ শেষ তিনটি শব্দ কি সাবধানবানী? কে জানে! ফর্সা পাত্রী নিয়ে আদিক্ষেতার একটা উৎকৃষ্ট উদাহরন দিই। অনেকেই তো পরিচয় গোপন রাখার ইচ্ছে নিয়ে পাত্র পাত্রীর বিজ্ঞাপনের জন্য আলাদা ইমেল খোলেন। এক পাত্রপক্ষের নব্য ইমেল অ্যাড্রেসটি ছিল—ফেয়ারব্রাইডঅনলি অ্যাট দ্য রেট অফ অমুকমেল কম। ভাবুন একবার!   

এরকম দাবি দাওয়া চাহিদায় তোমাকে চাইয়ের কুটকচালির মধ্যে দিয়েই কত ঘরে ভ্রমর চলে আসে গুণগুণিয়ে। বাছবিচারের অনেক শুঁয়োভরা বিজ্ঞাপনের থেকে প্রজাপতি পাখনা মেলে। সুখী থাক সক্কলে। একটি ম্যাট্রিমোনিয়াল অ্যাপ তো সদর্পে বলে—হাজারে নয়, লাখে একটিকে বাছুন। মানুষ বেছে চলে ক্রমাগত। তবে সবার অবশ্য এত বাছবিছার থাকে না, অন্তত প্রকাশ্যে। একটি বিজ্ঞাপনের কথা বলে দাড়ি টানি। শেষ পাতে মিষ্টি হোক। বিজ্ঞাপনটি বেরিয়েছিল কবিপক্ষে। ‘লাবণ্যময়ী, শান্তিঃ পাত্রীর জন্য পূর্ণপ্রাণ পাত্র চাই। পাত্রী ছাব্বিশ বসন্ত পার করে সাতাশের পথে।’ শান্তিঃ মানে কি ছিল? শান্তিনিকেতনী?

আরও পড়ুন:  দেউলিয়া বাঙালি ও চট্টগ্রাম অস্ত্রাগারের স্মৃতি
Sponsored
loading...

1 COMMENT

  1. অম্লান এর সব লেখাই দুর্দান্ত। এত ভাল লেখা পরলেই অনেক কিছু যেন নতুন করে চোখে পরে।