সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়
জন্ম : ২৩ নভেম্বর ১৯৭৪, দুর্গাপুরে | ১৯৮৬ সাল থেকে কলকাতায় বসবাস | তেরো-চোদ্দো বছর বয়স থেকেই কবিতা লেখার শুরু | প্রথম কবিতা ছাপা হয় 'দেশ' পত্রিকায় ২০০১-এ | তার পর নিয়মিত 'দেশ' সহ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি | প্রথম উপন্যাস : 'শঙ্খিনী', 'দেশ'-এ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত | শখ : অসংখ্য | তবে আসল শখ মানুষের সঙ্গে এই মহাপৃথিবীর সম্পর্ক অধ্যয়ন |

অনেক বছর আগে একবার তার বোন উর্মির মারাত্মক টাইফয়েড হয়েছিল, তিন মাস উর্মি বিছানা ছেড়ে উঠতে পারেনি | বাবলি ছিল উর্মির বন্ধু | স্কুল থেকে ফিরে বাবলি তখন প্রতিদিন এসে বসে থাকত উর্মির কাছে | দুজনে গল্প করত | কলেজ থেকে ফিরে দুজনের গল্পের মধ্যে সেও অজান্তে ঢুকে গেল একদিন কবে! টুলুকে নিজের হাতে বানানো লাল রেশমি রাখি পরিয়ে দিয়ে সেই বন্ধুত্বকে আর একটু জোরালো করে দিল বাবলি | তারপর একদিন তার আর বাবলির মধ্যে তীব্র বিরোধ সৃষ্টি হলো উর্মির সঙ্গে কৈলাশের প্রেম নিয়ে | উর্মি ঘোষবাগানের বিহারী দুধওয়ালার ছেলে কৈলাশের প্রেমে পড়েছিল | কৈলাশরা ঘোষবাগানে একটা গ্যারেজ ভাড়া নিয়ে থাকত | বাবা, মা, ভাই, বোন মিলে একসঙ্গে আট-ন’জন কম করে! গ্যারেজের সামনে চাতালে বাঁধা থাকত ওদের একমাত্র উপার্জনের উপকরণ ছ’টা ছাগল | ভোরবেলা আর বিকেলবেলা হয় কৈলাশ নয় ওর দিদিরা বিটি রোড পর্যন্ত এই পাড়ার অলিতে গলিতে ঘন্টি বাজিয়ে ছাগলসহ বিক্রি করত ফেনা ওঠা গরম দুধ | কিন্তু ওই গ্যারেজে থেকেও, ছাগলের দুধ বিক্রি করেও লেখাপড়া করেছিল কৈলাশ! একাউটেন্সি অনার্স নিয়ে ভর্তি হয়েছিল জয়পুরিয়ায় | উর্মি আর কৈলাশের প্রেমের সূত্রপাত সেখানেই | এই ঘটনার আগে অব্দি টুলু কৈলাশকে কখনো ছাগলের দুধ বিক্রেতা হিসেবে অবজ্ঞা করেনি | বিকেলের দিকে হয়তো ছাগল নিয়ে বেরোল কৈলাশ, টুলুকে দেখতে পেল রকে বসে আছে, এগিয়ে এসে সিগারেট চাইল একটা | দুটো-একটা কথা বলল, তারপর নিজের কাজে চলে গেল | পাড়ার ছেলের সঙ্গে পাড়ার ছেলের স্বাভাবিক সম্পর্কটা যেমন হওয়া উচিত তেমনই ছিল তাদের সামান্য কথোপকথনের সম্পর্ক | কিন্তু উর্মির ব্যাপারটা জানার পরেই মনোভাব বদলে গেল তার | মনে হলো এসব চলতে দিলে লজ্জায় মাথা কাটা যাবে তাদের পরিবারের | সে উর্মির ওপর চাপ দিয়েছিল কৈলাশের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করতে | উর্মি রাজি ছিল না | উর্মির বিশ্বাস ছিল, কৈলাশ ডব্লু  বি সি এস দিয়ে নিজের সমাজ নিজেই গড়ে নেবে একদিন | মুছে ফেলবে গা থেকে ছাগলের বোঁটকা গন্ধ! টেনে তুলবে গোটা পরিবারকে | পায়ে রুপোর মল পরা বিহারী দিদিদের সসম্মানে প্রতিষ্ঠা করবে, ভালো বাড়ি ভাড়া নিয়ে ছেড়ে আসবে গ্যারেজ ঘর! তখন রোজ অশান্তি হতো টুলুর সঙ্গে উর্মির | সে বাগবাজারে, রাজবল্লভপাড়ায়, শ্যামবাজারে, হাতিবাগানে যেখানে দেখতে পেত দুজনকে একসঙ্গে ক্ষেপে যেত দারুণ | উর্মি জানত চিঠির কথা, কেই বা না জানত, উর্মি খোঁটা দিতে ছাড়ত না তাকে, বলত, ‘ও তোর প্রেমটা প্রেম, আর আমার প্রেমটা নোংরামি? তাও যদি চিঠি তোকে নিয়ে না খেলত এরকম! কৈলাশ তো অ্যাটলিস্ট আমাকে ভালোবাসে রে! আমি বললে এক্ষুনি বিষ খেয়ে মরে যেতেও রাজি ও | কিন্তু তুই তো একটা বিশ্বাসঘাতক মেয়ের পেছনে কুকুরের মতো ঘুরছিস একটু পাত্তা পাওয়ার জন্য  আর সে তোকে প্রয়োজনে ডাকছে, প্রয়োজনে ভাগিয়ে দিচ্ছে | দাদা তুই নিজেকে সামলা, আমার কথা তোর না ভাবলেও চলবে!’ কিন্তু টুলুর মন পাল্টাত না | নিজের বোকামি, চিঠির খেলা এবং কৈলাশের প্রতি উর্মির ভালোবাসা কোনটাই বোধগম্য হয়নি তার | এই সময় বাবলি টুলুর সঙ্গে খুব লড়াই করত উর্মির অধিকার নিয়ে | বাবলির সঙ্গে যুগলের তখন সদ্য প্রেম হয়েছে বা হব হব করেছে, যতদূর মনে পড়ে টুলুর | একটু একটু মুখ ফুটছে ওর | সাহস হয়েছে, ‘তুই কেন ওকে বাধা দিবি টুলু? ও কী অন্যায় করছে আমাকে বোঝা!’ – এই কথা বলার |

উত্তরে বাবলিকে টুলু বলেছিল, ‘কৈলাশ উর্মির যোগ্য নয়!’

আরও পড়ুন:  লেপ

‘তুই-ও চিঠির যোগ্য নোস্, তাহলে তুই ওকে ভালোবাসিস কেন? বলতে পারবি কিছু? যেটা নিজে বুঝিস না সেটা অন্য কাউকে বোঝানোর কী রাইট আছে তোর? আগে চিঠির পেছনে ফেকলুর মতো ঘোরাটা তুই নিজে বন্ধ কর দেখি!’

উর্মি আর বাবলি, দুজনের কারও সঙ্গে কথা বলত না টুলু তখন | এর কিছুদিন পরে ভাগ্যের হাতেই ঘটে গেল দুটো ঘটনা! বাবা ছেলে ঠিক করল উর্মির জন্য বিয়ে দেবে বলে | আর চিঠি হঠাৎ চলে গেল পাড়া ছেড়ে | উর্মির জন্য বাবা যাকে পছন্দ করল তার নাম মলয় | ব্যাংক অফিসার | বেশ স্মার্ট, কথায় বার্তায় চৌখশ | উর্মিকে দেখে টেখে চলে যাওয়ার সময় মলয় তাকে ডেকে বলল, ‘আপনার বোনকে তো আমার খুব পছন্দ হয়ে গেছে, কিন্তু ও বলছে ও অন্য একজনকে ভালোবেসে!’

টুলু ভেঙে পড়েছিল মলয়ের কাছে, সব কথা খোলাখুলি জানিয়েছিল | শুনেটুনে মলয় বলল, ‘ও এই ব্যাপার! দূর, ও আমি সব মাথা থেকে সাফ করে দেবো! চিন্তা করবেন না!’

দুদিন পরেই আবার এসে হাজির মলয়, আত্মীয়, বন্ধু নিয়ে | বাবার অনুমতি নিয়ে উর্মিকে সেদিন বেড়াতে নিয়ে গেল ও | উর্মি ফিরল যখন ভিন্ন মূর্তি! বাড়িতে কারও সঙ্গে কোন কথা বলল না রাতে, পরেরদিন বাবাকে জানিয়ে দিল, ও বিয়েতে রাজি | তারপর প্রচন্ড কাঁদল! এর পনেরো দিনের মধ্যে উর্মির বিয়ে হয়ে গেল মলয়ের সঙ্গে | এবং উর্মি বেশ সুখী বলেই ধারণা টুলুর |

ছেলে হয়েছে, সংসারের সব দায়িত্ব উর্মির, ভীষণ ব্যস্ত, বাপের বাড়ি এসেই উঠতে পারে না | এই সময় কিছু দিনের জন্য টুলুর মনেও হয়েছিল উর্মি যেমন কৈলাশের হাত থেকে রক্ষা পেল তেমনি হঠাৎ করে পাড়া থেকে চলে গিয়ে তাকেও মুক্তি দিয়ে গেল চিঠি | ফলে চিঠি কোথায়, কেমন আছে এ বিষয়ে আর কোন আগ্রহ হয়নি সে | এবং শেষ অব্দি কৈলাশ যখন একটা সেলসম্যানের চাকরিতে ঢুকে গেল তখন বোনের ব্যাপারে নিজের কঠোর মনোভাব সম্পর্কে যে অপরাধবোধ ছিল তার মনে তাও কেটে গেল, আর সে ভেবেছিল, চিঠির সঙ্গে আরও তিক্ত অভিজ্ঞতা হওয়ার আগেই ঈশ্বর তাকে নিষ্কৃতি দিয়েছেন | উর্মির বিয়ের পর আবার আপনা থেকেই বাবলি আর তোর বিরোধ মিটে গেল | বাবলি বলল, ‘কি রে, আমার ওপর আর রাগ নেই তো?’

সে হেসে উঠে বলেছিল, ‘না রে তোর ওপর আমার কোনদিনই রাগ ছিল না!’

উর্মির বিয়ের আগেই অবশ্য যুগলের সঙ্গে প্রেম হয়ে গেছে বাবলির | এবং তাতে টুলুর একটা ইতিবাচক ভূমিকা যে ছিল তা বলাই বাহুল্য! বাবলি তার সঙ্গে ছাড়া পাড়ার আর কোন ছেলের সঙ্গে কথা বলত না তখন | কাউকে উল্টো দিক থেকে আসতে পর্যন্ত দেখলে মাথা নিচু করে ফেলত ও, এত লাজুক ছিল | যুগল একদিন টুলুকে বলল, ‘কি রে, বাবলির সঙ্গে তোর কিছু চলছে নাকি রে টুলু?’

‘ভাগ শালা!’ বলেছিল সে | ‘ও আমাকে ছোট থেকে রাখি পরায়!’

যুগল বলেছিল, ‘টুলু, আমি শালা কোনদিনও বাবলির হাত থেকে রাখি পরিনি, আমি বাবলির হাত থেকে পরলে মালাই পরব! তুই পারলে এই গলি থেকে বের করে কেসটাকে একটু বিটি রোডে এনে ফ্যাল! তারপর আমি বুঝে নিচ্ছি!’

‘অলি গলি থেকে বিটি রোড মানে?’ অবাক হয়ে বলেছিল সে |

‘আরে ওকে যে যে দিন ধরব বলে ওঁত পাতছি আমি, মাল শালা অন্য গলি দিয়ে কেটে পড়ছে! তার ওপর এ পাড়ার প্রতিটা বাড়িই তো মামা বাড়ি, যেই আমাকে দেখল পুত করে ঢুকে পড়ল কোথাও, ব্যস, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দাবনা খুলে যাওয়ার হাল, তুই ভাই ওকে পটিয়ে পাটিয়ে একটু টু বি স্ট্যান্ডে পাঠিয়ে দে মাইরি! মন খুলে একটু কথা না বলতে পারলে আমি তো মনে হয় ফুটে যাব এবার! আর তাছাড়া বিতানের কেসটা তোর মনে আছে? অতএব পাড়া থেকে একটু দূরে যাওয়াই ভালো!’

আরও পড়ুন:  সাগর, আই লাভ ইউ

যুগল তখন এরকমই ছিল, একটা কথাও সিরিয়াসলি বলত না! এখনও ওপরে ওপরে এরকমই আছে, তবে ভেতরে বদলে গেছে অনেক | টুলু জানে!

আল্টিমেটলি বাবলিকে যুগল পাকড়াও আর জি করের ম্যাটার্নিটি ওয়ার্ডের ভেতরে! বাবলির মাইমা তৃতীয় সন্তানের জন্ম দিতে ভর্তি হয়েছিল সেখানে | বাবলি রোজ দুপুরে তার খাবার পৌঁছে দিতে যেত | একদিন যুগল তাদের সবাইকে বলল, ‘চল!’ যুগল ত্রিশ হাত আগে আগে, পেছনে তারা আট-ন’জন | তারা দাঁড়াল বাইরে, যুগল বাবলিকে ফলো করে ঢুকে পড়ল ওয়ার্ডে | বাবলিকে ধরে বলল, ‘দ্যাখো, এটা কিন্তু বহুত খারাপ হয়ে যাচ্ছে | আমি জাস্ট তোমার সঙ্গে একটু আলাপ করতে চাইছি! তোমার পেছনে ঘুরে ঘুরে আমার বাবার ব্যবসায় কত লোকসান হয়ে গেল, এরপর তো আমি মাথা ঠিক রাখতে পারবো না!’

এ কথায় বাবলি উল্টো ঘুরে হনহন করে হাঁটতে শুরু করে, যুগল ওর পেছনে পেছনে যায়, ভয়ে বাবলি ওর মাইমার বেডটা গুলিয়ে ফেলে, এবং সারা দুপুর টিফিন ক্যারিয়ার হাতে এক ওয়ার্ড থেকে অন্য ওয়ার্ড চষে ফেলে বাবলি, পেছনে যুগল! শেষমেশ একটা সন্ধি স্থাপিত হয় উভয়ের মধ্যে | সেই সন্ধির চিহ্ন সরূপই ধরা যেতে পারে দিয়া আর টিয়াকে!

মন্দিরের চাতালের তুলনায় একটা অন্ধকার কোণ বেছে নিয়ে বসেছে টুলু | বেশি রাতের দিকে চাতালটা ফাঁকা থাকার কথার কথাই নয়! আজ কদিন ফাঁকা থাকছে যে তার কারণ আছে একটা | হরিদাদের গ্রুপের পল্লবদা কদিন আগে মাত্র এই চাতালে বসে মদ খেতে খেতে এখানেই মরে পড়েছিল সারারাত!

বয়েস পঞ্চাশ পেরিয়েছিল পল্লব্দার | সন্ধ্যে থেকে এখানে বসে যারা মদ, গাঁজা, চরস খায় পল্লবদা ছিল তাদের অন্যতম | হরিদা, পল্লবদা, ভৈরবদারা এ পাড়ার খ্যাতনামা নকশাল সব |

পল্লবদা ছিল নিভাননী ঠাকুমার প্রিয় পাত্র | তারা সবাই শ্মশানে গেছিল পল্লবদার মৃতদেহের সঙ্গে, পূর্ণেন্দু কাঁধ দিয়েছিল | নিভাননী ঠাকুমাকে এই মৃত্যুর খবর জানানো হয়নি! পল্লবদা ভালো ছাত্র ছিল, গান করত | গান লেখার শখও ছিল | গানের খাতাটা রাখা থাকাত নিভাননী ঠাকুমার কাছে | কারণ সেগুলো ছিল এক নকশাল আন্দোলনের শরিকের রচনা, যা পুলিশের হাতে পড়ে যাওয়ার ভয় ছিল! সে ভয় একমাত্র নিভাননীর বাড়িতে ছিল না কখনো, পাড়ার যারা নকশালদের অপছন্দ করত তারাও ছিল নিভাননীর ব্যক্তিত্বের সামনে নতজানু, নিভাননী পল্লবদাদের আশ্রয় দিত, একবার পল্লবদা দুটো পাইপগান রাখতে দিয়েছিল নিভাননীর কাছে, আর ফেরৎ নিতে পারেনি, তারপর প্রয়োজনও শেষ হয়ে গেছে একদিন, পূর্ণেন্দু বলে গান দুটো, গানের খাতা সব যত্ন করে রেখে দিয়েছে ঠাকুমা আজও! পূর্ণেন্দু জানে না, পূর্ণেন্দু তখন এখানে ছিল না, নাগপুরে গেছিল, পল্লবদারাই ডালিয়ার দাদা নতুনদাকে চমকে ছিল এই বলে, যেন যত তাড়াতাড়ি পারে বিয়ে দিয়ে দিয়ে বোনকে সরিয়ে দেয় এখান থেকে! হতে পারে হুমকিতেই মাসখানেকের মধ্যে বিয়ে হয়ে গেছিল ডালিয়ার! নিভাননী ঠাকুমার তখনও বিস্তর প্রতাপ ছিল পাড়ায় | বাবলি অবশ্য খুব তর্ক করে এই নিয়ে, বলে, ‘ঠাকুমা পল্লবদাদের দিয়ে ডালিয়াদের থ্রেট করিয়েছে, এ সব ঠাকুমার নামে রটনা! একটা বিধবা মেয়ে কোনদিনও এতটুকু ঘাড় নোয়ালো না, একা হাতে চালিয়ে দিল সব, এটা স্বীকার করতে অনেকের গাত্রদাহ হয়! কেন সেবারের কথা মনে নেই, দুর্গাপুজোর সময় পল্লবদা মদ খেয়ে মণ্ডপে ঢুকে চেঁচামেচি করেছিল বলে ওই আশি বছরের বুড়ি কী ভাবে জুতোপেটা করেছিল পল্লবদাকে! ঠাকুমা কি আমাদের মতো? ঠাকুমার জীবনের প্রিন্সিপাল আলাদা টুলু, বদনাম করলেই তো হলো না! মারা খেয়ে ঠাকুমাকে জড়িয়ে ধরে পল্লবদার কান্নাটা আজও আমার চোখে ভাসে! এতেই বোঝা যায় পল্লবদা ঠাকুমাকে কী রকম শদ্ধা করত! মানুষ মানুষকে এমনি এমনি এমন ভক্তি করে না জানবি! বিশেষত পল্লবদার মতো ছেলে, কাউকে জীবনে সে পরোয়া করেনি! ছাড় তো বালের কথা! ওসব ডালিয়ারা বুকের জ্বালা মেটাতে ঠাকুমার নামে রটিয়েছে!’

আরও পড়ুন:  বেণু তব বাজাও একাকী

মারা যাওয়ার দিনও পল্লবদা সন্ধে থেকে মদ খাচ্ছিল চাতালে বসে | কোন কারণে সেদিন হরিদারা রাত বাড়ার আগেই চলে গেছিল যে যার বাড়ি | পল্লবদা একা একাই মদ খাচ্ছিল, গান করছিল, বমি করছিল, আবার মদ খাচ্ছিল! পূর্ণেন্দুও সেদিন গভীর রাতে মাঠ থেকে পল্লবদার গলা ভেসে আসতে শুনেছে | ক্লান্ত ছিল বলে মাথা ঘামায়নি | সকালে ঝাড়ুদারদের প্রথম নজরে পড়ে প্রাণহীন দেহটা | পল্লবদা বিয়ে করেনি, বুড়ো মা ছাড়া পল্লবদার কেউ ছিল না সংসারে! সেই মাও গত হয়েছেন বেশ কিছুদিন হলো | অতএব পল্লবদার জন্য যেটুকু কান্নাকাটি তারাই করল | আর এতদিনে টনক নড়েছে হরিদা, ভৈরবদাদের পরিবারের | হরিদা আবার বোতল ধরতে চেয়ে নাকি বেদম ঝাড় খেয়েছে ছেলে বউ সবার কাছে! এ সব কারণেই মন্দিরের চাতালে কেউ বসে নেই আজ |

টুলুর হঠাৎ মনে হলো এর মধ্যে চিঠির সঙ্গে দু দুবার দেখা হলো কিন্তু একবারও পল্লবদার খবরটা জানানোর কথা মনে পড়ল না তার চিঠিকে!

এই সময় মাঠের ও প্রান্তে পূর্নেন্দুদের বাড়িতে বেশ কয়েকটা আলো জ্বলে উঠতে টুলু বুঝল যুগলদের বাড়ি থেকে ফিরল পূর্ণেন্দু আর তিথি! একটু পরেই বিতান আর ওর মেয়ে ডোনার গলা পেল সে! বিতান আর ডোনা কথা বলতে বলতে ওদের বাড়ির গলিটায় ঢুকে গেল! তারপর সে দেখতে পেল মোহনাকে | মোহনা গলিতে ঢুকে গেল না! মুখটায় দাঁড়াল | বলরাম মল্লিক স্ট্রীটের দিকটায় দেখল ঘাড় উঁচু করে | তারপর মাঠের দিকেও তাকিয়ে খুঁজল কাকে! টুলু বেশ অবাক হলো, এত রাতে কাকে খুঁজছে মোহনা, খুব যে একটা প্রকৃতস্থ বলেও মনে হলো না ওকে, টলছিল একটু! এত রাত বলে কেউ বাইরে নেই নিলে এ অবস্থায় কেউ দেখে ফেললে খুব খারাপ হতো, বিতান, বাপি, কেউই আজকাল কিছু মানছে না | কিন্তু এটা তো সাউথ ক্যালকাটা নয়, এখানে এ সব নিয়ে ভুরু কুঁচকানোর লোকের এখনও অভাব নেই . আর একবার ডাঁয়ে বাঁয়ে তাকিয়ে ধীর পায়ে ভেতরে চলে গেল বিতানের বউ! টুলুও বাবল উঠে পড়ে, কিন্তু বাপি, সজলরা এখনও যায়নি, ওরা না যাওয়া অব্দি অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই | টলতে, টলতে, গুলতানি করতে করতে ওরাও চলে গেল যখন তখন যেই উঠে দাঁড়াতে গেল সে পিঁকপিঁক করে একটা মেসেজ ঢুকল তার মোবাইলে! মনের ওপর একটা আনন্দের চাবুক এসে পড়ল যেন তার | চিঠি! চিঠি! চিঠি ছাড়া আর কে হবে! কিন্তু নিশ্চয়ই তাকে কিছু একটা ঝাড় দিতেই এই মেসেজ পাঠিয়েছে চিঠি |

চলবে…..

গত পর্বের লিঙ্ক – http://banglalive.com/bengali-novel-by-sangeeta-bandyopadhyay-part-5/

 

NO COMMENTS

এমন আরো নিবন্ধ