উল্লাস মল্লিক
জন্ম ১৯৭১ | লেখালিখি শুরু ২০০০ সালে | প্রথম উপন্যাস ‘প্রস্তুতিপর্ব’ | শখ –ক্রিকেট আর শস্য শ্যামল ক্ষেত | সুযোগ পেলেই বেরিয়ে পড়েন গ্রাম বাংলার সবুজের হাতছানিতে |

এবার পুলিশি বুদ্ধি কাজ করে ছোটবাবুর। আমার প্রশ্নের গুঢ় অভিসন্ধি বুঝতে পেরে বলেন, আপনি মশাই যা ভাবছেন তা নয়; যথেষ্ট ঢাকাঢুকি দেওয়া অবস্থায় আমরা ওকে পাই। তবে আপনি মনে করলে একটা মেডিকেল চেক-আপ করিয়ে নিতে পারেন। জোর করে মেয়েদের পোশাক খোলা যত কঠিন – পরানো তত নয় … সাধারণত যেকোনও জিনিস গড়ার চেয়ে ভাঙা সহজ; কিন্তু এই ব্যাপারটায় শুধু পৃথিবীর নিয়ম খাটে না।

ছোটবাবুর দার্শনিকতা দেখে সত্যিই অবাক হয়ে যাই আমি; খুব শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে তাকাই। এই ফাঁকে সিগারেটটা ধরিয়ে ফেলেন ছোটবাবু।

আড়চোখে কুমকুমের দিকে তাকিয়ে বড় একটা সুখটান দেন ছোটবাবু। তামাকের ধোঁয়ায় দার্শনিকতা আরও জোরদার হয়ে ওঠে। বলেন, আর তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই খারাপটা ঘটেছে, মানে আর কি বদ লোক কেউ ওকে … আপনি তো ফেলে দিতে পারেন না নিজের ওয়াইফকে … । ওর আর কী দোষ বলুন, নারীরা যে কত অসহায় … ।

আমি সঙ্গে সঙ্গে সায় দিয়ে বলি, সে তো বটেই।

ফের সিগারেটে একটা লম্বা টান দেন ছোটবাবু। বলেন, বরং আইডেন্টিফিকেশানটা মন দিয়ে করুন, ও যখন কথাবার্তা বলতে পারছে না আপনার ওপরই সবটা নির্ভর করছে … ।

আমি কুমকুমের দিকে ফের তাকাই। সেই ভোঁতা দৃষ্টি। আমাদের কথা কিছু শুনেছে বলে মনে হল না।

ছোটবাবু বলেন, আপনি থুতনির নিচে একটা কালো তিলের কথা বলেছিলেন না?

হ্যাঁ, হ্যাঁ, ছিল একটা।

এরও তিল আছে; তবে একটা নয় – দুটো পাশাপাশি।

আমার মুখ দিয়ে বেড়িয়ে আসে – এই রে !

ছোটবাবু বলেন, “এই রে”-র কিছু নেই।

আমি বুঝতে না পেরে ছোটবাবুর দিকে তাকাই।

ছোটবাবু বলেন, আপনি লাস্ট কবে দেখেছিলেন তিলটা।

বলি, সেটা তো মনে নেই।

একটু মনে করার চেষ্টা করুন।

ভাবতে থাকি কুমকুমের তিলটার কথা। বিয়ের পর যখন দুজনের খুব জড়ি জাপটি প্রেম, তখন নজরে পড়ে তিলটা। থুতনির ঠিক নিচে, একটু বাঁদিক ঘেঁষে। তারপরেও বেশ কয়েকবার দেখেছি; কিন্তু শেষ কবে দেখেছি, কিছুতেই মনে করতে পারছি না।

ছোটবাবু ফিসফিস করে বলেন, আপনাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা হত না?

ছোটবাবুর প্রশ্ন করার ধরণটা দেখে মনে হয়, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মামুলি ঘনিষ্ঠার কথা বলছেন না। এই প্রশ্নের গভীর তাৎপর্য আছে। ব্যাপারটা খোলসা করার জন্যে বলি, ঘনিষ্ঠতা মানে?

মানে সেক্স-টেক্স?

হত, হত; খুব হত। তাড়াতাড়ি বলি আমি।

লাস্ট কবে হয়েছে?

কুমকুমের দিকে একবার তাকিয়ে নিচু গলায় বলি, এই তো ক’দিন আগেই … ।

আরও পড়ুন:  মিউজিক্যাল চেয়ার

ছোটবাবু মুচকি হেসে বলেন, তখন কিছু নজরে পড়েনি?

কী?

তিল, একটা না দুটো; নতুন একটা তিল তো পুরনো তিলের পাশে হতেই পারে; সেক্ষেত্রে দুটো তিল থাকলে সমস্যা হবে না। কিন্তু সেক্সের সময়ে নজরে পড়ার কথা।

গভীর ভাবনায় পড়ি আমি। মিথ্যে বলতে গিয়ে এতো দেখছি মহা ঝামেলা।

হঠাৎ বুদ্ধি চলে আসে মাথায়। বলি, আসলে ওসব তো অন্ধকারে হয়।

ও, তাহলে তো সমস্যা। ছোটবাবু একটু চিন্তান্বিত গলায় বলেন, ঠিক আছে, আপনি এক কাজ করুন, ওর থুতনির নিচটা দেখুন; একটা তিলের পজিশান নিশ্চয়ই আপনার মনে আছে, দুটোর মধ্যে একটাও যদি সেই পজিশানে থাকে তাহলে নিশ্চিত হওয়া যাবে, এটাই আপনার ওয়াইফ। দুনম্বরটা পরে হয়েছে বলে আমরা ধরে নেব।

ছোটবাবুর বুদ্ধি দেখে আমি অবাক হয়ে যাই। এই হচ্ছে পুলিশ। এইরকম ক্ষুরধার বুদ্ধি না থাকলে ধুরন্ধর সব চোর ডাকাতের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া সহজ কথা নয়।

কুমকুমের মুখের দিকে ভাল করে তাকাই। মুখ নিচু করে বসে আছে; এই অবস্থায় থুতনির খাঁজে হারিয়ে গেছে তিল। ছোটবাবুকে বলি, আলো বড্ড কম।

ছোটবাবু বলেন, আসলে সন্ধ্যে থেকে ভোল্টেজ ড্রপ।

আমি বলি, একটা টর্চ-ফর্চ আনুন না।

ছোটবাবু পকেট থেকে ছোট একটা টর্চ বের করে এগিয়ে দেন আমার দিকে। বলেন, এটাতে হবে?

 

////////

 

মেয়েটার সামনে দাঁড়িয়ে বেশ দ্বিধায় পড়ে যাই। আমার দিকে একবার ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে ফের মুখ নিচু করে নিয়েছে। মুখটা না তুললে তিল দেখা সম্ভব নয়। ওকে আপনি বলব না তুমি বলব ঠিক ভেবে পাচ্ছি না। প্রকৃত কুমকুম হলে “তুমি” বলা উচিত। আবার ভাবি, এ যদি অন্য কেউ হয় তবে “তুমি” বলাটা অভদ্রতা হবে। কিন্তু মুখ না তুললে কিছুতেই সমাধান হবে না ব্যাপারটার। কিছুক্ষণ ভেবে, আমি কায়দা করে বলি, মুখটা একটু ওপর দিকে তুললে ভাল হয়। কি বুঝল কে জানে, আমার দিকে আবার তাকিয়ে ফের মুখ নিচু করে নিল।

আমি একটু অসহায়ভাবে ছোটবাবুর দিকে তাকালাম।

ছোটবাবু বোধহয় বুঝলেন আমার সমস্যা। একটু ধমকের সুরে বললেন, এই যে, মুখটা একটু ওপরের দিকে তোল, তোমার ভালর জন্যেই বলছি।

মুখ একটুও না তুলে ঠিক আগের ভঙ্গিতেই বসে রইল ও।

আমি ফের তাকাই ছোটবাবুর দিকে। দেখি এর মধ্যে বিশ্বাসদা এসে দাঁড়িয়েছে ছোটবাবুর পাশে; ছোটবাবু বিশ্বাসদাকে বুঝিয়ে বলছে সমস্যার কথা।

আরও পড়ুন:  রোগীর ছুটি , রোগের নয়

বিশ্বাসদা ইশারায় আমাকে হাত দিয়ে থুতনি তুলে তিল দেখতে বলে।

আমি সম্মতির জন্যে তাকাই ছোটবাবুর দিকে। ছোটবাবু ঘাড় নেড়ে সম্মতি দেন।

আমার বাঁ হাতের চারটে আঙুল ওর থুতনির নিচে, ডান হাতে টর্চ। কেউ অভিমান করলে যেভাবে মানভঞ্জনের জন্যে প্রিয়জনের থুতনি তুলে ধরে, সেভাবেই ওর থুতনি ধরে তোলার চেষ্টা করি আমি। বুঝতে পারি আঙুল কাঁপছে। আশ্চর্য। খুব বাধ্য মেয়ের মত ধীরে ধীরে মুখ তোলে ও। তিল দেখার আগে, আমার চোখ চলে যায় চোখের দিকে। এসময় ওর চোখে যদি জলের ধারা নামত তবে মানভঞ্জন-দৃশ্যের ষোলকলা পূর্ণ হয়। কিন্তু চোখ দুটোয় জল রাগ মান অভিমান – কিছু নেই। কেবল আছে নির্বাক শূন্যতা – যত কাছ থেকে দেখব তত ভয়ানক বলে মনে হবে।

আমার ডান হাতের টর্চ জ্বলে উঠেছে। আলোর বৃত্ত নিখুঁতভাবে পড়েছে ঠিক জায়গায়।

দুটো তিল পাশাপাশি। সরষের দানার মতো। কুমকুমের একটা ছিল। স্মরণ করার চেষ্টা করি; চেষ্টা করি মেলাবার। বড় ভুলচুক হয়ে যায়। বাঁদিকেরটা সেই তিল বলে মনে হচ্ছিল; হঠাৎ একবার আব গিলল ও; তিলদুটো নড়ে উঠে ঠাঁইনাড়া হল। এখন মনে হচ্ছে ডানদিকেরটা। খুব মনোযোগ দিয়ে দেখি। প্রায় নিশ্চিত হয়ে গেছি ডানদিকেরটা সেই তিল, কোনও ভুল নেই, তখনই আবার হাই তোলে ও। 

 

ফের ঘেঁটে যায় তিলদুটো। এবার মনে হচ্ছে দুটোর কোনওটাই ঠিক জায়গায় নেই; এ তিলদুটো একটাও কুমকুমের নয়।

এতক্ষণ ধরে আমার চেপে রাখা শ্বাস ভস্‌ করে পড়ে যায়।

ছোটবাবু পেছন থেকে বলেন, কী বুঝছেন?

আমি তাকাই ছোটবাবুর দিকে।

ছোটবাবুর পুলিশি চোখ আমার মুখ চোখের হতাশা পড়ে ফেলেন। বলেন, ভাল করে দেখুন, খুব ভাল করে দেখুন, দুটোর মধ্যে একটা মিললেই কাজ মিটে যাবে।

ছোটবাবুর কথায় উৎসাহিত হয়ে আমি আবার তিল খোঁজার কাজে লেগে যাই।

ও মুখ নিচু করে নিয়েছিল। আমি ওর চিবুকে হাত দিই।

হঠাৎ ঝপ করে অন্ধকার নেমে আসে।

ছোটবাবু বিরক্তির সঙ্গে বলেন, এই শালা হয়েছে – লোডশেডিং!

বোধহয় হতাশাতেই আমার হাতে টর্চ নিবে গিয়েছিল।

ফের টর্চ জ্বালি। চিবুক তুলে নিখুঁত নিশানায় আলো ফেলি; একটাকার ঝকঝকে কয়েনের মতো বৃত্ত।

চমকে উঠি আমি। দুটো তিলই আগের জায়গা থেকে সরে গেছে। আতঙ্কে চোখ বন্ধ হয়ে যায় আমার। টর্চ নিবে যায় ফের।

ছোটবাবু বিরক্তির সঙ্গে বলেন, কী হল মশাই; আচ্ছা ক্যালানে লোক তো … ।

আরও পড়ুন:  সাগর আই লাভ ইউ (পর্ব ১১)

ক্যালানে শব্দটা অন্ধকারের মধ্যে বোঁ করে উড়ে এসে আমায় হুল দেয়।

আমার হাতের টর্চ জ্বলে ওঠে। ঘন অন্ধকারের মধ্যে আমি পোকাটাকে খোঁজার চেষ্টা করি। বাইরের অন্ধকার থেকে আঁটকুড়ো, ধ্বজভঙ্গ, ঢ্যামনা সব পোকারা ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে আসে, হুল ফোঁটায় আমাকে। সাদা শুয়োরের মতো থপ থপ করে ছুটে আসে ঝন্টু। লাথি মারে বাবাকে। পেট চেপে বসে পড়ে বাবা। ঝন্টুর বাবা-মা, ভাই বোন সার দিয়ে দাঁড়িয়ে। হাঁ করে মুখগুলো। কি বিশাল হাঁ ওদের। হোসপাইপের জলের মতো ঝাঁকে ঝাঁকে হাঁ গুলো থেকে পোকা উড়ে আসে; সেই প্রচণ্ড তোড়ের সামনে আমার অসহায় মা চোখ বুজে, কানে হাত চাপা দিয়ে বসে পড়ে।

ছোটবাবু চিৎকার করেন, মশাই খেপে গেলেন নাকি! কোথায় টর্চের আলো ফেলছেন। জেনারেটার গেল কোথায় … , বিশ্বাসদা … ।

বলতে বলতে ফের আলো জ্বলে ওঠে ঘরের। আগের চাইতে জোর আলো।

ছোটবাবু খুব অবাক হয়ে দেখছেন আমাকে।

আমি হেসে বলি, ঠিক আছে।

ছোটবাবু বেশ জোরে বলে ওঠেন, মিলেছে?

হ্যাঁ।

যাক বাঁচালেন। ছোটবাবু স্বস্তির একটা শ্বাস ফেলে বলেন, এবার আর বলতে পারবেন না, পুলিশগুলো ক্যালানে। আসুন আমার সঙ্গে, কিছু সই সাবুদ করতে হবে।

                                                            ( দশ)

দৃশ্যটা প্রায় একরকমের। কুমকুমকে নিয়ে যখন প্রথমদিকে শ্বশুরবাড়ি থেকে ফিরতাম এইরকম ছোটখাট একটা ভিড় জমত রিক্সা ঘিরে। কুমকুমের বাবা-মা পাড়া প্রতিবেশী আত্মীয়-স্বজন কয়েকজন। ছোটবাবু একটা রিক্সার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। আমি ওকে নিয়ে বসলাম রিক্সায়। থানার সামনে ছোটবাবু, বিশ্বাসদা, কয়েকজন পুলিশ যাদের হাতে লাঠি বন্দুক নেই, বড়বাবু মেজবাবুর বউ, ছোটবাবুর শালি, পুত্রবধুর নামে অভিযোগ জানাতে আসা একজন বয়স্কা মহিলা। মহিলা একটু আগেই ছোটবাবুর কাছে পুত্রবধূর নামে অত্যাচারের কাহিনি বলছিলেন। উনিই এখন দাঁড়িয়ে রিক্সার পাশে। ফুলে থাকা চোখে এখনও কান্নার রেশ। ডিটো আমার শাশুড়ি মা । এই পরিপূর্ণ আয়োজনের মধ্যে শুধু আমার লুঙিটাই যা বেমানান। লুঙি পড়ে কেউ সাধারণত বউকে শ্বশুর বাড়ি থেকে আনতে যায় না; অন্তত আমি দেখিনি।

রিক্সা ছাড়ার আগে ছোটবাবু রিক্সাওয়ালাকে বললেন, সাবধানে নিয়ে যাবি। আমাকে বললেন, ভাড়া পঁচিশ টাকা কথা হয়েছে; দিয়ে দেবেন, আর লুঙ্গি গেঞ্জিটা পাঠিয়ে দেবেন সময় করে। বিশ্বাসদা বললেন, মিষ্টি বাকি রইল কিন্তু।

সবেতেই ঘাড় নেড়ে সায় দিলাম আমি।

 

চলবে

গত পর্বের লিঙ্ক – http://banglalive.com/bengali-novel-dugdugi-by-ullas-mullick-part-10/

পূর্ববর্তী পর্বের লিঙ্ক – http://banglalive.com/bengali-novel-dugdugi-by-ullas-mullick-part-9/

      

 

 

 

 

    

 

 

 

 

 

 

NO COMMENTS

এমন আরো নিবন্ধ