উল্লাস মল্লিক
জন্ম ১৯৭১ | লেখালিখি শুরু ২০০০ সালে | প্রথম উপন্যাস ‘প্রস্তুতিপর্ব’ | শখ –ক্রিকেট আর শস্য শ্যামল ক্ষেত | সুযোগ পেলেই বেরিয়ে পড়েন গ্রাম বাংলার সবুজের হাতছানিতে |

ফ্যালফ্যাল করে আমাকে দেখছে। একবার একটা বাচ্চা কুকুর পাড়ার বদমাশ ছেলেদের খোঁচা খেয়ে আমাদের উঠোনে ঢুকে পড়েছিল। তার আগেই কুকুরটাকে কেউ ছুড়ে ফেলেছিল পুকুরে। সারা গায়ে জলকাদা। আমি লাঠি নিয়ে তাড়াচ্ছিলাম ওটাকে। তাড়া খেয়ে দরজার দিকে না গিয়ে বারান্দায় উঠে এল। আমি বারান্দায় উঠতেই থাম ঘেঁষে দাঁড়িয়ে কেমন করুন চোখে তাকাল আমার দিকে। থিরথির করে কাঁপছিল কুকুরটা।

কেন কী জানি, আমার মনে পড়ে গেল সেই কুকুরটার কথা। 

তখনকার মত আশ্রয়হীন করে দিইনি কুকুর বাচ্চাটাকে। সবে তখন কিছুদিন বিয়ে হয়েছে আমার। কুমকুম আপত্তি করেছিল খুব। ঘরদোর নোংরা হবে। বেশ ব্যঙ্গের সঙ্গে বলেছিল, তোমার তো খুব দয়ার শরীর দেখছি।।

আমার দয়ার শরীর কিনা জানি না, কিন্তু সময় বিশেষে টুকটাক এমন কিছু কাজ করে ফেলি, সেগুলোকে মহৎ না বললেও সেমি মহৎ বলা যেতে পারে। অন্ধ ভিখিরি, অভুক্ত বাচ্চা, সহায় সম্বলহীন খুনখুনে বুড়ো-বুড়ি, দেখলে মায়া জাগে। দশ বিশ পয়সা, কখনও পাঁচ-দশ টাকা সাহায্যও করে ফেলি তাদের। সবসময় যে পারি তা নয়, কিন্তু যখন পারি, তখন বেশ কিছুক্ষণ ফুরফুরে লাগে মনটা, ভাবি ঘুস টুস নেওয়া ছেড়ে দেব এবার; কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রতিজ্ঞা টেকে না, সুযোগ পেলে উপরি দুপয়সা রোজগার কড়ি। ভাবি, এতে দোষের কিছু নেই, যা বাজার পড়েছে, তাতে আমাদের মতো মানুষের শুধু রোজগারের ভরসায় ভদ্রভাবে বেঁচে থাকা মুশকিল। একবার তো এমন একটা কাজ করতে যাচ্ছিলাম, যেটাকে মহৎ বলা যেতেই পারত। সেমি মহৎ নয়, পুরোপুরি মহৎ। তখন আমার বিয়ে হয়নি। সদ্য চাকরিতে ঢুকেছি। অফিসের পিয়ন তারক অ্যাকসিডেন্টে মারা গেল। তারকের সঙ্গে খাতির ছিল খুব, ফেরার পথে ওর বাড়িতে গেলাম। ওর বউ রাধা উলুটি পালুটি কাঁদছিল। পরে টাকা পয়সার ব্যাপারে রাধা অফিসে এসেছে কয়েকবার। মোটেই সুন্দরী বলা যায়না; অতি সাধারন দেখতে, প্লাস পয়েন্টের মধ্যে বয়েসটা কম। কিন্তু বড্ড শুকনো মুখ করে অফিসের এ ডিপার্টমেন্ট ও ডিপার্টমেন্ট ঘুরত। আমি সাধ্যমতো সাহায্য করতাম। তখনই মাথায় আসে, একে বিয়ে করলে কেমন হয়। বড় অসহায় বউটা। টাকা-পয়সা আদায় হয়ে যাবার দিন, রাধার সঙ্গে বাড়িতে গেলাম।

আরও পড়ুন:  সাগর আই লাভ ইউ (পর্ব ১১)

ফেরার সময় রাধা একটু এগিয়ে এল; আমি কথাটা বলে দিলাম। একটু যেন চমকে উঠল রাধা, মুখ নামিয়ে দাঁড়িয়ে রইল চুপ করে। হঠাৎ দেখলাম ওর শাশুড়ি দেখছে আমাদের। আমার চোখে চোখ পড়তেই চিৎকার করে ডাকল রাধাকে। রাধা তাড়াতাড়ি চলে গেল; আমিও দাঁড়ালাম না। তারপর বেশ কয়েকদিন ভেবেছি; একবার মনে হচ্ছে রাধা রাজি ছিল, আবার মনে হচ্ছে নয়। রাধা আর অফিসে আসেনি কোনওদিন, দু-একবার মনে হয়েছে যাই একবার ওদের বাড়ি; কিন্তু শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠেনি। আমার মতো ছাপোষা চরিত্রের মানুষের বেশিদিন মহৎভাব ধরে রাখা মুশকিল। একে একে অনেকগুলো বাস্তব যুক্তি এসে কখন যেন রাধার মলিন মুখটাকে ঠেলতে ঠেলতে টুক করে স্মৃতির বাইরে ফেলে দিল।

অনেকদিন পর বাসে দেখেছিলাম রাধাকে। তখন আমার বিয়ে হয়ে গেছে, সঙ্গে কুমকুম। চোখে-চোখ পড়তে আমিই সরিয়ে নিলাম। ও খুব দেখছিল কুমকুমকে। সত্যি বলতে কী, একটু অস্বস্তি হচ্ছিল আমার। কিন্তু আমাকে স্বস্তি দিয়ে একটু পরেই বাস থেকে নেমে গেল রাধা।

যাই হোক, রাধাকে বিয়ে করে শেষ পর্যন্ত মহত্ত্ব দেখানো হয়ে ওঠেনি; করতে পারলে একটা গোটাগুটি মহৎ কাজ হত বলে আমার বিশ্বাস। কোথাও কেটেছড়ে গেলে যেমন দাগ থেকে যায় একটা, মহৎ কাজ করলেও একটা গন্ধ পাওয়া যায়। মিষ্টি গন্ধ। গন্ধের উৎসটা টের পাওয়া যায় না, কখনও মনে হয় নিজের শরীর থেকে আসছে, কখনও মনে হয় কাছাকাছি কেউ ভুল করে সুগন্ধি স্প্রে করে দিয়েছে বাতাসে। যত মহৎ কাজ, তত তীব্র গন্ধ, তত বেশিদিন রেশ থাকে গন্ধের।

এত কিছু কুমকুম জানে না। ও শুধু কুকুরকে আশ্রয় দিতে দেখে বলেছিল, তোমার দেখছি দয়ার শরীর।

তবে ইদানিং, কিছু কিছু উলটো ঘটনাও ঘটছিল। একদিন বাসে এক ভিখিরিকে দেব বলে পকেট থেকে খুচরো বের করে দেখলাম, সব দুটাকা পাঁচটাকার কয়েন। উঁকি দিয়ে দেখলাম, ওর বাটিতে সর্বাধিক এক টাকার কয়েন আছে। মনে হল, আমার মতো মানুষের একটা ভিখিরিকে দুটাকা দেওয়া বড্ড বিলাসিতা। এদিকে পয়সা বের করে ফেলেছি পকেট থেকে, খুব আগ্রহভরে ভিখিরি বাটি ধরে অপেক্ষা করছে আমার সামনে; একবার ভাবলাম দুটাকার কয়েনটা দিয়ে ওর বাটিতে থেকে এক টাকা তুলে নিই; কিন্তু ব্যাপারটা কতটা বিসদৃশ হবে ভেবে ইতস্তত করছি, এমন সময়ে দেখি বাদামওলা আসছে; আমি ভাব করলাম যেন ভিক্ষে দেবার জন্যে নয়, বাদাম কিনতেই খুচরো বের করেছি। দুটাকার বাদাম কিনলাম। ইচ্ছে ছিল, অর্ধেকটা খেয়ে বাকিটা দিয়ে দেব ভিখিরিটাকে। কিন্তু হতাশ ভিখিরি অতক্ষণ অপেক্ষা না করে নেমে গেল। আর একদিন কন্যাদায়গ্রস্থ এক পিতা সাহায্য চাইতে মুখের ওপর সপাটে না বলে দিলাম। খুব রুঢ়ভাবেই প্রত্যাখ্যান করেছিলাম। আসলে সেদিন ধর্মতলায় জুয়া খেলতে গিয়ে বেকুবের মতো বেশ কিছু গচ্চা দিয়েছিলাম। কিন্তু সেটা তো ওই ভদ্রলোকের জানার কথা নয়। সত্যি বলতে কী, পরে কিছুটা আত্মগ্লানিও জন্মেছিল আমার। পরদিনই ক্যান্টিনে শুনলাম, একজন বলছে নিঃসন্তান দম্পতিরা নাকি ক্রমশ স্বার্থপর হয়ে ওঠে; নিষ্ঠুরতা জন্ম নেয় তাদের মনে। এজন্যে নিঃসন্তান দম্পতিদের উচিত কুকুর বেড়াল ইত্যাদি কিছু একটা পোষ্য নেওয়া; তাতে না কি মনের সুকুমার বৃত্তিগুলো বজায় থাকে। শুনে কিছুটা আতঙ্কিত হয়ে পড়ি আমি। দিন দিন তাহলে আমিও কি নিষ্ঠুর হয়ে যাচ্ছি? তখন থেকেই কুকুর বেড়াল কিছু একটা পোষার চিন্তা ভাবনা শুরু করি। কিন্তু কুমকুমের জন্তু জানয়ারে ভয়ানক অ্যালার্জি; তাই ভাবনাটা মনেই থেকে যায়।

আরও পড়ুন:  অস্ট্রেলিয়ায় দুর্গাপুজো

আমি জিজ্ঞেস করলাম ওকে, জেগে ছিলে না কি?

কী বুঝল কে জানে, আরও জড়োসড়ো হয়ে বসল। কুকুরটার কথা মনে পড়ল আমার। ছেলেগুলো চলে যেতে কিছুক্ষণ পর বের করে দিয়েছিলাম বাড়ি থেকে। খুব একটা যাবার ইচ্ছে ছিল না ব্যাটার; বোধহয় ধরেই নিয়েছিল ওর পার্মানেন্ট একটা আশ্রয় জুটে গেল।

ওদিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফের নেমে এলাম মেঝেতে। তারপর যতক্ষণ জেগেছিলাম, বুঝতে পারছিলাম ও ঘুমোয়নি; একভাবে বসে আছে বিছানায়।

/////////

রাতে ঘুম হল না ভাল। সকালে উঠে চা বানালাম।

কুমকুমের একটা ভাল শাড়ি সায়া ব্লাউজ ওকে দিলাম। পেয়ে খুব খুশি। শোবার ঘরের দরজা বন্ধ করে পরেও ফেলল। তারপর এসে দাঁড়াল আমার সামনে। ভাবখানা এমন – কেমন দেখাচ্ছে বল। তারপর যখন বুঝল ওকে নিয়ে বাইরে যাব একটু শঙ্কা ভেসে উঠল চোখে। খুব অনিচ্ছার সঙ্গে আমার পেছন পেছন বেড়িয়ে এল বাড়ি থেকে।

বাইরে বেড়িয়ে রিক্সা পেয়ে গেলাম একটা। রিক্সাওলাকে বললাম থানায় চল।

থানা শব্দটা শুনে একটু চমকে গেল ও। শঙ্কায় ছেয়ে গেল চোখ-মুখ। তবুও বাধ্য মেয়ের মত বসল আমার পাশে।

সকালে রাস্তা ফাঁকা। হু হু করে ছুটছে রিক্সা। গঙ্গারামের দোকান অন্যদিনের মতোই জমজমাট। পাশ দিয়ে যাবার সময় অনেকেই দেখল আমাদের। দুদিন আগেই এরা প্রবল ব্যঙ্গ বিদ্রুপ ছুড়েছিল আমার দিকে। আজ নিজেদের মধ্যে চাপা স্বরে আলোচনা শুরু করল।

থানার সামনে পৌঁছে দেখলাম বিশ্বাসদা বারমুডা গেঞ্জি পরে দাঁতন চিবচ্ছে। বলল, কী ব্যাপার?

দেখি বিশুবাবু গেটের কাছে দাঁড়িয়ে। তবে অন্যদিকে মুখ করে আছে, দেখতে পায়নি আমাদের।

আমি বলি, ছোটবাবু আছেন; খুব দরকার।

বিশ্বাসদা বলে, ছোটবাবুকে পাবেন না; এখন মেজবাবু ডিউটিতে।

বলার সময় বিশ্বাসদার মুখ থেকে দাঁতনের ছোট্ট কুঁচো উড়ে এসে আমার কপালে পরে। বিশ্বাসদা বোধহয় খেয়াল করেনি। ও তাড়াতাড়ি আঙুলের ডগা দিয়ে টুকরোটা তুলে নেয়।

আরও পড়ুন:  মিউজিক্যাল চেয়ার

 

চলবে…

গত পর্বের লিংক – http://banglalive.com/bengali-novel-dugdugi-by-ullas-mullick-part-14/

১৩ পর্বের লিংক –  http://banglalive.com/bengali-novel-dugdugi-by-ullas-mullick-part-13/

১২ পর্বের লিংক – http://banglalive.com/bengali-novel-dugdugi-by-ullas-mullick-part-12/

১১ পর্বের লিঙ্ক – http://banglalive.com/bengali-novel-dugdugi-by-ullas-mullick-part-11/

 

NO COMMENTS

এমন আরো নিবন্ধ