উল্লাস মল্লিক
জন্ম ১৯৭১ | লেখালিখি শুরু ২০০০ সালে | প্রথম উপন্যাস ‘প্রস্তুতিপর্ব’ | শখ –ক্রিকেট আর শস্য শ্যামল ক্ষেত | সুযোগ পেলেই বেরিয়ে পড়েন গ্রাম বাংলার সবুজের হাতছানিতে |

ঘরে ঢুকে দেখি মেজবাবু নয়, ছোটবাবুই আছেন। বিশ্বাসদা যে কী ভুলভাল বলে। যাক গে, ছোটবাবুকে পেলেই বরং আমার সুবিধে।

ছোটবাবু কিছু লিখছিলেন। মুখ তুলে তাকালেন। আমি বললাম, একটা ঝামেলা স্যার … ।

ছোটবাবু তাকিয়েই থাকেন।

আমি পিছন ফিরে তাকাই। ঘরের বাইরে মাথা হেঁট করে দাঁড়িয়ে ও পায়ের নখ দিয়ে মাটি খুঁটছে। খুব চেনা লাগছে ছবিটা। কোথায় দেখেছি … কোথায় দেখেছি … ।

হঠাৎ দেখি বিশুবাবু চলে গেলেন দরজার সামনে দিয়ে, সঙ্গে বিশুবাবু বউ।

ছোটবাবু গম্ভীর গলায় বলেন, বুঝেছি।

একটু চমকে উঠি আমি। বলি, কী বুঝেছেন?

আপনাদের প্রবলেম।

কী করে বুঝলেন?

আরে মশাই, এ লাইনে একুশ বছর হয়ে গেল … ।

ছোটবাবু হাতছানি দিয়ে আমাকে ঝুঁকতে বলেন। বাধ্য ছেলের মত আমি মুখ নামিয়ে আনি। ছোটবাবু ফিসফিস করে বলেন, অ্যাডজাস্টমেন্টে প্রবলেম হচ্ছে তো … মনে হচ্ছে এ যেন আমার বউ নয়, অন্য কেউ …?

আমি অবাক হয়ে বলি, হ্যাঁ তো।

ছোটবাবু বলেন, এরকম কিছুদিন হবে; তারপর দেখবেন সব ঠিক হয়ে গেছে … রোজ ভাল করে বাজার করুন, প্যাকাল আর শোলমাছ পেলেই কিনে নেবেন।

আমি বলি, কিনব স্যার।

ছোটবাবু বলেন, এটা কেন হয় জানেন, ও যে কদিন বাইরে ছিল, সেই কদিনের ইতিহাস আপনি জানতে চাইছেন … ও যাই বলুক, আপনার মনে হবে সত্যি বলছে না … ।

আমি ঘাড় নেড়ে সায় দিই।

ছোটবাবু বলেন, একে বলে মেল-ইগো; ওসব ঝেড়ে ফেলে একটু উদার হন, উদারতা খুব কমে যাচ্ছে সোসাইটি থেকে, চ্যাঙ ল্যাঠা শোলমাছের মতো, ওই জন্যেই বলছিলাম, পেলেই কিনবেন …।

আমি ফের পিছনে তাকাই। ও একই ভঙ্গিতে মাটি খুঁটছে। এবার মনে পড়ে যায় আমার। তারকের বউ রাধা। সেদিন এভাবেই মাথা নিচু করে পায়ের নখ ঘষছিল মাটিতে।

ছোটবাবু বলেন, যদি পাঁচটা মস্তান এসে বন্দুক দেখিয়ে আপনার বউকে রেপ করত; কিছু করতে পারতেন আপনি …?

আমি চুপ করে থাকি। ছোটবাবুর মুখে ঘেন্না ফুটে ওঠে। বলেন, দশ বছর পুলিশে আছি, অনেক তো দেখলাম।

একটু আগে ছোটবাবু বললেন, একুশ বছর, এখন বলছেন, দশ। কোনটা ঠিক ভাবতে থাকি আমি।

ছোটবাবু বলেন, চুপ কেন, বলুন, পারবেন কিছু করতে … ?

আমি ভাবতে থাকি, দশ না একুশ কোনটা ঠিক। ভাবতে ভাবতেই একটা গন্ধ পাই। চেনা গন্ধ। মিষ্টি গন্ধ। হেসে বলি, দুর মশাই, ওসব কিছু নয়, সেদিন কথা দিয়েছিলাম, মিষ্টি খাওয়াব, তাই এলাম … ।

আরও পড়ুন:  সাগর আই লাভ ইউ (পর্ব ১৫)

ছোটবাবু ভুরু কুঁচকে বললেন, তার মানে?

মানে স্যার আমি খুশি হয়েছি, তাই …।

ছোটবাবু গলাটা গম্ভীর করে বললেন, তাই, মিষ্টি খাওয়াতে চাইছেন! হোয়াট ডু ইউ মিন বাই “মিষ্টি খাওয়ানো” …?

আমি বলি, স্যার তেমন বেশি কিছু পারব না …।

হোয়াট! বিকট ধমক দিয়ে ছোটবাবু বললেন, ঘুষ দিতে এসেছেন … আপনারা কি ভাবেন পুলিশকে … টাকা ছাড়া আমারা কাজ করি না …

আমি মৃদু গলায় বলি, স্যার আপনি ভুল করছেন, পান খাওয়ানো মানে ঘুষ দেওয়া, মিষ্টি খাওয়ানো মানে খারাপ কিছু নয়, শুধুই মিষ্টি।

ছোটবাবু উঠে দাঁড়িয়ে প্রচণ্ড চাপড় মারলেন টেবিলে, শাট আপ …।

প্রচণ্ড চমকে উঠলাম আমি। ঘাম হচ্ছে কুলকুল করে। চোখ মেলে দেখি সকাল হয়ে গেছে। জানালার ফাঁক-ফোকর দিয়ে সরু সরু রোদ ঢুকেছে ঘরে। কেউ একটানা ডোর বেল বাজাচ্ছে বাইরে … ।

(পনেরো)

ত্রিপর্ণাকে এমন পোশাক পরতে কোনওদিন দেখিনি। ছাই রঙের একটা চুড়িদার পরেছে; বেশ আঁটোসাঁটো হয়ে সেঁটে আছে শরীরে। এতটাই টাইট যে, ওর শরীরের মাপজোপগুলো, এক ঝলক তাকালেই, অক্লেশে পড়ে নেওয়া যেতে পারে। দরজা খুলে ছাই রঙা চুড়িদার পরিহিত ত্রিপর্ণাকে দেখে আমার প্রথমেই মনে হল, এ যেন ছাই চাপা আগুন।

একটু বিরক্তির সঙ্গে বলল, কী করছিলে, কতক্ষণ ধরে বেল বাজাচ্ছি …?

আমি একটা হাই তুলে বলি, ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।

বাবাঃ, এত বেলা পর্যন্ত ঘুম। বলে আমার পাশ দিয়ে ত্রিপর্ণা ভেতরে ঢোকে।

আমি বলি, আসলে রাতে ভাল ঘুম হয়নি …।

ঘরের সামনে এসে থমকে দাড়ায় ত্রিপর্ণা। ওর-ও ঘুম ভেঙে গেছে, জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে খাটে। ত্রিপর্ণা ভুরু কুঁচকে খুব বুঝদারের মতো বলে, হুঁ।

ত্রিপর্ণা কী বুঝেছে সেটা বুঝতে পারিনা। তবে নিশ্চয়ই কিছু বুঝেছে; কিন্তু সেটা আমার পক্ষে অনুমান করা কঠিন, কারন বরাবরই দেখেছি ওর যুক্তিবুদ্ধি বড় বিচিত্র পথে গমন করে।

তুমি কোথায় শুয়েছিলে? ভুরু কুচকেই জিজ্ঞেস করে ত্রিপর্ণা।

এই তো, এখানে। বলে মেঝের বিছানাটা আঙুল দিয়ে দেখাই।

সারা রাত? একটু শ্লেষ ত্রিপর্ণার গলায়।

হ্যাঁ! কেন?

একবারও ওঠোনি?

কোথায়?

বিছানা ছেড়ে?

এবার ত্রিপর্ণার প্রশ্নের ভাঁজ কিছুটা খুলে যায় আমার সামনে। বুঝতে পারি, কোনদিকে ইঙ্গিত করছে ও। বলি, না না, সেই শুয়েছি, আর এই উঠলাম, এক ঘুমে রাত কাবার।

তবে যে বললে রাতে ভাল ঘুম হয়নি। 

বুঝতে পারি, ভুল হয়ে গেছে মোক্ষম। আসলে ত্রিপর্ণার মতো গোয়েন্দার সঙ্গে এঁটে ওঠা যার তার কম্ম নয়। তবু জোড়াতাপ্পি দেবার চেষ্টায় বলি, আসলে ঘুমটা ঠিক সলিড হয়নি। ঘুমিয়েছি, কিন্তু ঠিক সলিড না…।

আরও পড়ুন:  পথচলতি

স্বাভাবিক। এবারও শ্লেষ ত্রিপর্ণার গলায়, এক ঘরে মাত্র দু’হাত দুরে এক যুবতী মেয়ে থাকলে ঘুম সলিড হবার কথা নয়, তবু তুমি যে ফাঁপা ফাঁপা ঘুমিয়েছ এজন্যে তোমাকে মহাপুরুষের ক্যাটাগরিতে ফেলা উচিত।

এ কথার কী আর জবাব দেব। এখন যাই বলি ত্রিপর্ণা ফের তার বাঁকা অর্থ করে প্যাঁচে ফেলবে আমায়। তাই বোবা-কালার শত্রু নেই – থিয়োরিতে চুপ করে থাকি।

কিন্তু ত্রিপর্ণার ডিকশনারিতে অজাতশত্রু শব্দটাই নেই। ত্রিপর্ণা যেন সেই নেকড়ে আর আমি অসহায় মেষশাবক। নেকড়ে বলছে, আজ আমার খাবার জল ঘোলা করিসনি তো কি হয়েছে, এক বছর আগে করেছিলি; ও তোর বয়েস মাত্র ছমাস; তাতে কী, ওটা তোর বাবা ছিল নিশ্চয়ই … মোদ্দা কথা আমার খিদে পেয়েছে, তোকে এখন খাব …। ত্রিপর্ণারও এখন ঝগড়া পেয়েছে, তাই আমার বোবা কালা কানা ল্যাংড়া ঠুঁটো কিছু হবার রাইট নেই।

ত্রিপর্ণা বাঁকা হেসে বলে, যাক তাহলে সিদ্ধপুরুষ যখন তুমি, দীক্ষা-টিক্ষা দিও; নাকি আমার মতো পাপীদের স্থান নেই তোমার চরনে …।

আমি মৃদু গলায় বলি, বিশ্বাস কর … ।

ত্রিপর্ণা বলে, সে তো বটেই, অবিশ্বাস করলে কি আর ডায়মন্ডহারবার যাই তোমার সঙ্গে … বিশ্বাস করেই তো গিয়েছিলাম … ।

বুঝতে পারি, ত্রিপর্ণা সব চাইতে বিষাক্ত সাপের ঝাঁপিটা খুলছে। তাড়াতাড়ি বলি, ও প্রসঙ্গ এখন থাক না … ।

কেন লজ্জা পাচ্ছ, না ভয়?

না না, তা নয় …।

পেতেই পার,  নতুন বউ যদি জানতে পারে আমার সঙ্গে রাত কাটিয়েছ, তা হলে তো … ।

কে নতুন বউ! আমি ধমকে উঠি, কী বাজে কথা বলছ …?

ত্রিপর্ণার হাত ধরে পাশের ঘরে টেনে আনি। উত্তেজনায় যেন হাঁপাচ্ছে ও। বলি, তোমার কী মাথা খারাপ হয়ে গেল …।

আমার মতো অবস্থায় পড়লে তোমারও হত। বেশ জোরে বলে ওঠে ত্রিপর্ণা।

আমি দরজাটা বন্ধ করে দিই তাড়াতাড়ি। বলি, আস্তে, আস্তে … কী হয়েছে বলবে তো …!

বাবার শরীর ভীষণ খারাপ, আজ আছে কাল নেই … ছোটদা দিন দিন মাতলামি বাড়াচ্ছে, রোজ অশান্তি বাড়িতে। ফুঁপিয়ে ওঠে ত্রিপর্ণা।

এসব নতুন কিছু নয়, ত্রিপর্ণার পুরনো সমস্যা। বহুবার শুনেছি। তবুও বলে বলে ভোঁতা হয়ে যাওয়া সান্ত্বনা বাক্য ফের বলি, একটু ধৈর্য ধর, সব ঠিক হয়ে যাবে …।

আরও পড়ুন:  রাতের শেষ লোকাল

ত্রিপর্ণা বলে, ধৈর্য ধরে ধরে তো পা ব্যাথা হয়ে গেল …।

এখন মনে হচ্ছে বরানগরের ছেলেটাকে না করে খুব ভুল করেছি। তোমাকে বিশ্বাস করে এভাবে ঠকতে হবে জানলে, তখন অন্য রকম চিন্তাভাবনা করতাম …।

কিছুদিন আগে বরানগরে একটা বিয়ের যোগাযোগ হয় ত্রিপর্ণার। কথাবার্তা কিছু এগিয়েও ভেস্তে যায়, কারণ ছেলেটা ভাল নয়। খবর আসে, ছেলেটা মস্তান টাইপ, জেলেও গেছে একবার। এ ব্যাপারে আমার কোন ভুমিকা ছিল না। তাই খুব অবাক হয়ে বলি, কিন্তু আমি তো কিছু বলিনি তোমায় …।

ত্রিপর্ণা বলে, হ্যাঁ, বলেছ।

কী বলেছি?

তুমি তো বললে, জানা যাচ্ছে যখন ছেলেটা মস্তান টাইপ তখন না এগোনই ভাল …।

এটা অবশ্য সত্যি। বলেছিলাম বটে কথাটা। আসলে অন্য কারনে তখন বলেছিলাম। ক্ষীণ একটা আশা মনের মধ্যে ছিল, বিয়ের পরও ত্রিপর্ণা গোপন যোগাযোগ রাখবে। কিন্তু জেলখাটা মস্তান স্বামী হলে সেটা আমার পক্ষে বিপজ্জনক হতে পারে, ভেবেই মৃদু একটা আপত্তি জানিয়েছিলাম। কিন্তু ঘটনা হল, আমি না বললেও ত্রিপর্ণার বাবা-মায়ের মত ছিল না, ওর ছোটদা কেবল দায় ঝেড়ে ফেলার জন্যে উঠেপড়ে লেগেছিল।

আমি বলি, ক্রিমিনালের বউ হলে কি ভাল হত তোমার …?

খারাপ আর কী হত। ত্রিপর্ণা নাক টেনে বলে, অন্তত সারাজীবন তোমার রক্ষিতা হয়ে থাকতে হত না … ।

ত্রিপর্ণার জিভে যেন আজ সরস্বতী ভর করেছে। ওর সঙ্গে কথায় এঁটে ওঠা মুশকিল।

আমি খুব ক্ষীণ গলায় বলি, ছিঃ ছিঃ, তুমি এ কী বলছ।

ত্রিপর্ণা ফুঁপিয়ে ওঠে, তারপর নাগেরবাজারেরটাও তো না করে দিলাম তোমার মুখ চেয়ে।

এ কথাটাও আপাদমস্তক মিথ্যে। নাগেরবাজারের পাত্রপক্ষের যা দাবি ছিল, দেবার সঙ্গতি ছিল না ওদের। আমি বলি, ওদের তো প্রচুর ডিম্যান্ড ছিল … ।

চোখ মুছতে মুছতে ত্রিপর্ণা বলে, সে না হয় বাবা বাড়ি বিক্রি করে দিত; কিন্তু তুমি তো বললে নিজেকে এভাবে চিপ কোর না ত্রিপর্ণা; বলনি, বল …?

হয় তো বলেছিলাম। আমার মাথাতেও তো বিস্তর দুর্বুদ্ধির ঘাঁটি; কোনটা যে কখন ধান্দাবাজি করেছে মনে পড়ছে না এখন। ত্রিপর্ণার মাথায় হাত দিয়ে বলি, তোমাকে ভালবাসি বলেই তো বলেছিলাম … ।

 

চলবে…

গত পর্বের লিংক – http://banglalive.com/bengali-novel-dugdugi-by-ullas-mullick-part-15/

১৪ পর্বের লিংক –   http://banglalive.com/bengali-novel-dugdugi-by-ullas-mullick-part-14/

১৩ পর্বের লিংক –  http://banglalive.com/bengali-novel-dugdugi-by-ullas-mullick-part-13/

১২ পর্বের লিংক – http://banglalive.com/bengali-novel-dugdugi-by-ullas-mullick-part-12/

১১ পর্বের লিঙ্ক – http://banglalive.com/bengali-novel-dugdugi-by-ullas-mullick-part-11/

NO COMMENTS