হ্যাঁ | কানাইদা বেশ উত্তেজিত ভাবে বলে, আচ্ছা, তোর কোনও জামা-টামা রিপু করছিল?
আমি অবাক হয়ে বলি, জামা রিপু, কই না তো!
বড় একটা শ্বাস ফেলে কানাইদা বলে, আমার একটা দামি জামা বাসের খোঁচায় ছিঁড়ে গিয়েছিল; আসার সময় দেখেছিলাম বউ রিপু করছে সেটা | রিপুটা শেষ করেনি, আধখ্যাঁচড়া করেই পালিয়েছিল প্রকাশের সঙ্গে |
প্রকাশ কে?
কে আবার, ওর পিরিতের নাগর |
বুঝলাম বোকার মতো প্রশ্নটা হয়ে গেছে; বোঝা উচিত ছিল প্রকাশ কে | প্রসঙ্গ বদল করার জন্য তাড়াতাড়ি বলি, না আমার জামা-টামা রিপু করেনি কিছু; অনেকদিন আগে একটা প্যান্ট রিপু করেছিল, কিন্তু…
কিন্তু কী? মাঝপথেই বলে ওঠে কানাইদা |
কিন্তু, খুব বাজে করেছিল | রংটা পর্যন্ত ভালো করে মেলাতে পারেনি ; দেখে মনে হতো প্যান্টের ওই জায়গাটায় পাখিতে পায়খানা করে দিয়েছে | কিন্তু সে বহুদিন আগে, আমাদের বিয়ের বছরখানেকের মধ্যে হবে | খুব পছন্দের প্যান্ট ছিল ওটা, কিন্তু তখন আমি রসে এমন মশগুল যে তেমন কিছু শোক করিনি |
এখন হচ্ছে?
কী?
শোক?
নাহ | আমি বলি, এতদিন পরে আর শোক থাকে!
আরে প্যান্টের জন্যে নয়; বউয়ের জন্যে!
আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে যায়, এই রে!
‘এই রে’ –র কী আছে! প্রথম প্রথম একটু হবে; তারপর দেখবি ফুস…| মনেই পড়বে না বউয়ের কথা | তোদের মধ্যে সেক্স টেক্স হতো?
একটু চুপ করে থাকি আমি | তারপর বলি, খুব রেয়ার |
তবু ধর, কতদিন ছাড়া?
এই রে; সে কী আর হিসেব রেখেছি!
তবু একটা আন্দাজ তো আছে…|
মনে মনে একটু হিসেব কষে বলি, তা ধর একমাস ছাড়া, মাঝে মধ্যে তারও বেশি…|
কানাইদা খুব কৌতূহলী গলায় বলে, কে ইনিসিয়েটিভ নিত?
মানে!
মানে; বাইটা কার আগে চাগত?
একটু চুপ করে থেকে বলি, আমারই |
ও কি এনজয় করত?
প্রশ্নটা একটু সমস্যায় ফেলে দেয় আমাকে | বলি, এই রে, সেটা তো ঠিক বলতে পারব না!
একটু গম্ভীর গলায় কানাইদা বলল, মনে হয় করত না; বিদেশ হলে তুই কিন্তু রেপ কেসে ফেঁসে যেতিস |
এবার আমি একটু মৃদু প্রতিবাদ করি, নিজের বউয়ের সঙ্গে রেপ কেসে ফাঁসব কেন? ও তো আমার বিয়ে করা বউ |
একটু যেন শ্বাস ফেলে কানাইদা বলে, সে তুমি-আমি বুঝলেও সরকার বুঝবে না | দুনিয়ার যত আইন সব মাগিদের ফরে….পুরুষদের পাশে কেউ নেই |
হঠাৎ আমার মনে পড়ে যায় | বলি, দু একবার কিন্তু ওরও বাই চেগেছিল আগে |
কী রকম?
আমি খুব টায়ার্ড ছিলাম একদিন – শুয়েই ঘুমিয়ে পড়েছি, হঠাৎ ধাক্কা দিয়ে জাগালো আমায় | বলল, ভীষণ নাকি ভয় করছে ওর | আমার কাছে ঘেঁষে শুল | তারপর বলল, শীত করছে, জড়িয়ে ধর | সেদিন একটু ঠাণ্ডা ভাব ছিল ঠিকই; কিন্তু সেটা ঠিক শীতে কুঁকড়ে যাবার মতো নয় | ভাবলাম, জ্বর-টর হয়েছে; গায়ে হাত দিয়ে দেখি, সেসব কিছু নয় | তারপর বুঝতে পারলাম, ও চাইছে | হালকা শীতের আমেজ ছিল সেদিন; তারপর একটু ঘুমিয়ে ক্লান্তিটাও কেটে গেছে; দেখলাম, আমারও মন চাইছে | তবে শুরুটা কিন্তু কুমকুমই করেছিল |

আরও পড়ুন:  আলোঝাপসা

টানা বলে থামলাম আমি | কানাইদা বোধহয় দম বন্ধ করে শুনছিল | একটা শ্বাস ফেলার শব্দ পেলাম ফোনে | বলল, তোদের তো বাচ্চা-কাচ্চা নেই, তাই না?
নাহ |
প্রবলেমটা কার?
কী জানি |
ডাক্তার দেখিয়েছিলি?
বললাম, হ্যাঁ |
কী বলে ডাক্তার?
বলে, কারও কোনও প্রবলেম নেই |
তাহলে হচ্ছে না কেন?
সেটাই তো ব্যাপার |
হুম | বলে চুপ করে থাকে কানাইদা |

আমার বুক একটু ঢিপ ঢিপ করে ওঠে | বলার সময় কি গলাটা কেঁপে গেল? কানাইদা কি সন্দেহ করছে কিছু? অবশ্য গলা কাঁপার কথা নয় | কানাইদাকে যা বললাম, সেই একই কথা আমি আগে অন্তত পঞ্চাশজনকে বলেছি | এদের প্রত্যেকেই জানতে চায়, প্রবলেমটা কার? আমি যথেষ্ট জোরের সঙ্গে অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্যভাবে বলি, কারও নয় | ডাক্তার বলেছে, এরকম হয়, চেষ্টা চালিয়ে গেলে একদিন ঠিক সন্তানের মুখ দেখব | পনেরো-কুড়ি বছর পর সন্তান হয়েছে, এমন ঘটনাও নাকি আছে | আমি নিশ্চিত পঞ্চাশজনের মধ্যে অন্তত সাতচল্লিশ জন চোখ বুজে বিশ্বাস করেছে আমায় | তারা অন্য ডাক্তারের সন্ধান দিয়েছে; কেউ বা গুণিন বা ওঝার কাছে যেতে বলেছে; মোটের ওপর ধৈর্য হারাতে নিষেধ করেছে | বাকি তিনজন জাত সন্দেহবাতিকগ্রস্ত, এরা পৃথিবীর কোনও কিছুই সহজে বিশ্বাস করে না, এবং সবাইকে সন্দেহ করাটা মস্ত বাহাদুরি মনে করে |

কানাইদা নীরবতা ভাঙল – কতদিন যেন বিয়ে হয়েছে তোদের?
একটু কমিয়ে বললাম, প্রায় আট বছর |
তাহলে অবশ্য সময় আছে |
যাক, কানাইদা বিশ্বাস করেছে; একটু স্বস্তি বোধ করি আমি | বলি, সে তো বটেই | কিন্তু, ও যদি পালিয়ে যায়, তাহলে তো সব গেল….|

কানাইদা বলল, আবার ‘যদি’ বলছিস কেন? বউ তোর পালিয়েছে |
বলছ?
হ্যাঁ, বলছি | কানাইদা জোর দিয়ে বলে |

কানাইদার গলায় এত বেশি প্রত্যয় যে আমি পুরোপুরি মেনে নিলাম কুমকুম পালিয়েছে | মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল, যাঃ, কী হবে তাহলে?

আরও পড়ুন:  আলোঝাপসা

কানাইদা বলে, কী আবার হবে; তোর ষোল আনা লাভ হবে!

কানাইদার কথা বেশ গোলমেলে লাগে | বলি, কী বলছ, মাথায় কিছু ঢুকছে না!

কানাইদা বলে, শোন, সংস্কৃতে একটা শ্লোক আছে, যার মানে, ভাগ্যবানের বউ মরে | আমার মনে হয়, যাদের পালায়, তারা ডবল ভাগ্যবান |

এবার আমি বুদ্ধি করে বলি, তুমি কি নিজেকে ভাগ্যবান মনে কর?
আলবাত করি, একশবার করি | এবারও কানাইদার গলায় বেশ প্রত্যয় |

আমি কথা খুঁজে পাই না | বলে কী লোকটা! বউয়ের জন্য কোনও দুঃখ নেই!

কানাইদা গলা একটু নামিয়ে বলে, শিখা আমায় খুবই সুখে রেখেছে |

শিখাটা আবার কে? অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করি |

আছে একজন | কানাইদা গলা খাদে রেখেই বলে, যে তোর ফোন ধরেছিল |

আমি আর কৌতূহল দমন করতে পারি না | বলি, তুমি ফের বিয়ে-টিয়ে করেছ না কি?

বিয়ে | – বলে চুপ করে যায় কানাইদা | তারপর একটু দার্শনিকের মতো বলে, বলতেও পারিস, আবার নাও পারিস |

গোলমেলে ধাঁধামার্কা উক্তি আমি কোনদিনই ভালো বুঝতে পারি না | এটারও মর্মোদ্ধার করতে পারলাম না | শুধু বুঝলাম, বিয়ে এবং না-বিয়ের একটা ত্রিশঙ্কু অবস্থায় কানাইদা খারাপ নেই |

কেন জানি না তখনই চোখের সামনে ভুস করে ত্রিপর্ণার চেহারাটা ভেসে উঠল | সত্যিই তারিফ করবার মতো ফিগার একটা | ও কি রাজি হবে, এই বিয়ে এবং না-বিয়ের মধ্যে রহস্যময় ঝুলে থাকতে? মনে হয় হবে না | তবে হলে খুব ভালো হতো |

আমাকে চুপ দেখে কানাইদা বলে, ছেলেটার জন্যই যা একটু সমস্যা, না হলে অনেস্টলি বলছি আমার কোনও দুঃখ নেই | তোর ছেলেও নেই, প্লাস বউ পালিয়েছে, তুই শালা ট্রিপল ভাগ্যবান |

বলছ? বেশ দ্বিধার সঙ্গে জিজ্ঞেস করলাম |
আলবাত |

কানাইদা এত জোর দিয়ে বলে যে বিশ্বাস না করে উপায় থাকে না | বলি, তাহলে খোঁজাখুঁজির ঝামেলায় যাব না বলছ?
কোনও দরকার নেই | কানাইদা বলে, শুধু থানায় একটু ইনফর্ম করে দে |
থানা! আমি আঁতকে উঠি |
হ্যাঁ; নিজে সেফ-সাইডে থাকার জন্য থানায় জানানো দরকার |
কিন্তু আমি তো কোনদিন আগে থানায় যাই নি |
তোর কি আগে কোনদিন বউ হারিয়েছে?

আরও পড়ুন:  আলোঝাপসা

কানাইদার অব্যর্থ যুক্তি আমায় চুপ করিয়ে দিল | বললাম, কিন্তু গিয়ে কী বলব?
কী আবার বলবি! কানাইদা খেঁকিয়ে ওঠে, যা সত্যি তাই বলবি |

ফোনটা ধরে চুপ করে থাকি |

কানাইদা বলে, ছাড়ছি এখন; শিখা ভাত দিয়েছে | তুই তো মনে হচ্ছে অফিস যাবি না আজ |
না; তুমি তো থানায় যেতে বলছ |
হ্যাঁ, হ্যাঁ; তাই যা |

গলায় একটু আকুতি এনে বলি, কানাইদা একটা রিকোয়েস্ট তোমার কাছে…|
জানি | কানাইদা বলে, কাউকে কিছু বলব না; তাই তো?

আমি তাড়াতাড়ি বলে উঠি, হ্যাঁ, হ্যাঁ, তাই!

সামান্য একটু হেসে কানাইদা বলে, ঠিক আছে, বলছিস যখন – বলব না | কিন্তু মনে রাখবি, তোর লজ্জার কিছু নেই | বরং দেখবি, এমন অনেক কাজ আছে, যেগুলো আগে করতে ‘কিন্তু’ হতো, সেগুলো করতে একটা নৈতিক জোর পাচ্ছিস | অফিসে আয়, তোকে অনেক টিপস দেব | ও.কে.!

আমি বলি, তবুও প্লিজ তুমি কাউকে কিছু বোল না |

ততক্ষণে ফোন ছেড়ে দিয়েছে কানাইদা | শেষ কথাগুলো শুনেছে কি না বুঝতে পারলাম না |

 

চলবে….

২য় পর্বের লিংক – http://banglalive.com/bengali-novel-dugdugi-by-ullas-mullick-part-2/

১ম পর্বের লিংক – http://banglalive.com/bengali-novel-dugdugi-by-ullas-mullick/

উল্লাস মল্লিক
জন্ম ১৯৭১ | লেখালিখি শুরু ২০০০ সালে | প্রথম উপন্যাস ‘প্রস্তুতিপর্ব’ | শখ –ক্রিকেট আর শস্য শ্যামল ক্ষেত | সুযোগ পেলেই বেরিয়ে পড়েন গ্রাম বাংলার সবুজের হাতছানিতে |

1 COMMENT

  1. তিনটে পর্বই পড়লাম । পরবর্তী পর্বের জন্য অপেক্ষা করে থাকবো । আপনার লেখা নিয়ে তো আর নতুন করে কিছু বলার নেই । 😀

এমন আরো নিবন্ধ