ছোটবেলায় স্বপ্ন ছিল পুলিশ হব | কয়েকজনের সঙ্গে আমার কিছু হিসেব বকেয়া আছে, পুলিশ হয়ে সেগুলোর শোধবোধ হবে |

এক নম্বর হচ্ছে বিদ্যাবিনোদ ফ্রি প্রাইমারির হেডস্যার রাখাল হালদার | একবার উনিশের নামতা পারিনি বলে, ছুটির পর এক ঘন্টা আটকে রাখলেন | সেদিন আবার সিদ্ধেশ্বরীতলায় মেলা; পাড়ার সবাই চলে গেল আমায় ফেলে | পরদিন বন্ধুরা যখন মেলার ভেঁপু বাজাচ্ছে, মুখোশ পরে ঘুরছে আমি মনে মনে শপথ নিলাম বড় হয়ে থানার বড়বাবু হব | আমার নির্দেশে দুজন পুলিশ হেডস্যারকে বেত দিয়ে মারবে – আমি সামনে যাব না, কিন্তু আড়াল থেকে দেখব আর মনে মনে হাততালি দেব |

দু নম্বর বড় মেসো | বড় মাসি চিররুগ্ন; শীর্ণ দুর্বল শরীর; ভাসা ভাসা চোখ | আমাকে ভালোবাসত খুব, মাসির বাড়ি গেলেই চার-আনা আট-আনা যা হোক দিত | একদিন হঠাত্ দেখি চিলেকোঠায় বড় মেসো ছোটমাসিকে জড়িয়ে ধরে চুমু খাচ্ছে | ছোটমাসির তখনও বিয়ে হয়নি | ওদের দেখেই আমি প্রচণ্ড জোরে দৌড়ে পালাতে গিয়ে সিঁড়িতে আছাড় খেয়েছিলাম | বাঁ পায়ের পাতা ফুলে গিয়েছিল | বড়মাসি চুন-হলুদ লাগিয়ে দিত রাতে | আহত পা নিয়েই শপথ নিয়েছিলাম পুলিশ হব | আমার নির্দেশে বড় মেসো মাসির চানের জল তুলে দেবে; পা টিপে দেবে |

তিন নম্বর পাশের বাড়ির ঝন্টু | মা ঝন্টুকে ছেলের মতো ভালোবাসত; পিঠে-পায়েস বা মালপোয়া করলে আগে ঝন্টুকে দিত | ঝন্টুদের শরিকি বিবাদে ওরাই বাবাকে ডাকল মীমাংসার জন্য | বিচার পছন্দ হলো না ঝন্টুর; ছুটে এসে মারল বাবাকে, মাকে বেশ্যা-খানকি এইসব বলে গালাগালি দিল | মা তিনদিন খায়নি; কেঁদেছিল অঝোরে | পরে মা যখনই পিঠে-পায়েস বা মালপোয়া করত কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে যেত | এখনও আমি মাঝে মাঝে সেই দিনটা স্বপ্নে দেখি – ঝন্টু ছুটে এসে মারল বাবাকে, বাবা পেট চেপে বসে পড়ল যন্ত্রনায়, গলার শির ফুলিয়ে গালাগাল দিচ্ছে ঝন্টু, কানে আঙুল চাপা দিয়ে স্থির চোখে তাকিয়ে আছে আমার মা | আমার ঘুম ভেঙে যায়, ঘাম হয় কুলকুল করে, বুকের মধ্যে মনে হয় একটা গনগনে ফার্নেস জ্বলছে |

ঝন্টুর জন্যে একটাই শাস্তি বরাদ্দ করে রেখেছিলাম | স্ট্রেট গুলি | খাকি ইউনিফর্ম পড়ে কোমরে রিভলবার ঝুলিয়ে ঝন্টুর বাড়ি গিয়ে দরজা নক করব; ঝন্টু দরজা খুলে বেরিয়ে এলেই গুলি – পরপর তিনটে; ঝন্টু বুক চেপে লুটিয়ে পড়বে – ওর মুখে একদলা থুতু ছিটিয়ে গটগট করে ফিরে এসে জিপে উঠব |

এরা তিনজন ছিল মেন টার্গেট | তাছাড়া, ক্লাসের মনিটর প্রদীপকে ওঠবস করানো, পাড়ার দোকানদার লক্ষ্মীদা, যে দশটা হাতিঘোড়া বিস্কুট কিনলেও ফাউ দিত না – সেই লক্ষ্মীদার দোকানের বয়াম খুলে একমুঠো বিস্কুট তুলে নেওয়া – এইরকম ছোটখাট আরও কিছু মনোবাঞ্ছা ছিল আমার |

আরও পড়ুন:  আলোঝাপসা

কিন্তু বয়েস বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেইসব ইচ্ছে হাওয়া হয়ে উবে গেছে | খুব ভালো জানি, আমি নিজেই একটা আস্ত অপরাধী – গুচ্ছ গুচ্ছ অপরাধ আমার | ত্রিপর্ণার সঙ্গে এক্সট্রা ম্যারিটাল, অফিসে মাঝে মাঝে উত্কোচ গ্রহণ, ভিড়ের জায়গায় নারীশরীর লেপ্টে দাঁড়ানো – এমন হরেক বেআইনি কাজ হরবখত করে চলেছি | আইনের চোখে এর প্রত্যেকটাই অপরাধ | কেবল মনে হয়, পুলিশ যে কোনও সময় এসে অ্যারেস্ট করবে আমায়; হাতকড়া পরিয়ে প্রিজন ভ্যানে তুলবে | মাঝে মাঝেই আমার চোখে ভেসে ওঠে অন্ধকার একটা ঘরে ষন্ডামার্কা পুলিশ অফিসার জেরা করছে আমায়, চোখে কালো গগলস, হাতে ডান্ডা – বলুন, ত্রিপর্ণা সামন্তর সঙ্গে আপনার কী সম্পর্ক… বলুন, ফেব্রিক ইন্ডিয়া লিমিটেডের একটা বিল আপনি দিনের পর দিন চেপে রেখেছিলেন কেন…..বলুন, ঘোষ অ্যান্ড ঘোষ প্যাথলজিকাল ল্যাবের কর্মচারী রাধানাথ কর্মকারকে এক হাজার টাকা কেন দিয়েছেন….বলুন, চুপ করে থাকবেন না…বলুন…|

আমি চমকে উঠি | রাধানাথ কর্মকারের কথাটা পুলিশ জানল কী করে? এটা তো সম্ভব নয় | আমি আর রাধানাথ ছাড়া কেউ জানে না | রাধানাথ বলবে না নিশ্চিত; কারণ এটার ওপর ওর সুনাম, চাকরি, সব নির্ভর করছে | তাহলে? পরক্ষণেই মনে পড়ে, কথায় যেন শুনেছিলাম পুলিশ সর্বজ্ঞ, সর্বত্রগামী | আর সেই জন্যই তারা সর্বশক্তিমান | ঈশ্বরের মতো | মানুষের গোপনতম কাজকর্ম, নিভৃততম ভাবনাচিন্তা সব ধরা পড়ে পুলিশের নেটওয়ার্কে | তবু আমি, খুব জোরের সঙ্গে অস্বীকার করি, প্রবলভাবে মাথা নাড়তে নাড়তে বলি, বিশ্বাস করুন, আমি কিছু জানি না…..|

শাটাপ! ধমকে ওঠে অফিসার |

আমি চমকে উঠি | কুলকুল করে ঘাম হয় | পুলিশের প্রতি ভয় মেশানো শ্রদ্ধায় নত হয়ে আসে মাথা |

তাই পুলিশ সম্পর্কে সবসময় আমি এক বিপুল আতঙ্ক বয়ে বেড়াই | রাস্তা-ঘাটে আচমকা কোথাও পুলিশ দেখলে বুকের মধ্যে ধক করে ওঠে; দূর থেকে পুলিশ ভ্যান আসতে দেখলে মনে হয় দৌড়ে পালাই | সেই আমাকেই এখন যেতে হবে থানায়, যেটা কিনা পুলিশের আড়ত | দলে দলে পুলিশ যেখানে মারাত্মক সব মারণাস্ত্র নিয়ে সদা প্রস্তুত, গেলেই ক্যাঁক করে ধরবে, তারপর আমার অপরাধের ফিরিস্তি খুলে একটার পর একটা জবাবদিহি চাইবে |

কিন্তু এছাড়া আর উপায় নেই; তেমনই বলল কানাইদা | থানায় জানিয়ে দিলেই কুমকুমের ব্যাপারে কোনও দায় থাকবে না আমার | তখন ও রেপড হোক, মার্ডার হোক, কেউ কিডন্যাপ করুক, পালিয়ে যাক – কোনও কিছুর জন্যেই আমি দায়ী নয় |

মনে মনে সাহস সঞ্চয় করি | বড় বিপদের থেকে বাঁচতে এটুকু ঝুঁকি নিতেই হবে | আমার মতো এলিতেলি লোককে পাত্তা দেয় না শুনেছি | সঙ্গে হেভিওয়েট কাউকে – সেটা রাজনৈতিক নেতা হলে ভালো – নিয়ে যাওয়া দস্তুর | আমার সঙ্গে সি পি এম, কংগ্রেস, বিজেপি কোনও দলেরই সম্পর্ক খারাপ নয় | প্রত্যেক দলের নেতাদেরই ভোট দেব বলি | এমনকী পাড়ার আধপাগলা ভোম্বলদা নির্দল হয়ে একবার ভোটে দাঁড়িয়েছিল; আমি ওকেও ভোট দেব বলেছিলাম | এদের কাউকে এখন অনুরোধ করা যেতেই পারে; কিন্তু আমার সমস্যাটা অন্য রকমের – সঙ্গে কেউ গেলেই ব্যাপারটা রাষ্ট্র হয়ে যাবে |

আরও পড়ুন:  আলোঝাপসা

থানার সামনে দাঁড়িয়ে একটু ইতস্তত করি | এতক্ষণ যেটুকু মনোবল ধরে রেখেছিলাম সেটা কখন যেন ফস্কে পড়ে গেছে | পেটটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে; বাথরুমও পাচ্ছে | কিন্তু আশেপাশে কোথাও বাথরুম করার জায়গা দেখছি না | গেটে দাঁড়িয়ে একটা পুলিশ খৈনি ডলছে, পাঁচিলের সামনে একটা ভাঙাচোরা ম্যাটাডোর আর তোবড়ানো মোটর সাইকেল | মনে সাহস এনে, বাথরুম চেপে পুলিশটার দিকে এগিয়ে যাই | আমার সামনেই হাতের তালুতে চাপড় মেরে খৈনি ঝাড়ে সে | খৈনির গুড়ো নাকে এসে ঢোকে | একটা হাঁচি আসব আসব করছে | শুভকাজে হাঁচি পড়া ভালো নয়, তাই খুব চেষ্টা করে হাঁচিটা হজম করে ফেলি | তারপর জিজ্ঞেস করি, বড়বাবু আছেন?

ঠোঁট ফাঁক করে খৈনি গুঁজতে গুঁজতে কনস্টেবল কী বলে ঠিক বুঝতে পারি না | দ্বিতীয়বার প্রশ্ন না করে আমি ভেতরে চলে যাই |

থানার বারান্দায় আর একটা কনস্টেবল | এর হাতে আবার বন্দুক; তবে ভরসার কথা, নলের মুখটা মাটির দিকে নামানো |

হাতে বন্দুক থাকলেও এই কনস্টেবল মানুষ মন্দ নয়; দু-চারটে কথার পর আমার অন্তত তেমনই মনে হলো | এ নস্যি নেয়, একটু নাকি কন্ঠস্বর | কথাও বলে খুব ধীরে ধীরে | জানতে পারলাম, বড়বাবু ছুটিতে; থানার দায়িত্বে এখন মেজবাবু, কিন্তু মেজবাবুও এই মুহূর্তে থানায় নেই, ফুলবেড়িয়ায় মারামারি থামাতে গেছেন; আমাকে যেতে হলে সেজবাবুর কাছে যেতে হবে |

সেজবাবুর ঘরে গেলাম | টেবিলে খাতা রেখে মন দিয়ে কিছু লিখছিলেন; সামনে চার-পাঁচ জন বসে | আমার সমস্যা না শুনেই বললেন, আমি খুব ব্যস্ত; আপনি ছোটবাবুর কাছে যান |

পাশেই ছোটবাবুর ঘর | বন্দুকধারী কনস্টেবল আর সেজবাবু  – দুজন পুলিশের সঙ্গে কথা বলে আমার ভীতি অনেকটাই কেটে গেছে | ছোটবাবুকে দেখে সেই ভীতি ফিরে এল | ভদ্রলোকের মাথা জোড়া তাক, প্রবল একখানা গোঁফ, থ্যাবড়া নাক, আর চোখ দুটোতে দুনিয়ার যত অবিশ্বাস সব জড়ো হয়েছে | ভদ্রলোক যেন আমার অপেক্ষাতেই ছিলেন | ঘরে পা দেওয়া মাত্রই বললেন, বলুন কী ব্যাপার |
আমি বলি, স্যার, একটা কথা ছিল |
সেটাই তো বলছি | একটু যেন ধমকে উঠলেন ছোটবাবু |
বললাম, একটা প্রবলেম স্যার, খুব প্রবলেম….!

আরও পড়ুন:  আলোঝাপসা

খুব প্রবলেম ছাড়া এখানে কেউ আসে না; আপনিই বা আসবেন কোন দুঃখে! বলে ফেলুন |

চারপাশ দেখে নিয়ে একটু নিচু গলায় বললাম, কুমকুমকে পাচ্ছি না স্যার |

ভুরু দুটো একটু কুঁচকে ছোটবাবু বললেন, কে কুমকুম?
আমার স্ত্রী স্যার; ওয়াইফ |
হুঁ; কবে থেকে পাচ্ছেনা না?
কাল থেকে স্যার |

বসুন, দাঁড়িয়ে কেন? ছোটবাবু উল্টোদিকের চেয়ারটা চোখের ইঙ্গিতে দেখালেন |

আমার হাঁটুদুটো কাঁপছিল | ছোটবাবু বলতেই বসে পড়লাম |

তারপর শুরু হলো ছোটবাবুর দীর্ঘ জেরা | নাম ঠিকানা বয়েস হাইট গায়ের রঙ আঁচিল-জরুল সবকিছু খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করলেন | তারপর বললেন, আপনাদের মধ্যে সম্পর্ক কেমন?
বললাম, ভালো-ই |
ছোটবাবু বললেন, ঠিক বলছেন?
বেশ জোর দিয়ে বলি, হ্যাঁ স্যার, ভালোই |
দুবারই আপনি ‘ই’ লাগালেন, আমার সন্দেহটা এখানেই | বিজ্ঞের মতো ঘাড় নাড়তে নাড়তে ছোটবাবু বললেন |

ছোটবাবুর কথার মাথামুন্ডু বুঝতে না পেরে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকি |

ছোটবাবু বললেন, আপনি যদি শুধু ‘ভালো’ বলতেন তবে অতটা সন্দেহ হতো না, কিন্তু বললেন, ‘ভালো-ই’ – এই এক্সট্রা ই-টা ভেরি মাচ গোলমেলে |
আমি তাড়াতাড়ি বলে উঠি, বিশ্বাস করুন স্যার, ভালো, খুব ভালো সম্পর্ক আমাদের |
সে তো এখন চেপে ধরতে বলছেন |
না স্যার, বিশ্বাস করুন |
বিশ্বাস করলে তো আমাদের চলবে না মশাই | ছোটবাবু বললেন, ওর বাপের বাড়ি জানিয়েছেন?
মাথা নেড়ে বলি, না |
সে কী কথা! ছোটবাবু আঁতকে উঠলেন, এটা তো আরও সন্দেহজনক….|

বললাম, আসলে শ্বশুরবাড়িতে জানানোর মতো কেউ নেই; শাশুড়ি বাতের ব্যথায় শয্যাশায়ী, শ্বশুরের হাঁপানি, সেইজন্যে ওদের খবর দিয়ে ব্যস্ত করিনি…..|

হুম |গম্ভীর একটা শব্দ গলা দিয়ে বেরিয়ে এল ছোটবাবুর | মুখখানা থমথমে | স্থির হওয়া হাঁটু দুটো ফের কাঁপতে শুরু করেছে আমার |

শ্বশুরবাড়ির ঠিকানা, ফোন নাম্বার লিখে নিলেন ছোটবাবু | তারপর বললেন, প্রেম-পিরিতি কিছু আছে?
না স্যার | কী জানি!
ছোটবাবু মৃদু ধমকে উঠলেন, ঠিক করে বলুন….পাড়ায় কাউকে সন্দেহ হয়?

পাড়ার কথা বলতে বলতে প্রথমে কালীপুজো কমিটির সেক্রেটারির কথা মনে হলো | ছেলেটা কুমকুমের দিকে অভদ্রের মতো তাকাত | কিন্তু পুলিশের কাছে এসব চেপে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ | পুলিশ আর কিছু না পারুক, লোকজনকে হ্যারাস করতে ওস্তাদ, জিজ্ঞাসাবাদের জন্যে ছেলেটাকে হয়তো তুলে আনবে | ছোকরার চেহারা ভালো, দলে চেলা-চামুন্ডাও প্রচুর; ব্যাপারটা সত্যি না হলে পরে আমার কপালে দুঃখ অনিবার্য |

ক্রমশঃ…..

 

৩য় পর্বের লিংক –http://banglalive.com/bengali-novel-dugdugi-by-ullas-mullick-part-3/

২য় পর্বের লিংক –http://banglalive.com/bengali-novel-dugdugi-by-ullas-mullick-part-2/

১ম পর্বের লিংক –http://banglalive.com/bengali-novel-dugdugi-by-ullas-mullick/

উল্লাস মল্লিক
জন্ম ১৯৭১ | লেখালিখি শুরু ২০০০ সালে | প্রথম উপন্যাস ‘প্রস্তুতিপর্ব’ | শখ –ক্রিকেট আর শস্য শ্যামল ক্ষেত | সুযোগ পেলেই বেরিয়ে পড়েন গ্রাম বাংলার সবুজের হাতছানিতে |

1 COMMENT

এমন আরো নিবন্ধ