আমাকে বেশিক্ষণ উদ্বেগের মধ্যে না রেখে কাশিটা থেমে গেছে | শ্বশুরমশাই আশ্বস্ত করলেন, আমার নামে পুলিশকে ভালো ভালো কথাই বলেছেন ; আমি অত্যন্ত সৎ ভালো ছেলে, আমাদের মধ্যে ভালবাসা খুব, আমি শ্বশুর-শাশুড়িকে খুব শ্রদ্ধা করি, বিজয়ার প্রণাম করতে যাই….ইত্যাদি প্রভৃতি |

হঠাৎ শ্বশুরমশাই খুব আকুল কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি কিছু হয়েছিল নাকি?
আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম, না না |
ঠিক বলছ তো অবনীশ?
সত্যি বলছি | আমি বললাম, অফিসে যাবার সময় ভাত বেড়ে দিল, তারপর ফেরবার সময় হত্তুকি আনতে বলল; আপনি বলুন এসব কি ঝগড়ার লক্ষণ?
তা অবশ্য ঠিক কথা!
তবে! আমি আত্মবিশ্বাসী গলায় বলি |
তাহলে কি ওকে কেউ অপহরণ-টপহরণ করল?
না না, অপহরণ নয় |
তুমি এত নিশ্চিত হচ্ছ কী করে?
দেখুন জলজ্যান্ত একটা প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে পাড়ার মধ্যে থেকে – আপনি একটা কুকুরের বাচ্চাকেও সহজে তুলতে পারবেন না…| কানাইদার যুক্তিগুলো আমি শ্বশুরমশাইয়ের সামনে সাজিয়ে ধরলাম |

এবার মৃদু একটা প্রতিবাদ করে উঠলেন শ্বশুরমশাই | বললেন, না না, কুকুর বাচ্ছা নিয়ে পালানো কোনও সমস্যা নয়, আমাদের বাড়ির সামনে সাদা কুকুরটা চারটে বাচ্ছা দিয়েছিল, বেশ গোলগাল বাচ্ছা; বেপাড়ার লোক দুটোকে নিয়ে চলে গেছে – আয়-আয়-চু-চু করে ডাকলেই ওরা চলে যায় |

আমি একটু দুর্বল যুক্তি সাজানোর চেষ্টা করি | বলি, কিন্তু আর দুটোকে তো নিয়ে যেতে পারেনি; খুব সহজে নিয়ে যাবার হলে চারটেকেই নিয়ে যেত…|

শ্বশুরমশাই বলেন, বাকি দুটো মেদি যে; মদ্দা হলে ও দুটোকেও নিয়ে যেত |

আমি বলি, কিন্তু মানুষ তো আর কুকুরবাচ্চা নয়, অত সহজে….|

আমাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে শ্বশুরমশাই বলেন, সে কী আর জানি না – মানুষ কুকুরবাচ্চা নয়; কুকুরবাচ্চা মদ্দা হলে মানুষ নিয়ে পালায়; কিন্তু আবার মেয়েমানুষের বিপদ বেশি….|

শ্বশুরমশাইয়ের এই যুক্তিটা আমাকে একেবারে ধরাশায়ী করে দেয় | আমি সায় দিয়ে বলি, এটা অবশ্য একেবারে ঠিক বললেন |

তাহলে মনে হয় তাই হয়েছে; ওকে কেউ অপহরণ করেছে | শ্বশুরমশাই ভেঙে পড়া গলায় বললেন |

হুঁ | – বলে চুপ করে থাকি আমি | আড়চোখে বিশুবাবুর দিকে তাকাই | দেখি, বিশুবাবুও অবাক হয়ে এদিকে তাকিয়ে |

তুমি হাত-পা গুটিয়ে বসে থেক না অবনীশ | আমার শুনে থেকে যে কী হচ্ছে কী বলব…| ভাঙা গলায় হাঁপাতে হাঁপাতে বলা কথাগুলো খুবই করুণ শোনায় |

আমি বলি, হাত-পা গুটিয়ে বসে নেই; পুলিশকে তো জানিয়েছি….|

আরও পড়ুন:  লেখক বেচারার খেদ

পুলিশকে তো শুধু জানালেই হবে না, লেগে থাকতে হবে ওদের পেছনে, না হলেই ভুলে যাবে |

না না, ভুলে যাবে কেন! আমি প্রতিবাদ করে বলি, অফিসারটা খুবই গুরুত্ব দিয়ে শুনেছে, আজ দুপুরে আমাদের বাড়ি আসবে বলেছে |
এখনও আসেনি?
না, এখনও তো আসেনি |

তাহলেই দেখ ; দুপুরে আসব বলে এখনো এল না; এর পরও তুমি বলবে, পুলিশের মন আছে কাজে!

আমি বলি, দেখুন পুলিশের হাজার ঝামেলা, কোথাও হয়তো আটকে গেছে |
তবুও তুমি লেগে থাক | আমার শরীর বড় খারাপ, তার ওপর চোখে ছানি পড়েছে….না হলে আমিই চলে যেতাম |
না,না, আপনার আসার কোনও দরকার নেই |
শোনো, তোমাকে একটা কথা বলি | শ্বশুরমশাই একটু চক্রান্তের সুরে বললেন, পুলিশকে টাকাকড়ি কিছু খাওয়াও, না হলে ওরা নড়ে বসবে না |
ঠিক আছে, দেখছি |
দেখছি নয়; যা বলছি শন, টাকার জন্যে চিন্তা করো না, আমি টাকা দেব’খন…|
কিন্তু কীভাবে খাওয়াব টাকা?
কীভাবে খাওয়াব মানে! শ্বশুরমশাই বেশ বিস্ময়ের সঙ্গে বললেন, পুলিশকে টাকা খাওয়ানো কোনও কাজ হলো: ওরা খাবার জন্যেই বসে আছে, তুমি দিলেই খাবে |

এবার একটু বিরক্তির সঙ্গে বলি, সে তো বুঝলাম, কিন্তু তদন্ত শুরুই হলো না ভালো করে; এক্ষুনি টাকা অফার করা কি সঙ্গত হবে?
পুলিশকে টাকা খাওয়ানোর এক্ষুনি-তক্ষুনি নেই | তুমি কতটুকু চেন পুলিশকে? এবার শ্বশুরমশাই কিছুটা বিরক্ত |
বলি, তা অবশ্য ঠিক; থানা-পুলিশ ব্যাপারটায় আমি ঠিক সড়োগড়ো নই |
তাই তো বলছি; প্রথমেই টাকা খাওয়াও; টাকার জন্যে চিন্তা কোর না….|
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলি, ঠিক আছে, খাওয়াব |
যাও, তুমি এখনই একবার থানায় যাও; ওরা কখন আসবে সেই আশায় বসে থেক না |

শ্বশুরমশাইয়ের হাত থেকে নিস্তার পাবার জন্যে বলি, ঠিক আছে যাচ্ছি….|

 

ফোনটা পকেটে রেখে বাড়ির রাস্তা ধরলাম | পেছন থেকে গন্গারামা চিত্কার ক্করে ডাকল, চা দিতে বললেন যে, চা দিয়েছি আপনাকে |

ফের ফিরে আসি গঙ্গারামের দোকানে | বিশুবাবু চায়ে চুমুক দিতে দিতে চশমার ফাঁক দিয়ে আমার দিকে তাকালেন | আমি চোখ সরিয়ে নিলাম ওর চোখ থেকে | হাতের কাগজটা ভাঁজ করতে করতে বিশুবাবু বললেন, কার আবার কুকুর হারাল?

 

 

ছোটবাবু আমার মস্ত একটা উপকার করলেন | সম্ভবত না জেনেবুঝেই করেছেন; কিন্তু মোটের ওপর আমি তো উপকৃত, তা তিনি বুঝেই করুন আর না বুঝেই করুন | মনে মনে আমি তাই ছোটবাবুর কাছে একটু কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে নিলাম |

আরও পড়ুন:  ডুগডুগি (পর্ব ১৫)

ছোটবাবু জিপে না এসে মোটর সাইকেলে এলেন; আরো বড় কথা সন্ধে উতরে এলেন | বাড়ির সামনে পুলিশ ভ্যান দাঁড়িয়ে থাকা একখানা কেলেঙ্কারিয়াস ব্যাপার | পাড়া-প্রতিবেশীরা অন্তত দিন পনেরোর খোরাক পেয়ে যায় | একবার দেখেছিলাম, পাড়ার কালকেতু ঘোষের বাড়িতে পুলিশ এল | জিপটা বাড়ির সামনে রেখে ভেতরে ঢুকল পুলিশ, কিছুক্ষণ পর কাল্কেতুকে নিয়ে গাড়ি করে চলে গেল | কাল্কেতুর মস্ত তিনতলা বাড়ির সামনে যতক্ষণ পুলিশ ভ্যান দাঁড়িয়ে ছিল, পাড়ার লোক অকারণে যে সামনে দিয়ে কতবার হেঁটে গেল; যতক্ষণ সম্ভব ঘাড় চুলকোতে চুলকোতে বাড়ির দিকে তাকাল, কারও আবার ঠিক ওই জায়গায় এসে জুতোর মধ্যে কাঁকর ঢুকে গেল; কাঁকর বের করতে করতে বার বার চোখ গেল কাল্কেতুর বাড়ির দিকে | তারপর কত গল্প ! কালকেতু চোরাচালানের সঙ্গে যুক্ত, কাল্কেতুর মধুচক্র আছে, কালকেতু জাল ওষুধ তৈরি করে, কাল্কেতুর নামে তিনটে ব্যাংক-ডাকাতি আর ছটা মার্ডার….| সন্ধেবেলা শোনা গেল পুলিশ কাল্কেতুকে জেলে চালান করে দিয়েছে | দু’দিন পর বাজারে যাচ্ছি, হঠাৎ কাল্কেতুর মুখোমুখি – বাজার থেকে বেরোচ্ছে; এক হাতে বাজার-ভর্তি পেত্মতা ব্যাগ, অন্য হাতে প্রায় কেজি দুয়েকের ঝুলন্ত রুই মাছ | আমাকে দেখে বেশ বড় করে হেসে বলল, অবনীশ, ভালো আছ? আমি তো ঘাবড়ে-টাবড়ে একসা | জেল ফেরৎ লোকের কাছে কুশল সংবাদ জানতে চাওয়া উচিত কিনা ভাবছি | কথা খুঁজে না পেয়ে বলে বসলাম, মাছ কত দরে কিনলেন?

সস্তায় পেয়ে গেলাম, দেড়শ করে | কাল্কেতুর বড় হাসি বৃহত্তর হলো |

দেড়শ টাকা কিলো সস্তা কী করে হয় বুঝে উঠতে না পেরে শুধু বললাম, ও |

যাও না, আরও একটা আছে – ভেড়ির মাছ নয়, দিশি |

আমিও যেন কিনতে খুব আগ্রহী – এমন একটা ভান করে তাড়াতাড়ি কাল্কেতুর সামনে থেকে সরে পড়লাম |

পড়ে শুনলাম, কালকেতু জামিনে আছে, কেস চলছে | কেস মিটলে হয় ফাঁসি নয় যাবজ্জীবন |

তারপর বেশ কয়েক বছর কেটে গেছে; ফাঁসি, যাবজ্জীবন কোনটাই হয়নি কাল্কেতুর, এর মধ্যে দুটো অ্যালসেশিয়ান কুকুর পুষছে; মস্ত চারচাকা একটা গাড়ি কিনেছে, পাড়ার রবীন্দ্রজয়ন্তীতে সভাপতিও হয় | কিছুদিন আগেই ছেলের বিয়ে দিল ধুমধাম করে | যারা বলেছিল, কালকেতু মধুচক্র চালায়, জাল নোট ছাপায় তারা সবাই কব্জি ডুবিয়ে খেয়ে, ঢেকুর তুলতে তুলতে রান্নার প্রশংসায় পঞ্চমুখ | এমনকী, থানার বড়বাবু পর্যন্ত নিমন্ত্রিত ছিল; এবার কাল্কেতুর গাড়ি থানা থেকে নিয়ে এল তাকে |

আরও পড়ুন:  সাগর আই লাভ ইউ (পর্ব ১২)

কিন্তু আমার কাল্কেতুর মতো অত এলেম নেই | জেল হাজতে একটা দিন কাটিয়ে পরদিন রুই মাছের মুড়ো খেটে বসলে গলায় কাঁটা ফুটবেই |

আমার বাড়ির সামনে পুলিশ ভ্যান দাঁড়িয়ে থাকলে নিশ্চয়ই নানাবিধ কাহিনি গজাত; তারপর সেগুলো ছড়িয়ে পড়ত লোকের মুখে মুখে | তাই মোটর বাইকে ছত্বাবুকে আসতে দেখে বেশ শান্তি পেলাম মনে মনে | সঙ্গে এসেছে সেই বন্দুকধারী কনস্টেবলটা | এখন অবশ্য সঙ্গে বন্দুক-টন্দুক নেই; তবে ছোটবাবুর কোমরে চামড়ার খাপে রিভলবার ঝুলছে | ছোটবাবু বাইকটা গেটের বাইরে স্ট্যান্ড করছিলেন | আমি বললাম, বাড়িতে ঢুকিয়ে দিন না স্যার |

ছোটবাবু বললেনা, সেই ভালো, এক মাসে পাঁচটা মোটর বাইক চুরির রিপোর্ট পেয়েছি, তার মধ্যে একটা মাত্র উদ্ধার হয়েছে |

পুলিশ নিজেই চুরির ভয় পাচ্ছে দেখে বেশ আশ্চর্য হলাম | ভাবলাম, নিশ্চয়ই ছোটবাবু গা লাগিয়ে চেষ্টা করেননি, না হলে পুলিশের অসাধ্য তো কিছুই নেই | তবে, ছোটবাবু ভয় পেতে আমার একটু সুবিধে হলো; ছোটবাবু রাজি হলেন বাইকটা ভেতরে ঢোকাতে | নিজেই ছোটবাবু টেনে ঢোকাতে যাচ্ছিলেন বাইকটা, আমি তাড়াতাড়ি ছত্বাবুকে সরিয়ে হ্যান্ডেল দুটো ধরলাম; তারপর টানতে গিয়ে বিপত্তি; দেখি গাড়ি নোট-নড়ন-চড়ন , চাকাগুলো যেন গেঁথে গেছে মাটিতে | একটু জোর খাটাতে যেতেই ব্যালেন্স হারিয়ে ফেললাম; ভারী গাড়িটা হুড়মুড় করে উল্টে পড়ল আমার ওপর |

ছোটবাবু ধমকে উঠলেন, আপনি কেমন ক্যালানে দেখলেন তো, ক্লাচ পড়ে গেছে খেয়াল নেই, সবশুদ্ধু টানছেন !

আমার কোমর পর্যন্ত বাইকের নিচে | ছোটবাবুর বকুনি হজম করতে করতে হেঁচড়ে নিজেকে বার করার চেষ্টা করলাম | কিন্তু কুস্তিগীর যেমন প্রতিদ্বন্দ্বীকে আছড়ে ফেলে নানা প্যাঁচ দিয়ে চেপে রাখে ছোটবাবুর বাইক আমার তেমনই দশা করেছে; একটু নড়াচড়া করতেই আরও চেপে বসল আমার ওপর | আমি অসহায়ভাবে তাকালাম দুজনের মুখের দিকে | অন্ধকার হয়ে এসেছে; তবুও যেন কনস্টেবলের মুখ দেখে মনে হলো আমমর জন্য ও কিছুটা দুঃখ পেয়েছে | মায়া-মমতা এমন জিনিস অন্ধকারেও চেনা যায় | সেই তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে বাইকটা চাগিয়ে ধরল; আমিও ভয়ঙ্কর বাহনটার কবল থেকে মুক্ত করলাম নিজেকে |

 

চলবে

৫ম পর্বের লিংক –http://banglalive.com/bengali-novel-dugdugi-by-ullas-mullick-part-5/

৪ র্থ পর্বের লিংক –http://banglalive.com/bengali-novel-dugdugi-by-ullas-mullick-part-4/

৩য় পর্বের লিংক –http://banglalive.com/bengali-novel-dugdugi-by-ullas-mullick-part-3/

২য় পর্বের লিংক –http://banglalive.com/bengali-novel-dugdugi-by-ullas-mullick-part-2/

১ম পর্বের লিংক –http://banglalive.com/bengali-novel-dugdugi-by-ullas-mullick/

 

NO COMMENTS

এমন আরো নিবন্ধ