উল্লাস মল্লিক
জন্ম ১৯৭১ | লেখালিখি শুরু ২০০০ সালে | প্রথম উপন্যাস ‘প্রস্তুতিপর্ব’ | শখ –ক্রিকেট আর শস্য শ্যামল ক্ষেত | সুযোগ পেলেই বেরিয়ে পড়েন গ্রাম বাংলার সবুজের হাতছানিতে |

ওই কনস্টেবলই বাইকটা ভেতরে ঢুকিয়ে স্ট্যান্ড করল | পেছন পেছন ছোটবাবু আর আমি |

ছোটবাবু আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, বউ আপনার হারাবে না তো কার হারাবে!

কী দেখে ছোটবাবুর এমন ধারণা হলো কে জানে! আমার মনে হলো, ছোটবাবু অতি-সরলীকরণ করে ফেলছেন | একটা বাইককে সাফল্যের সঙ্গে নাড়াচাড়া করতে না পারলে বউ পালাবে এটা ভেবে নেওয়া ঠিক নয় | দুনিয়ার বহু মানুষই এই কাজটা করতে গিয়ে ব্যর্থ হবে; তাদের সবারই কি বউ পালাচ্ছে? যাই হোক, ছোটবাবু তার নিজের বিশ্বাস নিয়ে থাক; পুলিশের ভ্রান্ত বিশ্বাস সংশোধন করা আমার কাজ নয় | আমার নিজেরই এখন বড় বিপদ; কী করে তা থেকে মুক্তি পাব সেই চেষ্টা বরং করাই উচিত |

ছোটবাবু ঘুরে ঘুরে বাড়িটা দেখলেন | রান্নাঘরে একটু বেশি সময় নিলেন | বেশ পরিপাটি গুছোনো রান্নাঘর | গ্যাস ওভেন, মিটকেস, তাকে ঝকঝকে বাসন, সারি সারি কৌটো | টেনে খুললেন ফ্রিজের দরজা; ফ্রিজে চাপা দেওয়া ভাত-ডাল-তরকারি | আগের দিন গলদা চিংড়ি এনেছিলাম | কুমকুম মালাইকারি করেছিল | চিংড়ি মালাইকারিটা দেখে একটু ভ্রু কোঁচকালেন | তারপর জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কোথায় যেন চাকরি করেন?

আমি কোম্পানির নাম বললাম |
কী পোস্টে?
বললাম |

একটু বাঁকা হেসে ছোটবাবু বললেন, খাওয়া-দাওয়া তো বেশ গর্জাস করেন দেখছি, মাইনে কত?

এবার আমি মুখে হাসি ফুটিয়ে বললাম, না না, তেমন কিছু নয়…|

বলেন কী! ছোটবাবু বাঁকা হাসি মুখে ধরে রেখেই বললেন, চিংড়ির যা সাইজ দেখছি, মিনিমাম তিন-সাড়ে তিনশো করে কিলো হবে; এটাও যদি তেমন কিছু না হয়…! চিংড়ি কি রোজই খান?

না না, রোজ নয় | আমি তেমন পছন্দ করি না; কুমকুম ভালবাসে, তাই মাঝেমধ্যে পেলে নিয়ে নিই |
হুম| ছোটবাবু গম্ভীর হয়ে তাকালেন আমার দিকে |

আমি দ্রুত চোখ সরিয়ে নিই ছোটবাবুর চোখ থেকে | আশংকা হয়, ছোটবাবু মিথ্যে কথাটা ধরে ফেললেন বোধহয় | চিংড়ি আমি খুবই পছন্দ করি; বরং কুমকুমের এলার্জির সমস্যা আছে বলে খেতে চায় না | তবু মিথ্যে কথাটা বললাম; ছোটবাবুকে বোঝাতে চাইছিলাম, বউকে আমি কতটা ভালবাসি |

ছোটবাবু বললেন, বিশ্বাসদা, চিংড়ি খাবেন নাকি; এমন সাইজ তো ঝট করে পাওয়া যায় না |

বুঝলাম কনস্টেবলের পদবী বিশ্বাস | আমি তাকালাম বিশ্বাসের দিকে | বিশ্বাসের মুখ দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, চিংড়ি খাবার প্রবল ইচ্ছে; কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারছে না |

বুঝলাম পুলিশের চাকরি কী কঠিন, কী ভীষণ নিয়ম-শৃঙ্খলায় বাঁধা! এরা দুজন এখন যদি চিংড়ির মালাইকারিটা খেয়ে নেই, আমার কিছু বলার নেই | কিন্তু কর্তব্যের খাতিরে সেটা কোনোভাবেই সম্ভব নয় |

আরও পড়ুন:  সাগর আই লাভ ইউ (পর্ব ৭)

মালাইকারি ভেতরে রেখেই ফ্রিজ বন্ধ করে দিলেন ছোটবাবু | টর্চ নিয়ে ছাদে উঠলেন | নেমে এসে জিজ্ঞেস করলেন, আপনার স্ত্রী ডায়রি-টায়রি কিছু লিখতেন না?

বললাম, হ্যাঁ, লিখতেন |

খুব উত্সাহের সঙ্গে ছোটবাবু বললেন, লিখতেন! কোথায় সেটা; একটু দেখব |

বললাম, সেটা তো পুড়ে গেছে |

পুড়ে গেছে, পুড়ল কী করে; নাকি আপনিই পুড়িয়ে দিয়েছেন, সত্যি করে বলুন | ছোটবাবু ধমকে উঠলেন |

বিশ্বাস করুন | আমি বলি, আমাদের রান্নাঘরে যেবার আগুন লাগে, তখন পুড়ে যায় |

ডায়রি উনি রান্নাঘরে রাখতেন নাকি?

রাখত না; তবে মাঝে মাঝে নিয়ে আসত | একবার একটা মেক্সিকান পদ রান্নার জন্য নিয়ে এসেছিল – সেবারই স্টোভের তেল উপচে রান্নাঘরে আগুন লাগে – ডায়রিটা পুড়ে যায় – ও তখন বাথরুমে ছিল, তাই বরাতজোরে বেঁচে গেছে – দেখুন না, দেওয়ালের একটা জায়গা এখনও কালো |

ছোটবাবু ভয়ংকর ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছেন | অবাক চোখে তাকিয়ে আছেন আমার দিকে | কিন্তু ওই বিশ্বাসদা ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছে | সেই বুঝিয়ে দিল ছোটবাবুকে – এ ডায়রি, সে ডায়রি নয় – এ রান্না লেখা ডায়রি |

ছোটবাবু ধমকে উঠলেন আমাকে, ধুর মশাই, রান্না লেখা ডায়রি কে চায়, আমি গুপ্তকথা লেখা ডায়রির কথা বলছি; তেমন কিছু নেই?

আমি বলি, না স্যার |

ঠিক বলছেন? ছোটবাবু গলা ফের গম্ভীর করলেন |

বলি, সত্যি বলছি স্যার – অমন ডায়রি কুমকুমের থাকবে কেন; সে তো যাদের মনে খুব দুঃখ-টু:খ থাকে তারা লেখে |

ছোটবাবু বলেন, আপনি শিওর, আপনার ওয়াইফের কোনও দুঃখ ছিল না?

ছোটবাবুর এই প্রশ্নটা থমকে দেয় আমায় | আমি ভাবতে বসি | তাই তো – তাই তো – কুমকুমের কি দুঃখ ছিল না কিছু? ছিল তো, অনেকগুলো দুঃখ ছিল কুমকুমের – হুড়হুড় করে মনে পড়তে থাকে আমার | ইদানীং কুমকুমের চুল উঠছিল খুব, একটা অটোক্লিন চিমনির শখ ছিল. পোষা টিয়াপাখিটা উড়ে গিয়েছিল কিছুদিন আগে, ওর বাবা-ময়ের শরীর দিন দিন খারাপ হচ্ছিল – এসব কিছু নিয়ে একাধিকবার ওকে দুঃখ প্রকাশ করতে দেখেছি |

দেখলাম, ছোটবাবু একদৃষ্টে তাকিয়ে আমার দিকে | সেই দৃষ্টির মধ্যে সম্ভ্রম উদ্রেককারী একটা ব্যাপার আছে | সত্যি পুলিশ অন্তর্যামী – ঠিক ধরে ফেলেছে কুমকুমের অনেক দুঃখ ছিল | আমি ওর দুঃখের লিস্টটা প্রায় পড়ে শোনাতে যাচ্ছিলাম; কিন্তু শেষ মুহূর্তে সংযত করে নিলাম নিজেকে | এমন দুঃখ তো কমবেশি সকলের আছে; এসব পাতি দুঃখের কথা কেউ দেরিতে লেখে না; ডায়রি হৃদয় তোলপাড় করা, নাড়ী ছেঁড়া দুঃখের জন্যে |

আরও পড়ুন:  ডুগডুগি (পর্ব ১০)

ছোটবাবু বললেন, কী হলো, আপনি শিওর ওর কোনও দুঃখ ছিল না?
বলি, ছিল; তবে সেগুলো গুরুতর কিছু নয় |
তবু শুনি |

আমি কুমকুমের দুঃখগুলো একে একে ছোটবাবুর কাছে কবুল করি |

ছোটবাবুর মুখে ব্যাঙ্গের একটা হাসি ফুটে উঠেই মিলিয়ে যায় | বলেন, এই জন্যেই আপনাকে ক্যালানে বলি |
আমি খুব সরলভাবে বলি, কেন স্যার?

কোনও দুঃখকেই কখনও হালকাভাবে নেবেন না | আপনার কাছে যেটা সামান্য ব্যাপার, অন্যের কাছে সেটাই ভয়ঙ্কর | আপনি কি জানেন, বাবার কাছ থেকে সামান্য একটা মোবাইল পায়নি বলে এক স্কুল ছাত্রী সুইসাইড করেছিল, ওয়াশিং মেশিন কিনে দেয়নি বলে, এক স্ত্রী স্বামীর কাছে ডিভোর্স চেয়েছিল – তারপর ধরুন চুল, বহু মানুষ চুল হারিয়ে যত হাহাকার করে মাতৃ বা পিতৃশোকে তার এক শতাংশ নয় | সুতরাং, দুঃখ মাপার কোনও স্টান্ডার্ড স্কেল নেই জানবেন…|

ছোটবাবুর অমোঘ যুক্তিজালে জড়িয়ে আমি হাঁসফাঁস করি | খুব মৃদু গলায় বলি, তা অবশ্য ঠিক |

ছোটবাবু চিলতে অহংকারের হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে আমার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন | ভাবখানা এমন – পুলিশ মানেই শুধু হুড়ুম-দুড়ুম গুলি-বন্দুক নয়, পুলিশও পারে গম্ভীর দার্শনিক হতে |

নীরবতা ভেঙে আমার মোবাইল বেজে উঠল | ছোটবাবুর দার্শনিক-সুলভ দৃষ্টি সঙ্গে সঙ্গে পুলিশমার্কা হয়ে ওঠে | পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে মৃদু ধাক্কা খাই | ত্রিপর্ণা | মেয়েটা আর ফোন করার সময় পেল না!

একটু তফাতে সরে গিয়ে বললাম, হ্যালো!

ত্রিপর্ণা বলল, তুমি কি বেরিয়ে পড়েছ অফিস থেকে?

বললাম, আমি আজ অফিস যাইনি |
কেন?
সে অনেক ব্যাপার |
কী হলো আবার – শরীর খারাপ?
না না, শরীর ঠিক আছে |
তাহলে; তুমি কোথায় এখন?
বাড়িতে |

আমার শরীরটা খারাপ | ত্রিপর্ণা বলে, কাল ফেরার সময় ঠান্ডা লেগে গেছে – বসে জানলার ধরে বসেছিলাম, হাওয়াটা সরাসরি লেগেছে |

ত্রিপর্ণার টনসিলের সমস্যা আছে | প্রতি বছর সিজন চেঞ্জের সময় ভোগে | কাল হলে ঢোকার সময় বলল, একটা ভুল হয়ে গেছে, গরম পোশাক কিছু আনা হয়নি | ঠিক ছিল, সিনেমা দেখে ধর্মতলার কোনও স্টল থেকে মাথায় বাঁধার স্কার্ফ-টার্ফ কিছু একটা কিনে নেব | কিন্তু হল থেকে বেরিয়ে খুব গম্ভীর ছিল ত্রিপর্ণা; কোথাও কম বলছিল; আমিও কৃতকর্মের জন্যে একটু অনুতপ্ত ছিলাম, ফলে ভুলে যাই স্কার্ফের ব্যাপারটা | রবীন্দ্রসদন মোড়-এ শাল গায়ে একটি মেয়েকে দেখে মনে পড়ে যায় আমার, কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে |

আরও পড়ুন:  ফেবু কবি

আড়চোখে দেখলাম ছোটবাবু ছুঁচলো দৃষ্টি নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে | চাপা গলায় কথা বললে সন্দেহ করতে পারেন | তাই, একটু জোর গলায় বলি, ডাক্তার দেখিয়েছ?
না, দেখাইনি এখনও |
গায়ে জ্বর আছে নাকি?
না জ্বর নেই; কিন্তু ভীষণ গলা ব্যথা |

বলি, নুন জলে গার্গেল করো, ঠিক হয়ে যাবে; আমি ছাড়ছি এখন….|

পকেটে ফোনটা রেখে ছোটবাবুর দিকে সরাসরি তাকাই | সেই একই দৃষ্টি | এই ছুঁচ-দৃষ্টি যখন তখন বের করেন ছোটবাবুরা; সন্দেহজনক কোনও বেলুন দেখলেই ফুটো করে দেন |

ছোটবাবু বললেন, কে ফোন করেছিল?
ও আমার এক পরিচিত |
কালা?
না তো!
অত চিত্কার করে কথা বলছিলেন কেন?

বুঝতে পারি চিত্কারটা একটু বেশি রকমের হয়ে গেছে; ছোটবাবুর কানে লেগেছে | এই আমার চিরকালের সমস্যা – করতে যাই একরকম, হয়ে যায় আর এক | হঠাৎ বুদ্ধিটা খেলে যায় মাথায় | বলি, টাওয়ারের প্রবলেম; ভালো শোনা যাচ্ছিল না |
কোথায় বাড়ি?
কোন্নগরের নবগ্রামে |
হুম! ছোটবাবু গম্ভীর গলায় বলেন, কী নাম?

একটু চুপ করে থাকি আমি | বুঝতে পারছি, ছোটবাবুর যেরকম সন্দেহবাতিক, নামটা শুনলেই রহস্যের ভুরভুরে গন্ধ পেয়ে যাবে; তখন প্রশ্নের ফোয়ারা ছুটে আসবে আমার দিকে |

ছোটবাবু বলেন, কী হলো, নাম ভুলে গেছেন নাকি; কেমন পরিচিত আপনার?

বলি, বলাই সামন্ত |
এটা ত্রিপর্ণার বাবার নাম | কুমকুমের যাতে সন্দেহ না হয়, ত্রিপর্ণার বাবার নাম সেভ করে রেখেছিলাম ফোনে; তাই ওই নামটাই বলে দিলাম |

ছোটবাবু কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন | তখনই আমার পকেটের মোবাইল বেজে উঠল আবার | মোবাইলটা হাতে নিয়ে দেখলাম, যা আশঙ্কা করেছিলাম তাই | ত্রিপর্ণা |

ফোন ধরতেই ত্রিপর্ণা বলে উঠল, এই তুমি কি আমার রাগ করেছ আমার ওপর? কাল আসলে আমার মুডটা অফ ছিল, ছোড়দা কাল বাড়িতে প্রচন্ড অশান্তি করে তাই…|

আমি তাড়াতাড়ি বলি, রাগ-টাগ কিছু করিনি – আমি এখন খুব ব্যস্ত! পরে কথা বলব তোমার সঙ্গে |

 

চলবে

গত পর্বের লিংক – http://banglalive.com/bengali-novel-dugdugi-by-ullas-mullick-part-6/

৫ম পর্বের লিংক –http://banglalive.com/bengali-novel-dugdugi-by-ullas-mullick-part-5/

৪ র্থ পর্বের লিংক –http://banglalive.com/bengali-novel-dugdugi-by-ullas-mullick-part-4/

৩য় পর্বের লিংক –http://banglalive.com/bengali-novel-dugdugi-by-ullas-mullick-part-3/

২য় পর্বের লিংক –http://banglalive.com/bengali-novel-dugdugi-by-ullas-mullick-part-2/

১ম পর্বের লিংক –http://banglalive.com/bengali-novel-dugdugi-by-ullas-mullick/

- Might Interest You

NO COMMENTS

এমন আরো নিবন্ধ

0 129

0 201