উল্লাস মল্লিক
জন্ম ১৯৭১ | লেখালিখি শুরু ২০০০ সালে | প্রথম উপন্যাস ‘প্রস্তুতিপর্ব’ | শখ –ক্রিকেট আর শস্য শ্যামল ক্ষেত | সুযোগ পেলেই বেরিয়ে পড়েন গ্রাম বাংলার সবুজের হাতছানিতে |

জানালা দরজা বন্ধ করে চুপচাপ বসেছিলাম। কেউ একজন ডোর-বেল বাজাল। ভাবলাম, খুলব না দরজা। একটু আগে ফিরেছি বাড়িতে। বাজারের রাস্তায় কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করেও ঠিকমতো বুঝতে পারিনি খবরটা কতটা ছড়িয়েছে। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল, সবাই আমার দিকে তাকাচ্ছে। আবার মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে, না, মনের ভুল। এরা হয়ত আমার পিছনের দিকে কিছু দেখার চেষ্টা করছে। কেষ্ট বোস যেমন হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে বলল, কী খবর? মনে হল কেষ্ট তো অন্যদিন কথা বলে না; আজ কেন বলল? ও কি জেনে গেছে কিছু? আমি বেশ জোরেই বললাম, ভাল। কেষ্ট একটু যেন বাঁকা হাসল।

ফের বাজল ডোর-বেল ।

কয়েক সেকেন্ড পরে আবার। সঙ্গে সঙ্গে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ।

হঠাৎ মনে হল, যদি পুলিশ হয়? ছোটবাবু কাল আবার আসবেন বলেছিলেন।

ঘরের অন্ধকার থেকে বাইরে আসি। ফের ডোর-বেল। চিৎকার করে বলি, যাচ্ছি, যাচ্ছি … ।

দরজা খুলে দেখি পুলিশ নয়। বিশুবাবু।

বিশুবাবু কিছু বলার আগেই আমি বললাম, আপনি কার কাছে শুনলেন?

হতচকিত বিশুবাবু বলেন, শুনলাম; আপনারই এক প্রতিবেশীর কাছ থেকে।

ঝন্টু তো? সরাসরি বিশুবাবুর চোখের দিকে তাকিয়ে বলি।

বিশুবাবু ঘাড় নেড়ে সায় দেয়।

ও কি মাইক নিয়ে বেরিয়েছে, না কি লিফলেট ছাপিয়ে বিলি করছে?

বিশুবাবু একটু ঘাড় চুলকে বলেন, না না, মাইক লিফলেট কিছু নয় – বাজারে দেখা হল, একথা সেকথার পর …, তা আমি বললাম, কই, কালই তো চায়ের দোকানে অতক্ষণ কথা হল, কিছু তো শুনলাম না!

কিছু হলে তো শুনবেন।

অ্যাঁ!

হ্যাঁ। মৃদু হেসে আমি বলি, আসলে ঝন্টুর নিজের গায়ে প্রচুর খোস-প্যাজড়া, জামা পরে থাকে বলে দেখা যায় না; এতো পয়সা অথচ ট্রিটমেন্ট করাবে না, চুলকোতে বড় সুখ যে!

বিশুবাবু ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকেন।

আমি বলি, ঝন্টু যাদের ভালবাসে, তাদের গা চুলকে দেয় মাঝে মাঝে; ভাবে সবারই খোস আছে – আরামও পাচ্ছে …। আমাকে ঝন্টু খুব ভালোবাসে তো ; তাই কখনও নিজে চুলকে দেয়, কখনও বাবুলালদের বলে চুলকে দিতে … ।

বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেছে বিশুবাবুর চোখ।

আমি বলি, আপনিও যেমন – তেমন কিছু হলে আপনাকে বলতাম না! কাল অতক্ষণ গঙ্গারামের দোকানে কথা হল। বাজে কথা, বুঝলেন, বাজে কথা!

এবার বিশুবাবু একটু ধাতস্থ হন। বলেন, আমি অবশ্য বিশ্বাস করিনি – ও মালকে তো চিনি ভাল করে … ।

কুমকুম রাগারাগি করে এক আত্মীয়ের বাড়ি চলে গেছে – মহিলাদের ব্যাপার – বোঝেনই তো – বড় অবুঝ … ।

আমার ঘাড় টপকে বাড়ির ভেতর দৃষ্টি ফেলার চেষ্টা করেন বিশুবাবু। বিশুবাবুর মুখের ওপরই দরজা বন্ধ করে দিই আমি।

                          ( সাত )

খুব একচোট ধমক দিল কানাইদা। বউ হারিয়ে এমন পাগলামি নাকি আদিখ্যেতা। দুনিয়ায় কত মানুষ, যারা একাধিকবার বউ হারিয়েছে ; তার পরেও তারা দিব্যি আছে। কানাইদার এক দূর-সম্পর্কের জ্যাঠা না কি তিনবার বউ হারায়। প্রথম বউকে জ্যাঠার পছন্দ হয়নি, তাড়িয়ে দেয়; দ্বিতীয় বউ জ্যাঠাকে ছেড়ে চলে যায়, তিননম্বর বউয়ের সঙ্গে সুখে ঘরসংসার করছিল; কিন্তু অদৃষ্টের এমনই পরিহাস হঠাৎ কদিনের জ্বরে সেও গেল। এত কিছুর পরেও না দমে কানাইদার জ্যাঠা চতুর্থবার বিয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে।         

 

চায়ে একটা চুমুক দিয়ে কানাইদা বলল, তুই শালা এত গান্ডু জানা ছিল না! নে চা খা; ঠাণ্ডা হয়ে যাবে।

কানাইদার ঘরে বিছানার এক কোনে বসে আমি। সকাল নটা। এলোমেলো বিছানা, কোঁচকানো বেডকভার, একদিকে গোটানো নাইলনের মশারি। আমাদের এলাকায় বার্ড-ফ্লুর মতো ছড়িয়ে গেছে খবরটা। মোড়ে মোড়ে চাপা আলোচনা, তার মধ্যেই ফুট-ফাট করে ফেটে ওঠা বাঁকা মন্তব্য; কুমকুমের মাসতুতো বোনের বাড়ি যাবার কাহিনি পাত্তা পাচ্ছে না একদম। সবচেয়ে তুরীয় অবস্থা ঝন্টুর; উত্তেজনায় যেন ফুটছে; পারলে বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে মোচ্ছব লাগিয়ে দেয়। রাতটা কোনও রকমে কাটিয়ে সকালেই চলে এসেছি কানাইদার বাড়ি। কানাইদাকে বলেছি, এখন কটা দিন এখানে থাকব।

আরও পড়ুন:  মেয়ে তুমি বড়ই মন্দ, শরীর জুড়ে যোনির গন্ধ...

ফের ধমকের সুরে কানাইদা বলে, তুই থাক আমার আপত্তি নেই; কিন্তু কথা হচ্ছে, সামান্য একটা মেয়েছেলের জন্যে আত্মগোপন করে থাকবি, এটা মেনে নেওয়া যায় না।

আমি মাথা নিচু করে চায়ে ছোট চুমুক দিই একটা। হঠাৎ নজরে পড়ে কানাইদার বাঁ হাতের মাঝের তিনটে আঙুলে তিনটে আংটি, লাল, সাদা আর সবুজ রঙের তিনটে পাথর। কানাইদার পাথর-মাদুলি তাগা-তাবিজে বিশ্বাস খুব। ওর পরিচিত এক গুনিন আছে শুনেছিলাম, প্রচণ্ড নাকি নির্ভরযোগ্য। কানাইদাকে বলি, তোমার কে এক গুনিন আছে বলেছিলে।

আছে ।

একবার গেলে হয় না?

মৃদু ঘাড় নেড়ে কানাইদা বলে, তা যাওয়া যেতে পারে ।

আমি বলি, কোথায় যেন?

চণ্ডীতলা ।

যাবে একবার?

এখন! একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে কানাইদা।

চল না, দেরী করে লাভ কী!

কিন্তু এখন তো পাবি না তাকে; দেখা করতে হলে সেই সন্ধ্যেবেলা … ।

খুব ব্যস্তভাবে বলি, ঠিক আছে, তাই চল সন্ধ্যেবেলাই … ।

ঠোঁট কামড়ে কিছুক্ষণ চিন্তা করে কানাইদা। তারপর বলে, আমি ডিরেকশন দিয়ে দিচ্ছি, তুই চলে যা।

আমি আকুল গলায় বলি, তুমি চল, প্লিজ! আমার একা কেমন যেন লাগছে।

বিড় বিড় করে কানাইদা বলে, সন্ধ্যেবেলা আমার একটা কাজ ছিল জরুরি … ।

কী কাজ; আমাকে বল করে দিচ্ছি।

মৃদু একটু হেসে কানাইদা বলে, একাজ তো করে দেবার নয়।

আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি কানাইদার দিকে।

কানাইদা নাক খুঁটতে খুঁটতে বলে, বিকেলে শিখার কাছে যাবার কথা।

খুব কৌতূহলের সঙ্গে জানতে চাই, শিখা কে গো, সেদিনও বললে শিখার কথা?

দরজার দিকে তাকিয়ে কানাইদা বলে, তোকে সত্যি কথাটাই বলছি – লাইনের মেয়ে।

মানে ।

গান্ডু! কানাইদা বলে, এই জন্যেই তোর বউ পালায়। লাইনের মেয়ে মানে লাইনের মেয়ে; তোর আমার বউয়ের মতো সতী নয়।

ব্যাপারটা বোধগম্য হয় আমার। বলি, বুঝেছি। কিন্তু সেদিন যে বললে শিখা ভাত বেড়েছে। … ?

কেন, লাইনের মেয়েরা কী ভাত বাড়তে পারে না।

না না, তা নয়। আমি তাড়াতাড়ি বলি, ও কি তোমার বাড়ি-টারি আসে না কি?

ও আমার বাড়ি আসবে কেন, আমি ওর বাড়ি যাই; প্রায় দিনই থেকেও যাই রাতে … ।

সে কী গো!

কেন অসুবিধে কোথায়; ও তো পাকাপাকি থেকে যাবার কথা বলে। কিন্তু ছেলেটার জন্যে ফিরে আসি; না হলে থেকেই যেতুম … ।

যাহ্‌, তা আবার হয় নাকি!

কেন হবে না। কানাইদা বলে, আমার তো বউ ছাড়া অন্য কিছু মনে হ্য়না ওকে।

কী যে বল। মৃদু প্রতিবাদ করে বলি আমি।

এবার সামান্য উত্তেজিতভাবে কানাইদা বলে, কেন নয় – ওর সঙ্গে শুই, মাঝে মাঝে সিনেমা যাই, বেড়াই, ও রান্নাবান্না করে, আমি বাজার করি, আমার জামাকাপড় কেচে দেয়, এমনকী সেদিন একটা জামায় রিপুও করে দিল; দু-হাত দূর থেকে বুঝতে পারবি না রিপু, মনে হবে নতুন জামা।

তবুও, এরা কি কখনও ঘরের বউ হতে পারে?

ঘরের বউ কেমন হয় রে?

তুমি যাই বল কানাইদা, আমি বলি, প্রসটিটিউডদের দেখলেই বোঝা যায়, চোখে-মুখে কেমন একটা ছাপ থাকে।

ভুল ধারনা, ভুল। জোরে মাথা নাড়তে নাড়তে কানাইদা বলে, সেটা বেশ্যাপাড়ায় ওদের দেখিস বলে। শিখা যখন সিঁদুর-টিদুর পরে মাথায় কাপড় দেয় তখন কে বলবে ও লাইনের মেয়ে … ।

আমি অবাক হয়ে বলি, সিঁদুর পরে নাকি?

হ্যাঁ, পরে তো!

ওর বর কে?

একটু চিন্তা করে কানাইদা বলে, এখন ধর আমি-ই।

আরও পড়ুন:  পথচলতি

একটু বুদ্ধি করে বলি, তাহলে দেখ, এখন তোমার নামে সিঁদুর দেয়, আগে হয়ত অন্য কারও নামে দিত, আবার তুমি না থাকলে অন্য কারও নামে দেবে … । ও সিদুরের কী দাম আছে?

কোনও সিদুরের তেমন কোনও দাম নেই। কানাইদা দার্শনিকের মতো মুখ করে বলে, পাঁচ-সাত টাকায় এই এত সিঁদুর পাওয়া যায়, সিঁদুর জিনিসটা মার্কেটে এখনও খুব চিপ। তোর বউ তো তোর নামে সিঁদুর পরত – কী লাভ হল তাতে! কেটে পড়ল যেদিন, সেদিন চান করে উঠে তোর ঘরে তোর পয়সায় কেনা সিঁদুর পরেছিল, সেদিনই হয়ত রাতে অন্য কারও সঙ্গে শুয়েছে, তখনও মাথায় সেই সিঁদুর।

এবার একটু জোরে বলি আমি, কুমকুম পালিয়েছে, এটা তুমি কিছুতেই নিশ্চিতভাবে বলতে পার না।

সামান্য উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলাম। কানাইদা একটু অবাক চোখে তাকায় আমার দিকে, তারপর মৃদু হেসে বলে, ঠিক আছে তোর বউ সতী ধরে নিচ্ছি; কিন্তু আমার বউ তো এরকমই করেছিল … । তাহলে ?

আমি উত্তর না দিয়ে চুপ করে থাকি।

এবার কানাইদা উত্তেজিতভাবে বলে, শোন, সংস্কৃতে একটা কথা আছে – তদ্রুপ তদবর্ণ তদগন্ধ । সব সমান রে ভাই; অনেক ধাক্কা খেয়ে এটা শিখেছি। বুঝলি ?

হ্যাঁ ।

কী বুঝলি ?

তুমি ভাল সংস্কৃত জান। কিন্তু প্লিজ আজ একবার তুমি আমার সঙ্গে চল, আমি ট্যাক্সি করে নিয়ে যাব।

কানাইদা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। কাজের মহিলা এঁটো কাপগুলো নিতে ঘরে ঢুকতে চুপ করে গেল।

মহিলা বেড়িয়ে যেতে কানাইদা বলল, এই যে কাজের মাসিকে দেখছিস, এ যৌবনে তিন-চার বার পালিয়েছিল।

বল কি!

আর কি – ওর বর ছিল কুড়ের বাদশা, তার ওপর রোগা-ভোগা, মাসির ভরা যৌবন; মাসি বেশ কয়েকবার নিখোঁজ হয়ে যায়; ফের ফিরেও আসে স্বামীর কাছে। ওর বর নির্ভরশীল ছিল ওর ওপর, তাই হয়ত মেনে নিত। এমনও হয়েছে, ফেরার সময় মাসি বরের জন্য ভাল ধুতি, গরম জামা বা পছন্দের ব্র্যান্ডের বিড়ি নিয়ে এসেছে। মাসির চার ছেলেকে এত আলাদা রকম দেখতে যে ওদের প্রকৃত বাবা কে, সেটা মাসি আর ভগবান ছাড়া কেউ জানে না।

মাসি দরজার সামনে দিয়ে কোথাও একটা যায়। আমি উঁকি দিয়ে দেখতে দেখতে বলি, কানাইদা, প্লিজ!

                      ( আট )

চণ্ডীতলা মোড়ে অটো থেকে নেমে ঘড়ি দেখলাম। সাড়ে চারটে। এর মধ্যেই সূর্য তাপ-উত্তাপ হারিয়ে পশ্চিম আকাশে ফর শো ঝুলে আছে। শীত আসছে। এদিকটা বেশ গাছপালা, তাই শীত শীত ভাবটা টের পাওয়া যায়। অতি কষ্টে রাজি করিয়েছি কানাইদাকে। কানাইদার সাফ কথা, যে গেছে তাকে যেতে দাও, আটকে রাখার চেষ্টা বৃথা। কানাইদার হাতে অনেক মেয়ে আছে, আমি যদি চাই, নিয়ে যেতে পারে। ঘরের বউয়ের সঙ্গে কোনও তফাতই নাকি করা যাবে না। ঘুরবে বেড়াবে, শাঁখা-সিঁদুর পড়বে – আদর সোহাগেও ঘাটতি হবে না কিছু। কথায় কথায় কানাইদা বলল, শিখা নাকি ওর কল্যাণ কামনায় ব্রত উপবাস অবধি করে, পুজো-টুজোও দেয়।

আমি বললাম, আশ্চর্য!

কানাইদা বলল, তা হলেই বোঝ! তোর বউ এসব করত?

বলি, করত, তবে সেসব আমার জন্যে নয় – ছেলে হবার আশায় অনেক কাণ্ড করত …।

কানাইদা বলে, শঙ্কর ঠাকুর কিন্তু বাঁজাদেরও ভাল ওষুধ দেয়।

তাই নাকি?

হ্যাঁ। শঙ্কর ঠাকুরের ওষুধ নিয়ে কত বউয়ের যে বাচ্চা হয়েছে ঠিক নেই –

বিলেত ফেরত ডাক্তার অবধি বলে দিয়েছিল বাচ্চার আশা নেই, সেরকম কেসও ঠাকুরের দয়ায়  ফল পেয়েছে … । আমারই তো পিসতুতো ভাই, বড় বড় ডাক্তার সব ফেল, স্পার্ম কাউন্ট না কী যেন বলে, সেটা কম ছিল ভাইয়ের, শঙ্কর ঠাকুর সারারাত ধরে একটা জাগ্রত হোম করেছিল, তারপর বছর ঘুরতে না ঘুরতেই মেয়ে হল …।

আরও পড়ুন:  বাঙালির ফুলশয্যা

আমি খুব আগ্রহ নিয়ে বলি, স্পার্ম কাউন্ট কম এমন কেসে বাচ্চা হয়েছে?

হয়েছে ।

তুমি শিওর? বেশ জোরেই বলি আমি।

কানাইদা চোখ সরু করে আমার দিকে তাকিয়ে বলে, কী ব্যাপার বলত; ডাল মে কুছ কালা হ্যায় মনে হচ্ছে!

আমি একটু ঘাবড়ে গিয়ে বলি, মানে!

তুই যে বললি, তোদের কারও কিছু গণ্ডগোল নেই; মনে হচ্ছে ঠিক বলিসনি আমাকে … ?

আমি দ্রুত সামলে নেবার চেষ্টা করি। বলি, নানা, সত্যি বলছি, বিশ্বাস কর … ।

কিন্তু পরিস্কার বুঝতে পারি, গলায় তেমন জোর ফুটে উঠছে না।

কানাইদা প্যাকেট থেকে সিগারেট বের করতে করতে বলে, তুই না চাইলে বলতে হবে না, আমার জাস্ট মনে হল, তাই বললাম … ।

আমি খপ করে কানাইদার হাতটা ধরি। বলি, তোমার কাছে লুকোব না কানাইদা – বিশ্বাস কর লজ্জায় বলতে পারিনি, কেউ জানে না ব্যাপারটা …।

আচমকা ধরতে কানাইদার হাত থেকে সিগারেটটা ছিটকে পড়ে রাস্তায়। আমি তাড়াতাড়ি ঝুকে কুড়িয়ে কানাইদার হাতে দিই। কানাইদা সিগারেটটা নিয়ে গম্ভীর গলায় বলে, হু।

ডায়াগোনিস্টিক সেন্টারের একটা স্টাফকে ম্যানেজ করে একটা ভাল রিপোর্ট বের করি … । বলতে বলতে গলা কেঁপে যায় আমার।

কানাইদা সিগারেট ধরিয়ে বলে, আরে এই সামান্য ব্যাপারে তুই এত সেন্টিমেন্টাল হচ্ছিস কেন? ওইসব কাউন্ট ফাউন্ট গুলি মার, আমি আগে জানলে ব্যবস্থা করে দিতুম।

খুব ভুল হয়ে গেছে বুঝলে কানাইদা, … একটা সন্তান থাকলে আমাদের এত প্রবলেম হত না – আজাকাল কী যে ঢপের ফ্যামিলি প্ল্যানিং হয়েছে বুঝি না, আমায় যদি ভগবান কোনওদিন দেয় তো অনেকগুলো বাচ্চা নেব – পায়ে পায়ে ঘুরবে সব – ছেলের সঙ্গে ব্যাটবল খেলব, মেয়ের জন্যে পুতুল কিনে আনব, দুপাশে সবকটাকে নিয়ে ভাত খেতে বসব … বুঝলে কানাইদা, ভুল হয়ে গেছে খুব … । বলতে বলতে বুঝতে পারি গলায় প্যাথোজ এসে যাচ্ছে। এইসব আবেগ টাবেগ ভাল জিনিস না, বিশেষত আমার মত গণ্ডোগোলে মানুষের কাছে; এ শালা এমন জিনিস সুযোগ পেলেই মনের সুরঙ্গ থেকে হুক মেরে কাঁচা সত্যিগুলো বের করে আনে।

থাক, এখন আফশোস করে লাভ নেই; তোর গাছটাই তো শালা ভ্যানিশ – গাছ থাকলে ফলের কথা ভাবা যেত, কিন্তু বউ ছাড়া ছেলে – ঠাকুরও কিছু করতে পারবে না। বলে নিজের রসিকতায় নিজেই হেসে ওঠে কানাইদা ।

ইঁটপাতা রাস্তায় পাশাপাশি হাঁটছি দুজনে। ঝুপ ঝুপ করে সন্ধে নেমে আসছে, গাছপালার মাথাগুলো আগেভাগে টেনে নিচ্ছে অন্ধকার। আধঘণ্টার বেশি হাঁটতে হবে এখনও।

ফোন বাজছে কানাইদার। স্ক্রিন দেখে কানাইদা রিসিভ করল কলটা। ফোনে কানাইদার কথা শুনে ভীষণ অবাক হয়ে গেলাম। কানাইদা খুব গদগদ হয়ে কাউকে তোষামোদ করল; তারপর বলল, তার বাড়ির কাছেই নাকি আছে, একটা দরকারি কাজে আটকে গেছে, ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই পৌঁছে যাবে।

আমি চোখের ইশারায় জিজ্ঞাসা করি, কে?

কানাইদা ফোনটা পকেটে রাখতে রাখতে বলে, শিখা।

খুব অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করি, তুমি একঘণ্টার মধ্যে যাবে কী করে, বললে যে ওকে … ।

কানাইদা বলে, পাগল নাকি ; একঘণ্টার মধ্যে কেন, তুমি শালা যে ফ্যাসাদে ফেলেছ, আজ আর যেতে পারব কিনা সন্দেহ।

তবে?

সিগারেটে একটা দীর্ঘ টান দেয় কানাইদা। তারপর বলে, ও যদি জানে আমি এখন কোথায় আছি, আজ হয়ত যেতেই পারব না, তাহলেই বিপদ – অন্য কাস্টমার বসাবে।

চলবে
 
 

৬ঠ পর্বের লিংক – http://banglalive.com/bengali-novel-dugdugi-by-ullas-mullick-part-6/

৫ম পর্বের লিংক –http://banglalive.com/bengali-novel-dugdugi-by-ullas-mullick-part-5/

৪ র্থ পর্বের লিংক –http://banglalive.com/bengali-novel-dugdugi-by-ullas-mullick-part-4/

৩য় পর্বের লিংক –http://banglalive.com/bengali-novel-dugdugi-by-ullas-mullick-part-3/

২য় পর্বের লিংক –http://banglalive.com/bengali-novel-dugdugi-by-ullas-mullick-part-2/

১ম পর্বের লিংক –http://banglalive.com/bengali-novel-dugdugi-by-ullas-mullick/

NO COMMENTS