(‘বাস্তুহারা’ শব্দটা এ বঙ্গের শব্দ ভান্ডারে বিপুল জনসমর্থিত ! নেতাজি কলোনি …আজাদগড়…হকার্স কর্নার …ব্যবসায়ী সমিতি…সুগন্ধী ধুপকাঠি…ভোট ব্যাঙ্ক…সাহিত্য সভা …সেতু…স্কুল…কমিটি…বাজার সর্বত্র অবলীলায় উড়ে এসে জুড়ে বসেছে এই শব্দবন্ধ – আগে হোক  বা পরে ! ব্যূত্পত্তি থেকে সরে গিয়ে ‘বাস্তুহারা’ শব্দার্থ এখন দাঁড়িয়ে গেছে  ইংরাজির ‘refugee ! যার নিকটতম বাংলা প্রতিশব্দ অবশ্য হতে পারে ‘আশ্রয়প্রার্থী’ বা ‘অভিবাসনপ্রত্যাশী’ বা ওইরকম কিছু !

নিজের দেশ থেকে সবলে উত্খাত হওয়া মানুষের ঢল যখন সীমান্ত পেরিয়ে অন্য কোনো দেশে আশ্রয় নেয় তখন বলাই বাহুল্য তাদের শরীরে, আত্মায় লেগে থাকে  পাশবিক অত্যাচারের কালসিটে, হেরে যাওয়ার গ্লানি ! সর্বার্থেই তারা তখন সর্বহারা! আশ্রয়প্রার্থিত ভূখন্ডে গিয়ে প্রায় সর্বক্ষেত্রেই তাদের কপালে জোটে সমপরিমাণ অবহেলা হেনস্থা ঘষটানি , এমনকি বুলেট ! যখন ধৈর্য ছাড়া হাতের কাছে  ধরার মত আর কিছুই থাকেনা ….ভূত-ভবিষ্যত-বর্তমান কিস্যু না …তখন কেউ কেউ আশ্রয় নেন কল্পনার !

প্রায় ধ্বংসস্তুপে পরিনত হওয়া সিরিয়া থেকে প্রতিবেশী দেশ লেবাননে আশ্রয় নেওয়া তেমনই একদল মানুষের স্বপ্ন -কল্পনাকে  কাহিনীর আকারে লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল  রাষ্ট্রপুঞ্জ পরিচালিত এক শিবির উদ্যোগে, সাল ২০১৫ এ ! আর কি আশ্চর্য সেই গল্পগুলোতে খুঁজে পাওয়া গেল রূপকথার ক্লাসিক চরিত্রলক্ষন, সৌন্দর্যবোধ ! খোঁজ মিলল স্বপ্নের গভীরতা, মেধাবী নীতিবোধ, ক্ষমতা ও অর্থনীতি সম্পর্কে নির্মোহ ধারণা ! গল্পগুলিতে মিশে রইল  বিবাহ ও নারীপুরুষ সম্পর্কের খুঁটিনাটি, স্বাধীনতার অভিপ্রায়, অধ্যাত্ম ও নিসর্গ সম্পর্কে অভিজ্ঞান ! কাহিনীগুলিকে সিরিয় আরবী থেকে ইংরাজিতে অনুবাদ করেছিলেন জুলেইখা আবু রিশা ! তাঁর বাড়ি আম্মানে ! আম্মান থেকে  কলকাতায় তাঁর সঙ্গে আমার যোগসূত্র বলতে ইন্টারনেট ! গল্পগুলো পড়তে পড়তে মনে হয়েছিল নির্বাসিত  সিরিয়ানদের স্বপ্ন -কল্পনার কাহিনী ঋত্বিক -জীবনানন্দের মাতৃভাষায় অনুবাদ করে নেওয়াই সমুচিত !)

 

অনেক অনেক বছর আগে খেঁজুর গাছের গ্রাম তহলুক থেকে আল-দূরের উট বিক্রির হাটে যাবার রাস্তায় একবার দেখা হয়ে গিয়েছিল আতিল গ্রামের আবু জেহেরের সঙ্গে তহলুক  গ্রামের বশীরের ! ব্যাপারটা হয়েছিল কি, ইবনে তহলুক সেদিন হাটে দুটো উমদা উট বেচে বেশ মালকড়ি কমিয়েছে | তা থেকে  অল্প কিছু দিয়ে একবোঝা বরবটির বীজ কিনেছে , সামনেই ফসল বোনার মরসুম ! উপরন্তু দু’এক পাত্র খেঁজুর তাড়ি গলায় পড়ে থাকবে, তাই বুঁদ হয়ে গান-ঠুমরী গাইতে  গাইতে সে কোরেদান তহলুকের দিকে  রাস্তা হাঁটছিল !

(গান)

মাটিতে মুখ নামিয়ে কেন কাজল কালো আঁখি !
হার মেনেছে  বেহেস্তও যার বে-নূরীতে , সাকী !!

অতর্কিতে পথের বাঁকে ভেসে এল প্রত্যুত্তর !

আরও পড়ুন:  আয় বৃষ্টি ঝেঁপে

( গানের বদলা গান )

জমীন তো চাই আড়াই হস্ত, মিথ্যে জীবন বা বেহেস্ত !
রবের কাছে উদয়াস্ত চাইছি শাকুন পর্যুদস্ত !!

ইবনে তহলুক হকচকিয়ে সামনে তাকাল আর দেখতে পেল ইবনে অতিলকে ! দুজনে পুরনো আলাপী ! ইবনে আতিল আবু জেহের তখন চলেছিল উল্টোপথে, মানে কোরেদান আতিল থেকে তহলুক হয়ে আল দূরের দিকে ! তাকে দেখে বেশ দুঃখী আর বিপর্যস্ত মনে হচ্ছিল ! চেনা লোক দেখে রাস্তার ধারে এক রুহবার্ব গাছের তলায় তার বরবটি বীজের বোঝা কাঁধ থেকে নামিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল ইবনে তহলুক বশীর !

– “কী ব্যাপার দোস্ত ,মেজাজ কিছু কাহিল মনে হচ্ছে ?”

– “মেজাজের আর দোষ কী ! একজন চাষা যখন ফসল বোনার মরসুমে হাত  গুটিয়ে বসে থাকতে বাধ্য হয় আর জমীন যখন তাকে প্রেমিকার মত আহ্বান করে, কিন্তু অক্ষম অসহায়তায় সেই ডাক এড়িয়ে গিয়ে সে পালিয়ে বেড়ায়, তখন জিন্দা থাকার আর কোনো অর্থই হয় না !”

কথা নয় আবু জেহেরের মুখ দিয়ে এক ঝলক তাজা রক্তই যেন ফিনকি দিয়ে উঠে এল !

বশীর ইবনে তহলুক আন্তরিক দুঃখই পেল আবু জেহেরের কথায় –

– “কিন্তু ব্যাপারটা কী ? ফসল বুনতে অসুবিধেটা তোমার হচ্ছে কোথায়, একটু খোলসা করে বললে ভালো হত না ?”

– “ব্যাপারটা খুবই মর্মান্তিক বন্ধু ! গতবার কুরবানির সময় আমার উটটাকে আমি জবাই করি কারন আমার বড়ছেলে কথা দিয়েছিল যে যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে সে আমাকে দুটো উট কিনে দেবে, কিন্তু এখন সে জানিয়েছে যুদ্ধ শেষ হতে আরো ঢের দিন লাগবে, এবং সে ফিরে না আসা পর্যন্ত উট কেনার ব্যাপারটা স্থগিত রাখতে  বলেছে ! এদিকে উটের অভাবে আমি জমীনে লাঙ্গল দিতে পারছিনা !”

– “সত্যিই দুঃখের কথা ! তোমার কথা শুনে আমার যে কী মনকষ্ট হচ্ছে কী বলব!”

– “দোস্ত ! আমাকে বাঁচাও ! এই বিপদে তোমার মত পুরনো বন্ধুরা যদি পাশে না দাঁড়ায় তবে কে দাঁড়াবে !”

– “সে তো বটেই, সে তো বটেই …তবে যুদ্ধ শেষ বা শুরুর ব্যাপারে আমার মত একজন চাষার কীই বা করার থাকতে পারে !”

– “ তা করার নেই বটে, কিন্তু কথা হচ্ছে ইবনে তহলুক তুমি চিরকালই বড়মনের মানুষ, আমি তো সেই ছোটবেলা থেকেই তোমার সেই দিলদরিয়া স্বভাবটাকে সম্মান করে এসেছি !”

–  “সত্যি বলছ !!”

–  “এ অবস্থায় তুমি কি আমাকে অবিশ্বাস করতে চাও দোস্ত ??’’

আরও পড়ুন:  সাগর আই লাভ ইউ (পর্ব ৫)

মর্মাহত শোনালো আবু জেহেরের গলার স্বর !

– “ছি ছি … তোমাকে অবিশ্বাস করার কথা আমার মাথাতেও আসেনি ! ওপরওলার কিরে !”

– “ওপরওলার কিরে ! একটা উট কেনবার জন্য ২০০০ টি লিরা যদি তুমি আমাকে ধার দিতে, তবে এ মরশুমে প্রাণপাত করে আমি ফসল বুনতাম ! তারপর  ফসল বিক্রি করে সুদসমেত তোমার সে ঋণ আমি নির্ঘাৎ শুধে দিতাম !”

– “ তা বটে, তবে ২০০০ লিরা অঙ্কটা যে বড্ড ভারী শোনাচ্ছে দোস্ত !”

–  “কিন্তু আজকে আল-দূরের হাটে সওদা করে তুমি কি একটা বড় রকমের লাভ করনি  ! তাছাড়া ওপরওলার কৃপায় তোমার দিনকাল তো বেশ ভালোই চলছে দোস্ত !”

– “ সে ঠিক ! তবে …”

– “ তবে আর কি ! তোমার ২০০০ লিরা ঋণ আমি এ মরসুমেই শোধ করে দেব ইবনে তহলুক…কিন্তু তোমার এই বন্ধুত্বের ঋণ কক্ষনো শোধ হবেনা …আর তার সাক্ষী থাকবে এই রুহবার্ব গাছ !”

ইবনে তহলুকের আর কিছু বলার অবকাশ ছিল না, জেব থেকে ২০০০ লিরা বের করে সে  তুলে দিয়েছিল ইবনে আতিল আবু জেহেরের  হাতে….আর তার সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে রইল সেই রুহবার্ব গাছ যা খেজুর গাছের গ্রাম তহলুক থেকে উট বিক্রির হাট আল–দূর যাবার রাস্তায় পড়ে !

লোকে বলাবলি করছিল যে সে মরসুমে আবু জেহেরের জমিতে দেদার বরবটি ফলেছে, কিন্তু বশীর  টাকা আদায় করতে গিয়ে জানতে পারল যে বরবটি যখন পেকে উঠেছে তখনই আবু জেহেরের জমিতে আকাশ থেকে হুরী-জিন নেমে এসে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে ! ফলে আবু জেহের তার কাছে আরো এক বছর সময় চাইল ২০০০ লিরা শোধ দেবার জন্য !

পরের বছর ফসল ওঠার মরসুমে ইবনে তহলুক আগেভাগেই গিয়ে হাজির হল আতিল গ্রামে আবু জেহেরের খামারে ! এবং জীবনে সেই প্রথম বশীর মিঁয়া জানতে পারে যে ইবনে আতিলের স্মৃতিশক্তি বড্ড দূর্বল, কেননা ২০০০ লিরা ধার নেওয়ার ঘটনাটা কিছুতেই সে মনে করতে পারল না ! এমনকি আল-দূরের হাটে যাবার রাস্তায় সেই রুহবার্ব গাছ এবং সেই গাছের নীচে ফসল বোনার মরসুমে ২ বছর আগে ইবনে তহলুকের সঙ্গে তার মোলাকাত  – অনেক চেষ্টার পরেও কোনকিছুই তার স্মৃতিতে ধরা দিল না !  শেষপর্যন্ত ইবনে তহলুক বশীর গিয়ে নালিশ করল কাজী সাহেবের কাছে !

kothachuri-Bangla-galpoকাজী সাহেবের চুল ও লম্বা সাদা দাড়ি দেখে বেশ বোঝা যায় তার দস্তুরমত বয়স হয়েছে ! মেজাজটা বড্ড খিটখিটে ! বাদী ও বিবাদী দুপক্ষের জবানবন্দি নেবার সময় তিনি চক্ষু দুটি মুদে রইলেন ! তারপর তিরিক্ষি মেজাজে ইবনে তহলুককে প্রশ্ন করলেন –

আরও পড়ুন:  ইডিয়ট

– “ঠিক কোন গাছের তলায় লেনদেনটা হয়েছিল সবাইকে দেখাতে পারবে?’’

– “বিলক্ষণ ! ওই তো কোরেদান তহলুক থেকে আল-দূরের হাটে যাবার সময় রাস্তা যেখানে বাঁক নিয়েছে, সেখানে একটা রুহবার্ব গাছের তলায় ….”

বিরক্ত মুখে ইবনে তহলুককে মাঝপথেই থামিয়ে দিয়ে কাজী সাহেব হুকুম করলেন –

– “ থাক থাক ! আর হুঁশিয়ারী জাহির করতে হবেনা, ওই রুহবার্ব গাছের একটা ডাল ভেঙে আনতে পারবে ?”

ইবনে তহলুক তখনই ছুটল আল-দূরের পথে আর কাজী সাহেব পরক্ষনেই চোখ বুজে ঢুলতে থাকলেন ! আবু জেহের, যে কিনা অভিযুক্ত, যে এতক্ষন হাসি হাসি মুখে সব শুনছিল, কাজী সাহেব ঘুমিয়ে পড়তে সে পড়ে গেল মহা ফাঁপরে ! কাজীর দরবার ছেড়ে চলে যাবার তো প্রশ্নই ওঠে না, কিন্তু এদিকে বশীর মিঁয়া কতক্ষনে গাছের ডাল ভেঙে হাজির হবে তার জন্যে হা পিত্যেশ করে বসে থাকতে হবে ! একঘেয়ে  বসে থাকতে থাকতে আবু জেহেরও একসময় ঢুলতে শুরু করল ! আর তার কিছুক্ষনের মধ্যেই তার নাক ডাকার আওয়াজ শোনা গেল !

আরো কিছুক্ষন পরে তন্দ্রা ভেঙে চোখ মেললেন কাজী সাহেব ! ঘুম আর বিরক্তি জড়ানো গলায় গজগজ করতে করতে আবু জেহেরকে জিজ্ঞেস করলেন –

– “ এই যে  ইবনে আতিল, তোমার বন্ধুটি গাছের ডাল নিয়ে কতক্ষনে ফিরবে বলতো ? আর কতক্ষন আমায় বসে থাকতে হবে এখানে ? ঠিক করে বল তো জায়গাটা এখান থেকে ঠিক কতদূরে ?”

ঘুম ভেঙে মস্ত হাই তুলে আবু জেহের বলল –

– “বেশি দূর নয় হুজুর এখান থেকে ! এই দেড় কোশ হবে সাকুল্যে ! তা বশীর মিঁয়া তো অনেকক্ষন গেছে, এতক্ষনে সেই গাছতলায় পৌঁছে যাবার কথা !”

এবার সজাগ হয়ে চোখ মেললেন বুড়ো কাজী সাহেব, আর আবু জেহেরকে বললেন-

– “ যদি গর্দানটা আস্ত রাখার সাধ থাকে তবে যাও এক্ষুনি ২০০০ লিরা নিয়ে এস, ইবনে তহলুক ফিরে আসার আগেই ! আমার সময় আর নষ্ট কোর না!”

তারপর বশীর মিঁয়া যখন রুহবার্ব গাছের ডাল সমেত ফিরে এল এতটুকুও সময় নষ্ট না করে কাজী সাহেব তার হাতে তুলে দিলেন পাক্কা ২০০০ লিরা !

- Might Interest You

1 COMMENT

  1. দারুন ভালো গল্প…এমন ছোট ছোট গল্প দিয়ে শর্ট টেলি সিরিজ বানালে দারুন হবে…আমার ভীষণ প্রিয় ডায়রেক্টর অনুরাগ বসু যেমন তৈরী করেছেন “শর্ট স্টোরিজ অফ রবীন্দ্রনাথ টেগোর”… যেমন পিকচারাওজেশন সেখানে, তেমন কাস্টিং, স্ক্রিপ্ট এভ্রিথিং…

    আপনার অনুবাদ খুব ভালোলাগল…পড়ার ইচ্ছে রইল আরো…

এমন আরো নিবন্ধ