অভিজিৎ তরফদার
স্বনামধন্য চিকিৎসক | তবে সাহিত্যের জগতেও অতি পরিচিত নাম | লেখা প্রকাশিত হয়েছে বহু অগ্রণী পত্র পত্রিকায় |

এক থেকে একশো গুনছিলেন রতিকান্ত।

এক দুই তিন চার …….. ছাব্বিশ সাতাশ আঠাশ ……..  ছেষট্টি সাতষট্টি আটষট্টি …….. গুনতে গুনতে হঠাৎ থেমে গেলেন।

না, এমনটা তো বলা হয়নি। বলা হয়েছিল উল্টোদিক থেকে গুনতে। একশো নিরানব্বই আটানব্বই । তিনি গোড়াতেই ভুল করে বসে আছেন।আসলে ছিয়াত্তর বছরের অভ্যেস। সারাজীবন সব সোজা সোজা করে এসেছেন। তিনকাল গিয়ে যখন এককালে ঠেকেছে ; চাইলেই সব উল্টো পারবেন কেন ?

আবার শুরু করলেন। আশির কোঠায় পৌঁছে মাথা গরম হয়ে গেল। উঠে পড়লেন। ভেড়াগুলো সব একরকম। বিরানব্বইয়েরটা যেমন দেখতে ছিয়াশিরটাও অবিকল সেইরকম। কাঁহাতক মাথা ঠিক রাখা যায় ?

উঠে দু’চক্কর পায়চারি করলেন। তিন ঢোঁক জল খেলেন। এই বয়সে জল খেলেই তলপেটে চাপ পড়ে। বাথরুমে গেলেন। বেরিয়ে এসে তালুতে হাত দিয়ে পরখ করলেন। এখনো দাউ দাউ করছে গরম। বাথরুমে ফের ঢুকে কল খুলে এক আজঁলা জল নিলেন মাথায় দেবেন বলে। দেবেন কি ? সারাদিন ছাদের ট্যাঙ্ক প্রখর গ্রীষ্মের রোদ খেয়েছে। এখনো জলে হাত দিলে ছ্যাঁত করে ওঠে। এ জল মাথায় দিলে আর দেখতে হবে না।

ড্রইংরুমই ডাইনিং, এক পাশে ফ্রিজ। দরজা খুলে মাথাটা ভেতরে ঢুকিয়ে দিলেন। এতক্ষণে ঠাণ্ডা হল। আড়চোখে ওপাশের বন্ধ দরজার দিকে তাকালেন। ছেলের বউ মন্দিরা ও ঘরেই ঘুমন্ত। জানতে পারলে তুলকালাম করবে। মাঝরাত্তিরে মাথায় ঠাণ্ডা লাগিয়ে জ্বর বাধালে ওরই ভোগান্তি।

কিন্তু রতিকান্তরও উপায় নেই। মাথা ঠাণ্ডা করতেই হবে। দরকার হলে ফ্রিজের ভেতর ঢুকেই সারারাত বসে থাকবেন। কিন্তু গরম মাথা ঠাণ্ডা না হলে শোবার ঘরে ফিরে যাওয়া নেই।

আগের গ্রীষ্মে এসি থেকে বুকে ঠাণ্ডা বসে গিয়ে নিউমোনিয়া। সেই থেকে মন্দিরার হুকুম – ফ্রিজ হঠাও’। তাতে অবশ্য দুঃখ পাননি রতিকান্ত। ফ্রিজের ঠাণ্ডা এমনিতেই সহ্য হয় না তাঁর। কিন্তু এখন যে রোগে ধরেছে, তা থেকে পরিত্রাণ পাবার কি কোনও উপায় নেই ?

ডাক্তারবাবু পরীক্ষানিরীক্ষা করে গম্ভীর মুখে এসে বসেছিলেন। রতিকান্ত ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, খুবই খারাপ দেখলেন ডাক্তারবাবু ?

ডাক্তারবাবু জবাব দিয়েছিলেন, লিভার কিডনি দুটোরই দোষ দেখা দিয়েছে।

  • হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে ? ডায়ালিসিস ?
আরও পড়ুন:  ছাগল ও চুমু

এতক্ষণে ডাক্তারবাবুর হাসিবিহীন মুখমণ্ডলে প্রতিপদের চাঁদের মতো একচিলতে হাসি দেখা দিল।

  • না না, তেমন কিছু নয়। খাবারদাবারের ব্যাপারে সাবধানতা। আর ওষুধ ……
  • কী ওষুধ খেতে হবে ডাক্তারবাবু ?
  • খাবার কথা বলিনি। বলেছি না খাবার কথা।
  • বুঝতে পারলাম না।
  • ওষুধ ব্যবহারে সংযত হতে হবে। ধূমধাড়াক্কা ওষুধ খাবেন না। দরকার হলে ওষুধগুলো দেখিয়ে নেবেন।

বলে প্রেসক্রিপশনের ওষুধগুলো থেকে খ্যাঁচ খ্যাঁচ করে দু’খানা বাদ দিয়ে দিলেন।

প্রেসক্রিপশন হাতে নিয়ে রতিকান্তর চোখ ছানাবড়া।

  • এ কি করলেন ডাক্তারবাবু ? তিন নম্বরটা তো ঘুমের ওষুধ। আজ ছাব্বিশ বছর ধরে ………
  • খেয়েছেন। আর খাবেন না।
  • না খেলে তো ঘুমই আসবে না।
  • আসবে না, আসবে না।
  • আপনার পায়ে পড়ি ডাক্তারবাবু, ওটা কাটবেন না।
  • বেশ, খাবেন, নিজের দায়িত্বে খাবেন।
  • কেন ? খেলে কী হবে ?
  • কী আর হবে ? ঘুমিয়ে ঠিকই পড়বেন। কিন্তু সে ঘুম আর ভাঙবে না।

ঘুম আর ভাঙবে না ? তার মানে ? এমন নির্দ্বিধায় চোখের পলক না ফেলে কথাটা উচ্চারণ করলেন ডাক্তার ? আজ যে ঘুমিয়ে পড়বেন, কাল আর ঘুম থেকে উঠে পোস্তর বড়া – ধোঁকার ডালনা – কচুর লতি দিয়ে ইলিশ মাছের মাথা নেই ? মরে যাওয়া অত সহজ ? এখনো যে তাঁর আরও অনেকগুলো দিন বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করে ! জিভের স্বাদ এখনো অটুট। বলতে নেই দীপিকার নাচও আড়চোখে দেখতে মন্দ লাগে না।

মনে মনে ডাক্তারের বাপান্ত করলেন রতিকান্ত। প্রতিজ্ঞা করলেন, জীবনে আর এই ডাক্তারের চেম্বার মাড়াবেন না। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ভয়ও পেলেন। যা বলল তাই যদি সত্যি হয় ? লিভার, কিডনি – দুটোই কমজোর। ঘুমের ওষুধ খেলে সত্যিই যদি ঘুম না ভাঙে ? এত সুন্দর পৃথিবী ! কাল থেকে সব ‘না’ হয়ে যাবে ?

প্রথম দিকে হাত যে না বাড়ান নি তা  নয়। ড্রয়ার খুলে ওষুধের স্ট্রিপ নিয়ে নাড়াচাড়া করেছেন। আড়চোখে চন্দনচর্চিত, রজনীগন্ধার মালায় শোভিত রানুর ছবিখানার দিকে তাকিয়েছেন। কী আর হবে ? ঘুম না ভাঙলে তোমার কাছেই চলে যাব। কিন্তু তারপরেই ডাক্তারবাবুর কথাগুলো কানের মধ্যে ঝনঝন করেছে ঃ নিজের দায়িত্বে খাবেন। আবার ওষুধের পাতা যথাস্থানে রেখে দেরাজ বন্ধ করে দিয়েছেন।

আরও পড়ুন:  সাগর আই লাভ ইউ (পর্ব ১১)

এই বয়েসে অনেক নতুন বন্ধু হয়। কেউ হেঁপো রুগী, কারও বা হার্টের অসুখ। তারাও শুনে মাথা নেড়েছে : না হে রতিকান্ত, ঘুমের ওষুধটা না খেতে পারলেই ভাল। বিশেষ করে তোমার যখন লিভার – কিডনি দুটোই।

ঘুমের ওষুধ না খেতে পারেন, কিন্তু ঘুম ?

ছাব্বিশ বছরের অভ্যেস, রাতারাতি বন্ধ করলে চলবে কেন ?

ঘুমের ওষুধ ত্যাগ করলেন রতিকান্ত, ঘুমও ত্যাগ করল রতিকান্তকে।

ঘুম না হওয়ার যে কী যন্ত্রণা, যে না পেয়েছে তার জানা নেই।

একজন বলল, দুপুরের ঘুম না ছাড়লে রাতের ঘুম আসবে না।

তা-ই করলেন রতিকান্ত। সারা দুপুর ছাতা মাথায় প্রখর গ্রীষ্মে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়ালেন। পরিত্যক্ত পার্কের নিঃসঙ্গ বেঞ্চে ভবঘুরের মতো বসে থাকলেন। কুকুরগুলো পর্যন্ত অচেনা মানুষকে শুঁকে শুঁকে তাঁর সঙ্গে আত্মীয়তা রচনা করে ফেলল। ঘুম কিন্তু এলো না।

কেউ কেউ পরামর্শ দিল, রাতে শোবার আগে ভাল করে পায়ের তলায় তেল মালিশ করে নিলে ঘুম আসতে বিলম্ব হয় না। পা স্লিপ করে পড়ে বাথরুমের কলে মাথা ঠুকে আব হয়ে গেল। সারারাত ঘুমের বদলে মাথার যন্ত্রণায় এ’পাশ ও’পাশ করলেন, ঘুম যেমন কে তেমনই অধরাই থেকে গেল।

আর একজনের পরামর্শে রাত্তিরে খাবার পর মাথা ভিজিয়ে স্নান করতে গিয়ে এমন ঠাণ্ডা লাগল, মন্দিরার দাবড়ানিতে সেটাও আর করতে সাহস হল না।

অম্রুতাঞ্জন থেকে কায়ম চূর্ণ, এক কোয়া রসুন থেকে হর্তুকির রস, কুলেখাড়া শাক থেকে গাঁদাল পাতা বাটা, যে যা বলল সমস্ত চেষ্টা করলেন রতিকান্ত। নিট ফল শূন্য।

সব শেষে এই ভেড়ার মাথা গোনা।

এক থেকে একশ অবধি ভেড়ার গুনতি। ভুল হল, একশ থেকে এক। অবধারিত ফল। আশি অবধি যেতে হয় না। তার আগেই ঠাণ্ডা নরম ঘুম প্রজাপতির মতো চোখে এসে বসে, এমনটাই শুনিয়েছিল লোকজন।

কোথায় কী ? গুনতে গুনতে প্রতিটা ভেড়ার বুক-পেট-শিং অবধি মুখস্ত হয়ে গেল, ভেড়ার ডাক কানে ঢুকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিতে থাকল, ভেড়ার নাদির গন্ধে অন্নপ্রাশনের ভাত পর্যন্ত গলা দিয়ে উঠে এল, শুধু ঘুমই এল না।

আরও পড়ুন:  মিউজিক্যাল চেয়ার

ধুত্তেরি বলে উঠে পড়লেন রতিকান্ত।

গরম মাথা ঠাণ্ডা করবার যা যা পদ্ধতি জানা আছে সব কটা প্রয়োগ করেও যখন লাভ হল না, অসহায়ের মতো রানুর ছবির সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। হাসি হাসি মুখে তাঁরই দিকে তাকিয়ে রয়েছে রানু। যেন বলছে, কেমন শিক্ষা দিলাম। ভেবেছিলে আমি ঘাড় থেকে নামলেই মুক্তি পেয়ে যাবে। হল তো ? পারলে ?

ছবির রানুর কাছ থেকেও সেরকম কোনও ভরসা না পেয়ে আবার বাইরের ঘরেই গেলেন রতিকান্ত। কী ভেবে টিভির সুইচ অন করলেন। তারপর সোফায় বসে রিমোটটা হাতে নিলেন।

কিছুক্ষণের মধ্যেই পর্দা জুড়ে ছবি ফুটে উঠল।

খবর। হানাহানি। খুনোখুনি। দেশে দেশে। ভাইয়ে ভাইয়ে। নইলে প্রতিবেশীকে। স্বামী স্ত্রীকে। স্ত্রী স্বামীকে। তাড়াতাড়ি রিমোটে আঙুল ছুঁইয়ে পরের চ্যানেল। হিন্দি ছবি। গান। সঙ্গে নাচ। অন্য সময় হলে খারাপ লাগে না, এখন অসহ্য লাগল। খেলা। মহিলাদের হকি। দূরদর্শন। সেটাও পার হয়ে গেলেন। এবারে বাংলা সিরিয়াল।

শাশুড়ি পুত্রবধূকে ধুইয়ে দিচ্ছে। পুত্রবধূর চোখ থেকে অশ্রুবিন্দু গাল বেয়ে নেমে আসছে। চ্যানেল চেঞ্জ। এখানেও শাশুড়ি-পুত্রবধূ। পুত্রবধূ শাশুড়িকে পালিশ করছে। পরের চ্যানেল। ছেলেকে বউয়ের বিরুদ্ধে বিষোচ্ছে মা। রিমোটে আঙুল। অন্য সিরিয়াল। মায়ের অপরাধের সাতকাহন ছেলের কাছে পেশ করছে বউ।

অবাক লাগল রতিকান্তর। চারটে চ্যানেল। চারটে সিরিয়াল। নামও আলাদা। অথচ এক কাহিনি। শুধু কাস্টিং আলাদা। ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে একটাই গল্প। চ্যানেল সার্ফ করে দেখে যেতে লাগলেন রতিকান্ত।

ঘুম ভাঙল মন্দিরার ডাকে – বাবা সোফায় বসে কেউ ঘুমোয় ! যান, ভেতরে যান, বিছানায় শোন গিয়ে।

সেই থেকে রতিকান্তর আর ঘুমের ওষুধ লাগে না। সোফায় বসে বাংলা সিরিয়াল চালান। দু’মিনিটের মধ্যে ঘুমের চুমু তাঁর দুচোখের পাতা ভিজিয়ে দেয়। ভাবছেন পেটেন্ট নেবেন। লিভার খারাপ ? কিডনির অসুখ ? ঘুমের ওষুধ বারণ ?

কোনও চিন্তা নেই।

বাংলা সিরিয়াল আছে না ?  

NO COMMENTS

এমন আরো নিবন্ধ