ইন্দ্রনীল সান্যাল
জন্ম ১৯৬৬ সালের ১৯ জুলাই | নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ থেকে স্নাতক‚ স্নাতকোত্তর পড়াশুনো পিজি হাসপাতাল থেকে | প্রথম প্রকাশিত গল্প উনিশ কুড়ি পত্রিকায়‚ ২০০৪ সালে | প্রথম উপন্যাস প্রকাশিত হয় সানন্দা পুজো সংখ্যায়‚ ২০০৮ সালে | প্রকাশিত উপন্যাসের সঙখ্যা দশ | তাঁর কাহিনি থেকে নির্মিত স্বল্প দৈর্ঘ্যের ছবি 'হাবাব' কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছে |

 ডক্টর রায় প্লিজ, আমার কথাটা শুনুন। অবুঝের মত মাথা নাড়বেন না। আপনারা, ডাক্তাররা, নিজেদের কী মনে করেন কে জানে! আজ থেকে চল্লিশ বছর আগে জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষায় চান্স পেয়েছিলেন বলে আজ আপনার একটা লেজ গজিয়ে যায়নি। নিজের খুশি মত ট্রিটমেন্ট করবেন, আমার কথা শুনবেন না… দিস ইজ জাস্ট নট ডান। এটা কর্পোরেট হসপিটাল। আয়্যাম পেইং থ্রু মাই নোজ। আমার কথা শুনতে আপনি বাধ্য। ভুলে যাবেন না, আমি কোনও আনপড়, গাঁওয়ার মেয়ে নই। অভিজাত পরিবারের সন্তান, কলকাতার নামকরা স্কুলের ম্যাথস টিচার। আমার মতামতের গুরুত্ব আছে। আপনি যদি আমার কথা না শোনেন, তা হলে আমি কনজিউমার কোর্টে যেতে বাধ্য হব। মিডিয়াকে সব কথা খুলে বলব।

   এই তো! এতক্ষণে আপনার চৈতন্য হয়েছে। বিরক্ত হলেও আমার কথা শুনতে আপনি আগ্রহী। আপনার চেম্বারে যাব? নো ওয়ে! এইখানে, এই আইটিইউ-তেই আপনাকে আমার কথা শুনতে হবে।

   ডক্টর রায়, আমার বয়স কম হল না। আগামী মার্চে পঁয়তাল্লিশ হবে। আমার জন্ম আজাদগড় কলোনিতে হলেও এখন থাকি বন্ডেল রোডের গ্যালাক্সি অ্যাপার্টমেন্টে। না না, বিরক্ত হলে চলবে না। এগুলো শোনা জরুরি। আপনি ডাক্তার হয়ে ডিটেইল্‌ড কেস হিসট্রির গুরুত্ব বুঝতে পারছেন না? স্ট্রেঞ্জ! মেডিক্যাল এন্ট্রান্সে চান্স পেয়েছিলেন কী করে? কোটা-ফোটা ছিল না কি?

   ছিল না? ভাল কথা। বাই দ্য ওয়ে, ডাক্তারি ডিগ্রি থাকলেই সে শিক্ষিত হয়ে যায় না। শিক্ষা অন্য জিনিস, যার কিছুটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দেয়। বাকিটা আসে পরিবার থেকে, ফ্যামিলি ভ্যালুজ থেকে।

   আমাকেই দেখুন। বাবা ছিলেন পুলিশ অফিসার। নকশাল পিরিয়ডে উমাশঙ্কর দাশগুপ্তর ভূমিকা নিয়ে কাগজে অনেক লেখালিখি হয়েছে। কত নেতাকে তিনি গ্রেফতার করেছিলেন, কত মেধাবী ছাত্রকে এনকাউন্টারে খুন করেছিলেন, লালবাজারের গরাদের আড়ালে কত কমরেডকে থার্ড ডিগ্রি দিয়েছিলেন… এই নিয়ে আজও গল্প, কবিতা, উপন্যাসের ছড়াছড়ি।

   মায়ের কথায় আসা যাক। তিনি ছিলেন স্কুলের হেড মিসট্রেস। সেই জমানায় সরকারি, বাংলা মাধ্যম ইশকুলে লেখাপড়া হত। ডিসিপ্লিন ছিল। অন্যায় করলে ছাত্রছাত্রীদের বেতের বাড়ি মারা হত। রড স্পেয়ার করলে চাইল্ড স্পয়েল হয়ে যাওয়ার প্রবাদটা শিক্ষক এবং গুরুজন- সবাই বিশ্বাস করতেন।

   আমি এই বাবামায়ের মেয়ে। কী পরিবেশে বড় হয়েছি বুঝতে পারছেন তো? সায়েন্সে মোটামুটি নম্বর পেয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পরে আর্টস নিয়ে পড়তে চেয়েছিলাম। বাবামা পড়তে দেননি। ওইসব লাইনে কোনও ফিউচার নেই। বাবামায়ের থেকে ভাল আর কে বুঝবেন? ওঁদের কথামত অঙ্ক নিয়ে মাস্টার ডিগ্রি করলাম। মা শিক্ষিকা ছিলেন বলে টিচিংকেই প্রফেশান করলাম। চাকরি পেলাম কলকাতার নামকরা স্কুলে। এখানে আমি অঙ্কের শিক্ষিকা। জ্যামিতি আমার স্পেশাল ইন্টারেস্ট। জিয়োমেট্রি টিচার হিসেবে স্কুলে আমার খুব সুনাম। 

   চাকরি পাওয়ার দু’বছরের মাথায় বিয়ে। বাবামা খবরের কাগজের ‘পাত্রপাত্রী বিভাগ’-এ বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন। একগাদা ছেলের মধ্যে থেকে চালুনি দিয়ে ছেঁকে বেছে দিলেন তিনটি ছেলেকে। বাবামেয়ের গাইডেন্স মেনে তাদের মধ্যে থেকে আমি অত্রিকে সিলেক্ট করি।

আরও পড়ুন:  ডুগডুগি (পর্ব ১০)

   অত্রি কলকাতার ছেলে। আর্ট কলেজ থেকে পাশ করে ফাইন আর্টসের চর্চা করে। যে সব শিল্পীর ছবি লাখ লাখ টাকায় বিক্রি হয়, তাদের তালিকায়, বিয়ের সময়ে অন্তত, অত্রি পড়ত না। নিজের খুশিতে ছবি আঁকলে তো আর পেট ভরে না। ওকে তাই বিজ্ঞাপনের লে আউট, বইয়ের প্রচ্ছদ, গয়নার ক্যাটালগ ডিজাইন, বাংলা মেগা-সিরিয়ালের লোগো- এইসব আঁকতে হত। কিন্তু সেই কারণে অত্রিকে বেছে নেওয়া হয়নি। ওরা কলকাতার বনেদি বড়লোক। বন্ডেল রোডের দেড়শো বছরের পুরনো বাড়ি। অত্রিই একমাত্র ছেলে। আমার শ্বশুর বার্মা-শেল কোম্পানির ম্যানেজার ছিলেন। অঢেল টাকার মালিক। রিটায়ার করার পরে পুরনো বাড়ি প্রোমোট করে গ্যালাক্সি অ্যাপার্টমেন্ট বানিয়েছিলেন। তারই সাততলায় অত্রিদের তিন হাজার স্কোয়্যার ফিটের ফ্ল্যাট। বিয়ের আগেই শাশুড়ি মারা গিয়েছিলেন। এই রকম পরিবারের বউ হওয়া কি চাট্টিখানি কথা?

   ভাগ্য কতটা সহায় দেখুন ডক্টর রায়, বিয়ের তিন বছরের মাথায় শ্বশুরমশাই মারা গেলেন। আমরা হয়ে গেলাম ওই ফ্ল্যাটের মালিক। আমার বাবামা তো তাদের মেয়ের জন্যে এই রকম নির্ঝঞ্ঝাট সংসারই চেয়েছিলেন! আজাদগড়ের কলোনি থেকে বন্ডেল রোডের অ্যাপার্টমেন্টে উঠে আসার পিছনের স্ট্রাগলটা বুঝতে পারছেন তো? বাই দ্য ওয়ে, আপনার বাড়ি কোথায়? মাইকেল নগর? সেটা আবার কোথায়? সাউথ না নর্থ চব্বিশ পরগনা? হোয়াটএভার!

   যা বলছিলাম। মাস্টার ডিগ্রি করলাম চব্বিশ বছর বয়সে, চাকরি পেলাম ছাব্বিশে, বিয়ে হল আঠাশে। সায়ক জন্মাল তিরিশ বছর বয়সে। পারফেক্ট টাইমিং কাকে বলে খেয়াল করেছেন তো? এখন, পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে এসে আমার আর অত্রির জয়েন্ট অ্যাকাউন্টে ভালই সঞ্চয়, মিউচুয়াল ফান্ড থেকে লাইফ ইনসিয়োরেন্স, মেডিক্লেম থেকে ন্যাশনাল সেভিংস সার্টিফিকেট- সব থরে থরে সাজান। না, শেয়ার নেই কোনও। আনসার্টেনটি আমার পছন্দ নয়। ম্যাথসের টিচার হিসেবে আমি শূন্য আর একের বাইনারি ল্যাঙ্গোয়েজ বুঝি। বুঝি ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট। সাদা আর কালোর মাঝখানে যে ধূসর এলাকা, সেটা আমার পছন্দ নয়। আমি মস্তিষ্কের শাণিত যুক্তি বুঝি। হৃদয়ের ন্যাকামিকে প্রশ্রয় দেওয়ার কথা ভাবতেই পারি না।

   কথা ঘুরে যাচ্ছে। সায়কের প্রসঙ্গে ফিরি। আমাদের ওই একটাই ইস্যু। দ্বিতীয় সন্তানের কথা ভাবিনি। অত্রি একটা মেয়ের জন্য রেগুলার ঘ্যানঘ্যান করত। কিন্তু সায়ক হয়ে যাওয়ার পরে, হাউ টু পুট ইট… আই হেট সেক্স। ভীষণ গা ঘিনঘিন করে। এই নিয়ে অত্রির অভিযোগ থাকলেও মেনে নিয়েছে।

   সায়কের কথা বলতে গেলে অত্রির কথা আসবেই। বিয়ের সময়ে ও স্ট্রাগলিং পেইন্টার ছিল। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যে ন্যাশনাল লেভেলে অত্রির ছবির বাজার তৈরি হয়েছে। ওর করা অয়েল অন ক্যানভাসের ভালই দাম। এই মাসে বেঙ্গালুরুর ন্যাশনাল গ্যালারি অফ মডার্ন আর্ট, পরের মাসে মুম্বইয়ের জাহাঙ্গির আর্ট গ্যালারি, তার পরের মাসে দিল্লির ইন্ডিয়া হ্যাবিট্যাট সেন্টার- কোনও না কোনও প্রদর্শনী লেগেই থাকে। কখনও একক, কখনও যৌথভাবে। ওকে যেতেও হয়। এখন বছরের মধ্যে ছ’মাস অত্রিকে বাড়ির বাইরে থাকতে হয়। সায়ক যখন জন্মায় তখন ওর এত ব্যস্ততা ছিল না। বেশির ভাগ সময়টাই বাড়িতে ছবি এঁকে আর লেখাপড়া করে কাটাত। সায়ক বড় হয়েছে অত্রির পেরেন্টিং-এ।   

আরও পড়ুন:  অস্তমিত সূর্য

   সায়কের আপব্রিঙ্গিং নিজের হাতে না রাখাটা আমার মস্ত ভুল, বুঝলেন ডক্টর রায়। সারাদিন স্কুল আর টিউশানি করে রাতে বাড়ি ফিরে এত ক্লান্ত থাকতাম যে সায়কের দিকে তাকানোর এনার্জিটুকুও পেতাম না। তা ছাড়া পটি-হিসিতে আমার খুব ঘেন্না। সায়ক আর অত্রিকে পাশের বেডরুমে শিফ্‌ট করে দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, ছেলেটা বাবার হাতে মানুষ হচ্ছে, হোক। 

   শিল্পী হিসেবে অত্রির নাম হওয়ার পরে ও যখন বাড়ির বাইরে থাকতে আরম্ভ করল, তখন সায়কের দিকে নজর দিতে বাধ্য হলাম। এবং বুঝতে পারলাম, অত্রির আদর খেয়ে ছেলেটা বাঁদর হয়ে গেছে। সায়ক দুনিয়ার সমস্ত পোকামাকড়, পাখপাখালি, জীবজন্তু আর গাছপালা চেনে। ভ্যারেন্ডা গাছের আঠা দিয়ে কী করে বুদবুদ বানাতে হয়, বকফুলের বড়া কী করে ভাজতে হয়, বাড়িতে কী ভাবে পিনহোল ক্যামেরা বানাতে হয়- এই সব আলতু ফালতু জিনিস মুখস্থ। ভোরবেলা পায়রাদের গম খাওয়ায়, বিকেলবেলা গোলপার্কের ফুটপাথ থেকে পুরনো, পোকায় খাওয়া বই কিনে গোগ্রাসে গেলে, রাতের বেলা আকাশের দিকে টেলিস্কোপ তাক করে বসে থাকে। আলপনা বা কলকা আঁকতে দিলে নাওয়া-খাওয়ার জ্ঞান থাকে না। অত্রিকে বললে বলে, ‘সবাই কি পড়াশুনোয় ভাল হয়? না কি সবাই ফার্স্ট হয়? ছেলেটাকে নিজের মত করে বড় হতে দাও।’  

   অত্রি এইসব হাবিজাবি কাজকে প্রশ্রয় দেয়। কিন্তু ওর কথা শুনে চললে তো আর ছেলে মানুষ হবে না! আমি  সায়ককে কড়া ডিসিপ্লিনে বেঁধে ফেললাম। সকাল সাতটায় ঘুম থেকে উঠে স্নান-খাওয়া সেরে সোজা স্কুল। বিকেলে বাড়ি ফিরে পোষাক বদলে, জলখাবার খেয়ে পড়তে বসা। হোম টাস্ক ঠিকঠাক করলে রাতে একঘন্টার জন্যে টিভি। বাকি সব কিছু বন্ধ। পাশাপাশি সায়কের পড়াশুনোর দায়িত্ব নিজের হাতে নিলাম। এবং দেখলাম, ও পড়াশুনোয় খুবই কাঁচা। সব সাবজেক্টে বিলো অ্যাভারেজ রেজাল্ট। অঙ্কতে স্পেশালি খারাপ। আর জ্যামিতির অবস্থা জঘন্য। জ্যামিতি বই খুললেই না কি ওর ঘুম পায়।

   আমি নিশ্চিত ডক্টর রায়, এই সবই অত্রির কুশিক্ষা। ও সায়কের মধ্যে জ্যামিতির প্রতি ঘৃণা ডেভেলপ করিয়ে দিয়েছে! সায়কের এখন ক্লাস নাইন। কিন্তু একটাও সম্পাদ্য বা উপপাদ্য জানে না। থিয়োরেম পরের কথা, ত্রিভুজ আঁকতে পারে না। ত্রিভুজ ছেড়ে দিন, সরলরেখা আঁকতে পারে না। আপনি জানেন ডক্টর রায়, জ্যামিতির সব প্রশ্নই শুরু হয়, ‘মনে করো এ-বি একটি সরলরেখা’ – এই বলে। অথবা ‘মনে করো এবিসি একটি ত্রিভুজ’ – এই বলে। কিন্তু সরলরেখা আঁকতে গেলেই সায়কের হাত থরথর করে কাঁপতে থাকে। ওর জিভ শুকিয়ে আসে, পটি পায়। স্ট্রেটলাইন একবার ওপর দিকে ওঠে, একবার নিচের দিকে নেমে যায়। দেখে মনে হয় আরশোলার পায়ে কালি মাখিয়ে খাতার পাতায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। অথবা ইসিজি মেশিন থেকে গ্রাফ বেরচ্ছে। অথচ ও কিন্তু সরস্বতী পুজোর সময়ে চালের গুঁড়ো দিয়ে ফ্ল্যাটের মেঝেতে নিখুঁত আলপনা দেয়। আমি মনে করি এটা প্যাসিভ অ্যাগ্রেশান। প্রতিবাদ করার সামর্থ্য নেই বলে অসুখের অভিনয় করে জ্যামিতিকে পাশ কাটানো। 

আরও পড়ুন:  লুকনো সব কোডখাতা

   কী বললেন ডক্টর রায়? এটা প্যাসিভ অ্যাগ্রেশান নয়? এটা প্যানিক অ্যাটাক? আমাকে দেখে সায়ক ভয়ে সিঁটিয়ে থাকে? আমাকে দেখলেই ওর মাথার মধ্যে ভয়ের বিষ্ফোরণ ঘটে? এত বড় কথাটা আপনি বলতে পারলেন? কোনও ছেলে তার মাকে দেখে ভয় পেতে পারে? এ কথা ঠিক যে আমি ওকে নানারকম ইনসাল্টিং কথা বলি। ক্লাসের ফার্স্ট বয়ের সঙ্গে তুলনা করে বলি, ‘তোর দ্বারা কিস্‌সু হবে না!’ কিন্তু এইসব তো সায়কের কিলার ইনস্টিংক্ট ডেভেলপ করার জন্যে ভোকাল টনিক! ফিটেস্ট হিসেবে আজকের সমাজে সারভাইভ করতে গেলে মাথা ঠান্ডা রেখে যাবতীয় প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে লড়াই করতে হবে। আমি সেটাই শেখাতে চাই।

   আজ স্কুল থেকে ফিরে দেখি সায়ক পড়ার টেবিলে বসে বারান্দার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। আমাকে ঢুকতে দেখে তাড়াতাড়ি লাইফ সায়েন্সের বই খুলল। আমি বইটা বন্ধ করে অঙ্ক খাতা এগিয়ে দিয়ে বললাম, ‘পিথাগোরাসের থিয়োরেমটা বল। ওই যে, দ্য স্কোয়্যার অফ দ্য হাইপোটেনিউস…’

   সায়ক চুপ। 

   আমি বললাম, ‘একটা সমকোণী ত্রিভুজ আঁক। এবিসি ইজ আ রাইট অ্যাঙ্গলড ট্র্যাঙ্গল।’

   সায়কের মাথা নিচু। চোখ মেঝের দিকে। আমি কান মুলে দিয়ে হিশহিশ করে বললাম, ‘মনে করো, ক-খ একটি সরলরেখা। আঁক।’

   সায়ক খাতার পাতায় পেন রেখেছে। হাত কাঁপছে থরথর করে। সাদা পাতায় আঁচড় কাটছে আর কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘পারছি না মা!’

   ‘সরলরেখা আঁকতে পারছিস না? আমি বিশ্বাস করব?’ আঙুলের গাঁটে স্কেলের বাড়ি মেরে বললাম, ‘আজ তোর ন্যাকামির শেষ দেখে ছাড়ব।’

   আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই সায়ক চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠল। এক দৌড়ে বারান্দায় গেল। সাততলার বারান্দার রেলিং টপকে ঝাঁপ দিল রাস্তা লক্ষ্য করে।

 আপনাকে তো আগেই বলেছি ডক্টর রায়, ঘটনাটা ঘটেছে মাত্র চল্লিশ মিনিট আগে। সায়কের হাতে আর পায়ে ফ্র্যাকচার হয়েছে, নাক আর কান দিয়ে ব্লিডিং হচ্ছে। মাথায় কোনও ইনজুরি নেই তো? একটু আগে কেন কনভালশান হল ডক্টর রায়? কর্পোরেট হাসপাতালের আইটিইউ-এর দামি চিকিৎসা পেয়ে সায়ক একটু আগেও চাঙ্গা ছিল। পাল্‌স অক্সিমিটার পিঁকপিঁক করছিল, কার্ডিয়াক মনিটরের জীবনরেখা এঁকেবেঁকে, উঠে নেমে বুঝিয়ে দিচ্ছিল- সব ঠিক আছে।

   হঠাৎ কী হল ডাক্তারবাবু? কার্ডিয়াক মনিটর স্ট্রেট লাইন শো করছে কেন? আমি তো চাই যে সায়ক মনিটরে আঁকাবাঁকা রেখা আঁকুক। আলপনা, কলকা, হিজিবিজি- ওর যা খুশি! আমার কথা না শুনে যে রকম ও বারবার আঁকে। তার বদলে নিখুঁত সরলরেখা আঁকতে ওকে কে বলেছে?

   ডক্টর রায়, প্লিজ আইটিইউ ছেড়ে চলে যাবেন না! আমার কথা শুনুন। কার্ডিয়াক মনিটরের ওই সরলরেখাটাকে আপনি ভেঙেচুরে তছনছ করে দিন! প্লিজ!

- Might Interest You

NO COMMENTS

এমন আরো নিবন্ধ

0 436

0 3598