‘কেনাকাটার সময় চাবি হারানো’ – এক কথায় প্রকাশ করো , এই প্রশ্নের উত্তরে এক পোঁদপাকা ছোকরা উত্তর দিয়েছে ‘বিকিনি’ । ওই যে ‘বিকিকিনি’ থেকে , ‘কি’ (Key) হারিয়ে বিকিনি ।
অন্তর্বাস যখন বহির্বাস হয় ,তখন তাকে বিকিনি বলা হয় । বিকিন এবং সুইমসুটের একই মায়ের পেটের বোন । বিকিনি পরিধান করে লোকে নিশ্চয় অষ্টমীর অঞ্জলি দিতে যায় না , এর সাথে সমুদ্র সৈকতের অদ্ভুত এক নাড়ির টান । শুধু অন্তর্বাস (ব্রা-প্যান্টি) পরে তো বাইরে বেরোনো যায় না , বা সমুদ্র সৈকতে সেক্সি পোজ দেওয়া যায় না । তাই, ব্রা-প্যান্টির উপর সামান্য ছুরি-কাঁচি-আঁকি-বুকির পর তৈরি হয় বিকিনি ।

যে বস্তুই ঢাকা তা রহস্যময় ,আকর্ষণ করে । খাবার টেবিলে এক বাটি গু ,সুন্দর একটা ঝুড়ি দিয়ে ঢাকা দিয়ে রাখুন । মাছি নাও আসতে পারে ,কিন্তু লোকে বলবে – ‘আঃ, নিশ্চয় ভালো মন্দ কিছু আছে।’ নারীশরীর অপার রহস্যময়তার উৎস। সামান্য স্লিভ থেকে স্লিভলেস হলে ইতিহাস পাল্টে যায় । তারপর ব্যাক লেস ,লো কাট , কতরকম কাটারিতে খুন হয় হাজার চদু । পোশাকের অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা নারী শরীরের গোপনীয়তা আন্দাজ করার চেষ্টা করে পুরুষদৃষ্টি । স্বমেহনে ফ্যান্টাসির ক্যানভাসে ফুটে ওঠে কত অজানা ভাস্কর্য। সমরেশ মজুমদারের ‘কালবেলা’ উপন্যাসের লাইনকে মাথায় রেখে লেখা যায় , কটা পুরুষ ,ব্লাউজের ভেতর স্তন ছাড়া হৃদয়ের ঠিকানা খোঁজার চেষ্টা করেন ! মেয়েরা যতই খিস্তি করুন , আর ছেলেরা যতই অস্বীকার করুক , সৃষ্টি এইভাবেই চলছে। ভালো মন্দ জানিনা ।

পুরুষদের নোলা নিশ্চয় সারাক্ষন ছোঁক ছোঁক করছে নারীশরীরের দর্শনসুখ লাভের জন্য । নারীরাও কি একেবারেই দেখাতে চান না ! তারাও কি সবসময় ঢেকে রাখতে চান অনির্বচনীয় সৌন্দর্য্য ! তারাও কি এনজয় করেন না , তাদের ফিগার নিয়ে ছেলেরা আলোচনা করুক । রিভিল করার দিল সবার থাকে না । যদিও সবার কপালে এমন আলোচনা উদ্রেককারী ফিগার জোটে না । বাঙালিদের মধ্যে বিকিনি-বিলাস লক্ষ্যনীয় । আসুন সেই ব্যাপারে কিঞ্চিত আলোকপাত না করে টর্চ মারি ।

বাঙালি ললনাদের বিকিনি পরা প্রসঙ্গে ওই গানের লাইনটার কিঞ্চিত প্যারোডি বানিয়ে লেখা যায় – ‘তারে পরি পরি মনে করি,পরতে গেলে আর পারি না ।’একটু খেয়াল করলেই বুঝতে পারবেন বাঙালি মেয়েরা নিজেদের মতন বিকিনিকে ডিফাইন করে নিয়েছে । এই আলোচনা থেকে আমি অবশ্যই ,মডেল ,অভিনেত্রী এদের বাদ দিচ্ছি । যেটা বলছিলাম , বিকিনির বঙ্গ সংস্করণ । বিকিনি পরার কিছু সমস্যা আছে । বিকিনি পরার জন্য সুন্দর এক বালিঘড়ি ফিগার দরকার । তার নাকি কী সব মাপজোক আছে । এই ফিগার সকলের থাকে না । সাইজ জিরো ফিগার বানাতে গিয়ে অনেকেই অ্যানিমিয়া অথবা লো প্রেশারের রোগী হয়ে জান । টুনটুন থেকে করিনা কাপুরের যাত্রাপথ অপেক্ষা অমরনাথ যাত্রা অনেক সহজ । তারপর ল্যাদ সামলে জিমে যাবার অনেক হ্যাপা । ফাস্ট ফুডের লোভ সামলানো অসম্ভব । এসব কালোয়াতি ওই মডেলদের জন্যই তোলা থাক । যদিও অনেকে এইসব ফিগারের হিসেব নিকেশ উলটে বিকিনি পরে নেন । মাই বিকিনি ,মাই ফিগার ,মাই চয়েস ।

আরও পড়ুন:  বিশাল লাফে নদীখাত পেরিয়ে রক্তাক্ত চৈতক মুখ থুবড়ে পড়ল...প্রভুকে বাঁচিয়ে চোখ বুজল বাহক

আর একটা সমস্যা খুব জটিল । এই যুগটা হল ছবির যুগ । অবজেক্ট নয়, তাঁর রিফ্লেকশনটাই আসল । মানে ধরুন আপনার মুখটা একতাল কাঁচা গোবরের মতন ,কিন্তু ক্যামেরার দামী লেন্স এবং কম্পিউটারের কারসাজিতে সেই গোবরমুখো হয়ে গেলো পাত্র-পাত্রী বিজ্ঞাপনের পানপাতামুখো মডেল । সুতরাং , বিকিনি যদি পরেন ,তাহলে ছবি তুলতেই হবে । শুধু তুললেই হবে না ,সেটা আপলোড হবে ফেসবুক ,ইনস্টাগ্রামে । তারপর লাইকের বন্যা । বিকিনি এমন এক পোশাক যেখানে বলা যায় না ,’পরুন ও পরান’। এখানে বলতে হয় – ‘পরুন ও দেখান ।’কিন্তু ,হাজার হোক বিকিনি একটি অসব্য পোশাক । এতো রিভিলিং পোশাকের ছবি কি ফেসবুকে দেওয়া যায় !সেখানে ছোটো মাসি আছে ,নন্দাই আছে , রাঙা পিসি আছে ,মামাদাদুও আজকাল ফেসবুক করছে একটা ফেক প্রোফাইল সহ !সবচেয়ে ভয় ,বরের বন্ধুগুলোকে । সব কটার বাড়িতে বউ আছে ,কিন্তু ফেসবুকে সার্চলাইট নিয়ে বসে আছে । বিকিনি পরা ছবি দেখলে , নালের তোড়ে অফিস ভেসে যাবে ! কী আর করা যায় বলুন । নবারুন বাবু লিখেছেন – ‘বাঙালি শুধু খচ্চর নয় , তদুপরি অসহায় ।’ এই সব নালফেলুর দল বাড়িতে নাইটিবাসী সোনালির মধ্যে সানি লিওনকে খুঁজতে গিয়ে বারবার ব্যর্থ । স্টার জলসা খুঁড়লে নটি আমেরিকা বেরোয় না দাদা ! বিকিনি পরে যদি ছবিই না দেওয়া যায় ,তাহলে কীসের বিকিনি পরা বলুন ! বিকিনি তো রোজ রোজ কেউ পরে না । আর স্বামীকে দেখিয়ে কী লাভ ,স্বামী তো সবকিছুই দেখে ফেলেছে !আবার বিকিনির ছবি সোশাল মিডিয়াতে দিতেও কেমন লাগে । মেন পয়েন্টগুলো বাদ দিয়ে সব কিছুই দেখা যাচ্ছে । এ এক অদ্ভুত দোনামোনা । পরবো কি পরবো না ,ভেবে ভেবে ,হায় রে পরা তো হলো না !

যে কথাটা আগেই উল্লেখ করেছি ,বিকিনির বঙ্গ সংস্করণ । বুঝতেই পারছেন ,আসল বিকিনি পরা চাপ । তাই , রসগোল্লা না পেলেও নেহাত নকুলদানাও যদি কপালে জোটে মন্দ কি ! এ ব্যাপারে আলোচনা করতে গেলে , বাঙালিদের প্রচলিত কিছু ধারনার কথা বলতেই হয় । যেমন ধরুন ,যৌনতা খুব খারাপ জিনিস । এটি নোংরা ,ঈশ ,ছি ,ম্যাগো । এদিকে পেটে খিদে ,মুখে লাজ ! সঙ্গম সকলের জন্মগত অধিকার । কিন্তু,ছুতমার্গ , মানে বিয়ের আগে ! এদিকে যতই ঈশ ,অসব্য বলুক , বাংলা গান বেজে বেজে পচছে না – ‘আর কতো রাত একা থাকবো ।’এখানে ‘আর কত দিন একা থাকবো’ বললেই ঝামেলা মিটে যেত । কিন্তু,আর কত রাত ! মোক্ষম সুড়সুড়ি !

আরও পড়ুন:  প্রতি মাসে প্রায় ৩ লাখ টাকা...কীসে খরচ করেন এই চিকিৎসক-অভিনেতা ? জানলে অবাক হয়ে যাবেন

বাঙালি মেয়েদের (সবাই নয়) বিকিনি পরার শখ কম নয় ,তাই বিকিনি পরিধানের সমস্যার কথা মাথায় রেখে এসে গেছে বং বিকিনি । কিন্তু,রুক্মিণী থেকে বিকিনির যাত্রা মসৃণ নয় । অনেক মেয়েরাই মনে করেন ,পুরুষ মাত্রই ধর্ষক ,যেন পুরুষের নিঃশ্বাসে বীর্য আছে । যাই হোক , বেশিরভাগ বাঙালি মেয়েরা কলেজ-ইউনিভার্সিটির জীবনে চুড়িদার-কুর্তি-জিনস আর অষ্টমী-বাণীবন্দনায় বুটিক শাড়ি দিয়েই ফ্যাশনের রসনা তৃপ্ত করে নেন । কয়েকজন হয়তো একটু খোলামেলা পোশাক পরেন । তাঁদের দিকে বেশিরভাগ মেয়ে আড়চোখে তাকায় ,আড়ালে বলে – ‘মেয়েটা কী বাজে বাজে ড্রেস পরে । বেশি বেশি দেখায় !’আসলে সবটাই হিংসে !যারা এইসব কথা বলেন ,প্রকৃতির নিয়মে তাঁদের বিয়ে হয় ,এবং বিয়ের পর হনিমুন হয় । এখন আবার বাঙালিরা পশ্চিমবঙ্গে থাকেন না । অনেকেই বিদেশে থাকেন । সেই যে এভারগ্রিন বুড়ো দেব আনন্দ ,আর টিনএজ টিনা মুনিমের গান আছে – ‘জয়সা দেশ ,ব্যায়সা ভেস ,ফির কেয়া ডরনা ।’এইখানেই রুক্মিণী থেকে বিকিনি যাত্রার ক্লাইম্যাক্স । প্রথমে ,আসি যারা দেশেই থাকছেন । এরা হানিমুনে গোয়া জাতীয় কোনো সমুদ্র সৈকতে হাজির হন । এবার যে সব মেয়েরা ,এককালে স্বল্পবসনাদের দিকে তাকিয়ে মুখ ভ্যাংচাতেন ,তাঁরাই স্বল্পবসনা হয়ে গেলেন । হানিমুন একবার এসেছিল জীবনে !এখন বাঙালি হানিমুনে বিদেশ ভ্রমণে মজেছে । ব্যাংকক ,পাটায়া ছুটছে হানিমুন কাপেলের দল । ওখানে চারিদিকে বিকিনি সুন্দরীদের দেখে নতুন বউ এর শখ বিকিনির । তাই ,একটা সবচেয়ে ছোটো মাপের হট প্যান্ট , বং উপরে একটা স্প্যাগেটি টপ ,এই হল বঙ্গ বিকিনি । এর সুবিধা হলো ,এর মধ্যে একটা বিকিনি বিকিনি ব্যাপার আছে ,এটা পরে ছবি তুলে বিনা দ্বিধায় ফেসবুক ,ইনস্টাগ্রামে দেওয়া যায় । এই পোশাকের সঙ্গে অবশ্যই হাতে শোভা পায় শাঁখা-পলা ,না ওঠা মেহেন্দি । একটা নতুন বিয়ে বিয়ে ,এবং সোয়ামির সঙ্গে ইয়ে ইয়ে , ব্যাপার ফুটে ওঠে । হানিমুনের জন্য স্পেশাল শপিং হয় । যারা ধরুন বিয়ের পর ,বিদেশেই থাকবেন তাঁদের কাছে এই পোশাক অবশ্য জলভাত । ফলে ,যারা হনিমুনে গিয়ে একবার ওই বঙ্গ বিকিনির পরিধানসুখ পরবর্তী ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামের লাইকসুখ উপভোগ করেছেন ,তাঁদের মতন কপাল এঁদের নেই । সেই যে কলকাতার ফুলপ্যান্ট ,নিউ ইয়র্কে পৌছে হট প্যান্ট হয়ে আধুনিক হয়ে গেলো ,সে বিকিনি অবধি পৌছে আর উত্তর-আধুনিক হতে পারলো না । এতো ঝুট-ঝামেলা সত্ত্বেও সত্যি কিছু বঙ্গ ললনা বিকিনি পরেন । মারাত্মক সংযমের পরিচয় দিয়ে তাঁরা ছবি তোলেন না ,তুললেও আরও অনেক বেশি সংযমের পরিচয় দিয়ে কোথাও আপলোড করেন না ।
লেখার শেষলগ্নে একটা পাদটীকা । দেব অভিনীত ‘চাঁদের পাহাড়’দেখবার আগে অবধি আমি জানতাম না ,বুনিপ কেমন দেখতে । আমিও ফেসবুক পাড়ায় ঘুরতে ঘুরতে একদিন বিকিনি পরা বুনিপের ছবি দেখি ,গোয়ার সি বিচে তোলা । বিকিনি পরা বুনিপ আমি দেখিয়াছি ,তাই পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর ।

আরও পড়ুন:  সাগর, আই লাভ ইউ (পর্ব ৪)
- Might Interest You

3 COMMENTS

  1. khuuub bhalo.sabek prasansha adhunik lekhaak babajir prapya.ekdam adarsha ramya rachana.ramya srilekha,ramya swastika ityadi. bikini bong.pung.nei bole sironam adha sarthak