১৯৫৭ কি ’৫৮ হবে | উত্তম-সুচিত্রা অভিনীত অসিত সেনের ছবি ‘জীবন তৃষ্ণা’ সবে মুক্তি পেয়েছে | এই ছবির সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে তখন নাম হয়েছে অসমের সঙ্গীতশিল্পী ও সুরকার ভূপেন হাজারিকার | উত্তমকুমারের লিপে গেয়েছিলেন ভূপেন | গানটা ছিল ‘সাগরসঙ্গমে সাঁতার কেটেছি কত ‘ | এই গানটা তিনি লিখেছিলেন অসমিয়া ভাষায় | জাহাজে বসে আমেরিকা থেকে ফেরার সময় |প্রশান্ত মহাসাগরের রূপ দেখে |

পরে ওই গানের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘গান লেখা আর সুর করার ব্যাপারটা আমার সব সময় স্বতঃ স্ফুর্তভাবে আসে |’ আমেরিকা থেকে ডক্টরেট করে আফ্রিকা হয়ে ফেরার সময় গানটা লিখি, ঠিক এই ভাবেই লিখি শিকাগো যাবার পথে ট্রেনে যাবার সময়, ‘রেল চলে মোর রেল চলে |’ এই গানটা পরে বাংলায় রেকর্ড করি এইচএমভি কোম্পানি থেকে |’

আমেরিকা সফরের সময় ভূপেন হাজারিকার জীবনে ঘটেছিল একটি স্মরণীয় ঘটনা | নিউ ইয়র্কে একটি মেয়ের সঙ্গে পরিচয় হল  | নাম প্রিয়াম্বদা পাটিল | বরোদার মেয়ে  | পড়াশোনা শান্তিনিকেতনে | ওর তখন পড়া শেষ | তার তখন ফেরার পালা | জানি না, শিল্পীর মধ্যে কী দেখেছিলেন প্রিয়ম্বদা  | প্রথম দেখাতেই প্রেমে পড়লেন  | ভূপেনের তখন মাথায় বাজ পরার দশা | তিনি কিছুতেই মেয়েটিকে বুঝিয়ে উঠতে পারছেন না, তিনি চালচুলোহীন শিল্পী | বাউন্ডুলে | আজ এখানে তো কাল সেখানে| কোনো বাধা চাকরি নেই | বাঁধাধরা রোজগার নেই | এমন ছন্নছাড়া জীবনের সঙ্গে কি করে ফুলের মত নরম মেয়েটিকে জড়ান ? প্রিয়ম্বদা কানেই তুললেন না ভূপেনের কথা | ছিনে জোকের মত রইলেন ভূপেনের সঙ্গে | শেষে বাধ্য হয়ে ১৯৫০-এ আমেরিকায় ভূপেন বিয়ে করলেন তার প্রিয়া-কে |

প্রিয়ম্বদার সঙ্গে ভূপেন

এবার ঘর টানছে ভূপেনকে | প্রিয়ম-কে নিয়ে ১৯৫৪-তে গুয়াহাটিতে ফিরলেন শিল্পী | শুরু হলো সংগীত জীবন | এই সময় ভূপেন যোগ দেন গণনাট্য সংঘে | পান বাজারে তখন থাকতেন গণনাট্যের প্রাণপুরুষ হেমাঙ্গ বিশ্বাস | ওর সংস্পর্শে আসার পর দুজনে মিলে ঠিক করলেন, সারা উত্তরপূর্বাঞ্চলের মানুষদের নিয়ে গুয়াহাটিতে একটি বড় অনুষ্ঠান করবেন | রোজ ২২ হাজার লোক ১টাকা করে টিকিট কেটে সেই অনুষ্ঠান শুনতে আসত | বিনা পারিশ্রমিকে ওই সম্মেলনে অংশ নিয়েছিলেন বলরাজ সাহানি, সলিল চৌধুরী, সুচিত্রা মিত্র, দেবব্রত বিশ্বাস ও ওমর শেখ |

আরও পড়ুন:  অঙ্কিতাকে এড়াতেই কথা দিয়েও অ্যাওয়ার্ড শো-তে এলেন না সুশান্ত সিং রাজপুত

গুয়াহাটিতে আসার পর অসম সরকার দু’বছর গান গাইতে দেয়নি ভূপেন হাজারিকাকে | সব গান ব্যান করেছিল | এমনকী বিহু উৎসবেও তার গান নিষিদ্ধ ছিল | মুখ্যমন্ত্রী বিষ্ণুরাম মেধা পর্যন্ত বলেছিলেন, ভূপেন নাকি কমিউনিস্ট | কেন এমন ধারণা জন্মেছিল সবার মনে ? কারণ, তিনি কমিউনিস্ট পার্টি-র মেম্বার ছিলেন না বটে | কিন্তু গণনাট্য সংঘের হয়ে গান গাইতেন, তাই | সরকারের বিরুদ্ধে সেই সময় মুখ খুলতে পারেননি ভূপেন | কিন্তু মনের জ্বালা প্রকাশ করেছিলেন কালি-কলম আর কন্ঠ দিয়ে | ওই সময় তার সৃষ্টি ‘প্রতিধ্বনি শুনি’-র মত চিরকালের গান |

এরপরেই অসম ছেড়ে কলকাতায় চলে আসেন ভূপেন হাজারিকা | কলকাতায় আসার আগে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের মত নিয়েছিলেন শিল্পী | ভূপেনকে হেমাঙ্গবাবু এই পরামর্শ দিয়েছিলেন, ‘পৃথিবীর মানুষ তোমায় চায় | তাই শুধু অসমে থাকলে তোমার চলবে না | পৃথিবীর সঙ্গে লড়াই করতে হলে কলকাতা মহানগরীতে চলে এস |’ মৃত্যুর আগে হেমাঙ্গ বিশ্বাস এক প্রথম শ্রেণীর পত্রিকায় সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘ভূপেন-ই একমাত্র শিল্পী, যেকোনো সময় মানুষের মনে ঝড় তুলতে পারে |’

হেমাঙ্গবাবু খুব মিথ্যে বলেননি | কলকাতার ওয়েলিংটন স্কোয়ারে গণনাট্য সংঘের হয়ে গান গেয়ে পরের দিন সব দৈনিক পত্রিকায় হেড লাইন হয়ে গেলেন ভূপেন হাজারিকা | মুম্বই-এ সলিল চৌধুরী গণনাট্য সংঘের হয়ে একটা ইউথ কয়ার করেছিলেন | তাতে মহম্মদ রফি গেয়েছিলেন ‘ধিতাং ধিতাং বলে |’ আর ভূপেন গাইলেন ‘দোলা, এ দোলা’, ‘সাগর সঙ্গমে’ গানগুলো | প্রচণ্ড জনপ্রিয় হয়েছিল তাঁর এই সব গান | আর সারা ভারতের মানুষের কাছে বিশেষ ভাবে পরিচিতি পেলেন অসমিয়া গায়ক | শেষে গানকেই তিনি জীবিকা করলেন | শুধু জীবিকা নয়, গান-ই তাঁর হাতিয়ার, প্রাণ এবং জীবন |

কোনদিন তিনি অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেননি | আর তাঁর প্রতিবাদের ভাষা ছিল গান | অন্যায় দেখলেই প্রতিবাদে ভিতরটা ঝলসে উঠত | আর কলম দিয়ে বেরিয়ে আসত কালজয়ী গান | ১৯৬০-এ গণহত্যালীলার বিরুদ্ধে তিনি গেয়ে উঠেছেন ‘মানুষ মানুষের জন্যে |’

আরও পড়ুন:  বিপাশা কি নিজের প্রেগন্যান্সির খবর লুকনোর চেষ্টা করছেন!?

গানে নিজেকে মেলে ধরলেও কখনো এক গাদা গান গাওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন না ভূপেন | অনেকে ভাবতে পারেন, এতো অল্প গান গেয়ে কীভাবে এত জনপ্রিয় হলেন তিনি ! এই প্রশ্ন তাকে হেমাঙ্গবাবুও করেছিলেন | উত্তরে শিল্পী বলেছিলেন, ‘পুরনোকে আকড়ে ধরে বাঁচতে শিখিনি | বরাবর নতুন প্রজন্মের চাহিদাকে মিশিয়ে দিয়েছি আমার সৃষ্টির মধ্যে |’

এ বছর শিল্পীর ৯১তম জন্মদিন | আজও ভূপেন হাজারিকা সমসাময়িক, প্রাসঙ্গিক | এখানেই তাঁর শিল্পী সত্তার সার্থকতা | তাঁর সৃষ্টির সাফল্য |

1 COMMENT

  1. অন্যতম জনপ্ৰিয় এইগৰাকী শিল্পী