বাংলালাইভ রেটিং -

ইংরেজি একটা খবরের কাগজের কলকাতা এডিশনে দিন কয়েক আগে কৌশিক গাঙ্গুলীর ইন্টারভিউ বেরিয়েছে একটা। সিনেমা রিলিজের আগে আগে ছবি প্রোমোট করার জন্যে যেরকম ছাপা হয় আর কী। তা সেটা পড়তে গিয়ে দেখি, প্রতিবেদক সেখানে এটাও জানতে চেয়েছে যে এই ‘বিসর্জন’ ছবিটার আইডিয়া আপনি কনসিভ করলেন কী করে কৌশিক?

এর খুব সাদামাটা একটা উত্তর দিয়ে দায় সেরেছেন তিনি। যেটা বলতে চেয়েছেন সেটা যুগ যুগ ধরে বলে আসছে ক্রশ-বর্ডার লাভ স্টোরির পরিচালকেরা সবাই। যে, দুটো পাশাপাশি দেশের মধ্যে আকাশ বাতাস নদী কিংবা পশু-পাখিদের মধ্যে বর্ডার নামে কনসেপ্টটাই নেই। তাহলে তো এটা খুব ন্যাচারাল যে মানুষের ভালবাসাও সেই বর্ডার টপকে উপচে যাবে ওপারে। আরও যেটা বলেছিলেন সেদিন কৌশিক যে ওঁর বাবা নিজেও নাকি কুমিল্লার মানুষ, কথা বলতেন বাঙাল ভাষাতেই। সেসব কিছুর থেকেই নাকি এই ছবিটা তৈরির অনুপ্রেরণাটা পাওয়া।

সিনেমাটা তো দেখি নি তখনও, কিন্তু ইন্টারভিউয়ের এই অংশটা পড়ে ধোঁয়াটে লাগলো কেমন। বর্ডার-পেরনো লাভ স্টোরি তো ছবির দুনিয়ায় বোধহয় আরও হাজার একটা আছে। আর সেগুলোর সবকটার লজিকও তো মোটামুটি এরকম বলেই জানি। সেই এক কথাগুলো এখানে ফের রিপিট করার মানেটা কী, শুনি?

আর এটাও তো মানতে পারা কষ্টের যে, কোথাও কোন লুকিয়ে রাখা কিক-টিক কিছু নেই। নতুন একটা কনসেপ্ট দিয়ে দুঃসাহসে চমকে দেওয়াও নেই। কৌশিকের নতুন এই ছবিটা তৈরির কারণ আসলে আগে হওয়া সেই ‘রিফিউজি’ কিংবা ‘বীর জারা’ গোছের প্রেম-কথার মতোই ক্লিশে!

বেশিরভাগ পোস্টারে শুধু আবীর আর জয়া আহসানের মুখ

রাস্তাঘাটে বেশিরভাগ পোস্টারে মুখোমুখি আবীর আর জয়া আহসানের ছবি। ওরাই তাহলে এপার বাংলা ওপার বাংলার সেই প্রেমিক প্রেমিকা দুজন? এই পোস্টারের একটা বড় ভার্সন আছে, সেটার কম্পোজিশনটা একটু আলাদা, এই দুজন তো আছেই, দুজনের মাঝে, জয়ার ছবির ঠিক নিচে কেমন যেন আকুল হয়ে চেয়ে থাকা স্বয়ং পরিচালকের মুখ। এটা তখন দেখছি আর ভাবছি, কৌশিকের রোল এই প্রেমের গল্পে কোথায়। ও কি এই দুজনের প্রেমের পথের কাঁটা?

তখনও জানি না, ছবি তৈরির আসল কথা কৌশিক ওই ইন্টারভিউতে চেপে গিয়েছেন জাস্ট।

তখনও জানি না, কৌশিক অভিনয় করেছেন গণেশ মণ্ডল নামে এমন একটা লোকের রোলে, আসলে যে লোকটা হল কিনা এই ছবিটার প্রাণ। আর হ্যাঁ, অন্য কারুর না, শুধু ওই লোকটার গল্প শোনাতে কৌশিকের এই আস্ত ছবিটা করা।

কোথা থেকে স্কুপ এই খবর পেলাম, সোর্সটা এখানে লেখা যাবে না, স্যরি। শুধু এটুকু বলতে পারি, বেঢপ দেখতে ওই লোকটার বুক মুচড়ানো আত্মকথার টুকরো নিয়েই ‘বিসর্জন’-এর স্টোরি।

মজাটা এই, ন্যারেটিভের প্যাটার্নটা এমন যে গণেশকে আগাগোড়া মনে হবে যেন কমিক ভিলেন বলে। এরিয়ার সেই দুষ্টু লোকটা, যে করে হোক নায়িকাটাকে গিলে খেতে চায় যে। সিন-টিন সব এমন করেই লেখা। এরকমটাও হচ্ছে দেখছি যে স্ক্রিনে গণেশ অ্যাপিয়ার করলেই অস্ফূটে ‘আঁক’ শব্দ করে আঁতকে উঠছে পাশে বসা মা-মাসিদের দল। যেন সর্বনাশটা এক্ষুনি এই হয়ে গেল বলে প্রায়। যেন ফর্সা যুবতী রাজকন্যার মতো মেয়েটাকে লুটে নিয়ে শেষ করে দিল গণেশ নামের ডাকু।

আসলে সিনেমাটা দেখতে দেখতে আবেগ-টাবেগ সব চড়ে গেছে এত বেশি। কেউ এটা ভেবে দেখতেই চাইছে না যে যতই পদ্মা (জয়া আহসান) নামের যুবতী বিধবাকে টার্গেট করে থাকুক না কেন গণেশ। কোথাও একটা সিনেও এক রতি অভদ্রতাও করে নি কিন্তু ও।

খুব নরম করে শীলিত আলাপে প্রেম নিবেদন, কিংবা প্রপোজ করা তো এ দেশে অপরাধ নয় কিছু? তাহলে ওই গণেশবাবুর দোষটা কোথায় বলুন?

ছবিটা যত দেখছি, বুঝতে পারছিলাম, বেশিরভাগ মানুষের ভাবনা-চিন্তা করার যে সেট প্যাটার্ন আছে সমাজে, সেটা নিয়ে প্রায় নিষ্ঠুর একটা খেলা এ ছবিতে কৌশিক খেলতে খেলতে গেছেন। মনের মধ্যে ওই ধারণাটা গেঁড়ে বসে আছে না আমাদের? যে রূপকথার রাজপুত্তুর-রাজকন্যা দেখতে সবসময় ফর্সা আর কাত্তিকপনা হবে। আর ভিলেন মানেই কালো হবে, প্লাস দেখতে বেশ বাজে! অন্ধ সেই পারসেপশনের সংস্কারটাকে তো বটেই তার সঙ্গে আরও হাজার একটা অন্ধ মোহ চুপি-চুপি এ ছবিতে কৌশিক যেন আছড়ে ভাঙতে চান।

আরও পড়ুন:  পাঁচ বছর পর একই ছবিতে থাকলেও একসঙ্গে কোন দৃশ্য নেই অনুষ্কা-ক্যাটরিনার!?
পদ্মার এখনও মনে পড়ে সেই নতুন বিয়ে হয়ে আসার গল্প, তাঁর মাতাল স্বামীর স্মৃতি

এক এক করে বলি। পদ্মা নামের মেয়েটার কথাই ধরুন। ইছামতীর তীরে এক অজ পাড়া গাঁয়ে থাকে। বিয়ে হয়েছিল আগে, সেই বর ভয়ানক নেশার দাস ছিল। দিনে চার প্যাকেট সিগারেট আর সময় অসময় বোতল নিয়ে জীবন কাটত তার। সেই নেশার চোট নিতে না পেরে খুব তাড়াতাড়ি মরেই গেল সে। খোলা মনে হিসেব করে ভাবতে গেলে অকালকুষ্মাণ্ড এই বরের ওপর পদ্মার তো রাগে-দুঃখে ফেটে পড়া উচিৎ ছিল পুরো।

কোথায় কী, অদ্ভুত একটা গণ্ডী কাটা ঘরের মধ্যে পদ্মার সব ভাবনাগুলো আটকে রয়েছে যেন। ভাঙা চালের শ্বশুরবাড়িতে অথর্ব শ্বশুরকে নিয়ে একলা থাকে ও। স্বামীর ওই নেশা করার ব্যাপারটায় দোষ দ্যাখে না বোধহয় কিছু। বুড়ো লিয়াকৎ ডাক্তার (অরুণ গুহঠাকুরতা) যখন ওকে দেখিয়ে নাসিরকে (আবীর চট্টোপাধ্যায়) বলে, ‘(মেয়েটা আজও) মাতালের স্মৃতি আঁকড়ে ধরে আছে’, তখন নীরবে যা একটা মোচড় ও ওর নিজের শরীরে মারে, দেখে মনে হয়, ‘আমার যা খুশি তাই করবো গো চাচা, তাতে তোমার বাপের কী!’

ভিনদেশের ওই নাসির যখন ঠাঁই পায় ওর ঘরে, তখন উলটে নাসিরকেও তো নেশা করতে উৎসাহ দ্যায় ও। বাজার থেকে সিগারেট আনে কিনে আর আড়াল থেকে নাসিরের সুখটানের সেই ধোঁয়ার গন্ধ শোঁকে। এমনি করেই মাতাল বরের মেমরিগুলোর সেলিব্রেশন করে।

আন্ডারলাইন ক’রে ক’রে পদ্মার মনের এই প্যাটার্নটাকে দেখিয়ে দিয়েছেন কৌশিক। যে দ্যাখো সবাই, নেশা করতে গিয়েই মরে গেল ওর বর। তবু নেশা করাটাকে ঘেন্না করতে শিখল না আজও মেয়ে।

যুক্তি টুক্তি গোল্লায় গেছে সব। অন্ধ আবেগ জীবনটাকে চালায়।

দেখতে ভালো না, আকারে বেঢপ। এই খামতিই কি প্রেমের দৌড়ে গণেশকে পিছিয়ে দিল কিছুটা

এই পদ্মাকে বিয়ে করবে বলে পাগল হয়েছে এলাকার এক কেষ্ট বিষ্টু গণেশ মণ্ডল মশাই (অভিনয়ে কৌশিক গাঙ্গুলী নিজেই)। বয়স একটু বেশি হয়ে গেছে, বিয়ে হয় নি কো আজও। শরীরের আকৃতিটাও বেঢপ রকম মোটা। কে জানে, পদ্মার চোখে সেটাই বোধহয় এই লোকটার একমাত্র দোষ।

অবশ্য এই লোককে মনে ওর ধরবে কী করে বলুন? মনের মধ্যে গোপনে গোপনে তো স্বপ্ন দ্যাখে ও, যে ফের ওর বিয়ে হবে যার সঙ্গে, সে দেখতে খুব চাঁদপনা কেউ হবে। অনেকটা ওই বসিরহাটের নাসির আলির মতো। তার বদলে থপথপে ওই ব্যাঙের মতো গণেশ মণ্ডল জুটলে এসে রাগ হবে না খুব?

সেদিন সকালবেলায় যখন নদীর ঘাটে কাদার মধ্যে মাখামাখি হয়ে পড়েছিল কন্দর্পকান্তি নাসির। নিজে সারা গায়ে কাদা মাখামাখি করে বি এস এফ জওয়ানদের চোখের ওপর দিয়ে ওকে নিজের ঘরে এনে উঠিয়েছিল কেন পদ্মা? মুখে যতই বলুক না অতিথিকে সেবা করা পরম ধর্ম বলে। আসলে তো মনের মধ্যে ইচ্ছে ছিল অন্য। নইলে নিজের বরের শার্ট পরতে দেবে কেন ওকে, আর গলার কাছে যে ক্ষতটায় নিজে নিজেই নাসির আলি ওষুধ লাগাতে পারে, সেটায় ওষুধ লাগিয়ে দেবার নামে অমন করে কাছ ঘেঁষে আসবেই বা কেন।

সিনেমা হল-এর বেশির ভাগ লোকেই যে মনে মনে পদ্মার ওই ইচ্ছেটাকে সাপোর্ট করে বেশ, একথা হঠাৎ হঠাৎ ছিটকে আসা রিয়্যাকশনে টের পাওয়া যায় ভালোই। পদ্মার মতো তারাও ভাবে, সত্যি, বর মানে তো দেখতে হবে রাজপুত্তুর যেন। ঠিক যেন ওই বসিরহাটের নাসির আলির মতো। হোঁৎকা মোটা গণেশ সেখানে জায়গা পাবে কেন?

গণেশ তো নিজের মুখে ওর লিমিটেশনগুলো স্পষ্ট করে বলেও। নিজের মুখেই স্বীকার করে যে, ‘আমি তো জানি আমারে বাজে দেখতে’! আর প্রায় কাঁদতে থাকে এটা বলতে গিয়ে যে, ‘আমি আসলে আর একা থাকতে পারসি না’। মজা হল, এটা শুনে হল-এ বসা সবার মধ্যে তুমুল হাসির তোড়। হবে না কেন, বলুন? দেখতে ‘বাজে’ একটা এই রকমের লোক যদি সরলভাবে নিজের দেহ-মনের আর্তি শোনাতে আসে, সেটা নিয়ে উপহাসটাই তো এই দুনিয়ার রীতি!

আরও পড়ুন:  আর একটু হলে সদ্যোজাত অবস্থায় পাল্টাপাল্টি হয়ে জেলেনীর কোলে চলে যাচ্ছিলেন এই মহা তারকা
বিউটি অ্যান্ড দ্য বিস্ট-এর কাহিনী এ ছবিতে আরও নিষ্ঠুর করে বলা

এই তো সেদিন ‘বিউটি অ্যান্ড দ্য বিস্ট’-এর নতুন ভার্সন দেখলাম, মনে হচ্ছিল এটা তার নতুন একটা ইন্টারপ্রিটেশন ব’লে। ওই যখন আকুল হয়ে গণেশ এটা বলতে যাবে যে, ‘সুদর্শন পাজি বদমাশ মানুষ যেমন থাকে, কুদর্শন ভাল মানুষও তো থাকে’। কিংবা এটা বলবে যে, চেষ্টা করলেও নিজের শরীরটাকে, বিচ্ছিরি এই মুখটাকে তো পালটাতে পারবে না আর ও। শুধু এটুকু খামতির জন্যে সারা জীবন ভালবাসা কি আর পাওয়াই হবে না ওর? তখন তো মনে হতে বাধ্য যে এই কথাগুলো গণেশ নয়, বলছে সেই রূপ-কাহিনীর ‘বিস্ট’!

মোচড় এখানে এটাই যে এত কথার পরেও গণেশের দিকে মন ওঠে না পদ্মার। ওর ‘প্রেজুডিস্‌ড’ মন মনে মনে নাসির আলিকেই চায়। আর হল-এর সবার ‘প্রেজুডিস্‌ড’ মনও মনে মনে নাসিরকেই পদ্মার বর হিসেবে দ্যাখে। নাসির যখন খুলেই বলে যে ওপার বাংলায় বসিরহাটে আয়েষা নামে একটা মেয়ের সঙ্গে রিলেশন আছে ওর। এটা শুনে হঠাৎ করে পালটে যায় পদ্মার আচরণগুলো যেন। মনে হয় এক গামলা ছাই পড়েছে ওর খোয়াব দ্যাখার চোখে।

এরপর যতবার নাসির আয়েষার কথা তুলবে, ততবার শুধু একা ওই পদ্মার নয়, হল-এর সবার চাপা রিয়্যাকশনগুলোও যেন কান পেতে শোনার মতো। চারপাশে সাপের শিসের মতো ইস-ইস করে ধ্বনি। যেন ছিঃ, এটা কী করেছিস নাসির, কেন আগে থেকে প্রেম করে ফেলেছিস তুই, ওই আয়েষা খাতুন না কী যেন একটা মেয়েছেলেটার সনে! সে যা করেছিস, ভুলে যা এখন, ফুলের মতো সুন্দরী ওই পদ্মাকে আর কষ্ট দিস না, গ্রহণ কর ওকে।

আয়েষাকে চোখের সামনে দ্যাখা যায় না বলে, ওর ওপর সহানুভূতির বালাই নেই কোন। এটাই আমাদের – আম পাবলিকের মন!

আর পদ্মাও তো মনে মনে যেন বলতে চাইছে সেটাই। কাদা থেকে হিঁচড়ে তুলে তোমার প্রাণ বাঁচালাম এমনি এমনি নাকি? করবে না কিছু আমার জন্য তুমি? ছেড়ে যাবে আমায় ওই বাজে দেখতে গণেশ মণ্ডলের হাতে? এর সঙ্গে মিলিয়ে শুনুন পদ্মার নিজের মুখে বলা হিট সেই ডায়ালগখানা শুধু। ‘আজকালকার সময় কেউ কারুর জন্য কোন কিছু এমনি এমনি করে না।’ পদ্মা, তুমি বলেছিল এটা গণেশ মণ্ডলকে নিয়ে ঠিকই। কিন্তু এটা কি তোমার নিজের জন্যেও সত্যি না?

রাতে নেশার ঘোরে রঙিন শাড়ি পরে পদ্মা… ওর শরীর তখন অন্য কাউকে চায়

না হলে শেষটা কেন মরিয়া হয়ে নাসিরকে ও থেকে যেতে বলবে ওর সঙ্গে? আর নাসির চলে যাবেই এটা বুঝতে পারার পর ঘুমের ওষুধ খেয়ে নেশা করে টলতে টলতে রঙিন শাড়ি পরে এসে পাগলের মতো সেক্স করবে নাসিরের কোলে উঠে?

দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল এই যে গণেশ, এই যে পদ্মা, এই যে নাসির, লোকগুলোকে হানড্রেড পারসেন্ট এই কৌশিক গাঙ্গুলীর নিজের চোখে দ্যাখা। না হলে এত নিখুঁত ভাবে এদেরকে স্ক্রিনে ফোটানো যায় নাকি?

মনে হচ্ছিল এই যে বর্ডার নিয়ে অ্যাত্ত বড় বড় সব কথা, এই যে ইছামতী আর দুপাশ জুড়ে পড়ে থাকা দুই বাংলার গাঁ। এই যে নদীর বুকে দুর্গা ঠাকুর বিসর্জনের দুরন্ত সব সিন, আর কালিকাপ্রসাদের হাহাকার মেশা গান। এই সিনেমায় এসব কিছু আসলে বাড়তি সব সাজুগুজুর মতো। ভেতরে ভেতরে গোটা সিনেমাটা আসলে তো মনের ওই অন্ধ-বন্ধ প্রেজুডিসের স্টোরি।

দেখতে ‘ভালো’ হলেই যে লোক আসলে ‘ভালো’ হয় না, আর দেখতে ‘খারাপ’ হলেই ‘খারাপ’। তাই তো, এই সিনেমায় লুক-ওয়াইজ ‘হিরো’র আসন যার, সেই নাসির আলি লুকিয়ে আসলে চোরাকারবার করে। আর দেখতে ‘খারাপ’ যাকে, লুক-ওয়াইজ এই সিনেমায় ‘ভিলেন’ হলেন যিনি, সেই গণেশ মণ্ডল, তিনি? তিনি কিন্তু মোটের ওপর সৎ খেটে-খাওয়া মাছ-ব্যবসায়ী মোটে!

কে ‘হিরো’ আর কে ‘ভিলেন’ আসলে, এখানে এসে পুরোটা কেমন ঘুলিয়ে গেল না ভাই?

মনে হচ্ছে না, যে পুরো সিনেমায় গণেশের কথা শুনে উপহাস করে যতটা হেসেছেন, উচিৎ হয় নি সেটা। ইচ্ছে করলে পাড়ার যে কোন মেয়েকে তুলে নিয়ে আসতে পারতো গণেশ, সেটা না করে অচল নিষ্ঠায় বছরের পর বছর ধরে অপেক্ষা করেছে সে এই যে একটা মেয়ের জন্যে, সেটা নিয়ে টিটকিরিগুলো না শানালেই ঠিকঠাক হতো বেশি?

আরও পড়ুন:  গোবিন্দার করা দৃশ্য 'জগ্গা জাসুস' থেকে ছেঁটে ফেলার জন্য ক্ষমা চেয়ে নিলেন রণবীর
হয়তো রসিকতা করে বলা। তবে কথাগুলো একটুও মিথ্যে কিন্তু নয়।

সাদা শাড়ি ছাড়া পদ্মা আর কিছু পরে না বলে গণেশও সাদা শার্ট ছাড়া বাকি সব কিছু পরা ছেড়ে দিয়েছিল পুরো। এমন প্রেমকে তো স্যালুট জানানো অনেক আগেই উচিৎ ছিল ভাই। গণেশের চ্যালা লাউয়ের (অভিনয়ে লামা) ভাষায় বলতে গেলে, ‘বাংলাদ্যাশে যত প্রেমের উপাখ্যান আছে, আপনাদেরটা অ্যাক্কেরে জেম!’

তবে, অ্যাত ভালবাসার পরেও শেষ অবধি ঠকেই গেল গণেশ। অন্য রকম ঠকা। মোটকা কালো দেখতে ‘বাজে’ লোকটা রানির মতো ফর্সা সুন্দরী পদ্মাকে ঘরে এনে তুলতে পারলো বটে। কিন্তু পদ্মা তাঁর ঘরে ভালবাসার টানে আর এলোটা কই, বলুন? এলো তো বাধ্য হয়ে জাস্ট। আরও একটু ‘ভাল’ থাকবে বলে। আর ওর গুপ্ত আশিক স্মাগলার নাসিরকে নিরাপদে গণেশ মণ্ডল দেশের বর্ডার ক্রশ করিয়ে দেবে বলে।

ছবির লাস্ট সিনটা মর্মান্তিক পুরো। পদ্মা এখন গণেশবাবুর ঘরণী – ওর ফর্সা মিষ্টি ছেলেও হয়েছে একটা। সেই ছেলেকে নিয়ে, পদ্মাকে নিয়ে গণেশ আজ ভরপুর সুখে সংসার করে বটে। শুধু এটা ধরতে পারে না যে, সেই চোরাকারবারি নাসিরের পিঠে ঠিক যেখানে জন্মদাগ ছিল, ওদের কোল আলো করা শিশুর পিঠেও ঠিক সেখানে জন্মদাগ আছে!

হ্যাঁ, সাচ্চা প্রেমিক গণেশবাবুকে ঠকিয়ে দিয়েছে নতুন যুগের রাজকন্যেটি এসে! সৎ ব্যবসায়ী গণেশবাবুকে নয়, চোরাকারবারি নাসির আলির বাচ্চাটাকেই পেটে ধরেছে যে সে! এখন একটু একটু করে এই বাচ্চাটা বড় হবে, আর দেখতে হয়তো হয়ে যাবে সেই নাসির আলির মতো। মোটা কালো গণেশবাবুর বুক থেকে তাতে নতুন করে রক্ত পড়বে কত, তার খবর রাখবে কে?

কৌশিকও আর খুঁড়তে চান নি ব্যথা, এখানেই শেষ করেছেন ছবি।

এতক্ষণে বুঝলেন তো, এটা আসলে ভারত আর বাংলাদেশের বর্ডার পেরনো নিছক একটা প্রেমের গল্প নয়। তার চেয়ে অনেক গভীর, অনেক জটিল, অনেক রিয়্যাল আঘাত পাওয়ার স্টোরি। সারা জীবনের মতো ঠকে গিয়ে তবু প্রাণপণ নিজেকে খুশি-খুশি ক’রে সাজিয়ে রাখার স্টোরি। শোবার ঘরের নিভৃত কেচ্ছা, পরম গ্লানি, সবার সামনে পাগলের মতো ফাঁস করে দেওয়ার স্টোরি।

শুধু রূপ আর মিষ্টি মিষ্টি কথার জোরে দেখন-সুখ বান্দার হাতে নিজের ঘরের লক্ষ্মী লুঠ হয়ে যাওয়ার স্টোরি।

সাধে বলেছি, যে গল্পের মেন তিনটে লোককে নিজের চোখে ছুঁয়ে দেখেছেন কৌশিক, না হলে ওই লোকগুলোর ছবি এত মমতায় নিখুঁত ভাবে আঁকতে পারা তো দুঃসাধ্যই ছিল!

ছবিটা দেখতে গিয়ে শেষ দিকটায় মনে হবে একটু যেন স্লো। ধৈর্য ধরে তখন একটু ওয়েট করবেন প্লিজ। কারণ ওরপরেই যে হুড়মুড়িয়ে সেই চরম ধাক্কা আসার পালা!

পার্সোনালি কৌশিককে বহু বছর চিনি। ছবির শেষটা দেখে তাই হয়তো আরও বেশি করে মুচড়ে উঠলো মন। হল থেকে বেরিয়ে আসছি যখন, মনে হল, কাঁধের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন যেন। অস্ফূটে বলতে চাইছেন, যে বুঝতে পারলে তো, আসলে কীসের গল্প, কার গল্প শোনাতে চাইলাম আমি? দুগ্‌গা ঠাকুর বিসর্জনের গল্প এটা না। এ হল গিয়ে জীবনের অন্য পরম বিষ-অর্জনের কথা!

শুধু ছবির টাইটেল কার্ড নয়, ‘পুরস্কার’ বানানটা এই প্রোমোশনাল ছবিটাতেও ভুল!

ও হ্যাঁ, পুনশ্চ বলে আরও দুটো কথা লিখি। এত ভালো একটা ছবির মধ্যে কোথাও কোন ভুল নেই, সেটাও কিন্তু না। নিজে বাংলা ভাষা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর পড়েছেন, তার পর বহু বছর বাংলা পড়িয়েছেন কলকাতার নামী একটা স্কুলে! সেই কৌশিকের ছবিতেও কিনা বিশ্রী বানান ভুল! শুরুতে জাতীয় পুরস্কারের কথা লিখতে গিয়ে ‘পুরস্কার’ বানানটা লেখা হয়ে গেল ‘পুরষ্কার’ মানে ‘মূর্ধন্য ষ’ দিয়ে! তারপর ‘বিশ্ব পরিবেশনা’ লিখতে গিয়ে স্ক্রিন জুড়ে বড় বড় ক’রে লেখা হয়ে গেল ‘বিষ্ব পরিবেশনা’!

হৃদয়-নিংড়ে-আনা দুঃখ থেকে সিনেমা বানাতে গিয়ে কি বেখেয়ালি ছিলেন খুব? যে, এরকম বাজে বাজে ভুল হল?

যে নম্বরটুকু কম পেলেন এখানে, সেটা শুধু ওই বানান ভুলের দোষে!

- Might Interest You

1 COMMENT