bongblog2016
ইতিহাসের পথিক

বাংলার বাঙালিদের অনেক গুণ, প্রচুর মেডেল (নোবেল সহ), প্রচুর ট্রফি, দিস্তে দিস্তে জ্ঞানগর্ভ সাহিত্য সমাজচিন্তা | কিন্তু এমন বুৎপত্তি সম্পন্ন বাঙালিকে যখন সাধা লক্ষ্মী নিয়ে ফুটবল খেলতে দেখি তখন মনে হয় নিজের জাত্যাভিমান নিয়ে একবার অন্তত পুনর্বিবেচনা করা কর্তব্য | নিজের পাতে টানলে ঝোলটা খাওয়া যায় জানা সত্ত্বেও মন্বন্তরের সময় থেকে ভাতের ফ্যান খাওয়া অভ্যেস হাওয়ায় সেদিকে না হয় নজর নাই বা গেল, কিন্তু নিজের পরবর্তী প্রজন্ম কি ভাবে দুধে-ভাতে থাকবে সেই প্রবন্ধটা তো নিজেরই উদ্যোগে করতে হবে | সেটা কি অন্য কারু করবার কথা? সময় বড় বালাই | কোনো কাজ সময়ে না করলে পরে তার কার্যকারিতা তেমন থাকে না | এই ভাবনা থেকেই এই লেখার অবতারণা |

এখন সারা বিশ্বেরই অর্থনৈতিক পরিস্থিতি খুব একটা আশাব্যাঞ্জক নয় | তার ওপর মধ্যপ্রাচ্য, যেখানে আমাদের সবথেকে বেশি রপ্তানি হত সেখানেই লেগেছে আগুন | শিয়া আর সুন্নি বলয়ের মধ্যে একটা ঠান্ডা যুদ্ধ চলছে | অথচ ব্যাপক অনাবৃষ্টির কারণে ভারতবর্ষের গ্রামগঞ্জেও পণ্যের চাহিদা তলানিতে | এসময় কোনো শিল্পপতিই অতিরিক্ত উৎপাদন ক্ষমতা তৈরী করতে আগ্রহী হবেন না | তাই কলকারখানায় বিনিয়োগ বড় একটা হওয়ার আশা কম | এরমধ্যেও আমেরিকার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এখন অনেকটা স্বাভাবিক | এরকম ডলার-বুলিশ মার্কেট পরিসেবা ক্ষেত্রের জন্য অনুকুল, প্রধানতঃ যেসব পরিসেবা রপ্তানিযোগ্য, যেমন ধরুন তথ্যপ্রযুক্তি বা আর্থিক পরিসেবা অর্থাৎ ফিনান্সিয়াল সার্ভিস | তথ্যপ্রযুক্তি না হয় বোঝা গেল, কিন্ত এই ফিনান্সিয়াল সার্ভিস ব্যাপারটা কি? বিভিন্ন আর্থিক সংস্থা যেমন কোনো বিদেশী বিনিয়োগ (ইনভেস্টমেন্ট) ব্যাঙ্ক বা কোনো রিটেল ব্যাঙ্ক তাদের নানা রকম ব্যাক অফিস, প্রযুক্তি পরিকাঠামো, তথ্যকেন্দ্র বা ডাটা-সেন্টার, বৈশ্লেষিক ইত্যাদি কাজকর্ম ভারতবর্ষে আউটসোর্স করে থাকে অথবা ভারতেই তাদের অফিস খুলে সে সব কাজ কম খরচে সম্পন্ন করে | এধরনের পরিসেবা এখন কিছুটা হলেও লাভদায়ক হতে পারে | কারণ এসব পরিসেবা কর্মসংস্থান তৈরী করে খুব দ্রুত এবং কারিগরি তথা বিশেষ দক্ষতার কর্মীদের সাথে সাথে অপারেশন্স এর কাজে সাধারণ বিষয়ের স্নাতকদেরও নিয়োগ করে থাকে | সরকারী ব্যাঙ্কদের মত ধেড়িয়ে ধেড়িয়ে প্রবেশনারি অফিসার নিয়োগ করে না | আর সরকারী ব্যাঙ্কগুলোর এখন যে পরিমান অনুৎপাদক সম্পদ জমে গেছে তাতে নতুন ক্যাম্পাস তৈরী করার দিকে বিশেষ ঝুকবে না বলেই মনে হয় |

কিন্তু বিগত কয়েক বছরে বাংলার তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্র খুব একটা উন্নতি করতে পারে নি | কেন পারেনি তার কারণ বহু আলোচনায় ক্লিশে হয়ে গেলেও, ওই যে সময়, বাঙালি জাতির তাচ্ছিল্যে সময়ের অমোঘ স্রোতে বিলীন হয়ে গেছে প্রচুর সম্ভাবনা | বাঙালি একটা লেবারের জাতে পরিনত হয়েছে | তবু কিছু জানা চেনা কথা আবার চর্বিতচর্বন করবার প্রয়োজন বোধ করছি | যদি কিছু লোক পড়ে আমায় শতেক গালাগালি দিয়েও দু-একটা বাক্যেরও মর্মার্থ উদ্ধার করেন |

তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রের অর্থনৈতিক গুরুত্ব
মুক্ত অর্থনীতি প্রতিরোধ করবার জন্য আর ঝোলাঝুলি করে লাভ নেই | জানি এই কথাটা বামপন্থীদের বুকে তিরের মত বিঁধবে, কিন্তু ভারতের অর্থনীতি এখন মুক্ত | এবার এই মাঠে খেলার নিয়ম কানুন শিখতে হবে | আমাদের দেশে আয়ের বিচারে ওপরদিকের ১০% উচ্চ আয়যুক্ত মানুষ জাতীয় সম্পদের মোট ৭৬.৩% এর মালিক | বাকিটা ভারতের এই বিশাল জনসংখ্যার মধ্যে ভাগ হলে একেক জনের গড় সম্পদের অবস্থা সহজেই অনুমেয় | এই হতাশাজনক অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে হলে সোজা আঙ্গুলে ঘি উঠবে না | মুক্ত অর্থনীতি আর্থিক বৈষম্য লাঘবের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে | তথ্যপ্রযুক্তি হলো পুরোপুরি মুক্ত অর্থনীতির ক্ষেত্র | চিন্তা করলে দেখতে পাবেন, কোনো তথ্যপ্রযুক্তি পরিসেবা সংক্রান্ত বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠান কিন্তু স্থানীয় ব্যবসার আশায় কোনো ভারতীয় শহরে ঘাঁটি গাড়ে না | তারা আসে সেই শহরের দক্ষ মানবসম্পদ অর্থাৎ হিউম্যান রিসোর্সের লোভে | সেই অঞ্চলের মানবসম্পদের উৎকর্ষতায় উৎসাহিত হয়ে প্রতিষ্ঠানগুলি সেখানে মূলধনী ব্যয় বৃদ্ধি করে থাকে | সৃষ্টি হয় চাকরির বাজার | এর ফলে সেই এলাকায় প্রচুর সংখ্যক ছোট স্বচ্ছল পরিবারের সৃষ্টি হয় যারা বিভিন্ন পণ্য ও পরিসেবার উপভোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং বহু সংখ্যক ছোট ছোট দৈনন্দিন আর্থিক লেনদেনের সৃষ্টি করে যার সর্বমোট প্রভাবে স্থানীয় ব্যবসা বানিজ্যের শ্রীবৃদ্ধি ঘটে | এই প্রক্রিয়ায় লেনদেনে জড়িত অপেক্ষাকৃত কম আয়ের পরিবারগুলিও আর্থ-সামাজিক সিড়ির ধাপে ধাপে উঠে আসতে থাকে | শুধু তথ্যপ্রযুক্তিই বা বলব কেন, অর্থনীতির সম্প্রসারণের জন্য নতুন নতুন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র লেনদেন তৈরির কোনো না কোনো মাধ্যম সৃষ্টি করতেই হবে |

অর্থনীতির একটা মস্ত বড় চালিকাশক্তি হলো মানুষের উচ্চাকাঙ্খা | আগেই বলেছি যে তথ্যপ্রযুক্তি বা আর্থিক পরিসেবা পুরোপুরি মুক্ত অর্থনীতির ক্ষেত্র, তাই এই ক্ষেত্রে চাকরির বাজারও মুক্ত বানিজ্যের মত হতে হবে | কোনো কারণে এই বাজার যদি অলিগোপলিস্টিক হয়ে পরে তবে তাতে মানুষের উচ্চাকাঙ্খা সফল হওয়ার পথে বাধার সৃষ্টি হয় | যদি কেবলমাত্র কিছু সংখ্যক সংস্থার হাতেই বাজার নিয়ন্ত্রিত হয় তাহলে সেই অঞ্চলে দক্ষতার বা স্কিলের মূল্য হ্রাস পায় এবং সেই বাজারের প্রতি মানুষের আগ্রহ কমে আসে এবং দক্ষ শ্রমিক অন্যত্র পাড়ি দেয় উপযুক্ত পারিশ্রমিকের খোঁজে | কোনো ইনকিউবেশন সেন্টারে যদি তথ্যপ্রযুক্তি কর্মীর মাইনে সেখানকার দারোয়ানের মাইনের সমান হয় তাহলে দক্ষতার মূল্য হবে শুন্য | কারণ একজন তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী খুব সহজেই দারোয়ানের কাজটা করে দিতে পারবেন, কিন্তু দারোয়ান তথ্যপ্রযুক্তি কর্মীর কাজটি করতে পারবেন না | অথচ দুজনের পারিশ্রমিক একই | তখন বছরের পর বছর ইনকিউবেশনের সুবিধে দেওয়া হলেও স্টার্ট-আপ সংস্থাগুলি নিজের পায়ে দাঁড়াবে না |

অর্থনীতিতে তাদের গুরুত্ব সবসময় বেশি যাদের অধিত বিদ্যা বা কর্মদক্ষতা সহজে আয়ত্ত করা যায় না, যেমন একজন ডাক্তার, উকিল, প্রফেসর বা ইঞ্জিনিয়ার | কারন এঁরা ভালো ভোক্তা, এঁদের উপার্জন বেশি এবং জীবনযাত্রার মানও বেশ উঁচু | তার ওপর এই দক্ষতা যদি ব্যবহৃত হয় বিদেশী মুদ্রা অর্জনের জন্য তাহলে তো কথাই নেই | অধিক সংখ্যায় এরা সার্থক ট্রিকল ডাউন এফেক্ট তৈরী করতে পারেন | আবার যেমন ধরা যাক কলকাতার মত ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে তো খুব ধুলো, ধোঁয়া বা শব্দযুক্ত শিল্প হওয়া সম্ভব নয় | তা করতে গেলেও দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের ছাড়পত্র পাওয়া যাবে না | সেক্ষেত্রে শহরের মধ্যে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার অন্যতম বিকল্প হতে পারে তথ্যপ্রযুক্তি | অথচ এই পরিসেবা যথেষ্ট শ্রমনিবিড় এবং কর্মীদের গড়পরতা আয় পশ্চিমবঙ্গের গড় মাথাপিছু আয়ের থেকে বেশ কিছুটা ওপরে |

ভারতবর্ষের যে কোনো উল্লেখযোগ্য শহরের অর্থনৈতিক বৃদ্ধিতেই বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তির গুরুত্ব অপরিসীম | বেঙ্গালুরু, মুম্বাই, দিল্লী, চেন্নাই, হায়দ্রাবাদ, পুনে এবং কলকাতা – সব শহরেই এই বিশেষ পরিসেবা শিল্পের সমাবেশ লক্ষনীয় | এবার কোনো কারণে যদি তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে বৃদ্ধির রাশ টেনে ধরা হয় তাহলে অর্থনৈতিক গতিবিধিও গতিহীন হয়ে পরে | ইনস্যুরেন্স কোম্পানির বিজনেস ডেভেলপার ভাবতে থাকেন পলিসিগুলো মুভ করছে না | বেসরকারী হাসপাতালের মালিকদের মনে হতে থাকে, উঁহু, এত বড় হাসপাতাল করার দরকার ছিল না | প্রোমোটাররা বাজে টাইলস আর বাথ ফিটিংস লাগিয়ে দেন | নির্মানকার্য কমে যাওয়ায় শ্রমিকেরা ভিনরাজ্যে পাড়ি জমায় | কোনো বৈদ্যুতিন যন্ত্র বিক্রয়কারী সংস্থা হয়ত দেখতে পান সে অঞ্চলে বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি (অ্যানুয়াল মেইনটেন্যান্স কনট্রাকট)-গুলোর পুনর্নবীকরণ হচ্ছে না, লোকজনের মাইনে দিয়ে রাখাই মুশকিল হয়ে দাড়াচ্ছে | পরিসেবার মান নিচে নেমে যাচ্ছে | অনেক অনেক জায়গায় তো ইকোনমি অফ স্কেল না হলে ব্যবসার কাঠামোটাই দাঁড়ায় না | সেসব ক্ষেত্রে ব্যবসার ঝাঁপ বন্ধ করতে হয় | গৃহঋণ ইত্যাদির পরিমাণ ব্যাপকভাবে কমে যায় | রাজস্বের পরিমাণ কমে যাওয়ায় সরকারের ঋণের বোঝা বাড়তে থাকে এবং কোনো একটি তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর অঞ্চলের অর্থনীতির আত্মবিশ্বাস প্রবলভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয় | আইনশৃঙ্খলার সর্বব্যাপী অধোগতি দেখা যায় | চুরি-ছ্যাচরামি বাড়ে |

‘সেজ’ বা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রয়োজনীয়তা
বেশিরভাগ বড় তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থা স্পেশাল ইকোনমিক জোন(সেজ) বা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল-এর সুযোগ সুবিধা দাবি করে থাকে রাজ্যের কাছে | এতে সংস্থাগুলি বেশ কিছুটা কর ছাড় পেয়ে থাকে | এই স্পেশাল ইকোনমিক জোন বলবৎ হাওয়ায় সরকার তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থার কাছ থেকে সরাসরি কর আদায় না করতে পারলেও অপ্রত্যক্ষ করের পরিমান বহুলাংশে বাড়ে | কারণ তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে নিযুক্ত উচ্চ আয় যুক্ত জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে কোনো অঞ্চলের অর্থনৈতিক গতিবিধি তরান্বিত হয় | যেমন বিভিন্ন মূলধনী পণ্য তথা ভোগ্যপণ্যের বিক্রয় ও রক্ষণাবেক্ষণ, পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যবহার বৃদ্ধি পায় | এসব অর্থনৈতিক গতিবিধির উদ্ভব স্থানীয় ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগে উৎসাহিত করে | আবার আয়কর ও গৃহ ও অফিস ইত্যাদির বিক্রি বৃদ্ধির ফলে স্ট্যাম্প ডিউটি বাবদ প্রত্যক্ষ করের আদায় বাড়ারও সম্ভাবনা থাকে | সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি পেলে তা বিভিন্ন উন্নয়ন খাতে ব্যয় করা যেতে পারে | জনস্বার্থে ব্যবহৃত মূলধনী পণ্যের ক্রয়, নির্মান বা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সরকার যে খরচ করে তা হল সরকারের মূলধনী ব্যয় | এই মূলধনী ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ার অর্থ সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পের কার্যকারিতা বৃদ্ধি পাওয়া | সমগ্র ভারতবর্ষের অর্থনৈতিক উন্নতির ক্ষেত্রে এটা অন্যতম প্রমানিত সত্য |

তথ্যপ্রযুক্তি অন্য নানান ধরনের উদ্যোগের সৃষ্টি করতেও সক্ষম | বেঙ্গালুরুর কথাই ধরা যাক | ধীরে ধীরে বেঙ্গালুরু তথ্যপ্রযুক্তি কেন্দ্র থেকে আর্থিক পরিসেবার কেন্দ্র হয়ে উঠছে | বিভিন্ন মার্কিন এবং ইউরোপীয় ব্যাঙ্ক যারা প্রথমে এসেছিল তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে দক্ষ কর্মীর খোঁজে, এখন তারা সর্ববিধ কাজের জন্যই কর্মী নিয়োগ করছে এবং পরোক্ষে সমগ্র অর্থনৈতিক অঞ্চলে এসব কাজে দক্ষতাও বৃদ্ধি করছে | এই বিশেষ ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে প্রচুর দক্ষ কর্মী তৈরী করছে জে পি মরগ্যান চেজ, গোল্ডম্যান স্যাচ, ওয়েলস ফারগো, ক্রেডিট সুসি, সোসিয়েতে জেনেরালের মত একের পর এক আর্থিক সংস্থা | কর্মদক্ষতা সৃষ্টির বাস্তুতান্ত্রিক উৎকর্ষতার এ এক অনন্য উদাহরণ |

তথ্যপ্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক বৈষম্য
এবার আসি অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণের কথায় | ধরুন একজন প্রচুর সম্পত্তির মালিক | কিন্তু তার সম্পত্তির পরিমান এতই বিশাল যে তিনি ও তার পরিবার দু হাতে টাকা ছড়িয়েও তা সম্পূর্ণরূপে ব্যবহার করতে পারবেন না | তার ফলে সিংহভাগ টাকাই পড়ে থাকবে ব্যাঙ্কে | এবার সেই ধনী ব্যক্তি তার টাকা বিভিন্নভাবে বিনিয়োগ করতে পারেন কিন্তু তিনি তা করবেন তার ব্যক্তিগত লাভের উদ্দেশ্যে | ধরুন সেই ব্যক্তি একটি কারখানায় বিনিয়োগ করলেন | সেখানে তিনি কারখানার শ্রমিকদের যথাসম্ভব কম বেতন দেবেন তার উৎপাদন মূল্য কম রেখে লাভের মুখ দেখবার জন্য | তার ফলে সেই ধনাঢ্য ব্যক্তির সম্পদ বৃদ্ধি হবে | এভাবে সমগ্র অর্থনীতি থেকে অর্থ এসে কেবলমাত্র কিছু ধনী ব্যক্তির ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ভর্তি করবে | সাধারণ মানুষের উপার্জন বাড়বে না ও তাদের জীবনযাত্রার মান একই থাকবে | সরকার এইসব পুঁজিপতিদের সম্পদের ওপর প্রচুর কর আরোপ করতে পারেন এবং সেই টাকা বিভিন্ন জনকল্যানকারী সামাজিক পরিকল্পনায় (যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ভর্তুকি, গ্রামীন কর্মসংস্থান, সামাজিক ন্যায় ইত্যাদি) ব্যবহার করতে পারেন | এই পদ্ধতিকে বলা হয় পুনর্বন্টন বা রিডিস্ট্রিবিউশন | কিন্তু ভ্রষ্ট ও অকর্মন্য সরকারি আমলাতন্ত্রের মাধ্যমে সেই টাকা খরচ করাটা অকার্যকর ও দীর্ঘসূত্রিতার দোষে দুষ্ট | সমগ্র দেশের বিপুল জনসংখ্যার নিরিখে করের টাকা অপর্যাপ্তও বটে | তাই এভাবে কখনই প্রকৃত দারিদ্র দূরীকরণ সম্ভব নয় | এতে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় না এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক বৃদ্ধি বাধাপ্রাপ্ত হয় | দীর্ঘকাল এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে দারিদ্র জনসংখ্যার বৃদ্ধির সাথে বাড়তেই থাকে এবং পণ্য ও পরিষেবার চাহিদা সেভাবে না বাড়ায় পুঁজিপতিদের বিনিয়োগে আগ্রহ কমে যায় | বিনিয়োগে আগ্রহ কমে যাওয়ায় কর্মসংস্থানও হয় অপর্যাপ্ত | আমাদের দেশে এই সমস্যা বেশ প্রকট | এখানেই ভারতের অর্থনীতিতে তথ্যপ্রযুক্তির গুরুত্ব | তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের বাজার বিশ্বজোড়া | স্থানীয় বাজারের ওপর তা পুরোপুরি নির্ভরশীল নয় | এই শিল্পে বিনিয়োগও লাগে সামান্যই | প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগেরও অঢেল সুযোগ | কিন্তু এই ক্ষেত্রে নিযুক্ত আর্থিক ভাবে সমর্থ শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেনীর ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় পরোক্ষে নিয়োগকারী সংস্থার বিদেশী মুদ্রা উপার্জনের ফলেই | কারণ এই সকল পরিসেবা অর্থনৈতিকভাবে উন্নত দেশগুলিকে বিক্রি করার ফলে একজন মধ্যবিত্ত তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী হয়ে ওঠেন একাধারে উপভোক্তা ও করদাতা | সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল বেসরকারী ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায় বহুলাংশেই | এবার ধনী ব্যক্তিগণ ও তাদের পরিবারবর্গের বাইরেও প্রচুর সংখ্যক মানুষ গৃহ, বাহন, গৃহস্থালীর জিনিসপত্র, পোশাক-পরিচ্ছদ, বিনোদন, ভ্রমন, গয়নাগাটি, ইন্সুরেন্স ও মিউচুয়াল ফান্ড ইত্যাদিতে খরচ করে থাকেন | পণ্য ও পরিষেবার সামগ্রিক উৎপাদন বৃদ্ধি পায় | সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধির ফলে সরকারী ও পাবলিক সেক্টর সংস্থাগুলির কর্মচারীদের আয়বৃদ্ধি হয় | ভারতীয় পুঁজিপতিরাও বিদেশী মুদ্রার বলে বলীয়ান হয়ে বিভিন্ন বিদেশী কোম্পানির সাথে বিলয় ও অধিগ্রহনে (মার্জার অ্যান্ড অ্যাকুইজিশন) লিপ্ত হন | ভারতীয় বানিজ্যের আন্তর্জাতিক ক্ষেত্র প্রসারিত হয় |

তবে অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণের মানে যে লোকাল ট্রেনে শসা বিক্রি করে তাকে মুকেশ অম্বানিতে পরিণত করা নয় | গরীব পরিবারের অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করা, স্থায়ী রোজগার সুনিশ্চিত করা, তাদের পরিবারের শিশুদের উচ্চশিক্ষা লাভের পথ প্রশস্থ করা এবং জীবনধারণের বাস্তবানুগ মানোন্নয়নটুকু হলেই যথেষ্ট |

অবশেষে এটাও বলে রাখি, বিশ্বের বিশাল এই তথ্যপ্রযুক্তির পরিকাঠামোর ঘানি টানতে সব সময়ই ভারতীয় কর্মীর দরকার | আছে প্রচুর কাজ আর লাগবেও আরো প্রচুর লোক | আর কোনো দেশে আমাদের মত বাস্তুতন্ত্র তৈরী হতে বহু বছর লাগবে | আমরা ভারতীয়রা সময়ের সাথে সাথে বিশ্ব বাজারের সাথে আরো অভিযোজিত হব, পরিনত হব | আজকে ফরচুন ৫০০ এর অনেক ব্র্যান্ড-ই ভারতে অফিস খুলেছে | যেখানে খুলেছে ভাতটা তারাই খাচ্ছে | পশ্চিমবঙ্গ ভাতের ফ্যানের জন্য হা পিত্যেস করে রয়েছে |

NO COMMENTS

এমন আরো নিবন্ধ

Rupam Islam New Song

4 1431
Rupam Islam New Song

1 1738