দ্বিতীয় ভাগ :দৃশ্য ১
(থানার দৃশ্য)

(থানার নাম “কলিযুগ”। অসত্য, ভ্রষ্টাচার এতে ঠেসে পুরে আছে। চেয়ারে বসে পুলিশ বাবু। দেখে মনে হচ্ছে কাদাজলের মাঝে একখানি কালো পদ্ম। সেখানে ছড়িয়ে থাকা ফাইলেরা প্রমাণ করে যাচ্ছিল যে এই এলাকার নিয়মকানুন সব পায়ের নীচেই থাকে। খালি সময় কাটানোর উদ্দেশ্যে তখন তিনি কানে এক টুকরো কাগজ ঢুকিয়ে ময়লা পরিষ্কার করছিলেন আর ডাক পড়ল কৃষ্ণ সিংহের।)

পুলিশ :কিশন্‌ সিং, আরে ও কিড়শন সিং। হাওয়া হয়ে গেলে নাকি, শুনতে পাচ্ছ না।
কৃষ্ণ সিংহ :(ভেতরে আসতে আসতে) দেখুন সায়েব, আপনাকে কত বার বলেছি আমার নামটা ঠিক করে ডাকুন। ওটা কিড়শন না, কৃষ্ণ সিংহ। আমাকে যত খুশি গালি দিন, খুব একটা খারাপ লাগে না। কিন্তু নিজের নাম খানা ভেস্তে দিলে বড় মাথা খারাপ হয়, ওটা বদলাবেন না সায়েব।
পুলিশ :(খুব জোরে হেসে) আরে তোর দেখছি মেয়েছেলেদের মতো চটজলদি মন খারাপ হয়ে যায়। তোকে কিড়শন বলি আর কৃষ্ণ বলি, কোথায় রাবণ মারতে যাচ্ছ বাপ!
কৃষ্ণ :সায়েব, আপনার দেখছি সাধারণ জ্ঞান খুবই কম। রাবণকে তো রাম মেরেছিল। মনে হচ্ছে আপনি রামায়ণ পড়েন নি আর রামলীলাও দেখেন নি।
পুলিশ : তুইও দেখছি আমার বউয়ের মত ধর্ম – কর্ম শুরু করলি। ওই পথে যাস না বাছা।
কৃষ্ণ সিংহ :একটু আধটু করতে হয় সায়েব, পরজন্মটা শুনেছি এতে ঠিকঠাক চলে।
পুলিশ : ওই নিয়েই থাক। এদিকে গত জন্মের ঠিক নেই, সামনেরটা নিয়ে পড়েছিস। যা কিছু করতে হবে এখনই। খুনের কেসটার যেমন এই জন্মেই মিটমাট করতে হবে।
কৃষ্ণ সিংহ : কিন্তু উকিলের যা চক্কর, কোন কেসেরই বোধহয় এই জন্মে আর মিটমাট হবে না .. ..তার জন্য মনে হয় জজ সাহেবের থেকে .. ..
পুলিশ :এসব আস্তে বল, মানহানির মামলা হয়ে যাবে। আর আমাকে ওই ধর্ম – কর্ম নিয়ে বেশি শোনাস না তো!
কৃষ্ণ সিংহ : কিন্তু সায়েব, রামায়ণের কাহিনি বড় জমাটিয়া ছিল যে .. ..
পুলিশ :(রাগে হাতের লাঠিটা জোরে মেঝেতে মারলেন তারপর উঠে দাঁড়িয়ে .. ..)
মাথা জমাটিয়া ছিল। ওখানে পুলিশ ডিপার্টমেন্টের যা অপমান করা হয়েছে, তা জীবনে কেউ করেনি। তুই নিজেই ভাব, এত মার্ডার হল, শুর্পনখার মতো সুন্দরীর নাক কাটা হল, সীতা কিডন্যাপ হল, লঙ্কাতে আইন কানুন না মেনেই সেতু তৈরি হল, হনুমান লঙ্কা জ্বালিয়ে দিল, কি কি না হয়েছে বল! এত কান্ড তো আমাদের এলাকাতেও কখনও হয়নি।
এইবার ভাব, এত সব কান্ড অথচ পুলিশের কোনও ভূমিকাই নেই। তার মানে পুলিশ সম্পূর্ন বয়কট। তুলসীদাস এখানে সোজাসাপটা বদমায়েশি করেছে। উনি কিছুতেই চাইতেন না যে আমাদের ডিপার্টমেন্টে খ্যাতির আলো ছড়িয়ে পড়ুক। সব পুলিশদের তাই এই নিয়ে বিরোধিতা করা উচিত আর সেখানে তুই কিনা ক্যাবলার মতো রামায়ণে খুশি হচ্ছিস।
আচ্ছা বলত, পুলিশ থাকলে কি সেই সময় সীতা চুরি হত, সারা ডিপার্টমেন্ট উঠে পড়ে লাগত, তারে – বেতারে খবর থাকত। পুলিশের আর কিই বা চাই, একটু আধটু সেবা টেবা এই তো! কিন্তু দেখ ওরা আমাদের কোন পাত্তাই দিল না। উল্টে রাম আর লক্ষ্মণ গাছের কাছে, পাতার কাছে, হরিণের কাছে সীতার ঠিকানা জিজ্ঞেস করে বেরাচ্ছিল .. ..পুলিশ স্টেশনে এলেই তো ওদের সমস্যা মিটে যেত, তাই না!
কৃষ্ণ সিংহ : সায়েব, আজ দেখছি খুব বুদ্ধিমানের মতো কথা বলছেন, কি ব্যাপার! বাড়িতে কিছু ইয়ে মানে সেরে টেরে এসেছেন, মনে হচ্ছে ..
পুলিশ : চুপ কর ব্যাটা, খালি বক্‌বক্‌। (কানে ফিসফিসিয়ে) কিছু করব না তো কি এই সক্কালে ধার্মিক কথা বার্তা হবে নাকি! (হেসে) তবে ওগুলোও জানিস তো এক প্রকার নেশারই মতন। খালি নেশা কি বলি, তারও যম। আমার বউকেই দেখ, সারাক্ষণ মন্দিরে ঢোল কর্তাল নিয়ে বসে আছে। আমি নেশা করি পান করে আর বউয়ে নেশা ভজন গানে। জীবনের সব মাথাব্যাথা নাকি এতে পালিয়ে যায়।
কৃষ্ণ সিংহ :সায়েব, উল্টোটা কখনও হয়নি, মানে আপনি ভজন আর উনি .. ..
পুলিশ :আমার মতো এমন শহিদের সাথে মজা করিস না বাছা। (মেঝের থেকে বোতল তুলে ওপরে রাখলেন) …যা, আমার জন্য কিছু নাস্তা -পানির ব্যবস্থা কর। সকাল থেকে গলা শুকিয়ে একেবারে ভারতীয় জনতা হয়ে গেছি।
কৃষ্ণ সিংহ : সায়েব, আপনাকে তো আমার কাঁটা বলে মনে হয় যা ভারতীয় জনতার গলায় একবার আটকে গেলে প্রাণ বেরিয়ে যাবে।
পুলিশ : আচ্ছা, বেশ পাখনা গজিয়েছে দেখছি। মিথ্যে এনকাউন্টারে এবার তোর পায়ে গুলি ঠুকব, দাঁড়া। (পান করতে করতে)
কৃষ্ণ সিংহ :(আস্তে কাছে এসে) না সায়েব, মাফ করে দিন। ভিখিরি হয়ে যাব। কাল ভুল করে একটু হনুমান মন্দিরে চলে গেছিলাম, তাই বোধহয় মনে এমন উল্টোপাল্টা চিন্তা আসছে। আর সায়েব শেঠজির ভাইয়ের খুনের মামলাটার কাল যা আপনি দফা রফা করে দিলেন! দুই পার্টিই খুশি। আপনার বুদ্ধির সত্যিই প্রশংসা করতে হয়, থানার সব্বাইকে খুশিও করে দিলেন। সায়েব, আপনার মনটা সত্যি নদীর মতো .. ..না না সমুদ্রের মতো।
পুলিশ : ওহ্‌, মাখন লাগানো হচ্ছে। আমাকে বুদ্ধু ভেবেছিস না ভারতীয় জনতা!
কৃষ্ণ সিংহ :ওরা তো সব আপনার শত্রু সায়েব। আপনি সাক্ষাৎ দেশের নিয়ম কানুন, সত্যমেব জয়তে ..আর আমি আপনার সন্তান, তাই নিজের ছেলের উপর কি কেউ রাগ করে?
সায়েব, আজ সকালে এক সুন্দরী এসেছিল সাফাইয়ের কাজে। আমি ওকে বলে দিয়েছি বিকেলে আসতে। এও বলেছি পুলিশ বাবুর কামরাটা তখনই পরিষ্কার কোরো। তা গরীব দুখির উদ্ধারে আপনি থাকবেন তো ওই সময়.. ..
পুলিশ : (হেসে) দাঁড়া, বদমায়েশি হচ্ছে।
কৃষ্ণ সিংহ :সায়েব, পুরান চাচার হোটেল থেকে একটু তন্দুরি চিকেন নিয়ে আসি .. ..
পুলিশ : আচ্ছ যা, তবে তার আগে এক বাক্স সিগারেট দিয়ে যা।
(কৃষ্ণ সিংহ আলমারি থেকে সিগারেট এনে পুলিশের বড় বাবুকে দিয়ে চলে যায়। আর উনি তা ফুঁকতে ফুঁকতে বিড়বিড় করতে থাকেন.. ..)
ব্যাটা পাজি, আমায় বলে রামায়ণ দেখতে। ওতে আবার দেখার কি আছে! পুলিশ কই! এত খুন টুন, আর পুলিশেরই পাত্তা নেই! তারপর সীতা হাওয়া, অথচ থানায় এলো না কেউ। কেন এলো না .. ..আরে আমি খুঁজে দিতাম সীতাকে .. ..একটা পয়সাও নিতাম না .. ..কিন্তু আমি ওই পুলিশওয়ালা যে, তাই আর ভরসা হল না .. ..কেন রে বাবা .. ..কেন .. ..

দৃশ্য ২

(পুলিশ বাবু টলমল পায়ে চলছিলেন। মঞ্চ কিছুক্ষণের জন্য অন্ধকার। আলো যখন আবার এসে পড়ল তখন কলিযুগ থানার বদলে “পঞ্চবটী থানা” লেখা দেখা গেল। পুলিশ বাবু মেঝেতে লুটিয়ে ছিলেন, আর ওই অংশটাতে তখনও অন্ধকার ছিল। মঞ্চের অন্য পাশ থেকে কৃষ্ণ সিংহ প্রবেশ করল। ওর পোশাক এখন কিছু নতুন ও পুরোনো ফ্যাশন মিলিয়ে। হাতে খৈনি ডলতে ডলতে কৃষ্ণ মঞ্চে হাঁটছিল আর তখনই এক সাধুর প্রবেশ। কৃষ্ণ সিংহ সাধুকে কূট দৃষ্টি নিয়ে ঘুরে ফিরে দেখছিল। সাধু তা দেখে ভয় পেয়ে গেল।)
কৃষ্ণ সিংহ :(হেসে) আরে, এত কাঁপছেন কেন?
সাধু : আপনাদের সামনে সাদা সিধা মানুষেরা ভয় না পেয়ে করবেটাই বা কি .. ..
কৃষ্ণ সিংহ :আচ্ছা, তাহলে আপনি সাদা সিধা আর আমি বদমায়েশ।
সাধু : না না .. ..আমায় ক্ষমা করুন। আপনিও অমন।
কৃষ্ণ সিংহ :(হেসে) আরে আমি ব্যাটা বদমায়েশেরও বদমায়েশ।
সাধু :আপনার কথাই হোক তবে বড়বাবু, আপনি যা বলবেন আমিও তাই, আপনিও তাই। আপনাদের এই পোশাকের ক্ষমতা প্রচুর, ওতে সাদা সিধাকে খুনি আবার খুনিকেও সাদা সিধা করে দেওয়া যায়।
কৃষ্ণ সিংহ : সাধুরা খুব বোঝদার লোক হয় দেখছি। তপস্যাতেই সব কিছু আদায় করে ফেলে, তা আমাকে শেখাবে নাকি তপস্যাটা ?
সাধু :হ্যাঁ, নিশ্চয়ই।
কৃষ্ণ সিংহ :কোনটা বলো তো, ওই যে সদা যুবক থাকার কৌশল, জীবনের সবটুকু আনন্দ যাতে বেশিদিন লুটতে পারি। তা এই থলেতে কি আছে শুনি? যজ্ঞের জিনিসপত্র নাকি? রাক্ষসরাজ রাবণের সেই আদেশটা মনে আছে তো, যজ্ঞ করলেই মৃত্যুদন্ড!
সাধু :না না, ক্ষমা করুন। আমি শুধু গুরুদেবের আজ্ঞাটাই পালন .. ..
কৃষ্ণ সিংহ :আমাকেও ক্ষমা করুন। আমিও গুরুদেবের আজ্ঞাই পালন করছি। এবার যা যা আছে বার করে দাও তো বাবা .. ..
সাধু : কিন্তু এই সময় ঘুষ দেবার মতো তো আমার কাছে কিচ্ছু নেই।
কৃষ্ণ সিংহ : আরে, ঘুষ দেখলেন কোথায়, এ তো সেবা শুল্ক। নিজেই দেবেন নাকি আশ্রমে গিয়ে উশুল করব। তা আপনার কন্যার কি খবর সাধু জি, অনেকদিন তেনা কে দেখা – টেখা যায় না।
সাধু : ও তো .. ও তো .. (থলে থেকে পয়সা বার করতে করতে) এটা আপনার জন্য।
কৃষ্ণ সিংহ : (ওগুলো গুনতে গুনতে) বড় বুদ্ধিমান দেখছি, এটা এখন না হলে সোজা বাড়িতেই যেতে হত। এবার যান তো, ফুটুন। আর আমার জন্য একটু তপস্যা টপস্যা করবেন ..(সাধুর পেছনে লাঠির আঘাত সহ)
(সাধু চলে গেল। আর ওপাশ থেকে রাম লক্ষণের প্রবেশ। )
লক্ষ্মণ : দাদা, পঞ্চবটী থানাটা কি জানি কোথায়? ওটার নাম গন্ধও খুঁজে পাচ্ছিনা। তার চেয়ে বরং সীতা মা-কে আমরা নিজেরাই খুঁজে ফেলি।
রাম : আরে ভাই লক্ষ্মণ, ধৈর্য ধর। আমাদের আইন কানুনও বলে প্রথমে এদের আশ্রয় নেওয়া উচিত। এখানকার দেখভালকারীদের একবার সীতা চুরির ঘটনাটা জানানো দরকার।
লক্ষ্মণ : এদের ওপর আমার বিশ্বাস নেই দাদা। যেখানে সীতা মা চুরি হয়ে যেতে পারে, সেখানকার ব্যবস্থাপনার ওপর আমি আর আস্থা রাখতে পারি না।
রাম : সে যাই হোক, তুমি নিজের রাগটায় একটু সংযম রেখ। আয়েশিপনায় থাকতে থাকতে এদের ভাষা অসভ্য আর ব্যবহারেও অশোভনীয়তাই প্রকাশ পায়। কিন্তু আমাদের নিজেদের ঠিক রাখতে হবে, বুঝেছ।
লক্ষ্মণ :যেমনটি বলবেন .. ..
কৃষ্ণ সিংহ :(হাতে খৈনি ডলতে ডলতে বিড়বিড় করে) .. .. আমাদের সায়েবের আবার চব্বিশ ঘন্টা পানের ব্যবস্থা থাকা চাই সাথে একটু আধটু ভাজা মাংস .. ..চল ব্যাটা কৃষ্ণ সিংহ, জোগাড় করে ফেল। (লক্ষ্মণ, কৃষ্ণ সিংহের দিকে ইশারা করে রামকে থানার ঠিকানাটা জিজ্ঞেস করতে বলল…)
রাম : এ কে? এ তো নিজেই বদমায়েশ লাগছে দেখতে।
লক্ষ্মণ :তাহলে তো নির্ঘাত জানবে। (তারপর কৃষ্ণ সিংহ কে ডেকে) এই যে সাহেব শুনছেন.. .. আপনি কি একটু কষ্ট করতে পারবেন আমাদের জন্য?
কৃষ্ণ সিংহ :এত সম্মান দিয়ে কথা বলবেন না .. ..কাতুকুতু হয়। (রাম, লক্ষ্মণের পোশাক খুব মন দিয়ে দেখে বেশ আশ্চর্য হল সে…তারপর ..) কোত্থেকে এসেছেন আপনারা? কি চান?
রাম : (হেসে) পঞ্চবটী থানার ঠিকানাটা চাই।
কৃষ্ণ সিংহ :পঞ্চবটী থানা? কিন্তু সেখানে কি কাজ?
লক্ষ্মণ : আমরা আগে জায়গাটা দেখতে চাই। কাজটা ওখানে গিয়েই বলব।
কৃষ্ণ সিংহ : আপনাদের মতন তপস্বীদের থানায় কি কাজ শুনি? ওখানকার কাজ কর্ম দেখবেন নাকি? যান ..ওই ওখানে .. ..না না এখানে .. ..বাপরে, আমি চলি। (কৃষ্ণ সিংহ ঘাবড়িয়ে ওখান থেকে কেটে পড়ল।)

দৃশ্য : ৩

(তাল বেতাল হয়ে পুলিশবাবু মাটিতে লুটিয়ে ছিলেন, আর কৃষ্ণ সিংহ তার কাছে এসে চিৎকার করে ডাকল,
– সায়েব, ও সায়েব; ওঠো না সায়েব। দেশের ভবিষ্যতের মতো কি সারাক্ষণ ঘুমিয়েই থাকবে?)
পুলিশ : (জেগে গিয়ে) কি হল আবার, এত কাঁপছিস কেন? এই সকালে উর্বশী বা মেনকার সাথে দেখা হল নাকি?
কৃষ্ণ সিংহ : না সায়েব, তীর ধনুক হাতে দুই জন লোক সমানে ঘুরঘুর করছে, আর থানার ঠিকানা জিজ্ঞেস করে বেরাচ্ছে।
পুলিশ :আরে বাবা, শিকারি হবে হয়তো, হপ্‌তা দিতে এসেছে। লাইসেন্স ছাড়াই তো ওদের শিকার করতে দিই। তুই নিজেদের গ্রাহকদের এখনও চিনলি না! চোখটা বোধহয় তোর একেবারে গেছে।
কৃষ্ণ সিংহ :না সায়েব, ওরা শিকারি না। পোশাক আশাকে মুনি-ঋষি মনে হল।
পুলিশ : তো ভুলটা কি করেছে। সাজ বদলেই তো শিকার করা ভালো। তুই একেবারে বুদ্ধু, কিচ্ছু শিখলি না।
কৃষ্ণ সিংহ : সায়েব, গুপ্তচরের লোকেরাও শুনেছি পোশাক বদলে ধরপাকড় করে।
পুলিশ :(ঘাবড়ে) হ্যাঁ তা হয়তো হয়। তবে কি বদমায়েশ লোক বলত, ধরপাকড় করতে হলে বুক টানটান করে আয় না? চুরি ধরার জন্য একেবারে চোরের মতো আসে। যা তো এবার, এই সব বোতল টোতল সরিয়ে দে, মাংসটাকে ওইদিকে রাখ। আর যখনই ডাক দেব অলকাপুরী থেকে স্পেশাল কিছু নিয়ে আসবি, ওদেরকে খুব ভালো করে খাওয়াতে হবে বুঝলি। কোনও গন্ডগোল যেন না হয়, নইলে এই লাঠি আছে তোর পিঠে। তারপর লাঠিটা শক্ত হাতে ঘুরিয়ে নিয়ে উনি চেয়ার টেনে বসলেন আর তখনই কৃষ্ণ সিংহের সাথে রাম, লক্ষ্মণের প্রবেশ।
পুলিশ :আসুন আসুন, শিকারি দাদা’রা। তা পঞ্চবটীতে শিকার করতেই এলেন বুঝি?
রাম : না মহাশয়, আমরা শিকারি নই।
পুলিশ :আচ্ছা, আমার সাথে চালাকি হচ্ছে! শিকারি নয়তো কি তীর ধনুক নিয়ে চোর পুলিশ খেলা হচ্ছে? (হাসলেন সাথে কৃষ্ণ সিংহও)
রাম :মহাশয়, আমাদের সাথে এমন উপহাস করবেন না .. ..আমরা ক্ষত্রিয়, দুষ্টদের দমন করতে সবসময়েই এটা সাথে রাখি।
পুলিশ :(রাগে) তা আমাদেরও ওসব করবে নাকি?
লক্ষ্মণ : (হেসে) পুলিশের গালে দাড়ির চিহ্নটুকু দেখি না তাও কত বুদ্ধিমানের মতো কথে বলে চলেছে।
পুলিশ : আমার সাথে মজা করিস না ছোকড়া, আমি পুলিশ। পুলিশের সাথে মজা করলে তোরই ক্ষতি। একবার যদি আমাদের পাল্লায় পড়িস তো পকেট, ঘর সব খালি করে দেব। তারপর কোর্টের চক্করে পড়লে আর রক্ষে নেই। এদিকে নিজেদের ক্ষত্রিয় বলে চলেছে কিন্তু পোশাক দেখ, তপস্বীদের! এখনই এই সাজ বদলে চোখে ধুলো দেওয়ার জন্য ফাঁসিয়ে দিতে পারি। এইবার তাড়াতাড়ি বল, ঘটনাটা কি?
লক্ষ্মণ :আমরা পিতার আদেশে বনবাসে এসেছি।
পুলিশ :এইরকম মানুষদের বাবারা ঘর থেকে বার করে দেয় বৈকি! তা বাছা কোত্থেকে আসা হচ্ছে শুনি?
লক্ষ্মণ :আমরা অযোধ্যা থেকে আসছি।
পুলিশ :(একটু ভেবে) অযোধ্যা থেকে সোজা পঞ্চবটী! পোশাক এমন, নিজেদের আবার ক্ষত্রিয় বলা হচ্ছে, নিশ্চয়ই কিছু গন্ডগোল আছে। তা ওস্তাদ, মনে হচ্ছে পঞ্চবটীর মাল ওখানে আর ওখানকার মাল পঞ্চবটীতে নিয়ে আসার কিছু পরিকল্পনা করছ! তা তোমাদের চরণ দুখানা একটু এই পানে করো তো!
লক্ষ্মণ : (রাগে) সাবধান, এসব কি বলে চলেছেন আপনি?
পুলিশ : দেখ সরকারি কর্মচারীকে তোমরা এভাবে শাসাতে পারো না। আমাদের এটাই কাজ, সম্পূর্ণ খোঁজ খবর নিতেই হবে না হলে – না হলে ওই অন্দরে পুরে দেব। (কৃষ্ণ সিংহ লক্ষ্মণের কাছে এসে অনেকক্ষণ কি যেন দেখল।)
কৃষ্ণ সিংহ :আপনি কি লক্ষ্মণ সিংহ?
লক্ষ্মণ : সিংহ নয় শুধুই লক্ষ্মণ।
কৃষ্ণ সিংহ : ঠিকই, নামের সাথে ওটা লাগালেই তো আর সিংহ হওয়া যায় না। তবে অনেক নামওয়ালা সিংহকেও আমি ল্যাজ নাড়াতে দেখেছি। কিন্তু আপনি হচ্ছেন আসল সিংহ, রাবণের বোন শুর্পনখার নাকটা একেবারে কেটেই দিলেন।
পুলিশ :আরে, এ ব্যাটা রাবণের সাথে পাঙ্গা নিয়েছে। ব্যস, তুই তো তাহলে গেলি রে। শাসনের সাথে পাঙ্গা নেওয়ায় বড় মাশুল দিতে হবে। তা দেখলেই পাঙ্গাবাজ লাগছ ভায়া, তাই তো কেমন আমার সাথেও .. ..কিন্তু সোনা আমার সাথে অমনটি করলে আর রক্ষে নেই, পুলিশের বন্ধুত্বও খারাপ, শত্রুতাও খারাপ। তবে সুন্দরীর নাকটা কেন কাটলে যদি বলো?
লক্ষ্মণ : ও আমার পেছনে পড়েছিল। ভালোবাসতে জোর করছিল।
পুলিশ : হায় রে, এতে দোষটা করল কই? নারীদের কাজই তো ওটা। তা বলে নাক কাটাটা কি ঠিক করলে বাছা? সুন্দরী নারীরা যে আমাদের সমাজের শোভা হয়।
লক্ষ্মণ :ওই দুষ্ট রমণী কখনই সমাজের শোভা হতে পারে না।
পুলিশ : সুন্দরীদের যেমন জোর করার অধিকার আছে, পুরুষকে ভালোবাসার, উস্কানোর সেই সমস্ত কিছুর অধিকারও আছে আর কুৎসিত হলে সে তো একঘরে হয়েই থাকবে!
রাম :(রাগে) সাবধান নারী সম্পর্কে এমন প্রলাপ শুনতে চাই না। নিজের মুখটাকে এবার বিশ্রাম দাও,নইলে.. ..
কৃষ্ণ সিংহ :(পুলিশকে মঞ্চের এক কোণায় নিয়ে গিয়ে বোঝাতে থাকে) সায়েব, এটা থানা – আপনি আবার নারী-টারী নিয়ে এখানে কেন? এরকম ঝগড়াঝাটি বুদ্ধিজীবিরা করুক, আপনি শুধু সুন্দরীদের দিকে খেয়াল রাখুন। আর এই লোকদুটো তখন থেকে ভয় দেখিয়ে যাচ্ছে, ব্যাটাদের হাত বোধহয় অনেক দূর অবধি যায়। এদের সত্বর বিদায় দিন।
পুলিশ :(রামকে) তা দাদা, আপনার ভাই তো অপরাধ করে এসেছে।
রাম : না, ও অপরাধীকে সাজা দিয়েছে। আর আমরা ভদ্রলোক, মোটেও অপরাধী নই।
পুলিশ : ভদ্রলোক কি করে? তারা কি থানায় আসেন? আজ থানার উদ্ঘাটনও নয় যে আপনাদের নিমন্ত্রণ করা হয়েছে, আর যদিও হত, তাহলে সেই কাজটা প্রদেশের কোন মন্ত্রীই করতেন। তাদের আর্শীবাদ ছাড়া তো কিছুই হয় না। তা আপনারা ভদ্রলোক যখন কোনও বিদ্যালয়ে গিয়ে পড়ান টড়ান, এখানে কাজ নেই।
রাম : মহাশয়, একটু অসুবিধায় পড়েছি। তাই সাহায্যের জন্য এসেছি।
পুলিশ : (হেসে) সাহায্য! তা দাদা, আমাদের নিজেদেরই সব সময় সাহায্যের ওপর দিয়ে চলতে হয়। আপনি নিশ্চয়ই দেখেছেন এলাকার চারপাশে পুলিশ বুথ যাতে লেখা “পুলিশি সহায়তা” চাই। এর মানে জনতা মন প্রাণ দিয়ে পুলিশের সেবা করুক। আপনার ভাগ্য ভালো, আজ আমার মুডটা ঠিক আছে .. ..আপনার নিশ্চয়ই সাহায্য করব, বলুন কি কষ্ট?
রাম : আমি রাম, কোন দুষ্ট ব্যাক্তি আমার স্ত্রী সীতাকে চুরি করে নিয়ে গেছে।
পুলিশ : কে সে?
রাম : এটাই তো জানতে চাইছি।
পুলিশ : দেখুন এই হল মুশকিল ভারতীয় জনতায়, আমাদের এতটুকুও সাহায্য করে না, উল্টে চায় সব কাজ পুলিশ করুক। জনতার উচিত চোর ডাকাতকে তাড়া করে ধরে থানায় নিয়ে আসা।
লক্ষ্মণ : তাহলে পুলিশ কি করবে? ওদের কাছ থেকে মালকড়ি নিয়ে সৎ লোকেদের জেলে ভরে দেওয়া, তাই তো?
পুলিশ : আরে, বড্ড বুদ্ধিমানের মতো কথা বলছ দেখছি ভায়া। তবে এই বোঝদারপনাটা নিজের কাছেই রাখ, নইলে তোমাকেও অমন আম জনতা বানিয়ে ছাড়ব।
রাম : ওকে ক্ষমা করে দিন। আপনাকে ধন্যবাদ যে আমাদের সাহায্য করতে চাইলেন।
পুলিশ : ওই সব সাহায্য টাহায্য আমি আমার বাবাকেও করি না। নেহাত এ ঘটনাটা একটু মজার তাই। আর শুধু শুকনো ধন্যবাদে কিছু হবে না, দমের জন্য যদি অযোধ্যা থেকে কিছু সোমরস টস এনে থাকেন তো দিন।
রাম : আপনাকে বললাম না, আমরা ভদ্রলোক। ওই সবে বিশ্বাস নেই।
পুলিশ :ধন্য আপনারা। সারাটা দিন আজ আমার মাটি হয়ে গেল। পুরো দেশটাই আপনাদের মতো ভদ্রলোকের জন্য খারাপ হয়ে চলেছে। লোক যত ভদ্র হচ্ছে রাজ্যে চুরি,ডাকাতি কমে যাচ্ছে আর আমাদেরও কামাইয়ের রাস্তাটা বন্ধ হবার মতো অবস্থায়। এরকমই চলতে থাকলে থানা একদিন মন্দির হয়ে যাবে, আর আমরা খোল-কর্তাল বাজিয়ে ভজন গান করব। এই সব ভদ্রলোকেরাই আমাদের হাল বেহাল করে ছেড়েছে। একে তো সরকার মাইনের নাম করে ওই কণাটুকু দেয় আর অন্যদিকে এরকম ভদ্রলোকের সংখ্যা বাড়ছে। যতক্ষণ পর্যন্ত না কোনো পুলিশ এক আধটা মহল, এক দুটো রথ, কিছু স্বর্ণমুদ্রা আর পুষ্পক বিমান কিনতে পারবে, ততদিন দেশের ছাতা প্রগতি হবে। তা দাদা, আপনাদের মতো ভদ্রলোকের আর আমাদের দুঃখ কষ্ট ভেবে কি হবে? আপনারা শুধু নিজেদেরটাই লিখিয়ে যান। বলুন, কি যেন বলছিলেন!
রাম : আমার স্ত্রীকে চুরি করা হয়েছে ?
পুলিশ : নাম?
রাম : সীতা!
পুলিশ : আগে-পেছনে কি?
রাম : তার মানে? ঠিক বুঝলাম না।
পুলিশ : যাহ্‌ বাবা, এটাও বোঝেন না। মানে সীতা কি? সীতা শ্রীবাস্তব, সীতা মিশ্র, সীতা মেহতা, সীতা ভাটিয়া, সীতা কুন্দ্রা .. ..কি লিখব?
রাম : কিচ্ছু না, শুধু সীতা।
পুলিশ : আচ্ছা, স্বামীর নাম?
রাম : রামচন্দ্র!
পুলিশ : ঠিক আছে, তা রামচন্দ্রবাবু, সীতাদেবী চুরি হলেন কিভাবে?
রাম : আমরা কুঠিতেই বসে ছিলাম, তখনই আমার স্ত্রী একটা সোনার হরিণ দেখলেন আর .. ..
পুলিশ :(চেয়ারে লাফিয়ে) সোনার হরিণ! তার মানে আমাদের এলাকায় সোনার হরিণ তৈরি হচ্ছে। আরে, এই কেস বড় জমাটিয়া মনে হচ্ছে। সোনার বিস্কুট হয় শুনেছিলাম কিন্তু সোনার হরিণ হয় জানতাম না! খোঁজ তো নিতেই হয় তাহলে, প্রচুর মালকড়ি আসবে এতে। তাড়াতাড়ি বলুন তো তারপর কি হল?
রাম :আমার স্ত্রী সীতার তখন ঐ হরিণকে ধরার ইচ্ছা হল। আমি তীর ধনুক নিয়ে ওটা ধরতেই গেছিলাম। তখন ছল করে লক্ষ্মণকেও সরিয়ে দেয় ওই দুষ্ট ব্যাক্তি আর সীতাকে চুরি করে। হরিণের বধ করে জানলাম ওটা মারীচ নামক এক মায়াবী রাক্ষস ছিল। (পুলিশ একটু হতচকিত হয়ে কলম ছেড়ে বললেন)
পুলিশ : মারীচ ছিল? না দাদা, এই কেসে তাহলে কিছু করতে পারব না। মারীচ উপরওয়ালার খুব কাছের লোক। মনে হচ্ছে আমার নিজের চাকরিটাও এবার যাবে। তা দাদা উপরওয়ালার আদেশেই যদি সীতা চুরি হয়ে থাকে তবে তা একদিন না একদিন হতই। সাতটা তালা দিয়ে বন্দী করে রাখলেও সে চুরি হত। আরে উপরওয়ালা তো পুরো দেশটাকেই লুটে পুটে বিদেশি ব্যাংকে রেখে দেয়, আমি আপনি তো কোন ছাড়।
দাদারা আমায় মাফ করে দিন, আপনাদের দুঃখ বেশ বুঝতে পারছি কিন্তু মারীচের ওপর হাত তুলতে পারব না। তাঁর জন্য তাগড়া সুপারিশ চাই, নইলে তাকে ধরা যাবে না।
লক্ষ্মণ :কিন্তু মারীচ তো মরে গেছে।
(এটা শুনে পুলিশ আরো ঘাবড়ে গেল)
পুলিশ : মরে গেছে .. ..মানে হত্যা .. ..মানে ওকে খুন করা হয়েছে, আমাকে না জানিয়েই? এদিকে খুন করছ আবার নিজেদের ভদ্রলোকও বলছ। তোমরা তো মন্ত্রীদেরও বাপ দেখছি, মারীচকেও মেরে ফেললে।
রাম :আমরা যখন ওকে মেরেছি, ও একটা মায়ামৃগ ছিল। আর মায়াবীদের শেষটা এমন করেই হয়। তাও সম্মানের সাথে ওর শেষকাজ করা হয়েছে।
পুলিশ :(মাথায় হাত দিয়ে) যাহ্‌ বাব্বা, শেষকাজও হয়ে গেছে! তার মানে হত্যার আর কোনও চিহ্নই নেই। খুব ভালো করেছেন, এই জন্য আপনাকে পুলিশের তরফ থেকেই একটা মেডেল দেওয়া উচিত। তবে মারীচকে মেরে আপনি আমার মাথাব্যথা একটু কমালেন। ওকে নিয়ে বড় দুঃখে ছিলাম, বারবার সুপারিশ নিয়ে আসত, কিন্তু ব্যাটা একটা পয়সাও দিত না। গৃহমন্ত্রীর খুব কাছের লোক ছিল ও। তা দাদারা ও যে মরেছে এটা নিশ্চিত তো। কেননা আগেও একবার এমন খবর এসেছিল, আকাশবাণীতেও প্রচারিত হচ্ছিল যে ও মরে গেছে তারপর কোত্থেকে আবার জ্যান্ত হয়ে গেল। বড় বদনাম হয়েছিল সেদিন। যাক ভালোই হল, ওর শেষকাজটাও হয়ে গেছে। তাহলে তো ব্যাটা মরেছেই। আপনারা হেব্বি লোক মাইরি, তা সীতাকে কি মারীচই ভাগিয়ে নিয়ে গেছিল?
লক্ষ্মণ :না, সে চুরিতে সাহায্য করেছিল শুধু। কিন্তু আসল চুরিটা কে করল সেটা জানার জন্যই আপনার কাছে আসা। তাঁকে খুঁজতে আমাদের একটু সাহায্য করুন। ওর খবর পেলে আমিই ওকে বধ করব।
পুলিশ :(এ কথা শুনে পুলিশের খুব রাগ হল। উনি লাঠিটাকে মেঝেতে জোরে মারলেন।)
আমরা থাকতে তুমি ওকে হত্যা করবে? দেখছি সেই যখন থেকে এসেছ খালি বড় বড় বাতেলা দিয়ে যাচ্ছ। আইনকে হাতে নেওয়া? এদিকে তোমার দাদা তো প্রথমেই খুন টুন করে বসে আছেন, তুমিও কি করতে চাও? জানা আছে নিশ্চয়ই এই থানাতে খুনের রেট হল এক লাখ স্বর্ণমুদ্রা। দিতে পারবে তো? যদি পার তো দুই চারটে খুন করে ফেল, আমারও একটু কামাই হয়। তবে আমাদের সামনে অত বেশি ফরফর কোরো না, গুরু গুরু লোকেদের এখানে ডানা কেটে যায়, তুমি তো চুনোপুঁটি। আমরা আইনের রক্ষক, আমাদের সাথে পাঙ্গা নেওয়া মানে আইনের সাথে পাঙ্গা নেওয়া, আর তাদেরকে আমরা সোজা ভেতরে পুরে দিই।
রাম :সাবধান পুলিশ বাবু। বারবার লক্ষ্মণকে এমন হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন। আপনাদের মতো মানুষের সাথে কি ভাবে ব্যবহার করতে হয় আমাদেরও জানা আছে।
পুলিশ : আরে দাদা, ও তো কথার কথা। ঘরেতেও বাচ্চার বদমায়েশিতে এমনটা বলি, কিন্তু বউয়ের সামনে সাহস হয় না।
(সেই সময় আরেক হাবিলদার একটা লোককে টানতে টানতে নিয়ে এল।)
পুলিশ : আরে, এইটাকে কোত্থেকে ধরে নিয়ে এলি।
হাবিলদার : সায়েব, এ বড় ওস্তাদ লোক।
পুলিশ : (রাম লক্ষ্মণের দিকে তাকিয়ে) এদের থেকেও নিশ্চয়ই নয়। কি রেটের বদমায়েশি করেছে শুনি। (ছেলেটার পেটে লাঠি ঢুকিয়ে দিয়ে) কি রে, আমার সামনেও ওস্তাদি দেখাবি নাকি।
ব্যাক্তি :না না, আমি কিচ্ছু করিনি। জুয়া তো অন্যরা খেলছিল, আমি শুধু ওদের পাশে বসে পড়ছিলাম। ওই লোকগুলো হাবিলদারকে পয়সা দিল আর উনিও ওদের ছেড়ে আমায় ধরে নিয়ে এলেন।
পুলিশ : চুপ কর ব্যাটা .. ..আমাদের উপর দোষ দেওয়া .. ..দাঁড়া দেখাচ্ছি। (পুলিশ হাবিলদারকে এক পাশে নিয়ে গেল। সে লুকিয়ে কিছু পুলিশের হাতে দিল। তারপর দুজনকে একটু বিতর্কে দেখা গেল। হাবিলদার তখন আরো কিছু বার করে পুলিশের হাতে গুঁজে দিল আর পুলিশ ছেলেটির কাছে এসে ..)
আচ্ছা, নেশার জিনিসের ধান্দা হচ্ছে? আজ তোমার এমন হুলিয়া বানাব না! ..এই ছোড়াটাকে বন্ধ করে দে তো!
রাম :(রাগে) সাবধান থানাধিকারী, এটা সভ্য ভাষা নয়।
পুলিশ :দাদা, এটা পুলিশি ভাষা। আমাদের ভাষায় গালিগালাজকে অলঙ্কার হিসেবে দেখা হয়। আর এদের সাথে এমন করে কথা বলবনা তো কি! তবে আপনার সাথে দেখছি এখন এভাবে বলতে হবে,
– শ্রীমান জি, আপনি থানায় আসাতে আমরা ধন্য হলাম। আমাদের ভাগ্য খুলে গেল। খুন করে বড় পবিত্র কাজটি করেছেন, তাই এই খুশিতে আপনার হাতে হাতকড়া পড়িয়ে তার শোভা বাড়াতে চাই। তা কোন হাতে পড়তে চান ওটা? আপনার সেবার জন্য দেশ বিদেশের বিভিন্ন রঙের হাথকড়া আছে, আপনি কি সোনারটা পড়তে চান না লোহারটা?
(সুর বদলে) আরে ছাড়ুন তো আপনাদের ভাষা টাষা, আপনাদের এই সব ভদ্রতার জন্যই সীতা চুরি গেছে। আজকাল যারা অসভ্য তারাই সুখী, আর যারা সভ্য তারা বেচারার মতো গলি গলি ঘোরে আর নিজেদের সাথে আমাদেরও সময় নষ্ট করে। তাই বলি কি অত না ঘেঁটে, অন্যের সীতা হাওয়া করা শুরু করে দিন।
রাম :(রাগে) সাবধান থানাধিকারী, আপনার কথাবার্তায় মর্যাদাটুকুও নেই।
পুলিশ : কেমন করে হবে বলুন, পুলিশের পোশাকটাই এমন। ঘরে বাচ্চারাও ভয়ে কাঁপে। বিয়ের প্রথম রাতে বৌএরও ভালোবাসা দেখে মনে হচ্ছিল সে কোনও সাফাই দিয়ে চলেছে। এলাকাতে কোন ভদ্রলোক আমাদের সাথে হাত মেলায় না, বাড়িতে ডাক পাঠালেও ঘাবড়ে যায়। বদমায়েশি না করেই লোকে যদি এমনটা ভাবে, তার চাইতে পাক্কা বদমায়েশ হওয়া ঢের ভালো। (কৃষ্ণ সিংহ হাসতে হাসতে ভেতরে এল)
কৃষ্ণ সিংহ :সায়েব, সুনয়না কে পাওয়া গেছে।
পুলিশ : কোন সুনয়না?
কৃষ্ণ সিংহ : দশ দিন আগেই যে হাওয়া হয়েছিল, ওর স্বামী দশ হাজার টাকাও তো দিয়েছিল। রোজ খোঁজ নিতে আসত আর নেবেই না বা কেন বলুন, বৌ-টা যা সুন্দর ওর!
পুলিশ : (কৃষ্ণ সিংহকে গলা জড়িয়ে) তুই তো ব্যাটা দারুন কেসের হিল্লে করে দিলি। লোকে বলে পুলিশেরা কাজ করে না। যা, ওকে আমার ঘরে নিয়ে বসা।
লক্ষ্মণ : (রাগে) ওনাকে আপনার ঘরে বসাচ্ছেন কেন?
পুলিশ : তুমি এখনও ছেলেমানুষ আছ বাছা, ওখানে ওর বয়ান নেওয়া হবে। আর এও দেখা হবে যে দুষ্ট ব্যাক্তিটি ওর শরীরের ঠিক কোথায় কোথায় ছুঁয়েছে! তাই না”রে কিড়শন সিং? (তুমুল হাসির আওয়াজ শোনা গেল)
রাম :(রাগে) দুষ্ট থানাধিকারী, সুনয়নাকে ছেড়ে দাও, ও স্বামীর কাছে ফিরে যাক।
পুলিশ : যা বাব্বা, ছেড়ে দেব! হাতে আসা এমন সম্পদকে ছেড়ে দেব, মাথা খারাপ হয়ে গেল নাকি? এমন জিনিস কি কেউ ছাড়ে? তা দাদা আপনিও তো হরিণকে মানে সোনার (“সোনা” শব্দটার উপর একটু জোর দিয়ে) হরিণ শিকারে গেছিলেন, তারপর তাঁকে মেরেই শান্তি হল। আমরাও ওই অমন একটু আধটু ক্ষত্রিয়পনা করি – দুষ্টদের দমন করি। তাই আর বাধা দিয়ে লাভ নেই, আজ তো সুনয়নার বয়ান নিয়েই ছাড়ব।
লক্ষ্মণ :কি সব অনর্গল বকে চলেছেন, এই ভালো হবে শ্রীরামের আজ্ঞা পালন করুন, সুনয়নাকে তার স্বামীর কাছে যেতে দিন, না হলে .. ..
পুলিশ :না হলে কি করবে শুনি! .. ..দেখ পুলিশের কাজে বেশি মাথা ঘামিও না। আর যদি তা করেছ তো দুই জনকেই একসাথে অন্দরে পুরে দেব।
লক্ষ্মণ :দাদা, এ দেখছি এমনিতে কথা শুনবে না। আপনি আদেশ দিন, একে বধ করা দরকার।
পুলিশ :আরে যা, আমায় মারবি! দুধের দাঁতটি এখনও পড়েনি সে কিনা আবার ….আমরা কি তা জানিস নিশ্চয়ই ..আমরা .. ..
(লক্ষ্মণ রাগে তীর ছুঁড়ল। পুলিশের অট্টহাসি শোনা গেল। সে মঞ্চের পেছনের দিকে যেতেই অন্ধকার হয়ে গেল। আর তার জায়গায় গান্ধী টুপিতে নেতাকে দেখা গেল। লক্ষ্মণ তার দিকে নিশানায় তীর ছুঁড়ল। সে হাসতে হাসতে সরে যেতে সেখানে এক রিপোর্টার এসে উপস্থিত, হাতে কলম। লক্ষ্মণ তাকেও তীর ছুঁড়লে অট্টহাসিতে সে পর্দার পেছনে চলে যায়। এবার সেখানে খেমচন্দ শেঠ এসে দাঁড়াল। একইভাবে তাকেও বধের উদ্দেশ্যে তীর ছুঁড়লে সে সরে গেল ও সেখানে উকিলকে দেখা গেল।

সব শেষে পুলিশ, নেতা, রিপোর্টার, শেঠ, ও উকিল সবাই একসাথে অট্টহাস্যে বেরিয়ে এল। লক্ষ্মণ তাদের সকলকে নিশানা করে তীর ছুঁড়লে তা পুলিশের গায়ে লাগল। পুলিশ মরে গেল আর তার মৃতদেহ ঘিরে সবাই বিলাপের সুরে গাইতে লাগল)

নেতা : মরে গেল, মরে গেল – আমাদের পুলিশ বাবু মরে গেল।
রিপোর্টার :আমাদের অনাথ করে পুলিশটা মরে গেল।
শেঠ : উনি তো আমার কাকা ছিলেন, মামাও ছিলেন…নিজের ভাইয়ের মতন ঐ মানুষটা ছিল, মরে গেল।
জনতা : হায়, আমাদের বিধবা করে গেল, সে তো মরে গেল
আমাদের ভয়ও গেল
পুলিশটা মরে গেল।

[ পর্দার পেছন থেকে তখন গীতার মন্ত্র ভেসে এলো ]

ন জয়তে ম্রিয়তে ব কদাচিন্নায়ং ভত্বা ভবিতা ব ন ভুয়ঃ
অজো নিত্যঃ শ্বাস্বতয়োং পুরানো ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে।।
বসাংসি জীর্ণানি যথা বিহায় নবনি গৃহণাতি নরো পরাণি।
তথা শরীরাণি বিহায় জীর্ণান্যন্যানি সংযতি নবনি দেহি।।
নৈনং ছিদন্তি শস্ত্রানি নৈনং দহতি পাবকঃ।
ন চৈনং ক্লেদয়ন্ত্যাপৌ ন শোষয়তি মারুতঃ ।।

~ সমাপ্ত ~

অনুবাদ – ঝর্না বিশ্বাস

[এটি ২০০৯ এ প্রকাশিত হয়েছে এক অনুবাদ পত্রিকায়…]

NO COMMENTS

এমন আরো নিবন্ধ

Rupam Islam New Song

4 1761
Rupam Islam New Song

1 1936