Raju ahammed
Electrical & Electronic Engineer

স্বাভাবিকভাবে আমাদের সারাদিনের কাজকর্মের ব্যস্ততার যে দৃশ্যপট, সেগুলো মস্তিষ্কে বোঝা হিসেবে জমা হতে থাকে। এই বোঝা গুলোকে হালকা করার একটি জৈবিক প্রক্রিয়া হচ্ছে স্বপ্ন, যা আমরা ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেখতে পাই।ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও খ্যাতিমান পরমাণু বিজ্ঞানী এপিজে আবদুল কালাম, বলেছিলেন ‘‘স্বপ্ন তা নয় যা মানুষ ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেখে, স্বপ্ন হচ্ছে তা-ই যা মানুষকে ঘুমাতে দেয় না।’’অর্থাৎ শয়নে,স্বপনে, জাগরণে যে লক্ষ্যের অনুরণন আপনাকে কর্মব্যস্ত করে রাখে তা-ই হলো স্বপ্ন।এই স্বপ্ন দেখে যারা পৃথিবীকে আলোরিত করেছেন, তারা তাদের স্বপ্নটাকে বিশাল করেছেন যতক্ষণ না পর্যন্ত সেটার মধ্যে মানবতার কল্যাণ পাওয়া যায়। আর সেই স্বপ্নকে অর্জনের জন্যে তারা তাদের রক্তকে ঘাম করে ঝরিয়েছেন। আর সেখানেই অংকুরিত হয়েছে সাফল্যের বীজ।

আমরা যদি কোন স্বপ্নবান মানুষের জীবনের দিকে তাকাই তাহলে বোঝা যাবে তাদের স্বপ্নের পরিধি কত বড়, কত ব্যপক।মার্টিন লুথার কিং এর কথা মনে করুন। এই কৃষ্ণাঙ্গ নেতা এক চার্চের পাদ্রী ছিলেন।আমেরিকায় কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের সময় ওয়াশিংটনে তাদের সমাবেশে যে বক্তৃতা দিয়েছিলেন, সেই বক্তৃতার পর কেউ হাততালি দেয় নি, কারণ তারা হাততালি দিতেই ভুলে গিয়েছিলো। বক্তৃতায় তিনি তাঁর স্বপ্নের কথা বলেছিলেন।শুনিয়েছিলেন এক সাম্যবাদী সমাজের স্বপ্নের কথা ।তাঁর এই স্বপ্ন অনুপ্রাণিত করেছিলো সবাইকে।তারই ফলশ্রুতিতে পরের বছর সিভিল রাইট অ্যাক্ট ১৯৬৪ পাস হয়।যে স্বপ্ন তিনি লালন করেছিলেন, সেই স্বপ্ন তাঁর পরবর্তী প্রজন্মকেও দেখিয়েছে আলোকবর্তিকা। সেই স্বপ্ন বোনার ৫০ বছর পর আজ আমেরিকার রাষ্ট্রপ্রধান একজন কৃষ্ণাঙ্গ।আসলে স্বপ্ন দেখাও জানতে হয়। তাহলে তা বাহিত হতে পারে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ।

বাংলাদেশের প্রথম এভারেস্ট জয়ী মুসা ইব্রাহিম ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে পঞ্চগড়ে দাঁড়িয়ে হিমালয়ের চূড়া দেখেছিলেন। তখন থেকে তার স্বপ্ন ছিলো হিমালয় জয় করার। এই স্বপ্ন তাকে এমনভাবে উদ্বুদ্ধ করেছিলো যে,তিনি সবসময় ভারী একটা ব্যাগ প্যাক বহন করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে পর্বতারোহনের সময় ভারী ব্যাগ কাঁধে বহনের এই অনুশীলন তাকে স্বপ্ন পূরণে সাহায্য করবে।তিনি এভারেস্ট জয় করার পর ইতোমধ্যে আরো পাঁচ বাংলাদেশি এভারেস্ট জয় করেছেন।আসলে স্বপ্ন দেখতে জানলে অন্যদেরও সেই স্বপ্নে অনুপ্রাণিত করা যায়।

নেলসন ম্যান্ডেলা ২৯ বছর কারাবন্দী ছিলেন।এমন প্রকোষ্ঠে তাঁকে রাখা হলো যেখানেসূর্যের আলো পৌঁছাতো না। মুক্তির পর তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, আপনি সেখানে কী করেছেন? তিনি উত্তর দিয়েছেন, ‘স্বপ্ন দেখেছি’। মুক্ত দক্ষিণ আফ্রিকার স্বপ্ন দেখেছি। আলোচনার টেবিলে তিনি শেতাঙ্গদের পরাজিত করে কৃষ্ণাঙ্গ শাসন জারি করেন।

বর্তমান যে আধুনিক মালয়েশিয়া, এর জনক হিসেবে যাকে আমরা চিহ্নিত করি মাহাথির মোহাম্মদ, এই মানুষটি একাই বদলে দিয়েছেন মালয়েশিয়াকে। কুয়ালালামপুর বিমানবন্দর যখন তৈরি হলো পার্লামেন্টে তাকে জিজ্ঞেস করা হলো-বিমানবন্দর শহর থেকে এত দূরে তৈরি করার কী দরকার ছিলো,লোকালয় থেকে অনেক দূরে যেতেও সময় লাগে গাড়ির তেলও খরচ হয় ? তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘একশ বছর পরের মালয়রা তো আমাকে কাঠগোড়ার আসামী করে বলবে যে, বিমানবন্দর এত কাছে কেন বানালাম?’ আমরা একটু চিন্তা করলেই বুঝতে পারি কী সুদূরপ্রসারী স্বপ্ন তিনি দেখেছেন!আসলে স্বপ্ন হচ্ছে মনছবির প্রথম পদক্ষেপ।স্টিভ জবস খুব সুন্দর করে বলেছিলেন, তোমার সময় সীমিত। অন্যের মনমতো জীবন যাপন করতে গিয়ে এ সময়টুকু নষ্ট করো না। অন্যেরা কী ভাবছে, সে ফাঁদে পা দিও না। অন্যের মতামতের ভিড়ে তোমার অন্তরের কণ্ঠস্বরকে চাপা পড়তে দিও না। নিজের হৃদয় ও অনুভূতিকে বিশ্বাস করার মতো সাহসী হও। তোমার হৃদয় ঠিকই জানে তুমি আসলে কী হতে চাও। বাকী সবকিছুই হচ্ছে অবিবেচ্য।

মনছবিকে বাস্তবায়িত করতে হলে স্বপ্নকে বড় করে লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। প্রচলিত একটি প্রবাদ আছে, তুমি যদি গাছের মগডালে লক্ষ্য করে তীর চালাও তাহলে কোনো মতে গাছের নিচু ডালটার নাগাল পাবে। আর যদি পাহাড়ের শীর্ষকে লক্ষ্য করে তীর নিক্ষেপ তাহলে অবশ্যই গাছের মগডালে পৌঁছাতে পারবে। আপনি নিজেকে যে মূল্য দেবেন পৃথিবী আপনাকে সেই মূল্য দেবে।ঔপন্যাসিক কুটভানেগার্টের ভাষায়, আমরা নিজেদের সম্পর্কে যা কল্পনা করি, আমরা আসলে তা-ই। এজন্যেই নিজের লক্ষ্যকে সবসময় বড় করতে হবে।শুধু স্বপ্ন দেখলেই হবে না বিশ্বাস করতে হবে কারণ স্বপ্নের সঙ্গে বিশ্বাস যুক্ত হয়ে সেটা পরিণত হয় ভবিষ্যতের বাস্তবতায় অর্থাৎ মনছবিতে।

আপনি যা হতে চান সে ব্যাপারে ভেতরে কোনো সংশয় বা সন্দেহ রাখা যাবে না।সবসময় মনে রাখতে হবে, মহান কিছু করার জন্যেই আপনার জন্ম হয়েছে।দার্শনিক কনফুসিয়াস খুব সুন্দর করে বলেছেন, যে পাহাড়কে সরিয়ে ফেলে, সে শুরু করে ছোট ছোট পাথর বহনের মাধ্যমে। সফল মানুষের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবার আগে অধিকাংশ বিষয়ই তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিলো না। সময় তাদেরকে এগিয়ে নিয়ে গেছে লক্ষ্য অর্জনের পথে।আসলে বিশ্বাস যখন চলে আসে তখন সামগ্রিক সচেতনতা থেকে সহযোগী শক্তি চলে আসে,প্রকৃতির নেপথ্য স্পন্দন সাফল্যের পথে কাজ করতে শুরু করে।

স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে হলে আপনাকে সঙ্ঘবদ্ধ হতে হবে। যত সঙ্ঘবদ্ধ থাকবেন তত আপনি করে মনছবি বাস্তবায়নের পথে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাবেন। বারাক ওবামার জীবন দেখুন, সঙ্ঘে ছিলেন বলেই তিনি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পথে এক ধাপ এগিয়ে গেছেন। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করার পর অনেক মোটা অঙ্কের চাকরির সুযোগ থাকার পরও প্রথম পেশা হিসেবে বেছে নেন কমিউনিটি সংগঠনকে। দারিদ্র ও বর্ণ সমস্যা নিয়ে কাজ শুরু করেন তিনি। সুবিধাবঞ্চিত লক্ষাধিক নাগরিকের ভোটাধিকারের সুযোগ তৈরি করে দেন।সেই কাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্যে প্রয়োজন মনের স্থিরতা।

উত্তাল বঙ্গোপসাগরে একটা বড় অট্টালিকা যদি ফেলে দেয়া হয় তবে সে কোন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে না। কিন্তু একটা শান্ত সরোবরে একটা ছোট্ট ঢিল ছুঁড়লে সেই ঢিল কিন্তু পানিকে আন্দোলিত করবে।তেমনি প্রগাড় বা চিন্তা হলো সচেতন ভাবে দেহ মন এবং মস্তিষ্ককে শিথিল করার বৈজ্ঞানিক এবং সহজলভ্য প্রক্রিয়া। যার মাধ্যমে আমরা আমাদের শরীরকে শিথিল এবং মন ও মস্তিককে প্রশান্ত করতে পারি। মনের এই প্রশান্ত অবস্থায় মনছবি তৈরি করে তা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করে, আমরা বড় হতে পারি আমাদের স্বপ্নের সমান।

NO COMMENTS

এমন আরো নিবন্ধ

Rupam Islam New Song

4 1431
Rupam Islam New Song

1 1738