পশ্চিমবঙ্গের আর্থিক সংকট থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে শিল্পায়নের ভূমিকা নিয়ে আর সন্দেহের অবকাশ নেই | কিন্তু শিল্পায়নের পথে কিছু উপাদান কাঁটার মতো ছড়িয়ে আছে | তাই সরকার বিশ্ববঙ্গ সম্মেলন করার সাথে সাথে আরও কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিন যাতে স্বল্প এবং দীর্ঘকালের নিরিখে শিল্পায়নের বাধা দূর হয় | কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে চাই যা পশ্চিমবঙ্গ সম্পর্কে শিল্পমহলের মানসিকতাকে পাল্টাতে সক্ষম |

শিল্পমহলের কাছে পশ্চিমবঙ্গের ভাবমূর্তি আরো উজ্জ্বল করতে হবে, কিন্তু তার জন্যে শুধু মৌখিক প্রচারটাই যথেষ্ট নয় | যথেষ্ট নয় শুধুমাত্র উপযুক্ত পরিকাঠামো বা শিল্পনীতির আশ্বাস | বর্তমান শাসকদলের আমলে একটা বড় বেসরকারি বিনিয়োগের সফল উদাহরণ খাড়া করতে হবে | সেটা সিঙ্গুরের ন্যানো কারখানার পুনুরুজ্জীবনই হোক বা লর্ড স্বরাজ পলের ক্যাপারো গাড়ির কারখানা বা অন্য কোনো আনকোরা নতুন বৃহৎ শিল্প, অ্যাদ্দিন পর একটা অন্তত মাইলফলক পোঁতা প্রয়োজন | বিশ্ব বাজারে তো এতো মন্দা, তাহলে মহারাষ্ট্র ফক্সকনের আইফোন প্লান্ট বা অন্ধ্রপ্রদেশ জাওমি প্লান্ট-এর প্রতিশ্রুতি পেল কি করে ? হরিয়ানাই বা কিভাবে পেল সোনিপেটে চীনের ওয়ান্ডা গ্রূপের দশ বিলিয়ন ডলারের শিল্পোদ্যান ? কর্ণাটকও কুক্ষিগত করেছে বায়োকনের হাজার কোটির প্ৰকল্প | হলদিয়া পেট্রোকেমের উদাহরণ বা টাটা মেটালিক্স দিয়ে কিন্তু আর চলবে না |

কিছু নীতি নিয়ে পুনর্বিবেচনা করতে হবে, যেমন তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল না দেওয়ার নীতি | এটা অনেক বিনিয়োগকারীর মনে বিরূপ ধারণা সৃষ্টি করতে পারে | কারণ সাধারণভাবে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল নিয়ে যতই বিতর্ক থাকুক না কেন, তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে ব্যবহৃত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলি কিন্তু বেশিরভাগই সফল | এসব অর্থনৈতিক অঞ্চলের গুরুত্ব প্রশ্নাতীত | তাই তথ্যপ্রযুক্তিতে ‘সেজ’-বিরোধী নীতি ধরে রেখে পশ্চিমবঙ্গের পক্ষে শিল্প-মানসে তৃণমূল সরকারের শিল্পবিরোধী ভাবমূর্তি মুছে ফেলা সহজ হবে না | খুচরো ব্যবসায় বিদেশি লগ্নির বিরোধিতা না হয় মানা গেল কিন্তু জমির অভাব দেখিয়ে কাটোয়া এনটিপিসি-র প্রকল্পের বহর ছোট করাই হোক বা পারমাণবিক বিদ্যুতের প্রতি অনীহা, এগুলোর কোনোটাই পশ্চিমবঙ্গকে শিল্পমহলের কাছে খুব স্বস্তির জায়গায় রেখেছে বলে তো মানতে পারছি না | তারপর তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রের প্রসারের অভাবে কলকাতা ভিত্তিক নির্মাণশিল্প কিন্তু মহা ফাঁপরে পড়েছে | পশ্চিমবঙ্গের শিল্পমহলের বড় একটা অংশ নির্মাণ শিল্পের সাথে জড়িত বা এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল |

আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতি উদ্বেগজনক | ভারতবর্ষের অন্যান্য প্রান্তের মানুষের পশ্চিমবঙ্গের সম্বন্ধে একটা ধারণা আছে যে, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অনুপ্রবেশে প্রচ্ছন্ন সমর্থন আছে এবং এখানে বাংলাদেশ থেকে অবাধ অনুপ্রবেশ চলে | দিল্লির মিডিয়া তো প্রায় প্রমাণ করেই ছেড়েছিল যে মালদায় বড়সড় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ঘটে গেছে | কিন্তু সেবার মুখ্যমন্ত্রীর দ্রুত প্রতিক্রিয়ায় জনমানসে বিভ্রান্তি দূর হয়, সত্য ঘটনা সামনে আসে | পশ্চিমবঙ্গের উদাহরণযোগ্য সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ভারতবর্ষের সামনে উজ্জ্বল হয় | তবু জঙ্গি গতিবিধি নিয়ে এখন পশ্চিমবঙ্গ সরকার এবং বাংলাদেশ সরকার দুপক্ষই বিব্রত | তাই আইন শৃঙ্খলা নিয়ে শিল্পমহলের মনের আশঙ্কার মেঘ দূরীভূত করতে সরকারের শিল্পমন্ত্রককেই ভূমিকা নিতে হবে |

অর্থনীতিকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে রাখবার রসদ পশ্চিমবঙ্গেই যথেষ্ট পরিমাণে মজুত আছে, কোথাও ক্রোনি-ক্যাপিটালিজম তো কথাও সিন্ডিকেট-রাজ রূপে | কাউন্সিলর থেকে ট্রাফিক পুলিশ, তোলাবাজিতে সবাই যুক্ত | এই রোগ পুরোনো এবং খুব সহজে নিরাময় হওয়ার নয় | ছোট ছোট উদ্যোগ এতে আত্মবিশ্বাস হারায় | না হলে পশ্চিমবঙ্গের বুক থেকেই প্রচুর সফল শিল্পোদ্যোগের জন্ম হতো, বাহ্যিক বিনিয়োগের ওপর নির্ভরতা কমত | সিট ধরে রাখতে গেলে লোকবল চাই | প্রতি বুথে লোক চাই | একটা লোক ফুলটাইম পার্টির জন্য খাটবে কিসের আশায় ? সাধারণ ক্যাডারদের প্রাপ্তি এগুলোই – তোলার বখরা অথবা ব্যবসায় অগ্রাধিকার | দলীয় রাজনীতিটা পশ্চিমবঙ্গের জনজীবনের সাথে এত ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছে যে ভোটযুদ্ধটা ঠিক রাজনৈতিক লড়াই না জীবিকার লড়াই তা মাঝেমধ্যে বোঝা মুশকিল হয়ে দাঁড়ায় | পার্টির আনুগত্য না স্বীকার করলে ব্যবসা শুরু করা এখানে দূরূহ ব্যাপার |

শিল্পায়ন জরুরি এবং শিল্পমহলের প্রত্যাশা পূরণ করেই সেটা সম্ভব | কিন্তু বিদ্যুৎ, জল বা রাস্তার থেকেও প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো হল সরকারের একটা দুর্দমনীয় অ্যাটিটিউড যার কাছে কোনো বাধাই বাঁধা নয় |

NO COMMENTS

এমন আরো নিবন্ধ

Rupam Islam New Song

4 1493
Rupam Islam New Song

1 1764