সে এক দিস্তা খাতা আর ফাউন্টেন পেনের গল্প। ছাদের ঝুপ্পুস ঘরটাতে আলো পর্যন্ত যখন কিপটে হয়ে ঢুকছে সেখানেই বসত ছিল এই দুই প্রাক্তন প্রেমিকের…

ফাউন্টেন ওর সোনালি চকচকে শরীরে চম্‌কে দিত মধ্য বয়স্ক মনোরথ স্যারকেও…তাঁর লম্বা ঝোলা থেকে টুক্কুস করে মাথা বার করত এই পেন…আর গড়গড়িয়ে সে যখন উপড়ে দিত শব্দগুলো, দিস্তা খাতারও হেব্বি খুশি…পাতা টু পাতায় ইন্টিগ্র্যাল ক্যালকুলাস বা ব্যাঙের পৌষ্টিক তন্ত্রের পুরোপুরি ব্যাখ্যা দিয়ে তবেই থামত দুজনে।

তাও পাতায় কাটাকুটি একেবারে যে হত না, তা নয়। কেমিস্ট্রির আরো বয়স্ক স্যার তাঁর লাল কালিতে মাঝে মাঝেই এটা হলো না, ওটা হলো না করে দাগ দিতেন। দিস্তাও তাঁর সারা শরীরে ছাত্রীর কষ্টটা পুরোপুরি টের পেত।

এদিকে দিস্তা মানেই বাড়ির খাতা, টিউশনি মাস্টারের খাতা – তাই ওকে ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যেই বন্দী রাখতে হত। যদিও মোটা বাঁধানো খাতার থেকে দিস্তার লম্বাটে পাতারাই বেশি বেশি সুযোগ দিত প্রান খুলে লেখার। আর এভাবেই মাসকাবারি বাজার ফর্দে চাল – গুড়োমশলার সাথে সহজেই স্থান করে নিত দিস্তা পাতা… কেজি দরে আনা হত, না ডজন পাতায় তা মনে নেই – তবে ব্যাগ থেকে বেরিয়ে আমাদের হাত অবধি পৌঁছতে তাকে অনেকখানি ঝক্কি পোহাতে হত।

বাবা ওর লম্বাটে শরীরে একটা মোটা সুঁই ঢুকিয়ে দিতেন, যার গায়ে কখনও লেপটে থাকত উল বা কখনও মোটা পরতের সুতো… তারপর এফোঁড় ওফোঁড় ভালো করে তাতে গাঁট বাঁধা হত, যাতে একটি পাতাও ফস্কে না যায়।

খাতা সেলাইয়ের কাজ শেষ হলে চলত অলঙ্করণের পালা। শনিবারের কাগজ মানেই রঙিন পাতা জুড়ে ফিল্মস্টার, আর তা থেকে বেশ কটা চকচকে পাতা দিয়ে মুড়ে দেওয়া হত দিস্তা খাতাকে। এরপর বিষয় ও নাম লেখা বিভিন্ন কায়দায়। আর দিস্তারও সরলতা এমনই, সব টানাপোড়েন সহ্য করে বাজে মেয়েকে ভালো করে তুলতে সে জি-জান লড়ে যেত।

অন্যদিকে ফাউন্টেন এক পোশাকি নাম, লুক-ওয়ার্ক সবেতেই দিস্তার চেয়ে স্মার্ট। একটা ফাউন্টেন পেন, মা এ বছর কিনে দিলে তাঁর পুরোপুরি হিসেব থাকত কতদিন চলবে। তাই ওতে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষামূলক কিছু ঘটানোর কোনও সুযোগ ছিল না। তাও ওর সরু নিবে হাত বোলানোর অভ্যাসটা চলতই, বিপরীতে “আমি বিলকুল ফিট” প্রমানে তিনিও কালি ছুঁড়তেন।

এভাবেই হাতে একখানি ফাউন্টেন পেন মানে বিশাল ব্যাপার…কম্পাস বক্সে লাল-কালো নটরাজ পেন্সিল ও সফেদ স্কেলের পাশাপাশি তাকে যখন প্রতিপক্ষের সামনে উপস্থিত করা যেত তখন আলাদা গর্ব হত। তেমনটা পরীক্ষা হল-এও…একখানি ফাউন্টেন পেন কখনই লেখার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবেনা জানতাম। তাই আমার ভীষণ প্রিয়তে বহু বছর সামিল ছিল সে। মাধ্যমিকের পরও কে যেন দিয়েছিল একটা ফাউন্টেন পেন, যার শরীরটা ছিল মেরুন আর ক্যাপ সোনালি। অদ্ভুত কম্বিনেশন! পরে অনেক ভালোলাগা কিছুর মত তাকেও হারিয়ে ফেলেছি।

এ লেখায় দিস্তা এলো, ফাউন্টেন পেন এলো…আর নীল কালির দোয়াত থাকবে না, তা হতে পারে না। আমাদের লেখাপড়ার জিনিসের বাজেটে তার স্থান ছিল ওপরেই। একে বেশ ক’দিনের কালি কেনার খরচ থেকে মুক্তি, আবার বড় দোয়াত সস্তাও, সেই ভেবে পড়ার টেবিলে আঁটগাঁট হয়ে সে বসত ফাউন্টেন পেনের পাশেই। ওর সাথে একটা ড্রপার ফাউ, যাতে কালি ভরে তবেই পেনের মোটা পেটটাতে ঢালতে হত। ফাউন্টেনও স্বচ্ছতার প্রতিমূর্তি, তাই কালি ভরা শেষে একটা বাজে রুমাল দিয়ে তাঁর পুরো শরীর ভালো করে মুছিয়ে দিতে হত।

এভাবেই আমাদের পড়ালেখার সমস্ত দিনগুলোয় জুড়ে ছিল দিস্তা খাতা আর ফাউন্টেন পেনের অবিচ্ছেদ্য প্রেম কাহিনী… কিন্তু এখন এদের অস্তিত্ব বিরল…এখন খাতা মানেই মসৃন পাতায় বাঁধানো দামী কোম্পানীর পাতারা…যার দাম যত বেশি তাঁর পাতাও তত মসৃন, আর পকেটে পকেটে জেল ও ডট পেন জায়গা করে নিয়েছে। সি বি এস ই – ও তাই পরীক্ষার উত্তরপত্রে ডট পেনের গোলাই বাধ্যতামূলক করে দিয়েছে।

এইসব ডট ও জেল পেন-এর বেশিরভাগই রিফিলিং হয়না…মানে ওয়ান টাইম ইউজ… আর কেই বা চাইবে ঝাঁ চকচক শার্টখানিতে কালির ছিটে দাগ…তাই লেখালিখিতেও শিক্ষক ও ছাত্র দুয়ের পছন্দে সর্বসেরা এখন তাঁরাই।

যদিও খুব ইচ্ছে হয় আবারও ফিরে আসুক কালি-কলম-দোয়াত…আঙুলে ফাউন্টেন বাঁধিয়ে আবারও লেখা হোক প্রিয় সহেলির প্রেমপত্র আর “হ্যাঁ” ভরিয়ে কাছের মানুষটারও উত্তর আসুক কালি কলমেই।

NO COMMENTS

এমন আরো নিবন্ধ

Rupam Islam New Song

4 1697
Rupam Islam New Song

1 1881