পশ্চিমবঙ্গের বিশ্ববিদ্যালয় গুলি স্নাতক স্তরে পার্ট থ্রি পরীক্ষার তারিখ বিধানসভা নির্বাচন চলাকালিন ঘোষনা করে এক নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। ভোট চলাকালিন পরীক্ষার দিন ঘোষনা বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষের ওপর ছাত্র-ছাত্রীদের ক্ষোভ বৃদ্ধি ঘটিয়েছে।
কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় হোক বা বর্ধমান বা বারাসাত রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় সর্বত্র একই চিত্র ফুটে উঠছে। ছাত্র-ছাত্রীরা ক্রমশ সুর চড়াচ্ছে পরীক্ষা পেছনর দাবিকে কেন্দ্র করে। কোথাও চলছে উপাচার্য ঘেরাও আবার কোথাও রাজপথে মিছিলের মতো কর্মসূচী লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
কিন্তু এই পরীক্ষা পেছনর দাবিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বর্ধমান, কলকাতা বা বারাসাত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-আন্দোলনের গর্জন বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে বা রাজপথে যতো না প্রবল তার থেকে অনেক বেশি মাত্রায় গর্জন লক্ষ্য করা যাচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া বা ফেসবুকে।
অনেকেই ফেসবুকের এইরূপ তীব্র গর্জনকে আন্দোলনের স্বতঃস্ফূর্ততা বলে দাবি করছেন। কিন্তু যেরূপ মন্তব্য বা পোস্ট ফেসবুকের প্রতিবাদে উঠে আসছে এবং সেই মন্তব্য গুলি থেকে এই আন্দোলনের দাবিগুলি যা দাড়াচ্ছে তা এই আন্দোলনকে এক সুবিধাবাদী রূপদান করছে। সেখানকার দাবি গুলির মধ্যে একবারও লক্ষ্য করা যাচ্ছে না যে প্রশ্নটি তা হল, বিধানসভা নির্বাচন চলাকালিন পরীক্ষার দিন ঘোষনার অর্থ কী ছাত্রছাত্রীদের গনতান্ত্রিক অধিকারে হস্তক্ষেপ করার সমান নয়?
বিধানসভা নির্বাচন কোন রাজ্যের প্রতিটি মানুষের কাছে তার ব্যক্তিগত বা দলগত গনতান্ত্রিক ক্ষমতা প্রদর্শনের অন্যতম মাধ্যম। কোন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রচার অভিযানে ছাত্র-সমাজের ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। তাহলে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় কতৃক বিধানসভা নির্বাচন চলাকালিন পরীক্ষার দিন ঘোষনা কীরূপ মানসিকতার পরিচয় দেয়?
যাই হোক মূল কথায় ফেড়া যাক, এরকম গুরুত্বপূর্ণ একটি দাবিকে দূরে সড়িয়ে যে সমস্তদাবি সামনে উঠে আসছে তা হল, পরীক্ষার্থীরা পড়াশনার জন্য উপযুক্ত সময় পাননি বা এত তাড়াতাড়ি পরীক্ষা হলে ভালো ফল তো দূরের কথা পাশ করাই কষ্টসাধ্য হয়ে যাবে। আবার কেউ কেউ দাবির মান নামাতে নামাতে এও বলছে যে, বিশ্বকাপ চলাকালিন পরীক্ষা দেওয়া যায় না সেকারণে পরীক্ষা পেছতে হবে।
এই সমস্ত দাবি গুলি যে খুবই ঠুনকো এমন নয় তবে তৃতীয় বর্ষের পরীক্ষায় সময় না পাওয়া কেবল এই বছরের সমস্যা নয় কারন প্রতি বছর বছর পার্ট থ্রী পরীক্ষা তুলনামুলক ভাবে তাড়াতাড়ি নিয়ে থাকে বিশ্ববিদ্যালয় গুলি। কারণ এর পরবর্তীতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় গুলির স্নাতকত্তর পর্যায়ে ভর্তির পরীক্ষা গুলি থাকে। ফলত স্নাতক স্তরে তৃতীয় বর্ষে পরীক্ষা পিছিয়ে মে বা জুন মাসে হলে যে সমস্ত ছাত্র-ছাত্রী বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকত্তর ভর্তির পরীক্ষা গুলি দেবে তাদের সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে। সকল ছাত্র-ছাত্রী কথা মাথায় রেখে ছাত্র-আন্দোলনের দাবি নির্বাচন করা হলে সেই আন্দোলন অনেক বেশি স্বতঃস্ফূর্ত রূপ ধারন করবে।
আর একটি বিষয় যা বার বার লক্ষ্য করছি তা হল- আন্দোলনকারীদের মুখে তাদের সহপাঠীদের প্রতি একটি অভিমান, তারা বলছে, ‘যাদবপুর যা পারে, প্রেসিডেন্সী যা পারে তা কলকাতা বা বারাসাত বা বর্ধমান কখনই তা পারবে না। কারণ এখানে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে ঐক্য নেই।’
ঐক্য যে নেই এ কথাটি একেবারেই সত্য, কিন্তু প্রশ্নটি হল, ‘কেন নেই?’
মূলত বারাসাত বা বর্ধমান-এর মতো বিশ্ববিদ্যালয় গুলির অন্তর্গত বিভিন্ন কলেজে ছড়িয়ে থাকা ছাত্র-ছাত্রীরা ঐক্যের স্বাদ কখনই উপলব্ধি করতে পারেনি(যদিও কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কিছু কালের জন্য হলেও এই স্বাদ উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছে)।
কারণ এই সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয় ও এদের অন্তর্গত কলেজ গুলিতে সর্বদাই রাজ্যের শাসক দলের ছাত্র-সংগঠনগুলি (তা সে বামফ্রন্ট আমলে এসএফআই হোক বা তৃণমূল আমলে টিএমসিপি) ছাত্র-রাজনীতির একচেটিয়াকরণ ঘটিয়েছে। এবং এই সমস্ত ছাত্র-সংগঠনগুলির কাজই হল ছাত্র ঐক্যকে ধ্বংস করা। ছাত্র-ঐক্যের ধ্বংস না ঘটালে তাদের সমর্থিত রাজনৈতিক দল রাজনৈতিক ক্ষমতার শীর্ষে বসে সৈরাচারিতা চালাতে পারবে না। ইতিহাস বার বার আমাদের মনে করিয়ে দেয় শাসক যখনই সেচ্ছাচারি হয়ে উঠেছে তখনই শাসকের বিরুদ্ধে জনমত গঠনে পথে নেমেছে ছাত্র সমাজ। আজকের রাজনৈতিক নেতারা ইতিহাস থেকে এই শিক্ষা নিয়েছেন যে সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ কলেজে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে গড়ে উঠেল তাদের সমূহ বিপদ। ফলত তারা খুবই সুকৌশলে, কখনও বলপূর্বক, কখনও লোভ দেখিয়ে, কখনও বা ভয় দেখিয়ে, ক্ষমতায় আশার পরেই সমস্ত কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় গুলিতে নিজ ছাত্র-সংগঠনের একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করাতে ব্যস্ত হয়ে পরে।
অপরদিকে যদি দিল্লির জহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়, বা আমাদের রাজ্যে যাদবপুর, প্রেসিডেন্সী বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে নজর দেওয়া যায় তবে লক্ষ্য করা যাবে এ সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের গণতান্ত্রিক অধিকার অনেক বেশি কারণ এই সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শাসকের মনোপলি বা ছাত্র-রাজনীতির একচেটিয়া করণ ঘটানো সম্ভব হয়নি(যদিও শাসক চেষ্টা আজও চালিয়ে যাচ্ছে)। ফলে তারা অর্থাৎ এইসকল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা নিজেদের সমস্যার কথা, দাবি-দাওয়ার কথা অকুতোভয় হয়ে ঐক্যবদ্ধ ভাবে ঘোষনা করতে, তুলে ধরতে পারে।
পরিশেষে একথাই বলা যায় যে বারাসাত, বর্ধমান বা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের সমস্যা, দাবি-দাওয়ার কথা দৃঢ়তার সাথে তুলে ধরতে গেলে সবার আগে প্রয়োজন ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে ঐক্য বৃদ্ধি ঘটানো। কেউ যেন নিজেকে একা না ভাবে।
এই ঐক্যবোধ কেবলমাত্র একভাবেই জেগে উঠতে পারে তা হল, শিক্ষাক্ষেত্রে রাজনৈতিক মনোপলি বন্ধ করে সুষ্ঠ রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে। যতদিন না ছাত্র সমাজ ছাত্র রাজনীতির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে পারবে ততদিন তারা কোনো ইস্যুতেই(তা সে যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক) ঐক্যবদ্ধ হতে পারবে না। বরং ক্রমশ একটি আত্মকেন্দ্রিক, স্বার্থপর জীবে পরিণত হবে।

4 COMMENTS

  1. এই বয়সে আপনার মধ্যে একটা রাজনৈতিক চেতনা গড়ে উঠেছে দেখে ভালো লাগলো | আজকাল সোশ্যাল মিডিয়া নিজমত প্রকাশের একটা মাধ্যম দিয়েছে, সেখানে সমালোচনা চলতেই পারে | সঠিক গ্রহনযোগ্য মতামত সৃষ্টি হতে পারে | তবে একটা প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে | ছাত্রানাং অধ্যয়নং তপঃ | কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে, সুস্থ হোক বা অসুস্থ, রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে উঠবেই বা কেন? ছাত্র আন্দোলন তো বেশ কয়েক দশক ধরেই চলছে | তার ফলে কোন মহৎ উদ্দেশ্যটা সাধিত হয়েছে বলুন তো ? শুধু পাকা মাথার রাজনৈতিক নেতারা ছাত্রদের ব্যবহার করে গেছেন আন্দোলনের নামে | কলেজে জানালার কাঁচ ভাঙ্গা, ক্লাসরুমে লাইট নেই, হোস্টেলের বাথরুমের মেঝে জলে থই থই, লাইব্রেরীতে বই নেই, ল্যাবে ইনস্ট্রুমেন্ট নেই | শুধু পরিকাঠামো নয়, পঠনপাঠনের পদ্ধতিগত কোনো সংস্কার হয় নি | বিষয়গুলো ভালোভাবে বোঝবার জন্য আপনার নিজের ভাষায় পাওয়ারপয়েন্ট প্রেজেন্টেসনের মাধ্যমে উপস্থাপিত করা বা কলেজে নানান ধরনের অ্যাসাইনমেন্ট করিয়ে বিষয় সম্পর্কে সম্যক ধারণা তৈরী করা, কোনো কিছুতেই কিন্তু তেমন সচেতনতা তৈরী হয় নি | স্যারেরা ক্লাসে পড়াচ্ছেন আর গত দশ বছরের প্রশ্নপত্রের ওপর নির্ভর করেই পড়াশোনা চলছে, রবীন্দ্রনাথের ভাষায় যা হলো সেই ‘পাশের পড়া’ | বরং বৃহত্তর রাষ্ট্র বা রাজ্য রাজনীতির সাথে ছাত্র রাজনীতি ঘেঁটে গুলিয়ে গেছে | তার প্রকৃত মর্মার্থ আজকের ছাত্ররা উপলব্ধি করতে পারছে না |

  2. আমি রাজনীতি বলতে তৃনমূল বা বাম বা অন্য কোন রাজনৈতিক দলের মারামারির রাজনীতির কথা বলেছি। আপনি বোধহয় সেটি বুঝতে অক্ষম হয়েছেন। যাই হোক রাজনীতি মানুষকে নিজ স্বার্থ এবং দেশের মানুষের স্বার্থ সম্পর্কে সচেতন করে তোলে।
    ছাত্র রাজনীতি একদিকে যেমন প্রশ্ন তোলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অপর্যাপ্ত পরিকাঠামো বা administration এর অকর্মণ্যতা নিয়ে। তেমনি প্রশ্ন তোলে শাসক দ্বারা গৃহীত জনস্বার্থ বিরোধী নীতির বিরুদ্ধে আবার কখনো শাসকের অপশাসনের বিরুদ্ধে।

    আসলে আমাদের রাজ্যে রাজনৈতিক মনোপলি চলতে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলির ছাত্ররা এতবেশী সচেতন যে তাদের অধিকাংশ জানেই না শিক্ষা ক্ষেত্রে নতুন কি নীতি প্রয়োগ করা হচ্ছে রাজ্য বা কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে। অপর দিকে জহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা যাদবপুরের ছেলে মেয়েরা Occupy UGC এর মতো কর্মসূচী গ্রহনেও ভয় পায় না।
    আপনি মনে করতেই পারেন যে শিক্ষাক্ষেত্রে GATS চুক্তি সাক্ষরিত হল কি হলনা, শিক্ষাক্ষেত্রে WTO এর অনুপ্রবেশ ঘটবে কি ঘটবে তা নিয়ে ছাত্রদের অত ভাববার কারণ নেই।
    “ছাত্রানাং অধ্যয়নং তপঃ” বলে কথা- আমায় পড়ান তো বাপের কাজ, হোক না লাখ দেড়েক খড়চা, আমার তাতে কি?? কি ঠিক বলিনি? তবে আমি ঠিক আপনার মতো ভাবতে পারি না। কি করব বলুন।
    তাছাড়া আরও একটি কথা ছাত্র আন্দোলনে আপনি বুড়ো কথায় পেলেন? আপনার বুঝি মাথায় সব চুল পাকা?? তার জন্য দাদু আমি করতে পারি?
    যাই ছাত্র আন্দোলন কি পারে। তা জানতে আপনি একটু JNU এর সাথে বঙ্গের বিশ্ববিদ্যালয় গুলির তুলনা করে দেখুন।
    পরিশেষে, আমার লেখাটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ।

  3. প্রথম লাইনের শেষে একটি না যোগ করে নিলে বাধিত হইব।

  4. আমি অতকিছু ভেবে বলিনি | আপনি আঘাত পেয়ে থাকলে দুঃখিত | এরকম আরো লেখা চাই |

এমন আরো নিবন্ধ

Rupam Islam New Song

4 1698
Rupam Islam New Song

1 1883