প্রায় তিরিশ ফুট, হয়ত তার চেয়েও বেশি উঁচু সিলিং | স্কাইলাইটের ফাঁক দিয়ে ছাদ এবং কিছুটা আকাশ দেখা যায় | বর্ষাকালে এক দুফোঁটা বৃষ্টির জল মাধ্যাকর্ষনে ভর করে গতি বাড়িয়ে নিচে নেমে আসে | দুপাশে মাটি থেকে লম্বা থাম উঠে গেছে দোতলায়–দোতলা মানে রেলিং দেওয়া বারান্দা | সেখানে আলমারিতে বই, পুরনো নথি | অনেক উঁচুতে অদ্ভূত এরেন্জমেন্টএ-এ লম্বা রড থেকে পাখা ঝুলছে | নিচে, প্রশস্ত হলঘরে টানা বেঞ্চ-এর শ্রেনীবিন্যাস | দুদিকে কয়েকটি ক্লাসরুম | এক প্রান্তে সাদা মার্বেলের প্লাটফর্ম | তার পিছনের দেওয়ালে প্রতিষ্ঠাতা স্কটিশ সাহেবের আবক্ষ মূর্তি | দুদিকে যীশুখ্রিষ্ট এবং মা মেরির পেইন্টিং, মাউন্ট করা | অর্গানটি কোন একটি দরজার আড়ালে সুরক্ষিত | প্রতিদিন সকালে প্রেয়ারের সময় প্রকাশ্যে আসে | কলেজের অ্যাসেম্বলি হল | আমরা যখন কলেজজীবন শুরু করি তখন তার বয়স দেড়শ বছরেরও বেশি | ভেতরে পা দিলে নিজের থেকেই গলার স্বর নিচু হয়ে আসে, চটির ফটফট শব্দ কমে যায় | আর অবশ্যই বুকের ঢিপঢিপ বাড়ে | তার কারণ ওই টানা বেঞ্চ, তাদের শ্রেনীবিন্যাস | বসার জায়গা দ্বিধাবিভক্ত | প্রত্যেক অংশে শতাধিক ছাত্রছাত্রীর বসার ব্যবস্থা | প্রকৃতির আপন খেয়ালে কবে থেকে একটি অংশ ছাত্ররা এবং অন্যটি ছাত্রীরা দখল করেছে তা কেউ জানে না | এই সংক্রান্ত কোন লিখিত সার্কুলার নেই তা আমরা অফিসে খোঁজ নিয়ে জেনেছি | বাইরে, খোলা লনে এই মানসিকতার পরিবর্তন লক্ষনীয় কারণ সেখানে ছাত্রছাত্রীরা কাছাকাছি, মাঝে মাঝে বেশ ঘনিষ্ঠ, প্রেম ও বিচ্ছেদ স্বমহিমায় বিরাজমান |যাদের ঘনিষ্ঠতা আরেকটু এগিয়েছে তারা সিঁড়ির পাশে, ক্যান্টিনের বাইরে এক কোনে অথবা ফাঁকা ক্লাসরুমে আড়াল খুঁজছে | অথচ এসেম্বলি হলটি যেন শুদ্ধতার মূর্ত প্রতীক! আর কলেজের অলিখিত নিয়মে শুদ্ধতা মানে ছাত্র ও ছাত্রীর মধ্যে অন্তত: একফুট তফাৎ | এই ব্যাপারটি নিয়ে আমাদের আক্ষেপ ছিল | বিশেষ করে, বৃষ্টি নামলে লন থেকে উঠে এসে হল-এ ঢুকেই আলাদা হয়ে যাওয়ার ধাক্কা সামলানোর মত হৃদযন্ত্র আমাদের অনেকেরই ছিল না |

freedom-of-sexকলেজে ভর্তি হওয়ার দিন থেকে কলেজ ফেস্ট-এর গল্প শুনে শুনে আমাদের মনে একটি ছবি আঁকা হয়ে গিয়েছিল | বেশ খোলামেলা ছবি | জানতাম এসেম্বলি হলের ওই শান বাঁধানো প্ল্যাটফর্মের তিনদিকে কাঠের তক্তা বেঁধে উঁচু স্টেজ করা হবে | স্বাভাবিক মধ্যবিত্ত মানসিকতার বশবর্তী হয়ে আমাদের মনে এই আশা জাগে যে এই সুসময়ে নিশ্চয় একই বেঞ্চিতে আমরা মিলিয়ে মিশিয়ে বসতে পারব | সে গুড়ে বালি |যদ্দুর মনে পড়ে কোন একটি ফেস্ট-এ একটিবার চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু দুপক্ষই আড়ষ্ট হয়ে পড়ায়, ফেস্ট-এর স্পিরিট নষ্ট হয়ে যাবে এই ভয়ে আমরা আবার মূষিক হই | এসেম্বলি হলে ঢুকে স্টেজের দিকে মুখ করে দাঁড়ালে ডানদিকে ছেলেদের বসার ব্যবস্থা | অর্থাৎ বেঞ্চে বসা অবস্থায় প্রিয়তমা (বা অন্য কাউকে) দেখতে হলে বাঁদিকে ঘাড় ঘুরিয়ে থাকতে হবে | মেয়েদের ক্ষেত্রে ডানদিকে | আজ এতদিন পর মনে হয় কলেজ পরবর্তী জীবনেও ঘাড়টি একদিকে ঘুরে থাকার জন্য ওই প্রাগৈতিহাসিক ব্যবস্থাই দায়ী, কোন রাজনৈতিক মতাদর্শ নয়! আমরা অনেকই এই হতাশাবোধ কাটানোর জন্য ফেস্ট-এ পারফর্ম করতে শুরু করি, কারণ স্টেজের ওপর থেকে শুধু সামনে তাকাতে হয়, ঘাড় ঘোরানোর প্রয়োজন নেই | স্টেজে ওঠার সমস্যা অবিশ্যি কম নয় কিন্তু সে অন্য গল্প |

ছেলেদের দিকে সামনের বেঞ্চটি বেশিরভাগ সময়ই খালি থাকত | এটা আমাদের চারিত্রিক গুণ বিশেষ | সামনে কেউ থাকলে সুবিধে হয়, ফাঁকা বেঞ্চে সাহেব ভূত বসে আছেন কল্পনা করে নিলেই হল | আমরা দ্বিতীয় বেঞ্চ থেকে হল ভরিয়ে ফেলেছি | নিয়মমাফিক ঘাড়ের ব্যায়াম চলছে, এবং চোখে চোখ | আমাদের কলেজে দৃষ্টিহীন ছাত্রছাত্রীদের পড়াশুনার বিশেষ ব্যবস্থা, বোধহয় ব্রিটিশ আমল থেকেই | অনেকই হস্টেলে থাকত এবং তাদের কলেজে নিয়ে আসা, ক্লাসে বসানো এবং আবার হস্টেলে ফিরিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব ক্লাসের বন্ধুরাই যত্নসহকারে পালন করত | প্রতিবন্ধীদের নিয়ে আমাদের মানসিকতায় বিস্তর গন্ডগোল, সহপাঠী হলেও তারা নিশ্চয় অন্য গ্রহের মানুষ, আমরা সাধারনত: এড়িয়ে চলি | যারা এই বেড়াজল ডিঙিয়ে প্রকৃত বন্ধুর হাত বাড়িয়েছে তাদের থেকেও আমরা একটু দূরে থাকার চেষ্টা করি কারণ ইনফিরিয়রিটি কমপ্লেক্স | দুপুর নাগাদ, লাঞ্চের পর এসেম্বলি হল-এ ভিড় একটু একটু বাড়তে শুরু করেছে | পরবর্তী অনুষ্ঠান একটু পরেই | মাইক্রোফোনে কেউ অনাবশ্যক হ্যালো হ্যালো করছে | ঠিক তখনই একজন ছাত্র একটি দৃষ্টিহীন ছেলে ও একটি মেয়ের হাত ধরে তাদের সামনের বেঞ্চ-এ বসিয়ে দিয়ে গেল | আমরা একটু ভ্রুকুঞ্চন করলাম | তারপর আবার অন্য অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তায় মজে গেলাম | কিছুক্ষন পরেই পাশে বসা এক সহপাঠীর খোঁচায় নিতান্ত বাধ্য হয়েই সামনে তাকাতে হল | দেখলাম এসেম্বলি হলের অনেকেই ওদিকে তাকিয়ে আছে | দৃষ্টিহীন ছেলে ও মেয়েটি সেই মুহুর্তে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ | তাদের মুখমন্ডলে বিশুদ্ধ কামনার উদ্ভাস | হাতের আঙ্গুল ছুঁয়ে দেখতে চাইছে পরস্পরের শরীর | ছুঁয়ে দেখতে চাইছে, কারণ অন্ধকার | লোকলজ্জার ভয় নেই, কারণ ওই অন্ধকার | আমরা নতমস্তক | দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরেছি | এসেম্বলি হলে নিয়ম ভেঙ্গে প্রেমিকার পাশে বসে যে ঘনিষ্ঠতা ফ্যানটাসাইজ করে এসেছি এতদিন, চোখের সামনে তা ঘটতে দেখে কুঁকড়ে গেছি | কারণ এর অভিঘাত ক্ষিদে আর মৃত্যুর মতই তীব্র | বড়জোর মিনিট দুই | ইউনিয়নের দাদার তত্পরতায় বন্ধু ছাত্রটিকে ডেকে আনা হল | ‘আমার সঙ্গে এস’ ..| দুহাতে দুজনের হাত ধরে হলের পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল সে | সামনের বেঞ্চ আবার খালি | আমরা মুখ তুলে তাকালাম | এসেম্বলি হল আরও একবার কোলাহল মুখর | হঠাতই নিজেদের জড় ও ক্লীব মনে হল | মনে হল কেবল মাত্র একজন নারী এবং একজন পুরুষই ছিল এই ইডেন উদ্যানে | আর ওই বন্ধু ছাত্রটি সাপরূপী শয়তান | লজ্জার চাদরে ঢেকে দিল আদম ও ইভকে |

- Might Interest You

NO COMMENTS

এমন আরো নিবন্ধ

Rupam Islam New Song

4 1538
Rupam Islam New Song

1 1779