( দ্বিতীয় পর্বের পরে…)

১৮৪৬ -এর ১৩ এপ্রিল | মারা গেলেন মহাপণ্ডিত জয়গোপাল তর্কালঙ্কার | তিনি তখন সংস্কৃত কলেজের সাহিত্যের অধ্যাপক | ঈশ্বর ও মদন দুজনেই তাঁর ছাত্র | 

এই বছরেই পয়লা জানুয়ারি স্থাপিত হয়েছে কৃষ্ণনগর কলেজ | প্রথম প্রিন্সিপাল ক্যাপ্টেন ডেভিড রিচার্ডসন | কলেজের সূচনা থেকেই সেখানে সাহিত্য পড়াচ্ছেন মদনমোহন তর্কালঙ্কার | কলকাতার সংস্কৃত কলেজে কে
পূর্ণ করবেন সদ্য প্রয়াত জয়গোপাল তর্কালঙ্কারের আসন ?

           ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তখন সংস্কৃত কলেজের সহকারী সম্পাদক | তিনি ডাক দিলেন বন্ধু মদনমোহন তর্কালঙ্কারকে পূর্ণ করতে জয়গোপাল তর্কালঙ্কারের আসন | উনতিরিশ বছরের পণ্ডিতপ্রবর মদনমোহন উত্তর দিলেন কৃষ্ণনগর থেকে‚ এখুনি পারছি না বন্ধু‚ নতুন চাকরি‚ হুট করে ছেড়ে দিলে যে দেখানো হবে দায়িত্ববোধের অভাব | বিদ্যাসাগর বললেন‚ আসতে তোমাকে হবেই মদন | তবে যতদিন আসতে না পার‚ আমিই কোনও রকমে চালিয়ে নিচ্ছি | মনে রেখো‚ জয়গোপাল তর্কালঙ্কারের পদে আর কেউ বসবে না‚ তুমি ছাড়া |

             দু – মাস পরে ১৮৪৬ -এর ২৭ জুন সংস্কৃত কলেজে অধ্যাপনা শুরু করলেন মদনমোহন | বন্ধু এবং সংস্কৃত কলেজের অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি ঈশ্বরের ডাকে তিনি ছেড়ে দিলেন কৃষ্ণনগর কলেজের প্রধান পণ্ডিতের পদ | এবং কলকাতায় এসেই জয় করলেন ছাত্রদের মন | একেবারে নতুন স্টাইলের অধ্যাপনা | কলকাতায় এমন অধ্যাপনার ধরন তো চালু নেই | ছাত্রেরা অবাক | এবং তারা মদনমোহনকে ভয় পায় না | ভালবাসে | কেমন এই নতুন স্টাইলের পড়ানো ?

              মদনমোহন ছাত্রদের সঙ্গে গল্প করেন | সেই গল্প থেকে ঝরে পড়ে সাহিত্যরস | সময় সময় শৃঙ্গাররসেরও আভাস থাকে বইকি | মদনমোহন  বেড়াতে নিয়ে যান ছাত্রদের | সাহিত্যের বাগানে বেড়াতে নিয়ে যান তিনি | সেই বাগানে কত ফুল‚ কত লতাপাতা‚ কত সুবাস‚ কত উতল হাওয়া | নবীন অধ্যাপক মদনমোহনের এই রসলীলায় মেতে ওঠে ছাত্ররা | অধ্যাপনার এই নতুন শৈলী চেনা নিয়মের ধার ধারে না | মদনমোহনের রোম্যান্টিক মনের বেপরোয়া প্রকাশ ঘটে তাঁর অধ্যাপনায় | অধ্যাপক হিসেবে মদনমোহনের প্রিয়তা তুঙ্গে ওঠে | ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মনে খিঁচ ধরে | ছড়িয়ে পড়ে ঈর্ষার গুমো আঁচ | নিয়মভাঙা অধ্যাপনার এই আধুনিক স্টাইল ভাললাগে না বিদ্যাসাগরের | কিন্তু বন্ধুকে সরাসরি কিছু বলেন না তিনি | কলকাতায় এসে প্রথম কদিন তো ঈশ্বরচন্দ্রের বাড়িতেই উঠে ছিলেন মদনমোহন | দিনরাত বন্ধুর সঙ্গেই মদনমোহন আলোচনা করেছিলেন‚ কী পড়াবেন | ঈশ্বরের মনে পড়ে‚ বন্ধুকে কত আগ্রহে তিনি শুধু কী পড়াতে হবে তা-ই বুঝিয়ে দেননি‚ কেমনভাবে পড়াতে হবে তা-ও তো বলে দিয়েছিলেন | সেই রীতি সংস্কৃত কলেজের ঐতিহ্যের কথা মনে রেখেই গড়ে উঠেছে | কিন্তু মদন এ কী করছে ? সংস্কৃত কলেজের যে বদনাম হবে !

               একদিন ঘটল এক ঘটনা | পাড়ার কিছু লোকজন এল ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের কাছে | কী ব্যাপার ? অবাক বিদ্যাসাগর | একটি অভিযোগ নিয়ে এসেছি‚ বলল তারা | অভিযোগ ! আরও বিস্মিত বিদ্যাসাগর | বলুন‚ কী আপনাদের নালিশ | একজন এগিয়ে এসে বলল‚ সংস্কৃত কলেজের পাশেই আমাদের বাড়ি | কলেজ ঘরের একটি জানলা দিয়ে আমাদের বাড়ির ছাদ দেখা যায় | আমাদের বাড়ির মেয়েরা ছাদে উঠতে পারে না |

— কেন ? ছাদে উঠতে পারে না কেন ? জিজ্ঞেস করলেন বিদ্যাসাগর |

— তার কারণ‚ আপনার কলেজের একটা ক্লাসরুম থেকে ছাত্রেরা ছাদে আমাদের মেয়েদের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে | আপনি এই অন্যায়ের বিহিত করুন বিদ্যাসাগর মশাই |

রাগে রাঙা হয়ে উঠল বিদ্যাসাগরের মুখ | কার ক্লাস থেকে দেখা যায় পাশের বাড়ির ছাদ ?

কার আবার ? মদনমোহনের | মনে মনে গর্জে উঠলেন বিদ্যাসাগর | ছুটে গেলেন মদনমোহনের ক্লাসে | আর গিয়েই থমকে দাঁড়ালেন | মদনমোহন হাসছেন আর তার সঙ্গে ছাত্ররাও বেশ মজায় আছে |

মদনমোহন বিদ্যাসাগরকে দেখতে পাননি | তিনি নিজের মনে পড়িয়ে চলেছেন | কিন্তু এ কেমন অধ্যাপনা ! মদন যে রসে টইটম্বুর | আর সেই রস ভাগ করে নিচ্ছে ছাত্রদের সঙ্গে | ছাত্ররা যেন রসে ভাসছে — সাহিত্যের রস | ব্যাকরণের দিকে কোনও মন নেই মদনের |

অগ্নিশর্মা বিদ্যাসাগর ঢুকে পড়লেন মদনমোহনের ক্লাসে‚ দাঁড়ালেন গিয়ে তাঁর সামনে | ছাত্রেরা ভয়ে শিঁটিয়ে | রসভঙ্গ হল মুহূর্তে | মদনমোহন নীরবে মুখ তুলে তাকালেন |

— এ কী কথা শুনছি মদন ? বিদ্যাসাগরের কণ্ঠে ক্রোধ |

— কী কথা শুনে তুমি ছুটে এসেছ ঈশ্বর ?

— তোমার ছাত্রদের বিরুদ্ধে আমার কাছে অভিযোগ এসেছে |

— কী অভিযোগ এল আমার ছাত্রদের বিরুদ্ধে ? অন্যায় যদি কিছু হয়ে থাকে‚ বন্ধু‚ শাস্তি দাও আমাকে | আমার ছাত্রদের তো কোন দোষ দেখি না আমি |

— শোনো মদন‚ অভিযোগটি গুরুতর | তোমার ছাত্রদের জ্বালায় পাশের বাড়ির মহিলারা ছাদে উঠতে পারেন না |

— এই অভিযোগের অর্থ ? মদনমোহনের কন্ঠে শিশুর সারল্য |

— তুমি বুঝতে পারলে না ? তোমার ছাত্ররা জানলা দিয়ে মহিলাদের দিকে তাকিয়ে থাকে | অর্থাৎ তাদের ওপর তোমার কোনও শাসন বা নিয়ন্ত্রণ নেই |

ক্লাসের মধ্যে বাজ পড়ল | মদনমোহন তাকালেন ছাত্রদের দিকে | এতটুকু রাগ নেই তাঁর চোখে | সেখানে শুধু স্নেহ‚ মায়া‚ মমতা | এবং তার মধ্যেই ঝিলিক মারছে মদনমোহনের বুদ্ধিদীপ্ত কৌতুকবোধ |

বিদ্যাসাগর নীরব | তিনি অপেক্ষা করছেন মদনমোহনের জবাবের জন্য |

ছাত্রদের সামনেই অপমানিত অধ্যাপক কী বলবেন এবার ?

হঠাৎ হো হো করে হেসে উঠলেন মদনমোহন | বিদ্যাসাগরের মনে হল মদন সংস্কৃত কলেজের ঐতিহ্যের থোড়াই কেয়ার করে | তারপর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর শুনতে পেলেন মদনমোহন তর্কালঙ্কারের মধুর কণ্ঠস্বর —

— শোনো ঈশ্বর‚ বসন্তকাল‚ পড়ানো হচ্ছে স্বয়ং কালিদাসের মেঘদূত‚ পড়াচ্ছেন স্বয়ং মদন | সুতরাং ছাত্রদের মন যদি একটু ব্যাকুল‚ সামান্য চঞ্চল হয়ে ওঠে‚ তাতে তেমন দোষের কী হল ?

              এই উত্তর আশা করেননি বিদ্যাসাগর | তিনি দেখলেন‚ ছাত্ররা বেশ মজা পেয়েছে | তারা যেন হাসি চাপতে পারছে না | অপমানিত বোধ করলেন বিদ্যাসাগর | রাগের আগুন ছড়িয়ে পড়ল তাঁর সারা শরীরে | সে রাগে ঈর্ষাও মিশে গেল | তিনি চটির শব্দ তুলে বেরিয়ে গেলেন | পরের দিন মদনমোহন ক্লাসে এসে দেখেন বসন্তের আকাশ-বাতাস সেই ক্লাসরুমে আর কোনওদিন ঢুকবে না |

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মিস্ত্রি ডেকে জানলার সমস্ত খড়খড়ি স্ক্রু দিয়ে বন্ধ করে দিয়ে জানলাটিকেও চিরদিনের মতো এঁটে দিয়েছেন ! বসন্তের আপদ বিদায় হয়েছে !

কিছুদিন আগেও তো ছিল বিদ্যাসাগরের সঙ্গে মদনমোহনের ভারী মধুর সম্পর্ক | মদনমোহনের স্ত্রী নৃত্যকালী বিদ্যাসাগরকে ঠাকুরপো ডাকেন | বিদ্যাসাগর নৃত্যকালীকে ডাকেন বউদি | বউদির সঙ্গে ঈশ্বরের মিষ্টি সম্পর্ক | একদিন দুপুরবেলা ঘটল মজার ঘটনা |

                 খুব খিদে পেয়েছে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের | তিনি হাঁটতে-হাঁটতে চলে এলেন বন্ধু মদনের বাড়ি | বন্ধু বাড়ি নেই | দেখলেন তাঁর বউদিটি একা বসে ভাত খাচ্ছেন | বললেন‚ বউদি‚ বড্ড খিদে পেয়েছে | কী খাব ?

— কেন‚ এই তো ভাত | খাও না | নিজের ভাতের থালাটিই নৃত্যকালী এগিয়ে দিলেন ঠাকুরপো ঈশ্বরের দিকে |

ঈশ্বর বেশ গদগদ | বউদির এঁটো থালা থেকেই পাশে বসে ভাত খেতে লাগলেন তিনি | খাচ্ছেন আর দুজনে মশগুল হয়ে গল্প করছেন | নৃত্যকালী বেশিরভাগ বাঙালি মেয়েদের মতো নয় | বেশ কথা বলে | জড়তা নেই | ভাললাগে ঈশ্বরের এমন বউদিটিকে |

                  এমন সময় মদনমোহন হঠাৎ বাড়ি ফিরলেন | তিনি যে এই সময় হঠাৎ বাড়ি ফিরবেন‚ নৃত্যকালী ভাবতে পারেননি | তিনি খাওয়া থামিয়ে দেন | যেন কিঞ্চিৎ অপ্রস্তুত | ঈশ্বরও কী বলবেন‚ বুঝতে পারেন না | কিন্তু রসিক চূড়ামণি মদনমোহনের রসবোধের অভাব ঘটে না | তিনি হাসতে-হাসতে বলেন‚ এ কী বিদ্যাসাগর‚ সব মহাপ্রসাদ তুমি সাবাড় করে দিলে‚ আমি খাব কী ?

নৃত্যকালী দেখেন‚ পাতে তখন আর সত্যিই বিশেষ কিছু নেই | তবু বলেন‚ যা আছে তাই খাও | এঁটো থালাটি স্বামীর হাতে তুলে দেন তিনি | মদনমোহন মহা খুশিতে সেই খালি থালা চাটতে থাকেন |

(চলবে)

প্রথম পর্বের লিঙ্ক :  http://banglalive.com/blogs/the-man-who-wrote-pakhi-sab-kore-rab-raati-pohailo/

দ্বিতীয় পর্বের লিঙ্ক : http://banglalive.com/blogs/the-rivalry-between-iswar-chandra-vidyasagar-madanmohan-tarkalankar/

1 COMMENT

  1. নতুন পর্ব আসবে না আর?

    খুব ভালো. আশায রইলাম.

এমন আরো নিবন্ধ

Rupam Islam New Song

4 1668
Rupam Islam New Song

1 1866