ভদ্রলোকের সন্তর্পণ চাউনি এখনও মনে আছে | সামনে আমার মাঝপথে আটকে যাওয়া অঙ্কের নীরস খাতা‚ উল্টো দিকে বেজায় কৌতূহল নিয়ে আমি‚ আর দরজার পর্দায় একটু আগে হেঁটে যাওয়া এক মনোরোগ চিকিৎসকের ছায়ার ভগ্নাংশ | কেন কৌতূহল হবে না বলুন ? একটু আগেই যে ভদ্রলোকটির সঙ্গে আমার অঙ্কের স্যারের আলাপ করিয়েছি তিনি আমার দাদুর এক বন্ধু—-দাদুর ঘরে যাওয়ার আগে আমার সঙ্গে এক চিলতে আহ্লাদ করছিলেন—-আমিও সৌজন্যের রেয়াজ মেনে স্যারের সঙ্গে ডাক্তার দাদুর আলাপ করিয়েছি | এখন দুটো আপাত অপরিচিত মানুষের পরিচয়ের পর আমার বাজখাঁই মাস্টারমশাইকে রাতারাতি চুপসে যেতে দেখলে অবাক তো হবই |

এমন একটা অঙ্ক না মেলা অবধি যথারীতি খাতা পত্তরে আর মন বসানো যাচ্ছিল না | উনি নিজেও বোধহয় বলে হালকা হতে চাইছিলেন‚ না হলে অত সহজে উত্তর জুটত না | ওই প্রথম শুনেছিলাম‚ এক অদ্ভুত তথ্য !মনস্তত্ব নিয়ে যারা পড়াশোনা করে তারা নাকি কাউকে এক ঝলক দেখলেই সব ভিতরের কথা বুঝে ফেলে | মনের খুপড়িতে সাবধানে সরিয়ে রাখা আড়াল কথা‚ গর্হিত চোরাগলি‚ আচমকা অচেনা কারওর কাছে ধরা পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা স্বভাবতই সুখের নয় – আর সেই কারণেই নাকি সাইকিয়াট্রিস্ট দাদুকে দেখে স্যার সন্ত্রস্ত |

আমি আদৌ স্যারের সঙ্গে একমত হইনি | আমার বিলক্ষণ মনে ছিল‚ যেবার বেড়ালের বেবি পুষেছি বলে দাদুর দু তিন জন বেড়াল-ভীত বন্ধুদের আমি এপ্রিল ফুল করেছিলাম‚ তাঁদের মধ্যে তো ইনিও ছিলেন | বেড়াল ত্রিসীমানায় ছিলনা – একটা বাটিতে দুধ হাতে ঘুরে ঘুরে আমি সবাইকে একটু ঘাবড়ে দিচ্ছিলাম‚ কই বোঝেননি তো কেউ আসল কথা ? আমার পরীক্ষিত সত্য‚ হাতে কলমে যোগাড় করা প্রমাণ দেখিয়েও কিন্তু স্যারের ধারণা বিশেষ বদলানো যায়নি – তখনও জানতাম না‚ আরও কী কী উদ্ভট ধারণা আমার ভবিষৎ পেশার প্রতিটি মোড়ে অপেক্ষা করছে |

মানসিক রোগ নিয়ে অমূলক ভয়ের বাড়বাড়ন্ত কলেজে পড়ার সময় থেকে স্পষ্ট ভাবে টের পেতে থাকি | এমনকী এখনও বহু মানুষ বিশ্বাস করেন‚ মনের কোন সমস্যা হওয়া মানেই উন্মাদ দশার সূত্রপাত – পাগল যেন একটি বিশেষ প্রজাতি যাদের কামড়ানোর প্রতি অসীম আগ্রহ থাকে এবং গরমকালে এরা সেই কাজটি দক্ষতার সঙ্গে পালন করে থাকে |

এতো গেল বাড়াবাড়ি রকমের ভুল ধারণার ফিরিস্তি | মানসিক অসুখ মানেই সারাজীবন ওষুধ খেতে হবে‚ সব ওষুধ আসলে ঘুমের ওষুধেরই অষ্টোত্তর শতনাম‚ একটা মানসিক সমস্যা থাকা মানে সে ব্যক্তিকে বাতিলের খাতায় সেঁটে ফেলা ছাড়া গতি নেই – এমন সব ধারণা অবলীলায় তথাকথিত শিক্ষিত মহলেও পায়চারি করে |

বহু অতি পরিচিত সিনেমায় দেখা যায়‚ মানসিক রোগী মানেই একটি শিশুসুলভ আধো আধো বুলি আওড়ানো মানুষ‚ যার বিয়ে দেওয়া মাত্র সাবালকত্ব আর রোগ নিরাময় আপনাআপনি ঘটে যায় | অনেকেই এখনও সেই সব ছবির বাতলানো টোটকা অনুসরণ করে বাড়িতে কারওর মানসিক অসুবিধে হচ্ছে বুঝলেই বিয়ের তোড়জোড় শুরু করে দেন | অনেক সময়‚ পাছে নতুন কুটুমদের কাছে জানাজানি হয়ে যায়‚ সেই ভয়ে যাবতীয় চিকিৎসায় দাঁড়ি টেনে দেওয়ার নজিরও চোখে পড়ে | মাঝখান থেকে এমনিতেই আবেগের না মেটা জটিলতায় হিমসিম খাওয়া মানুষগুলো বিয়ের দায়িত্ব‚ সম্পর্কের চাপে আরো বেশি কোণঠাসা হয়ে পড়েন – মানসিক ভাবে আরও কিছুটা বিধ্বস্ত হন |

এই প্রসঙ্গে বলা জরুরি‚ কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘকালীন চিকিৎসা দরকার হতে পারে‚ কিছু মানসিক সমস্যার ক্ষেত্রে আচরণ নিজের নিয়ন্ত্রণে নাও থাকতে পারে‚ কিছু ক্ষেত্রে কর্মক্ষমতা‚ রোজকার জীবন থমকে যেতে পারে কিন্তু সঠিক চিকিৎসা আর মনের পক্ষে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানসিক সমস্যার জটিলতা আর তীব্রতা কমিয়ে আনা আলবাত সম্ভব | তাছাড়া সব সর্দিকাশি যেমন নিউমোনিয়া নয় তেমনই যে কোনও মন খারাপই অবসাদ নয় – মনের অসুখেরও বিভাজন আছে‚ তারতম্য আছে এবং সেই অনুসারে চিকিৎসা আছে |

মানসিক রোগ নিয়ে যেমন আমরা অজস্র আজগুবি গুজব বয়ে চলি‚ তেমনি মানসিক স্বাস্থ্য কর্মীদের নিয়েও আমাদের ভ্রান্তির তল্লাট বিস্তৃত | আমার অঙ্কের স্যারের বক্তব্যের মতই একটি প্রশ্ন শুনেছিলাম সদ্য মাস্টার্স চুকিয়ে চাকরির ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে | সেখানেও এটা সেটার পর‚ ‘বলতো আমি এখন কি ভাবছি ? ‘ জিজ্ঞেস করা হয়েছিল | মনস্তত্ব আর ফেস রিডিং যে এক নয়‚ মনোবিজ্ঞান মানুষের আচরণ‚ তার কারণ (এই মুহূর্তের এবং অবদমিত) নিয়ে মাথা ঘামায়…ইত্যাদি বুঝিয়ে বলতে তদ্দিনে আমিও অভ্যস্ত | এতো কিছু বলার পরেও একটা কিন্তু কিন্তু ভাব লক্ষ করছিলাম বলে নেহাতই একটু হালকা ভাবে বলেছিলাম‚ ‘ আমায় নেবেন কিনা ভাবছেন সম্ভবত ‘ |

চাকরিতে ঢোকার মাস কয়েক পর জানতে পেরেছিলাম‚ ওই ঠাট্টার মেজাজে দেওয়া উত্তরটি শুনেই নাকি প্রশ্নকর্তারা মুগ্ধ হয়ে যান‚ এমন অব্যর্থ মুখ পড়ে ফেলার দক্ষতাই নাকি আমার চাকরিটি পাওয়ার মূল কারণ ছিল | ভুল জায়গায় সেন্স অফ হিউমার দেখাতে গেলে কী ঘটতে পারে তা হাড়ে হাড়ে বুঝেছিলাম‚ ভাগ্যিস সেখানে বেশিদিন টিকতে হয়নি |

মন নিয়ে যাঁরা কাজ করেন‚ তাঁরা আবেগের গিঁট খুলে আপাত দৃষ্টিতে অর্থহীন আচরণের পাঠোদ্ধার করতে শেখেন | কিন্তু তাই বলে যেখানে সেখানে এর তার মগজে উঁকি মেরে অহেতুক কৌতূহল মেটান না |একজন দাঁতের ডাক্তার যেমন আপনি হাসলেই ক্যাভিটি গুনতে বসেন না‚ তেমনই আমাদেরও স্থান-কাল আছে‚ বিদ্যে ফলানোর পরিপ্রেক্ষিত আছে |

মনোরোগ চিকিৎসক‚ মনোসমীক্ষক‚ মনোবিদদের নিয়ে অবান্তর সব আখ্যান আমাদের আড্ডায়‚ সাহিত্যে‚ চলচ্চিত্রে যুগে যুগে জাঁকিয়ে বসে আছে | সেই ‘দীপ জ্বেলে যাই’-এর সময় থেকে আমরা দেখেছি‚ কীভাবে চিকিৎসার পদ্ধতি হিসেবে প্রেমিকার ভূমিকায় নেমে পড়েন রাধা নামের একজন নার্স —–তারপর অন্যের মনের অসুখ সারাতে গিয়ে নিজেই উন্মাদিনী হয়ে যান | মানসিক চিকিৎসকরা নিজেরাই একদিন পাগল হয়ে যান মার্কা ভাবনা এখনও অনেকেই যত্ন করে পুষে রাখেন | রাধা যখন তাঁর ডাক্তার শিক্ষকের পায়ের কাছে হাপুস চোখে বলতে থাকেন‚ আমি কোনওদিন অভিনয় করিনি‚ অভিনয় করতে পারি না‚ ইত্যাদি‚ তখন সেই অভিজ্ঞ ডাক্তারটি যদি একবার বলতেন‚ অভিনয় কেন করবে বাছা‚ চিকিৎসা করবে‚ তাহলে ফিল্মটির নাটকীয় ঘনত্ব হয়তো একটু কমত‚ কিন্তু সাধারণ মানুষের উপকার হত বৈ কী |

এই যে‚ মানসিক শুশ্রূষা মানেই প্রেম প্রেম আবহাওয়া তৈরি করে ফেলা‚ আর তারপর সত্যি প্রেমে পড়ে যাওয়া এই ধারণার মধ্যে রোমান্স থাকলেও সত্যতা নেই | শরীরের চিকিৎসার ক্ষেত্রে যেহেতু হাড়গোড়‚ রক্ত‚ উপশিরা নিয়ে ডাক্তারকে ওঠাবসা করতে হয় তাই সেই পদ্ধতির মধ্যে আমরা জোর করে একটু প্রেম ঠুসে দিইনা | কিন্তু মনের তল্লাট মানেই একজন মানুষের ক্লান্তি‚ যৌনতা‚ তাগিদ‚ উদ্বেগ‚ বিষাদ‚ কল্পনা —-সুতরাং সে সব নিয়ে কথা বলতে গেলে যেন কোনো বিজ্ঞানের‚ শিক্ষার দরকার নেই‚ একটু মাখো মাখো গলা‚ মায়া ভেজা বৃষ্টি দিতে পারলেই চিকিৎসা হয়ে যায় |

একজন কার্ডিয়াক সার্জেনকে নিয়ে কোনও ছবির দৃশ্যে আমরা কিন্তু দেখি না তিনি বাইপাস সার্জারি করতে করতে রোগীর হৃদয় তুলে নিয়ে তোমার হৃদয় আমি আপন হাতের দোলে দোলাই‚ দোলাই‚ দোলাই বলে গান গেয়ে বেড়াচ্ছেন | অথচ মনোবিদ করিনা কাপুরকে দেখতে পাই‚ অবসাদগ্রস্থ সলমন খানকে সারিয়ে তোলার জন্য গাছের গুঁড়ি জাপটে প্রেমের গান গাইতে গাইতে ছুটে চলেছেন | আহা‚ মনের ডাক্তারিতে চেম্বারও লাগে না‚ যেখানে ইচ্ছে রোগী ধাওয়া করে পৌঁছে গেলেই হল |

অথচ‚ মানসিক চিকিৎসায় একজনের ব্যক্তিগত আবেগ নিয়ে নাড়াচাড়া করতে হয় বলেই দীর্ঘ প্রশিক্ষণ লাগে – অজস্র নিয়ম এই পেশার স্তরে স্তরে জুড়ে থাকে | যিনি চিকিৎসা নিতে এসেছেন‚ তাঁর অনেক সময় আবেগের নির্ভরতা তৈরি হতেই পারে‚ কিন্তু একজন মানসিক স্বাস্থ্যকর্মীর প্রাথমিক ট্রেনিং-এর মধ্যে পড়ে‚ সেই আবেগে নিজে ভেসে না যাওয়ার সচেতনতা | নিজের নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখার জন্য চেম্বারের বাইরে সামাজিক আদান প্রদানে না ঢোকা‚ নিজের ঘনিষ্ঠ মানুষদের চিকিৎসা না করা‚ কোনও উপহার গ্রহণ না করা এমন অনেক প্রয়োজনীয় পেশাগত রীতি মানতেই হয়‚ এগুলো চিকিৎসার জরুরি অংশ | তারতম্য সব পেশাতেই থাকে‚ সবার দক্ষতা বা মূল্যবোধ যে এক হয় না তাও নয় মানছি | শুধু‚ মানসিক অসুবিধে নিয়ে কারওর কাছে ট্রিটমেন্ট করাতে গিয়ে যদি খেয়াল করেন সেই চিকিৎসক নিজের আবেগের‚ নিজের নিবেদনের কথা বলতে ব্যস্ত‚ কিংবা চিকিৎসার বাইরে আপনার সাহচর্য প্রার্থী—-বুঝবেন সেখানে আর যা-ই হোক ঠিকঠাক চিকিৎসা হওয়া সম্ভব নয় |

একটা পেশার থেকে আমরা কী প্রত্যাশা করব সেই ধারণা গুলো বহু সময় আমাদের চারপাশের নানা মাধ্যম থেকে আমরা জানার চেষ্টা চালাই | প্রচলিত শিল্পে সাহিত্যে যদি মানসিক চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু রাখতেই হয়‚ সেক্ষেত্রে বরং একটু ঠিকঠাক তথ্য দিন প্লিজ‚ যাতে লোকজন বিভ্রান্ত না হন‚ যাতে প্রেম ভেঙে যাওয়ার পর কোনও যুবক এই আশায় ক্লিনিকে না আসেন যে এক ঢিলে চিকিৎসা আর প্রেম দুটোই জুটে যাবে – কিংবা কোনও অনুষ্ঠান বাড়িতে একজন মনোবিদ ঢুকলে ‘আমায় নিয়ে কিছু বলো’গোছের আকাট ভিড় না জমে …

… যাতে ডাক্তার দাদুর ফেলে যাওয়া ছায়ার গায়ে যে সব ভুল ধারণার ঝুল জমেছিল‚ আমার নিজের পেশার সর্বাঙ্গে আজ এতো বছর পরেও তার ধুলো উড়ে না আসে …

NO COMMENTS

এমন আরো নিবন্ধ

Rupam Islam New Song

4 1488
Rupam Islam New Song

1 1763