।। উধাও আরশি নগর।।

মাস ছয়েক আগে ঢাকা, কলকাতা হয়ে টরন্টো ফিরে আচমকা যে দৃশ্যের মুখোমুখি হলাম, তাতে করে মাথাটি আপনাতেই ঘুরে উঠল! নেই! একটুকরো বন্ধু-দ্বীপের মতো দাঁড়িয়ে থাকা পাড়ার ছোট্ট কফি শপ ‘টিমহর্টন্স’ আর নেই, একেবারে উধাও হয়ে গেছে! হঠাৎ দেখলে মনে হবে, কোনো এক ঘূর্ণিঝড় এসে তাকে গুঁড়িয়ে দিয়ে গেছে। তার জায়গায় পড়ে রয়েছে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন মাটি, পাথর আর কংক্রিটের স্তূপ এবং অসংখ্য রকমের নির্মাণ সামগ্রীর সমাহার। স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম, বিশাল বিশাল কন্সট্রাকশনের বুলডোজার, রোলার হো হো শব্দে চষে বেড়াচ্ছে তারের বেড়া দিয়ে ঘেরা জায়গাটি। শুনলাম, আরো বড়ো করে তাকে তৈরি করা হবে। অনেক জমজমাট ব্যবসা গড়ে উঠবে তাতে। কিন্তু আমার সেই ছোট্ট টিমহর্টন্সটি হারিয়ে গেছে কোন এক ফাঁকে, জানতেই পারিনি!

‘সুন্দর মেখেছে এত ছাইভস্ম-, ভালোই লাগে না
বুঝি পাহাড়ের পায়ে পড়েছিল নীরব গোধূলি
নারী কলহাস্য শুনে- ভয় পেল ফেরার পাখিরা
পাথরের নিচে জল ঘুমে মগ্ন কয়েকশো বছর
মোষের পিঠের মতো, রাত্রির মেঘের মতো কালো
পাথর গড়িয়ে যায়, লম্বা গাছ শব্দ করে শোয়
একজন ক্ষ্যাপা লোক ঝর্নাটিতে জুতোসুদ্ধু নামে
কেউ কোনো দুঃখ পায় না, চতুর্দিকে এমনই স্বাধীন!
সুন্দর মেখেছে এত ছাইভস্ম-, ভালোই লাগে না’

[সুন্দর মেখেছে এত ছাই-ভস্ম : সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়]    

বেশ কিছু দিন ধরেই শুনছিলাম, এই টিমহর্টন্সটির রিনোভেশন শুরু হবে। কিন্তু তাই বলে তা এভাবে এক্ষুণি! রিনোভেশন মানে যে একেবারে গুঁড়িয়ে দিয়ে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া, তা জানা ছিল না। এদিকে সদ্য দেশ থেকে  ফিরে এসে, আর দশজন বাঙালির মতো আমারও খুব মন খারাপ। কিছুই ভালো লাগে না। ঠিক সেসময় কিনা নিঃশ্বাস ফেলার মতো প্রিয় জায়গাটি উধাও হয়ে গেল! ভাবতেই পারিনি। এ ছিল আমার বাড়ির পাশের আরশি নগর। যখন ইচ্ছে চলে যেতাম তার কাছে। দুই-এককাপ কফির বিনিময়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিয়েছি লেখালিখি, বইপড়া, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেয়ায়। বন্ধুরা এলে তাদেরকেও নিয়ে গিয়েছি। কফি ও আড্ডায় ভেসেছি প্রিয় জায়গাটিতে। ওরা মজা করে বলে, এই টিমহর্টন্স তো ফেরদৌসের ড্রইং রুম। ওই একই প্লাজায় একটি চমৎকার ম্যাকডোনাল্ডসও রয়েছে। কিন্তু সে কখনই তেমন আকর্ষণ করতে পারেনি। কারণ ম্যাকডোনাল্ডস মানেই কাচ্চা-বাচ্চা, টিন-এজ ছেলেপুলেদের হই-হল্লা, নয়তো বুড়ো মানুষের ঝিমধরা গল্পের শব্দ। সেদিক থেকে টিমহর্টন্সকে অনেক আপন মনে হয়। এর পরিবেশ নিজস্ব টেস্টের সঙ্গে যায় বলে, সেখানেই ছিল আমার নিত্য যাওয়া আসা। তাকে হারিয়ে ক্রমশ ডিপ্রেশনের দিকে রওয়ানা হলাম। একে দেশ ফেরতের বেদনা, তার উপরে প্রিয় কফি শপের গড়াপেটার প্রাথমিক অবস্থা, কবে শেষ হবে এই নির্মাণ কেউ ঠিক করে বলতে পারে না। সবকিছু মিলিয়ে সত্যি সত্যি একধরনের মানসিক বিরাণতা অনুভব করতে থাকি।

ভ্রাম্যমাণ টিম-হর্টন্স
ভ্রাম্যমাণ টিম-হর্টন্স

এদিকে শীত এসে গেছে, স্নো পড়ছে, মনে মনে ভাবি- রিনোভেটেড টিমহর্টন্সের জন্য আর কত দিন অপেক্ষা করতে হবে কে জানে! যদিও ওই নির্মাণ জায়গার পাশেই টিমহর্টন্স তার নিজের মতো করে ব্যবসা জারি রেখেছে। তবে তাতে নেই কোনো বসবার জায়গা, নেই কোনো ছাওনি। প্লাজার উন্মুক্ত পার্কিং লটে বিশাল মাপের একটি চাকা লাগানো মোবাইল রেস্টুরেন্ট বসিয়ে, নিয়মিত বেচাকেনা করে চলছে। মানুষ লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে প্রয়োজন মাফিক কফি এবং খাবার কিনে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আয়েশ করে বসে রসিয়ে রসিয়ে কফির পানের মজা মিলবে না বলে, ওই ভ্রাম্যমাণ টিমহর্টন্সে তেমন আর যাই না। গেলেই ওদেরকে জিজ্ঞেস করি, বাপু হে কবে শেষ হবে এই রিনোভেশন? উত্তর, হয়তো ২০১৬-এর মার্চ এপ্রিল মে লেগে যেতে পারে। বলে কী, এত দিন! তার মানে, এবারের পুরো শীতকালই কাটাতে হবে, বাড়ির পাশের আরশি নগরের পড়শির কাছে যাবার আনন্দ ছাড়াই।

যদিও এই মোবাইল টিমহর্টন্সের গায়ে লেখা আছে, রিনোভেশনের সময়ে খোলা আছে। তাতে কী! আমি অপেক্ষায় আছি সত্যিকারের জানালার পাশে বসতে পারা সেই কফি শপের। যার টেবিলে বই বা ল্যাপটপ রেখে নির্মাণ করব নিজেকে, মানুষ দেখব, দেখব বিচিত্র বৈচিত্রের আনাগোনা। যেখানে গেলে শুনতে পাব ভেতরে জেগে থাকা শব্দগুলো, ঠিক তারই জন্যে। এই শীত ফুরালে সে আসবে কি?

।। দৈব যোগের ইশারা।।

খুঁজছিলাম। একটি কলম, মনে মনে এবং প্রকাশ্যে। আজকাল কলমের ব্যবহার কমে গেছে তাই স্টকের কলমগুলো কালি ক্ষয়ের পর গত হয়েছে। নয় অনেকগুলোর কালি অব্যবহারে অব্যবহারে শুকিয়ে গেছে। তবু মাঝে মাঝে তাকে যে আমার একেবারে লাগে না, তা নয় কিন্তু।  লাগে, এই যেমন কদিন ধরে কিছু কাগজপত্র নিয়ে ঘুরছি, স্টকে রাখা কলম ঘষে যাচ্ছি। কিন্তু তারা ভারি নারাজ হয়ে ভেতরে ভেতরে রক্ত-শূন্যতায় ভুগছে। খোঁজাখুঁজি করে টেবিলের ড্রয়ারে, ব্যাগে অথবা বইয়ের ফাঁকে, কোত্থাও মেলে না একটি সচল কলম। এমন কী সেদিন দোকানে খেতে গিয়ে, ক্যাশ-কাউন্টারে অল্প কিছুক্ষণের জন্য একটি কলম ধার চেয়েও পাইনি। ফেরত দিয়ে যাব বলেও কোনো লাভ হল না। আসলেই ওদেরও আজকাল কলমের তেমন প্রয়োজন পড়ে না। আগে যাওবা সামান্য ব্যবহার ছিল, এখন সবকিছু কম্পিউটারাইজড। অগত্যা একজোড়া কলম কিনে নেবার সিদ্ধান্ত নিয়ে রাখি।

‘দূরে বসে প্রবাহের অন্তর্গত আমি, তাই নিজেরই অচেনা নিজে
কেবল দিব্যতাদুষ্ট শোনিতের ভারা ভারা স্বপ্ন বোঝাই মাঠে দেখি,
সেখানেও বসে আছে বৃক্ষের মতোন একা একজন লোক,
যাকে ঘিরে বিশজন দেবদূত গাইছে কেবলি
শতজীবনের শত কুহেলী ও কুয়াশার গান!

পাখি হয়ে যায় এ প্রাণ ঐ কুহেলী মাঠের প্রান্তরে হে দেবদূত!’

[পাখি হয়ে যায় প্রাণ : আবুল হাসান]   

সেদিন সন্ধ্যা লাগে লাগে। দিনের আলো প্রায় নিভে এসেছে। শীত বাতাসে তখনও তেমন টান লাগেনি। হেঁটে যেতে যেতে বাসস্টপের সামনে, পথের মাঝে আলো আঁধারে কি একটা জিনিসের প্রতি হঠাৎ চোখ আটকে গেল। খানিক দূর থেকে কেমন যেন চকচক করছে, আবার কলম কলমও মনে হচ্ছে! আসলেই কি ওটা কলম, না অন্য কিছু? তা দেখবার জন্য দ্রুত কাছে যাবার আগেই, অন্য আরেকজন পথচারীর বুটজুতোর তলে এই পড়ে- সেই পড়ে অবস্থা! প্রায় হুড়মুড় করে দৌঁড়ে, বুটজুতোকে দ্রুত পাশ কাটিয়ে তুলে নিলাম জিনিসটি। ইউরেকা ইউরেকা! পাইয়াছি পাইয়াছি! বলে সেই কবে গ্রিক বিজ্ঞানী আর্কিমিডিসের নগ্নদেহে দৌড় লাগানোর কথা মনে পড়ে গেল। আসলেই এটি একটি কলম! এই আবিষ্কারের আনন্দে নিজেও  ইউরেকা বলে উঠলাম। বুটজুতো অবাক চোখে দেখল, পড়ে থাকা সামান্য একটি কলমের জন্যে, এই মহিলা কিনা তাকে টপকে, তারই পায়ের কাছে হুমড়ি খেয়ে পড়ল! পথের উপর পড়ে থাকা একটি বেওয়ারিশ কলম কুড়াতে, এই বয়সে এমন দৌড় লাগানো মানায় কিনা, সেটাও ভাবতে পারে। যে যা ভাবে ভাবুক। নির্লজ্জের মতো কুড়িয়ে নিলাম বিখ্যাত BiC কোম্পানির তৈরি অতি পরিচিত ক্রিস্টাল বলপয়েন্ট পেন। নীল ঢাকনা, খুব সাধারণ চেহারার একটি কলম। কত দেখেছি, সাধারণ বলে হয়তো ফিরেও তাকানি কখনো। কিন্তু আজ দেখলাম। ওভাবে কুড়িয়ে না নিলে হয়তো, পথের মাঝে পড়ে থাকা অভিমানী কলমটি একসময় গুঁড়িয়ে যেত, কোনো না কোনো পথিকের জুতোর নিচে।

কুড়িয়ে পাওয়া কলম
কুড়িয়ে পাওয়া কলম

ঢাকনা খুলে নিজের হাতের তালুতে আঁক কষে দেখলাম কালি আছে কিনা। বাহ্‌, এক্কেবারে টইটম্বুর কালিতে ভরা। বেশ নতুন আর ঝকঝকে। যার ছিল, সে বোধহয় একবারের বেশি ব্যবহার করার সুযোগই পায়নি। হতে পারে এই কলমের মালিক কোনো শিক্ষার্থী, নয়তো আমারই মতো এখনো পুরোপুরি কলম ছেড়ে দেয়নি এমন একজন! কী অবিশ্বাস্য, আমি খুঁজছিলাম যা মনে মনে, তা সত্যি পেলাম! যার ব্যাগ বা পকেট থেকে অজান্তে পড়ে গেছে। সে কখনো জানবেই না, তার হারিয়ে যাওয়া কলমটি কোথায় গিয়ে পৌঁছাল, না মাটিতে মিশে গেল। তবে এই কলম যে আমার অপেক্ষাতেই ছিল এটা মানছি। তা না কেন এভাবে পথে পড়ে রইবে, কেনইবা সেই সন্ধ্যার আলো অন্ধকারে আমার চোখ চলে যাবে তার দিকে?

এমন করে অদ্ভূত জায়গায় একটি অক্ষত কলম পেয়ে যাবার ঘটনাকে, মিলিয়ে দেখতে থাকি কদিনের কলম খোঁজার সাথে। বুঝে যাই, প্রকৃতির দৈব যোগাযোগের ইশারা। যেখানে যাকে পাবার কথা নয়, সেখানে প্রকৃতিই নিয়ে যায় মিলিয়ে দিতে। যার জন্যে যা নির্ধারণ করা, সে তা পাবেই পাবে। প্রকৃতির এই দৈব যোগাযোগ ক্ষুদ্র বা বৃহৎ, কোনো কিছুই মানে না। হোক তা সামান্য কলম বা বড়ো কিছু, হোক তা বস্তু বা মানুষ, হোক তা পার্থিব অথবা অপার্থিব।

।। হৃদয়ে জেগে থাকা ঘুম।।

ট্রেন এবং স্টেশনের প্রতি আমার এক ধরনের ঘনঘোর টান রয়েছে। ট্রেনের হুইসিল, ঢং ঢং ঘণ্টার আওয়াজ, প্ল্যাটফর্মের কোলাহল, যাত্রীদের হাঁক-ডাক, কুলির দৌঁড়-ঝাঁপ, ফেরিওয়ালার চিৎকার, ট্রেন চলে যাবার পর আবারো নেমে আসা নির্জনতা। সব মিলিয়ে এই বিষয়টি চিরদিন প্রবলভাবে টেনেছে, এখনও। হয়তো এই টান এবং ভালোবাসা কিছুটা ক্ষ্যাপামির পর্যায়েই পড়ে। যাকে এক কথায় অবসেশন বললেও ভুল হবে না। আমার অসংখ্য কবিতায় তারা উঠে এসেছে বহুবার। পুরানো লাল ইটের বিল্ডিং, টিনের সেড দেয়া দীর্ঘ প্ল্যাটফর্ম, যাত্রীদের জন্য ওয়েটিং রুমের বিশাল বিশাল দরজা জানালা, সবুজ রং করা পাল্লাগুলোতে খড়খড়ি লাগানো। আবলুশ কাঠের টেবিল, হাতল লাগানো কাঠের চেয়ার। সবকিছু ভালো লাগে। প্রায় পৌনে একশো বছর হতে চলেছে ইংরেজরা চলে গেছে এদেশ থেকে। কিন্তু সেই সময়ে গড়া স্টেশনের প্যার্টান এখনো প্রায় একই রকমের রয়ে গেছে। যা দেখলে আপনাতেই নস্টালজিক অনুভব মনে ভর করে।

‘যে শহরে কোনো স্টেশন নেই, সে শহরে নির্বাসনে যাব না আমি
তুমি ফুল লতাপাতা এঁকে প্রলোভন দেখাতে পার, তবু আমি যাব না
যেখানে ট্রেনের হুইসিল সিটি মেরে টেনে নিয়ে যায় না কোনো
অঝোর স্টেশনে

কঠিন পথের বাঁকে আয়ু ভুলে যতই টেনে ধরো, আমি যাব না
মনে রেখো। এ নিতান্ত সংসারে যা-ই সত্য হোক, আমি কিন্তু যাচ্ছি না
ভীষণ জরুরি কোনো উত্তরের সন্ধানেও স্টেশন বিহীন শহরে’

[যে শহরে স্টেশন নেই : ফেরদৌস নাহার]  

আমার এই কবিতাটি পড়ে অনেকেই মুখ টিপে হাসতে পারেন। কারণ, আমার বাবার দেশ বরিশালে তো ট্রেন স্টেশনের ছায়ামাত্র নেই, সেই আমি কিনা স্টেশনহীন কোনো শহরে যাবে না! তাদেরকে বলি, আর বাবার দেশে নেই তো কী হয়েছে, মায়ের দেশে তো সারি সারি রেলগাড়ি আর স্টেশনের বহর। কুষ্টিয়া মানেই রেলগাড়ির দেশ। কাজেই সেগুলো আমারও রেলগাড়ি, আমারও স্টেশন।

ইউরোপে গিয়েও এ ব্যাপারে দূরে থাকিনি। উড়োজাহাজে করে লন্ডন পর্যন্ত পৌঁছানোর পর, একাধারে ট্রেনে করেই ঘুরেছি ইউরোপের নানা দেশের নানা শহর। সেইসব দূরপাল্লার ট্রেনযাত্রা এখনো ঘুরে ফিরে মাথায় হানা দেয়, কখনো লেখায়। রোম, মিলান, জুরিখ, মিউনিখ, প্যারিস হয়ে আবার লন্ডন। সবই ছিল ট্রেনে চেপে যাওয়া আসা। তাই মাঝে মাঝে মনে হয়- ইশ! যদি এ জীবনটা ট্রেনেই কাটিয়ে দিতে পারতাম, তাহলে কি খুব খুশি হতাম?  আবার এও ভাবি, মাটির মানুষ তো, মাটিতে ফিরে এলেই না বুঝতে পারি, ট্রেনে ট্রেনে ঘুরে বেড়ানোর আনন্দ ও তার ভিন্নতা।

এপর্যন্ত ভারতের যতগুলো শহরে গিয়েছি, তার আটানব্বই ভাগই গেছি ট্রেনে চেপে।  সেক্ষেত্রে প্রকৃত একজন টুরিস্টের মতো রেল-কামরার জানালা দিয়ে শত শত মাইল পার হতে হতে বুঝেছি, দিন এবং রাতের স্টেশনের চরিত্র কত ভিন্ন, কত আলাদা। যে স্টেশন দিনের আলোয় গমগম করে, হৈ-হল্লায় মত্ত থাকে, সে-ই কিনা রাতের মন্থর আলোয় সম্পূর্ণ অন্যরকম। রাত যত সঘন হয় স্টেশনের চেহারাও বদলে যেতে থাকে। ট্রেনের আসা-যাওয়া ছাড়া একটি স্টেশনের প্রকৃত জীবন যেন খুঁজে পাওয়া যায় না। ঢং ঢং শব্দে ট্রেন আসার ঘণ্টা বেজে উঠলে শুরু হয় প্রাণের স্ফুরণ। কুলি, এই কুলি! বলে যাত্রীর উদ্বিগ্ন কণ্ঠস্বর, চা-মিষ্টি থেকে শুরু করে নানা কিসিমের সওদা নিয়ে হকারের ব্যস্ত ছোটাছুটি। প্ল্যাটফর্মে লেগে থাকা ট্রেন যেন তখন জীবনের স্পন্দন বয়ে আনে। সে হোক দিনে বা রাতে। তারপর হুইসিল বাজিয়ে চলে যাওয়া ট্রেনের সাথে চলে যায় সব উৎকণ্ঠিত হাঁক ডাক, ব্যস্ততার সবটুকু উত্তাপ। তার পরিবর্তে এক অদ্ভূত নীরব নির্জনতা গ্রাস করে নেয় স্টেশনের এতক্ষণের তারুণ্য। এত বৈপরীত্য বোধহয় আর কোনো যাত্রা স্থলে দেখিনি, যা পেয়েছি ট্রেনে, স্টেশনে।

ঘুম স্টেশন
ঘুম স্টেশন

আমার এত কিছু বলে যাবার পেছনে খানিকটা একান্ত আখ্যান রয়েছে বৈকি। একটি অদেখা স্টেশনের প্রতি গভীর ভালোবাসার কথা মনে করাই যার মূল উদ্দেশ্য। যেখানে আমি কখনই যাইনি, গল্প শুনেছি। পরবর্তীতে দেখেছি চলচ্চিত্র ও ভিডিওতে। কিন্তু সেসব দেখে যে সেই জ্বলজ্যান্ত স্টেশনকে ভালোবেসে ফেলেছি, তা কিন্তু নয়! শুধু একটি নাম- ‘ঘুম’! এই নামে কোনো স্টেশন থাকতে পারে তা ভাবনাতেও ছিল না। যেদিন প্রথম শুনলাম, তখন বয়স মাত্র পনেরো, ষোল হবে। সেদিন থেকে অবাক হয়ে ভেবেছি- পাহাড়ের দেশে, ভেসে যাওয়া মেঘ এসে, ঘুম স্টেশনকে কি আরো ঘুম দিয়ে যায়? আমার ভেতরে কী করে যেন সেই তখন থেকেই, ধীরে ধীরে তার ছাপ পড়তে শুরু করে। যদিও জানি না সেই স্টেশন দেখতে কেমন, কী আছে ওখানে। শুধু জানি দার্জিলিং-এর কাছাকাছি। সেসময় তো ইন্টারনেট ছিল না। সাধারণ জ্ঞানের বই বলে, ভারতের সবচেয়ে উঁচুতে দাঁড়িয়ে থাকা স্টেশনের নাম- ঘুম। কুয়াশায় ঢেকে থাকে যার বেশিটা সময়। নামের মধ্যই খুব নির্জন নির্জন অনুভব রয়েছে। এমন স্টেশনে যে কোনো কোলাহল নেই, সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত। মন বলে, সে খুব নৈঃশব্দ্য নিয়ে ঝিম মেরে দাঁড়িয়ে আছে। ১৮৮১, ইংরেজদের শাসন আমলে তৈরি। সমুদ্র থেকে প্রায় সাড়ে সাতশো ফুট উপরের এই স্টেশনকে বর্তমানে ইউনিস্কো, বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসাবে ঘোষণা করেছে। ‘ঘুম’ নিয়ে কত কিছু ঘটে গেল। আর আমার কিনা আজ পর্যন্ত যাওয়াই হল না সেখানে!

দার্জিলিং-এর কথা উঠলেই সকলে কাঞ্চনজঙ্ঘা, টাইগার হিল, বৌদ্ধ মন্দির দেখতে যাবার কথা আগে বলে। আর আমি ঘুম স্টেশনের কথা ভাবি। যেখানে টয়-ট্রেনে চেপে যেতে মনে হবে- অন্য কোনো পৃথিবীতে এসে গেছি! ঘুম ঘুম চোখ মেলে আমিও তাকিয়ে দেখব তাকে। ঘুম স্টেশনেইর আকর্ষণে কতবার দার্জিলিং যাবার উদ্যোগ নিয়েও, যাওয়া হয়ে উঠল না। অথচ সেদেশে তো আমি কম যাইনি। তাহলে কেন এখনো পারিনি ঘুম স্টেশনের ঘুম ছুঁয়ে আসতে! যে আমি ঘুরেছি পৃথিবীর কত না প্রান্তরে, গিয়েছি কত না স্টেশনে। সে-ই কিনা কৈশোর থেকে ভালোবেসে আসা একটি গন্তব্যে আজও পৌঁছাতে পারল না! অবাক বিস্ময়ে মাঝে মাঝে ভাবি, এও কি সম্ভব!

- Might Interest You

6 COMMENTS

  1. দিনযাপনের ছোট ছোট ডিটেইলস, আবেগ, অনুভূতির কি চমৎকার গ্রন্থনা!

  2. কফি শপের সেই আড্ডা মনে পড়ে যায়। কলমের ব্যপারটা দারুণ। একজন লেখকের কাছে কলম এতোটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, তা সে কুড়িয়ে পাওয়া হোক কিংবা কেনাই হোক। ঘুম স্টেশনে একটু ঘুরে আসতে ইচ্ছে করেছে। ভালো লেগেছে কবি…

  3. লেখাটি খুবই ভালো লাগলো। রেলের ব্যাপারটি নিজের অনুভুতির সাথে মিলে গেল বলেই মনে হয় বেশি ভালো লাগলো। এছাড়া অন্যগুলোও তাৎপর্যবহ। সুন্দর।

    স্মৃতি হাতড়ে যতটুকু মনে পড়ছে ‘ঘুম’ কার্শিয়াং-এর কাছে, তবে দার্জিলিং যেতেই পড়ে।

    আর একটি কথা, রেল স্টেশন কেন যে এত ভালো লাগে, জানার চেষ্টা করেও কোনদিন সদুত্তর পাইনি, রেলে ভ্রমণ করে যত মজা পাই, তারচেয়ে বহুগুণ বেশি মজা পাই রেল স্টেশনে বসে সময় কাটাতে, সময়টা দিনরাতের যেকোন প্রান্তেরই হোক।

    সকাল হলে যাত্রীদের ব্যস্ততা, দুপুরে খালি প্লাটফর্মের অলস টং-দোকানি নিরস ঝগড়া বা আড্ডা বা টুকরো টুকরো কিশোর কুমারে পুরানো বাংলা-হিন্দী গানের মায়াজাল, বিকেলে ফিরতি যাত্রীদের বাড়ি ফেরার আকুলতা, সন্ধ্যায় সোডিয়াম লাইটের আলোয় খোলা বাতাসে পাকা বেঞ্জে বসেও বাড়ি ফেরা মানুষ বা সিনেমা দেখতে যাওয়া মানুষগুলোর চলতি পায়ের আলোচনা বা স্কুল-কলেজ পড়ুয়া ছেলে-মেয়েদের সারাদিনের ব্যাগঠাসা ক্লান্তি বয়ে বাড়ি ফেরা দেখা আর রাতের স্টেশন যেন নিজেই বলে হাট-ভাংগার গল্প ।

    এই উপলব্ধিগুলো সবই ভারতের কোন না কোন স্টেশনে। নিজ দেশে সেই সৌভাগ্য হয়নি।

    কৈফিয়ত:
    লেখাটি পড়ে, নিজের কথাগুলো আমাকে স্বস্তি দিচ্ছিল না। তাই স্বস্তির আশায়…

  4. স্মৃতি হাতড়ে যতটুকু মনে পড়ছে ‘ঘুম’ কার্শিয়াং-এর কাছে, তবে দার্জিলিং যেতেই পড়ে।

    আর একটি কথা, রেল স্টেশন কেন যে এত ভালো লাগে, জানার চেষ্টা করেও কোনদিন সদুত্তর পাইনি, রেলে ভ্রমণ করে যত মজা পাই, তারচেয়ে বহুগুণ বেশি মজা পাই রেল স্টেশনে বসে সময় কাটাতে, সময়টা দিনরাতের যেকোন প্রান্তেরই হোক।

    সকাল হলে যাত্রীদের ব্যস্ততা, দুপুরে খালি প্লাটফর্মের অলস টং-দোকানি নিরস ঝগড়া বা আড্ডা বা টুকরো টুকরো কিশোর কুমারে পুরানো বাংলা-হিন্দী গানের মায়াজাল, বিকেলে ফিরতি যাত্রীদের বাড়ি ফেরার আকুলতা, সন্ধ্যায় সোডিয়াম লাইটের আলোয় খোলা বাতাসে পাকা বেঞ্জে বসেও বাড়ি ফেরা মানুষ বা সিনেমা দেখতে যাওয়া মানুষগুলোর চলতি পায়ের আলোচনা বা স্কুল-কলেজ পড়ুয়া ছেলে-মেয়েদের সারাদিনের ব্যাগঠাসা ক্লান্তি বয়ে বাড়ি ফেরা দেখা আর রাতের স্টেশন যেন নিজেই বলে হাট-ভাংগার গল্প ।

    এই উপলব্ধিগুলো সবই ভারতের কোন না কোন স্টেশনে। নিজ দেশে সেই সৌভাগ্য হয়নি।

    কৈফিয়ত:
    লেখাটি পড়ে, নিজের কথাগুলো আমাকে স্বস্তি দিচ্ছিল না। তাই স্বস্তির আশায়…

  5. আরেকটি অসাধারণ গদ্য পাঠ করলাম। আজ আবার নতুন করে বলতেই হচ্ছে – কবির হাতের গদ্য মানে, রসসিক্ত আনন্দ। ধন্যবাদ প্রিয় কবি ফেরদৌস নাহার।

  6. পথের শরীর জুড়ে নিমগ্ন সখ্যতা
    গাছেদের সারি বাঁধা সংগ সুখে
    দুপাশে বাড়িয়ে হাত অবিরাম
    ভ্রমণের সাথে বোনে স্মৃতিস্মানতা

এমন আরো নিবন্ধ

Rupam Islam New Song

4 1614
Rupam Islam New Song

1 1812