কত মিলন ! কত বিচ্ছেদ ! কত সোহাগ ! কত ঘৃণা ! কত আলিঙ্গন ! কত পরিত্যাগ ! কত প্রেম ! কত বিরহ ! কত কাছে-আসা ! কত দূরে-যাওয়া ! কত বিয়ে ! কত মধুরাত ! কত বিয়ে-ভাঙা ! কত নিঃসঙ্গতা ! কত সহবাস ! কত একাবাস ! গত বত্তিরিশ বছর পুরোপুরিই একা আমি | এই আমার জীবন | যখন ফিরে তাকাই‚ কোনও শোচনা নেই | আছে মনকেমন | কিন্তু নেই অভিযোগ | যখন তাকাই সামনে‚যে-পথটুকু এখনও বাকি‚ সেদিকে তাকিয়ে ভাবি‚ অনেক কাজ যে বাকি থেকে যাবে |

এই তোলপাড়ের মধ্যে আমার প্রান্ত জীবনে এল এক অপ্রত্যাশিত বিভাবন — স্বামী বিবেকানন্দের সঙ্গে প্রায় আড়াই বছর কাটাবার অলৌকিক অভিজ্ঞতা ! আমি এই আকস্মিক প্রাপ্তির যোগ্য নই | তবু আমারই জীবনে ঝরে পড়ল এই আশীর্বাদ |

আমি আড়াই বছর ধরে ‘প্রতিদিন’ সংবাদপত্রে প্রতি রবিবার ‘ছুটি’ —- সাপ্লিমেন্টটির শেষ পাতায় লিখে চলেছি স্বামী বিবেকানন্দ-কে নিয়ে ধারাবাহিক উপন্যাস | নাম ‘প্রাণসখা বিবেকানন্দ’ | বিবেকানন্দকে নিয়ে বাংলা ভাষায় কোনও উপন্যাস নেই | উপন্যাসটির প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড ‘পত্রভারতী’ প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত হয়েই বেস্টসেলার ! তৃতীয় অর্থাৎ শেষ খণ্ডটি প্রকাশিত হবে এই বছরের ৪ জুলাই — বিবেকানন্দের ১১৩ তম প্রয়াণদিবসে | আমার ‘প্রাণসখা বিবেকানন্দ’ এক প্রেমের গল্প | ভালবাসার কথা | কেমন সেই ভালবাসা ?

যে-প্রেম ছেয়ে আছে সমস্ত ভুবন | যে-ভালবাসা শাশ্বত | যে-ভালবাসার কথা চিরায়মান | যে-প্রেমের চেয়ে বড় প্রেম আমি অন্তত ভাবতে পারি না | এক গভীর তাড়না থেকে লিখেছি এই বই | লিখেছি না লিখে পারিনি বলে | লিখেছি অন্তরের আদেশ নতজানু হয়ে পালন করে |

এই উপন্যাসের বিষয়টি আমার মধ্যে ঘুমিয়ে ছিল বহু বছর | যেমন আগ্নেয়গিরির মধ্যে সুপ্ত থাকে দহন-বহ্নি উৎসার |

প্রকাশের সময় যখন এল‚ তখন তাকে বাধা দেওয়ার শক্তি আমার ছিল না |

‘প্রাণসখা বিবেকানন্দ’ এমন এক ভালবাসার কথা অনন্ত যার প্রততি‚ অমেয় যার পুণ্যতা |

কতটুকুই বা ক্ষমতা আমার !

তবু চেষ্টা করেছি সেই ভালবাসার কথা বলতে |

সেই প্রচেষ্টার প্রেরণা এল প্রাণসখার কাছ থেকেই | তাঁরই আলোয় আলোকিত হল
আমার সব তোলপাড় |

প্রতিষ্ঠিত হল আমার প্রত্যয় |

তিনিই বিষয় !

তিনিই প্রাণন !

কল্পনা করতে পারিনি ‘প্রাণসখা বিবেকানন্দ’ -র প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড এমনিভাবে ছুঁয়ে থাকবে মানুষের হৃদয় !

ভাবতে পারিনি‚ মানুষের নিরন্তর উৎসাহী সাড়া ‘প্রাণসখা’-কে পৌঁছে দেবে প্রিয়তার শীর্ষে |

পিছন ফিরে তাকিয়ে মনে হচ্ছে‚ ‘প্রাণসখা’-র অবিশ্বাস্য প্রিয়তার বিন্দুমাত্র শংসা আমার প্রাপণীয় নয় |

‘প্রাণসখা বিবেকানন্দ’-র সাফল্যের সবটুকু সমর্পণ করলাম শ্রীরামকৃষ্ণ ও স্বামী বিবেকানন্দের চরণকমলে | তাঁরাই আমার
বিশ্বাসের ভূমি | নোঙর ফেললাম সেখানেই |

বিবেকানন্দ সম্বন্ধে লিখতে-লিখতে আমার অনুভূতি শান্তায়িত হল যে গহন বিন্দুতে তা হল–বিবেকানন্দ যেভাবে ভালবেসেছিলেন জীবনকে‚ সেই ভাবেই স্বইচ্ছায় আলিঙ্গন করেছিলেন মৃত্যুকে |

তাঁর মহাপ্রয়াণও এক অবিকল্প ভালবাসার কথা !

তিনি মৃত্যুর আগেই বলেছিলেন‚ আমার মৃত্যু ৪ ঠা জুলাই | তিনি জানতেন ঠিক কখন‚ কবে শেষ হবে তাঁর জীবন |

বারবার বলতেন‚ আমি চল্লিশ পেরবো না |

কেমন তাঁর জীবনের শেষ দিনটি ? কেমন সেই ভালবাসার কথা ?

**********************

আজ ১৯০২ -এর ৪ জুলাই | বিবেকানন্দ জানেন‚ আজই সেই দিন !

ভোরবেলা ঘুম ভেঙেছে বিবেকানন্দের | মন্দিরে গেলেন তিনি | উপাসনায় কাটালেন দীর্ঘক্ষণ | উপাসনার পর সামান্য ফল আর গরম দুধ খেতে খেতে গুরুভাইদের সঙ্গে হাসিঠাট্টা করলেন |

বেলা সাড়ে আটটায় স্বামী প্রেমানন্দকে ডেকে বললেন‚ ঠাকুরের শয়নঘরে পুজোর আসন করে দিতে |

সেই আসনে বেলা এগারোটা পর্যন্ত ধ্যানমগ্ন বিবেকানন্দ | তারপর এই গানটি গুনগুন করে গাইতে-গাইতে বেরিয়ে এলেন ঠাকুরঘর থেকে —

মা কি আমার কালো‚
কালোরূপা এলোকেশী
হৃদিপদ্ম করে আলো |

বিবেকানন্দের রূপের দিকে তাকিয়ে অবাক গুরুভাইরা !

সকালবেলা বেলুড়ঘাটে জেলেদের নৌকো ভিড়েছিল | জালে উঠেছে গঙ্গার ইলিশ | বিবেকানন্দের কাছে সেই খবর আসতেই তিনি মহাউৎসাহে ইলিশ কিনিয়েছেন | তাঁরই আদেশে রান্না হয়েছে ইলিশের ঝোল‚ ইলিশ ভাজা‚ ইলিশের অম্বল | বিবেকানন্দ জানেন‚ আর তো মাত্র কয়েকঘণ্টা পথ | ডাক্তারের উপদেশ মানবার আর প্রয়োজন নেই | অন্যদিন তিনি নিজের ঘরে বসে একলা খান | আজ খেতে বসলেন সবার সঙ্গে |

দুপুরে মিনিট পনেরো বিছানায় গড়িয়ে নিয়ে প্রেমানন্দকে বললেন‚ সন্ন্যাসীর দিবানিদ্রা পাপ | চলো‚ একটু লেখাপড়া করা যাক |

দুপুর একটা থেকে চারটে বিবেকানন্দ সন্ন্যাসীদের পড়ালেন পাণিনী-ব্যাকরণ | সংস্কৃত ব্যাকরণের ক্লাসেও নিয়ে এলেন হালকা হাস্যরস |

ব্যাকরণের ক্লাস শেষ করে এক কাপ গরম দুধ খেয়ে প্রেমানন্দের সঙ্গে হাঁটলেন বেলুড়-বাজার পর্যন্ত প্রায় দু-মাইল পথ | অন্যদিন এতটা হাঁটা তাঁর শরীরে নেয় না | আজ ৪ জুলাইয়ের গল্প অন্যরকম |

বিকেল পাঁচটায় মঠে ফিরেছেন বিবেকানন্দ | গঙ্গার ধারে আমগাছের তলায় তামাক খেতে-খেতে সন্ন্যাসীদের সঙ্গে গল্প করছেন বিবেকানন্দ | সন্ধে সাড়ে ছটা | বিবেকানন্দ এক কাপ চা চাইলেন | সন্ধে সাতটা | শুরু হল সন্ধ্যারতি | বিবেকানন্দ জানেন‚ আর দেরি করা চলে না | সময় আসন্ন | শরীরটাকে জীর্ণ বস্ত্রের মতো এবার ত্যাগ করতে হবে |

তিনি ভক্ত ব্রজেন্দ্রকে সঙ্গে নিয়ে নিজের ঘরে চলে গেলেন | ব্রজেন্দ্রকে বললেন‚ আমাকে দু-ছড়া মালা দিয়ে তুই বাইরে বসে জপ কর| আমি না ডাকলে আসবি না |

বিবেকানন্দ জানেন‚ আজকের ধ্যানই শেষ ধ্যান | তাঁর দেহের মধ্যে মূলাধার পদ্মে তিনটি বেষ্টনে অধোমুখে বিরাজিত পরমাশক্তি কুলকুণ্ডলিনী !

সেই কুণ্ডলিনী জাগ্রত করবেন বিবেকানন্দ | পরমাশক্তিকে করবেন ঊর্ধ্বমুখ | তারপর কুণ্ডলিনীকে মেরুদণ্ড দিয়ে আরোহী করাবেন তিনি | এবং সেই ভয়ংকর শক্তিকে প্রবিষ্ট করাবেন মস্তিষ্কে | এরপর ফেরার পথ বন্ধ !

জাগ্রত কুণ্ডলিনী যা ঘটাবার তাই ঘটাবেন | খুলে দেবেন মহাপ্রস্থানের পথ |

রাত সাতটা পঁয়তাল্লিশ | বিবেকানন্দ পেরেছেন ঘটিয়ে দিতে যা তিনি চেয়েছিলেন | ব্রজেন্দ্রকে ডাকলেন তিনি | বললেন‚ সব জানলা খুলে দে | গরম লাগছে |

মেঝেতে বিছানা | সেখানে শুয়ে বিবেকানন্দ | হাতে জপের মালা | ব্রজেন্দ্র বাতাস করছেন বিবেকানন্দকে |

আর বাতাস করিসনি‚ একটু পা টিপে দে |

রাত নটা | বাঁ পাশে ফিরলেন |

তাঁর ডান হাতটা থরথর করে কেঁপে উঠল | কুণ্ডলিনীর শেষ ছোবল |

নীরবে কাঁদছেন বিবেকানন্দ | দীর্ঘশ্বাস ফেললেন | গভীর সেই শ্বাস |

মাথাটা নড়ে উঠেই বালিশ থেকে পড়ে গেল |

বিবেকানন্দের ঠোঁট আর নাকের কোণে রক্তের ফোঁটা |

দিব্যজ্যোতিতে উজ্জ্বল তাঁর মুখ |

ঠোঁটে হাসি |

তিনি বলেছিলেন‚ তাঁর বয়েস চল্লিশ পেরবে না |

তাঁর বয়েস ঠিক ঊনচল্লিশ বছর‚ পাঁচমাস‚ চব্বিশ দিন !

(শিকাগো ধর্মসভার ছবি সৌজন্য :অদ্বৈত আশ্রম‚ কলকাতা)

NO COMMENTS

এমন আরো নিবন্ধ

Rupam Islam New Song

5 2062
Rupam Islam New Song

1 2128