স্কুলে পড়েছেন বৈদিক সভ্যতার সপ্ত ঋষির নামে আকাশে জ্বলজ্বল করে সপ্তর্ষিমণ্ডল | আকাশপাঠের পাশাপাশি আসুন একবার খোঁজার চেষ্টা করি সেই সাত ঋষিকে |

হিন্দু পুরাণের নানা উৎসে সাত ঋষির নাম পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছে | তবে সবথেকে বেশি স্থানে যাঁদের নাম রয়েছে তাঁদের কথাই বলব | সেই সাত ঋষি হলেন ভৃগু‚ অত্রি‚ অঙ্গীরা‚ বশিষ্ঠ‚ পুলস্থ্য‚ পুলহ ও ক্রতু |

এই পর্বে অত্রির কথা |

দুর্বাসা মুনি হিন্দু পুরাণে বিখ্যাত তাঁর ক্রোধের জন্য | যখন মর্জি হয়েছে যাঁকে তাঁকে অভিশাপ দিয়ে বসে আছেন | অথচ ভাবলে বিস্ময়াপন্ন হতে হয়‚ তাঁর জন্মদাতা খ্যাত স্তোত্র রচনা করে | দুর্বাসার ঋষির নাম যত না শুনেছেন‚ হলফ করে বলতে পারি তাঁর পিতার নাম সেই তুলনায় কম শুনেছেন |

কিন্তু ঋক বেদের একটা পঞ্চম খণ্ড প্রায় পুরোটাই তাঁর সৃষ্টি | তিনি মহাঋষি অত্রি | সপ্তর্ষির একজন | বেদপণ্ডিতরা মনে করেন ঋক বেদের পঞ্চম মণ্ডলের ৮৭ টি স্তোত্র তিনি রচনা করে গেছেন | ঋষি অত্রি এবং তাঁর উত্তরসুরীদের হাতে রচিত বলে এই স্তোত্রদের বলা হয় আত্রেয় |

অগ্নি‚ ইন্দ্র প্রধান দেবতা | তাঁদের উদ্দেশে রচিত হয়েছে প্রভূত স্তোত্র | এছাড়া মরুৎ‚ অশ্বিনীকুমার‚ ঊষা‚ সবার উদ্দেশে স্তোত্র রচনা করেছিলেন অত্রি‚ খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ থেকে ১২০০ সময়কালে |

অত্রি-স্তোত্র বিখ্যাত তাদের সুর এবং ছন্দোময় বৈশিষ্ট্যের জন্য | আধ্যাত্মিক দর্শন সেখানে বিরচিত হয়েছে রূপকের ছদ্মে | মেটাফোরের মাধুর্যে এইসব স্তোত্রে রাজভাষা স্রোতস্বিনীর মতোই এগিয়েছে | বেদ ছাড়াও অত্রির আর এক প্রসিদ্ধ কাজ অত্রি সংহিতা |

রামায়ণ ও মহাভারত দুই মহাকাব্যেও আছে অত্রির সাড়ম্বর উপস্থিতি | তিনি যেমন সপ্তর্ষির একজন‚ তাঁর স্ত্রী অনসূয়াও কিন্তু হিন্দুধর্মের পঞ্চসতীর অন্যতমা | রামায়ণে আছে‚ চিত্রকূট পর্বতে তাঁদের তপোবনে এসেছেন রাম লক্ষ্মণ ও সীতা | অনসূয়া সীতাকে শিখিয়েছিলেন আদর্শ পতিব্রতা স্ত্রীর কর্তব্য | দিয়েছিলেন এমন এক রূপটান যার জন্য সীতার রূপ থাকবে চির অমলিন |

অত্রি-অনসূয়ার সন্তান লাভ নিয়েও রয়েছে চমকপ্রদ পৌরাণিক আখ্যান | কথিত নারদের কাছে অনসূয়ার সততার কাহিনি শুনে পরীক্ষা করতে আসেন ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর | তাঁরা তিন বিপ্রর ছদ্মবেশে হাজির হন অনসূয়া সমীপে | তপোবনে তখন ঋষি অত্রি অনুপস্থিত |

দ্বিজবেশী তিন দেবতা অনসূয়ার কাছে প্রার্থনা করলেন ‚ তাঁদের দ্বিপ্রাহরিক ভোজন করাতে হবে | কিন্তু অনসূয়াকে খাবার পরিবেশন করতে হবে বিবস্ত্র হয়ে | সাধ্বী ঋষিপত্নী সব বুঝতে পারলেন | তিনি কমণ্ডলু থেকে মন্ত্রঃপুত বারি ছিটিয়ে দিলেন তিন ছদ্মবেশী দেবতার উপরে | মুহূর্তে তাঁরা তিন শিশুতে রূপান্তরিত হলেন | এরপর নগ্ন অনসূয়াও তিন শিশুকে ভোজন করালেন |

তপোবনে ফিরে এলেন অত্রি | তিনি দেখলেন স্ত্রীর সঙ্গে তিন দেবশিশু | স্বামীকে সব ব্যক্ত করলেন অনসূয়া |

এদিকে স্বামীরা স্বর্গে না ফেরায় মর্ত্যে এলেন সরস্বতী-লক্ষ্মী-পার্বতী | ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরের স্ত্রী | তাঁরা ক্ষমাভিক্ষা করলেন অত্রি-অনসূয়ার কাছে | ফিরে পেতে চাইলেন স্বামীদের‚ স্ব স্ব রূপে |

উত্তরে অনসূয়া প্রার্থনা করলেন‚ ত্রিদেবকে সত্যই তাঁর সন্তান হয়ে জন্মলাভ করতে হবে | সেই প্রার্থনা মঞ্জুর হল | অনসূয়া আবার মন্ত্রঃপুত বারি ছিটিয়ে দিতেই নিজ নিজ রূপ ফিরে পেলেন ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর |

যথাসময়ে তিন পুত্রসন্তানের জন্ম দিলেন অনসূয়া | ব্রহ্মার অবতার হয়ে জন্ম নিলেন সোম‚ বিষ্ণুর অবতার হয়ে জন্মলাভ করলেন দত্তাত্রেয় এবং মহেশ্বরের অবতার হয়ে জন্ম হল দুর্বাসার | এভাবেই দেবত্বের উপরে মানবতার জয়গান গেয়ে গেছেন সাত মহাঋষি |

অন্যদিকে এমন সৌম্যকান্তি ঋষির পুত্র হলেও মহাদেবের ক্রোধ পর্যবসিত হয়েছিল ঋষি দুর্বাসার মধ্যে |

 

আরও পড়ুন:  মানুষের লিঙ্গ পাল্টে ঈশ্বরের করা ' ভুল ' শুধরে দেন এই চিকিৎসক

এই প্রসঙ্গে :  তাঁর শাপে ব্রহ্মা নরলোকে পুজো পান না‚ বিষ্ণুকে জন্ম নিতে হয় নানা অবতারে‚ শিব পূজিত হন লিঙ্গরূপে http://banglalive.com/why-is-rishi-bhrigu-famous-in-hindu-mythology/

NO COMMENTS