ঠাকুরদালানে চলছে সন্ধি পুজো | হবে বলিদান | দেখার জন্য উপচে পড়েছে লোক | পরিতৃপ্ত চোখে মায়ের আরাধনা দেখছিলেন রামদুলাল দে ( দেব সরকার) | দেবী দুর্গার আরাধনায় কোনও কসুর করেননি তিনি | কলকাতার যেকোনও ধনী পরিবারের থেকে কোনও অংশে কম যায় না রামদুলালের মাতৃ আরাধনা | হঠাৎ ভাবনায় ছেদ পড়ল রামদুলালের | তাঁর পায়ের পাতায় কী যেন লাগছে ! নীচু হতেই চমকে গেলেন তিনি‚ আরে ! এ যে পাঁঠা | কিছুক্ষণ পরে যেটিকে মায়ের পায়ে উৎসর্গ করা হবে | কী করে যেন দড়ি ছিঁড়ে পালিয়ে এসেছে আশ্রয় খুঁজছে গৃহকর্তার পায়ে |

অবোধ পশুকে দেখে রামদুলালের মন পাল্টে গেল | বুঝলেন‚ মা ভবতারিণী তাঁর পুজোয় অবোধ পশুর বলি চাইছেন না | সেদিন থেকে বাড়ির পুজোয় বলিদান বন্ধ করলেন প্রথম কোটিপতি বাঙালি ব্যবসায়ী (জনশ্রুতি অনুযায়ী) রামদুলাল দে | সেটা ১৭৭২ | কলকাতায় তাঁর বাড়িতে দুর্গাপুজোর বয়স তখন মাত্র দু বছর |

বিডন স্ট্রিটে সেই বাড়ি আজও দাঁড়িয়ে আছে | পুজো হয় পশুবলি বাদ দিয়েই | তবে রামদুলালের শুরু করা পুজোর নাম এখন ছাতুবাবু লাটুবাবুর বাড়ির পুজো | এঁরা হলেন যথাক্রমে আশুতোষ দে ( দেব সরকার) এবং প্রমথ নাথ দে ( দেব সরকার) | রামদুলালের সুযোগ্য পুত্র |উনিশ শতকের দুই বিখ্যাত বাবু-র নামেই পরিচিত হয়ে গিয়েছে বনেদী বাড়ির এই পুজো |

ঐতিহ্য মেনে বাড়ির একচালা প্রতিমায় দুর্গার বাহনের মুখ ঘোড়ার মতো | কিন্তু দেহ সিংহের মতো | দেবীর দুপাশে লক্ষ্মী সরস্বতীর বদলে থাকেন দুই সখী জয়া ও বিজয়া | তাঁদের হাতে বীণা বা ঝাঁপি নয় | থাকে শুধু অভয়মুদ্রা | অষ্টমীর ভোগের বিশেষ আকর্ষণ বিশালাকায় লেডিকেনি আর দরবেশ |

শুধু পুজো পার্বণই নয় | সাবেক কলকাতার এই বনেদী পরিবারের নাম রয়েছে সঙ্গীত সমঝদার হিসেবেও | কিংবদন্তিসম শিল্পীদের সঙ্গীত এবং বাদ্য পরিবেশনের সাক্ষী থেকেছে প্রায় আড়াইশো বছরের প্রাচীন এই বাড়ির নাটমন্দির | বাড়ির ছেলে ছাতুবাবুকে বলা হয় কলকাতার প্রথম সেতারশিল্পী |

আভিজাত্য আর বনেদীয়ানার সেই যুগলবন্দি-মূর্ছনা আজও শোনা যায় খিলান থেকে কড়িবরগায় | শুধু কান পাতার অপেক্ষা |

আরও পড়ুন:  কী বলে একে অভিহিত করা যায় ? বৈদিক যুগে অস্ত্রোপচার করে শিশুর জন্ম ?

NO COMMENTS