বাংলালাইভ রেটিং -

প্রথমে একছিটে ফ্ল্যাশ ব্যাক হয়ে যাক। মাস দুয়েক আগে কলকাতার অভিজাত এক বইয়ের দোকানে জমে উঠেছিল বাংলা সাহিত্যের আলোচনা, টপিক ছিল, ‘(বাংলা) সিনেমায় সাহিত্যের গোয়েন্দারা’। আর এটা নিয়ে সেদিন সেখানে বলতে এসেছিলেন অরিন্দম শীল।

বলবেন না-ই বা কেন! অলরেডি তো তাঁর রান্নাঘর থেকে ততদিনে দু’পিস শবর নামানো হয়ে গেছে গরম গরম। আর সঙ্গে এক পিস আস্ত ব্যোমকেশ। ব্যোমকেশের পরের পিসটাও তখন উনুনে বুগবুগিয়ে ফুটছে, শীতকাল এলেই জমিয়ে বাঙালির পাতে এসে পড়লো বলে।

তো এরকম একটা সময়, এরকম একটা জমায়েতে নিজের ফার্স্ট ব্যোমকেশ শুটিং করার গল্প শোনাচ্ছেন অরিন্দম শীল চুটিয়ে। দেখেশুনে মনে হচ্ছে, গোয়েন্দা নিয়ে সিনেমা করার ব্যাপারে একটা দুর্দমনীয় অথরিটি হয়ে গেছেন যেন, প্রায় এরকম একটা মেজাজ। কী বলছেন তিনি, সেটা শুনুন এবারে।

‘অনেক ব্যাপার থাকে যেগুলো আপনারা সিনেমা দেখতে গিয়ে জানতেও পারেন না। আজ সেরকম একটা বলি। ‘হর হর ব্যোমকেশ’ দেখেছেন তো? লাস্ট সিনটা মনে করুন। বেনারসের গঙ্গায় বজরা করে আসছে আমার ক্যারেক্টারটা, যেটা মগনলাল মেঘরাজকে ভেবে বানানো। তারপর সেটা ঘাটে এসে পৌঁছে সাধুবাবা মানে মছলিবাবার দিকে ভেট দিতে যাবে আর কি। জানেন নিশ্চয়, এই পুরো অ্যারেঞ্জমেন্টটাই সত্যজিৎ রায়কে ট্রিবিউট দেওয়ার জন্যে করা। হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন, ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’।… এবার শুনুন আসল যেটা বলতে চাইছি। ওই সিনে আমরা কোন বজরা ইউজ করেছিলাম, জানেন কি? খোদ রায়বাবু যে বজরা নিয়ে ‘ফেলুনাথ’ শুট করেছিলেন সেইটে! এতদিন পরে বজরাটার হাল খুব একটা ভাল ছিল না… আমরা সেটা খুঁজে বের করে, সারিয়ে, নতুন করে রং করে তারপর শুট করি। হাজার-হাজার টাকা খরচ হয় স্রেফ এটার পেছনে। সিনেমা দেখে আমাদের এই এফর্টটা কেউ ধরতে পেরেছিলেন, বলুন? আমরা কিন্তু পরিশ্রমের ত্রুটি রাখছি না!’ একটু দম নেবেন বলে এই সময় বোধহয় থামলেন ভদ্রলোক, মুখে তখন প্রায় একটা ‘মার-দিয়া-কেল্লা’ গোছের হাসি।

'জয় বাবা ফেলুনাথ'ছবিতে সেই মগনলালের বজরা...'হর হর ব্যোমকেশ' শুটিংয়ে এটাকেই নাকি খুঁজে বের করে,সারিয়ে ব্যবহার করা হয়েছিল
‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ছবিতে সেই মগনলালের বজরা…’হর হর ব্যোমকেশ’ শুটিংয়ে এটাকেই নাকি খুঁজে বের করে,সারিয়ে ব্যবহার করা হয়েছিল

আর এটা শুনে আমার তখন প্রায় বাক্যি হ’রে যাওয়ার দশা! মানে কথা-টথা সব বন্ধ হয়ে গেছে প্রায়, যেন চোক্‌ড হয়ে গেছে গলা। ভাবছি, সিনেমা তৈরির সুযোগ পাওয়ার আনন্দে আর বড় প্রযোজকের বাজেটের ঝুলি ইচ্ছেমত ফুটো করতে পারার আহ্লাদে এই ভদ্রলোকের মাথার ভেতর সব কিছু গোলমাল হয়ে গেল কিনা। না হলে মূল গল্পের সঙ্গে যে সিনটার কোথাও কোন রকম সংযোগ অবধি ছিল না, স্রেফ ‘ট্রিবিউট’ দেওয়ার হ্যাং ওভারে সেটার পেছনে হাজার হাজার টাকা উড়িয়ে দিলেন দিব্যি! পরে আবার সেই কথাগুলো দুনিয়ার লোককে শুনিয়েও বেড়াচ্ছেন গব্বো-মাখা মুখে!

সত্যজিতের লেখা পড়ে যেটুকু জেনেছি আর ওঁর ছবি দেখে যেটুকু বুঝেছি, কী সিনেমা বলুন, কি লিটারেচর, কোথাও এক চিলতে মেদ সহ্য করতে পারতেন না ভদ্রলোক। তখন তো আজকের মতো সুলভ ডিজিটাল যুগ আসে নি, দুর্মূল্য সেলুলয়েডের জমানা চলছে। শুনেছি, সেই অবস্থাতেও শুট করে আনা শট কিংবা পুরো সিন ফেলে দিয়েছেন শুধু এই কারণে যে ফাইনাল এডিট করতে গিয়ে ওঁর মনে হয়েছে, পর্দায় এতটা বলার দরকার নেই কোন। যত ছোট, যত টানটান আর যত তীক্ষ্ণ হবে সিন, অভিঘাতটাও বেটার হবে সেই অনুপাতে!

সেই সত্যজিৎকে ‘ট্রিবিউট’ দেবেন বলে ছবির সঙ্গে কার্য-কারণহীন সিন জুড়ে দিয়ে প্রোডিউসারের টাকা খসিয়ে এ কোন আদেখলাপনার যুগ এল আজ, ভাই? শুনে আমার কথা বন্ধ হয়ে গেছিল কি আর সাধে!

‘হর হর ব্যোমকেশ’-এর মেকিং থেকে সোজা চলে আসুন হালের ‘ব্যোমকেশ পর্ব’ ছবিতে। উত্তর বঙ্গে সান্তালগোলায় স্বাধীনতার ঠিক এক বছর পরের গল্প। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকান সৈন্যদের দৌলতে পুরো এলাকাটায় অস্ত্রের কালোবাজারি আর তুমুল নৈরাজ্যের শুরু। সেই কেস সল্‌ভ করতে সরকারের বিশেষ অনুরোধে এবার তাই নর্থ বেঙ্গল অভিযানে ব্যোমকেশ।

ছবির শুরুর ফ্রেমটা তো যাকে বলে ‘একঘর’ হয়েছে পুরো। ড্রোনে লাগানো ক্যামেরা ধীরে ধীরে মাটির থেকে আকাশের দিকে উড়ছে। আর অমনি যেন জমাট রহস্য আর আবছা আঁধার নিয়ে জঙ্গুলে সেই প্রকৃতিটাকে ‘ঈগলের চোখ’ দিয়ে দেখতে পাচ্ছে ভিউয়ার। নিচে পড়ে থাকা বিশাল ভূখণ্ডের মাঝবরাবর আবার সরু একটা সিঁথির মতো রেল লাইনের রেখা। সব মিলিয়ে চেয়ারে তখন অটোমেটিক্যালি শিরদাঁড়া টানটান করে রেডি হয়ে গেছেন আপনি।

2সেই অনুভূতিটাই কিন্তু একদম ছানা কেটে গেল স্ক্রিন জুড়ে দেদার নাচ-গান শুরু হয়ে যাওয়ার পর! হিরো-হিরোইনদের নাচ-গান নয়, সেটা আছে আরও পরে, এই নাচ-গানটা হল স্থানীয় আদিবাসীদের। গল্পের সঙ্গে এর রিলেশন আছে কোন? এর ফলে কি আরও ঘনীভূত হল মিস্ট্রি? না হলে এটা এখানে রয়েছে কেন মশাই? ধুস, আপনি এখনও বোঝেন নি নাকি কিছু? এটা যে আমাদের শীল মশাইয়ের সেই ‘ট্রিবিউট’ দেবার ব্যামো। সেবার ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’কে দিয়েছিলেন, এবার এই সিনটায় ‘আগন্তুক’য়ের পালা। ওখানে সেই ছিল না যে আদিবাসী নাচ-গান দেখে একটা সময় নিজেকে সামলাতে না পেরে তাদের সঙ্গে হাতে হাত ঠেকিয়ে কোমরে কোমর মিলিয়ে নাচতে শুরু করবেন শহুরে হাউসওয়াইফ অনিলা। এখানে সেটার হুবহু কপি – শুধু সেই অনিলা মানে মমতাশঙ্করের জায়গায় এখানে ঠাঁই পেয়েছেন সত্যবতী (সোহিনী সরকার) আর যূথিকা মল্লিক (জুন মালিয়া) এসে।

আরও পড়ুন:  'নিউটন'-এর সাফল্যকে মায়ের আশীর্বাদ বলে মনে করছেন রাজকুমার রাও

আগেই ‘হর হর ব্যোমকেশ’ দেখার অভিজ্ঞতাটা ছিল বলে আর তার সঙ্গে শীলমশাইয়ের সেই জ্ঞানগর্ভ ভাষণটাও শোনার সৌভাগ্য হয়ে গেছিল বলে এই ‘ট্রিবিউট’টাকে আলাদা করে চিনে নিতে কোন দেরি হল না আর।

যেটা বুঝতে পারছিলাম না যে, শীল অরিন্দম কি ছবি করেন জুতসই ভাবে একটা গল্প বলবেন বলে, নাকি তাঁর ট্রিবিউট দেওয়ার পার্সোনাল খাতার স্কোর বাড়াবেন বলে!

একে তো ব্যোমকেশ জমাট রহস্যের কিনারা করতে গেছে নাকি ভ্যাকেশনে ফুর্তি করতে গেছে, সেটাই বোঝা যাচ্ছে না সঙ্গে বৌ নিয়ে গেছে বলে আর সেই বৌ মাঝে মাঝে আদুরে গলায় মেলা থেকে চাকী বেলন কিনে দেওয়ার জন্যে বায়না জুড়ছে বলে। তারপর জায়গায় জায়গায় এরকম সব নাচ-গান জুড়তে জুড়তে গেলে শেষ অবধি ‘থ্রিলার’ ছবির হালটা ঠিক কেমন হয়ে দাঁড়ায়, সেটাই ভাবুন একবার!

কেস সবচেয়ে গোলমেলে হয়ে দাঁড়াল সেখানটায়, যখন বৌ সত্যবতী আর পরাণসখা অজিতের থেকে মহাভারতের বিরাটপর্বের রেফারেন্স পেয়ে রহস্য সমাধান করার ক্লু পেয়ে গেল ব্যোমকেশ। ঠিক এরপরের সিনেই শীলমশাই কী দেখাচ্ছেন বলুন তো আমাদের? সম্ভাব্য অপরাধী আর তার বৌয়ের সঙ্গে বসে কব্জি ডুবিয়ে পেটপুজো চালাচ্ছে ব্যোমকেশ, তাঁর বৌ আর অজিত, এই তিনজনে মিলে! বিষম খাবেন না, রগড় এখানে শেষ নয়, সবে শুরু! এরপর এই দুই ফ্যামিলি মিলিয়ে জমিয়ে পিকনিক আর ‘খোল দ্বার বধূয়া’ বলে গীতিকবিতার পালা! তখন জাস্ট কী মনে হচ্ছে জানেন? এটা ডিটেকটিভ সিনেমা হচ্ছে নাকি আর কিছু? রহস্য সমাধানের ক্লু খুঁজে পাওয়ার পর কোথায় গল্পের গতি আরও অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠবে। আমরা পাবলিকরা দেখে নিঃশ্বাস ফেলতে ভুলে যাব। তার বদলে এমন খাওয়া দাওয়া, বনভোজন আর বিনাকা গীতিমালার চোটে যে থ্রিলারের থ্রিলটা পুরো ওখানেই এলিয়ে গিয়ে ছেতড়ে পড়লো ভাই!

থ্রিলার ছবিতে সম্ভাব্য অপরাধীর সঙ্গে গানা-বাজানা-পিকনিক করতে ব্যস্ত গোয়েন্দা
থ্রিলার ছবিতে সম্ভাব্য অপরাধীর সঙ্গে গানা-বাজানা-পিকনিক করতে ব্যস্ত গোয়েন্দা

স্ক্রিপ্ট কে লিখেছে, ডিরেক্ট কে করেছে, সেসব কথা তো জানি। ক্রেডিট টাইটেলেই আছে! শুধু যেটা বুঝতে পারছিলাম না, রহস্যকাহিনীর অমন একটা জায়গাতে ওভাবে খাওয়া-দাওয়া, পিকনিক আর হিরো-হিরোইনের গানা-বাজানার সিন ঢুকিয়ে সিচুয়েশনের পুরো বারোটা বাজিয়ে দেওয়ার উর্বর পরিকল্পনাটা আসলে কোন প্রতিভার কল্পনা থেকে বেরল। আরও যেটা বুঝতে পারছিলাম না, ব্যোমকেশকে নিয়ে এই গোছের নির্বোধ সব ফাজলামিগুলো ঠিক আর কতদিন ধরে চলবে?

একবার রাইটস কিনে ফ্যালা মানে কি তাহলে কাগের ঠ্যাং-বগের ঠ্যাং যা ইচ্ছে করে দেওয়ার স্বাধীনতা? কয়েক মাস পরপর ব্যোমকেশ নিয়ে বঙ্গসংস্কৃতির কুলাধিপতিদের এই ক্রিয়েটিভিটি দেখে একেকবার কী মনে হয়, জানেন? ফেলুদার রাইটসটা বারোয়ারি লেভেলের পাগল-ছাগলদের হাতে তুলে না দেওয়ার ডিসিশনটা বোধহয় ঠিকঠাকই নিয়েছিলেন সন্দীপ রায় মশাই!

এতদিন ধরে ব্যোমকেশ বলতে আপনি কী বুঝতেন জানি না। তবে ‘ব্যোমকেশ পর্ব’ দেখতে গিয়ে কিন্তু সত্যান্বেষী ভদ্রলোকের পুরো নতুন একটা আপডেটেড ভার্সন পেয়ে যাবেন হাতে। ‘হর হর’ ভার্সনে যেমন ছিল ব্যোমকেশের সেক্স-ভার্সন। বৌয়ের শরীরে চড়ে বসে ঠিক যখন সেক্স করতে যাবে, অমনি বৌয়ের আদুরে বিড়বিড়ানি থেকে খুঁজে পেয়ে গেল রহস্যভেদের ক্লু! ব্যাস, সঙ্গে সঙ্গে বাজিমাত! এবারেরটায় সেরকম হলো ব্যোমকেশ ভার্সন ২.০, মানে একসঙ্গে দুটো ভার্সন, একটা হচ্ছে অ্যাকশন ভার্সন আর সেটা নিলে তার সঙ্গে আপনি পাবেন গণিকালয় ভার্সন ফ্রি।

10চমকাবেন না প্লিজ! একটুও বাড়িয়ে বলছি না! কে বলবে ব্যোমকেশ মানে মগজের কারবার করে বেড়ান ক্ষুরধার এক বাঙালি যুবা, এর বেশি আর কোন কিচ্ছু না। এই ব্যোমকেশকে যে লেভেলে ঝাড়পিট করতে দেখলাম, হালের জিৎ কিংবা দেব অধিকারীকেও তো সে বলে বলে দশ গোল দেবে ভাই! পাঁচ দশজন গুণ্ডাকে একা হাতে ঘায়েল করে দেওয়াটা যার কাছে জাস্ট কোন ব্যাপার না। শার্লক হোমসকে নিয়ে গত কয়েক বছরে হলিউডে যে দুটো সিনেমা হয়েছে, সে দুটোতে মারপিট করতে নেমে ধস্ত হয়ে গেছিল হোমস, একটায় তো মরতে বসেছিল প্রায়। আর এখানে? তাবড় তাবড় খুনে গুন্ডাকে কাত করে দিতে গিয়ে এই ব্যোমবাবুর চুলের স্টাইলটুকু অবধি ঘাঁটে না! বিক্ষত হওয়া তো বহু দূরের কথা, ডান কনুইয়ের কাছটা একটু নুনছাল উঠে যায় শুধু!

আরও পড়ুন:  প্রাক্তন প্রেমিক জনের সঙ্গে খারাপ সম্পর্কের জন্য তাঁকেই দায়ী করলেন বিপাশা

সিনেমায় এই ব্যোমকেশের ইনট্রোডাকশন শটটা আবার গণিকাপাড়ায় নেওয়া। মোটে বছরখানেক হল তো বিয়ে হয়েছে, এরমধ্যেই ব্যোমকেশ আবার খারাপ পাড়ায় পা রেখেছে কেন গোছের কু-ভাবনা মনে আনবেন না প্লিজ। আভাসে ইঙ্গিতে যেটা বোঝা গেল, ব্যোমকেশ এখানে এসেছে এখানকার এক বেবুশ্যে মায়ের কিশোরী মেয়ের পাচার রুখতে। তবে দুষ্টু লোকদের থেকে মেয়েটাকে বাঁচাতে ঢিসুম-ঢুসুম শুরুর আগে যেভাবে সে ঘড়ি-টরি খুলে সেগুলো এক-এক করে মেয়েটার হাতে ধরার জন্যে তুলে দিতে থাকে, তখন মনে হয় বোম্বে হিরো মার্কা এই গামবাটপনাটা তো সেই বজরঙ্গী ভাইজানকেও করতে দেখি নি!

আমাদের ব্যোমকেশের তাহলে হলটা কি যে আর্তত্রাণে গিয়েও শো-ম্যানশিপটা আর ভুলতে পারছে না কিছুতে! এই দেখানেপনাটা যে কী বিপুল, সেটা বোঝা যাবে মারপিট হয়ে যাওয়ার পরের ডায়ালগটা থেকে। জামা-কাপড় বিশেষ কিছু নষ্ট না হলেও লজ্জার মাথা খেয়ে ব্যোমকেশ পুলিশকে তখন কী বলছে জানেন? ‘… (এবার) একটু পরিষ্কার জামাকাপড় লাগবে’। হরি হে মাধবঃ! হিন্দি ফিলিমের খাস্তা নায়ককেও আজ অবধি অ্যাকশন করে উঠে এই ডায়ালগ ছাড়তে শুনি নি ভাই!

কলকাতায় বাইজি বাড়িতে যাওয়ার আগে এই ড্রেস পরেছিল ব্যোমকেশ... কিন্তু এই ড্রেস না পরলেই বা কী ক্ষতি হত
কলকাতায় বাইজি বাড়িতে যাওয়ার আগে এই ড্রেস পরেছিল ব্যোমকেশ… কিন্তু এই ড্রেস না পরলেই বা কী ক্ষতি হত

অ্যাকশন ভার্সনের পাশাপাশি এটাকেই বলতে চাইছি ব্যোমকেশের গণিকাবাড়ি ভার্সন। যে এই এরিয়ায় পা রেখেছি মানে পুরো অন্য ‘সেট অফ ড্রেস’, অন্য কেতা! ব্যাপারটা ছবির মাঝবরাবর আরও চরমভাবে আসছে! কলকাতা ছেড়ে কেস সল্‌ভ করতে নর্থ বেঙ্গল গিয়ে যেই না শুনল ওই গ্রামের সদানন্দ সুর নামে একজনের মাঝে মাঝে ফুর্তি করতে কলকাতায় যাওয়ার অভ্যেস আছে, অমনি ব্যোমকেশ ধরে নিল ব্যাটা নির্ঘাত গণিকালয়েই যায়। আর অমনি একবছরের পুরনো বৌকে বন্ধু অজিতের সঙ্গে উত্তরবঙ্গে একলা ফেলে রেখে হুশ করে ফেরত চলে এলো সেই চীনে পাড়া ঘেঁষা গণিকাপট্টিটাতেই!

বুঝুন অবস্থা! এখন আপনি যদি জানতে চান যে সেই ১৯৪৮ সালে কলকাতা শহরে ফুর্তি করতে যাওয়া মানে সাকুল্যে ওই একটাই বেশ্যালয় বোঝাত কিনা, না হলে ব্যোমকেশ কীসের জন্যে বেছে বেছে ফের এটায় এসে জুটল, আমার কাছে তার কিন্তু কোন উত্তর নেই ভাই!

সে তো আপনি এরপর এটাও জানতে চাইতে পারেন যে, ‘ও’পাড়া থেকে কোন খবর জোগাড় করতে গেলে কি সেখানে বাবু সেজে গোলাপবাইয়ের (সায়ন্তিকা) মুজরোতে বসে ঠুমকি মারতে হয় ওইভাবে? যেভাবে এই ছবিতে ব্যোমকেশকে মারতে দেখলাম আমরা। কিন্তু আপনি বলুন, পুরো ব্যাপারটা ওইভাবে না সাজালে, ব্যোমকেশকে দিয়ে ওই গাড়লপনাটুকু না করালে আর কোন অজুহাতে ছবিটায় সায়ন্তিকার মতো নামী হিরোইনের লচক-মচক নাচ ঢোকাতেন ডিরেক্টর? আর মুম্বই থেকে সরোজ খান এসে যে সেই নাচের কোরিওগ্রাফি করে দিয়ে গেছেন সেই গোছের চটকদারি ঢাক-পেটান মার্কেটিংটাই বা হতোটা কী করে?

আর এসব প্যাঁচ না মারলে বাজারে আজকাল ‘বই’য়ের কাটতি বাড়ে নাকি?

মার্কেটিংয়ের কথা উঠলো বলে আরেকটা কথা না লিখে এখানে পারছি না। এদিক-ওদিক খুব শুনছিলাম যে, এই ছবিটার জন্যে নাকি আলাদা করে ঘোড়ায় চড়া শিখতে হয়েছে আবীরকে, দুর্দান্ত সব ঘোড়দৌড়ের সিন আছে নাকি সব! মজাটা কোথায় জানেন? সিনেমা দেখতে গিয়ে টের পাবেন, এর পুরোটাই আসলে জাস্ট টোটাল ডোজের গ্যাস! ঘোড়ার পিঠে চড়ে যে চেজ সিকোয়েন্সটা আছে, সেটায় শেষ তিন-চার সেকেন্ড ছাড়া তো কোথাও কারুর মুখই দ্যাখা যাচ্ছে না ভাই! এখন সেই সিকোয়েন্স আবীর করছে নাকি স্টান্ট ডিপার্টমেন্টের আর কেউ, কে বলবে বলুন তো? শেষ যে কয়েক সেকেন্ড আবীরের মুখ দ্যাখা গেল, তার আগেই ঘোড়া থেমে গেছে, চেজিং-টেজিং শেষ!

এই বাইজির নাচ, এই মেয়ে পাচার, এই ধুম ঝাড়পিট, এই ঘোড়দৌড়, সিনেমার মোড়কটা এমন গ্লসি করতে গিয়ে যেটা হয়েছে, ভেতরে ডিটেলিংয়ের জায়গাটা একেবারে শূন্য কলসির মতো ঢনঢনাচ্ছে! ফনীমনসার ঝোপে কিংবা শুকনো বাবলা গাছে কীভাবে মার্কিনীদের রেখে যাওয়া অস্ত্র লুকিয়ে রাখা গেল, আপনি নিজেও তো বোধহয় সেটা জানেন না, অরিন্দম! ঘোর বর্ষার যে সিজন আপনি দেখালেন, সেই সিজনে ভিজে চুপ হয়ে গিয়ে অনেক আগেই তো সেগুলোর বারোটা বেজে যাওয়ার কথা! বর্ষার খোলা জঙ্গলে সেগুলো অমন শুকনো রয়ে গেল কী করে, তার কোন ব্যাখ্যা দেখানোর কথা কি আপনার মাথায় ছিল, স্যর? একবারও কি মনে হয়েছিল যে অজিতের হাতে এম. সি. সরকারের ছাপা রাজশেখর বসুর চকচকে কভারওয়ালা ওই মহাভারতটা তুলে দেওয়ার আগে এটুকু অন্তত চেক করে দেখি যে, আদৌ সেই ১৯৪৮ সালের জুলাই-অগাস্ট মাস নাগাদ বইটা এই কভারে ছাপা হয়েছিল কিনা। খোঁজ নিলে জানতে পারতেন, বইটা তখন ছাপাই হয় নি, ওটা প্রথম ছাপা হয়েছিল, এই সিনেমার যে সময়কাল, ঠিক তার পরের বছর, অর্থাৎ ১৯৪৯ সালে।

আরও পড়ুন:  পিসতুতো বোন ইনায়াকে দেখতে গিয়ে কী করলো তৈমুর?

বুঝছেন তো, কোথায় আছে ফাঁক, আর কোথায় রয়ে গেছে ফাঁকি!

সদানন্দ সুরের ভূমিকায় রুদ্রনীল ঘোষ
সদানন্দ সুরের ভূমিকায় রুদ্রনীল ঘোষ

দাবি করছেন এটা নাকি গোয়েন্দা গল্প বলে। কিন্তু তার ভাঁজে ভাঁজে এমন সব অসঙ্গতি থাকলে চলে? ব্যোমকেশের মতো তুমুল সেনসিটিভ একজন মানুষ। তার প্রায় চোখের সামনে বিস্ফোরণে উড়ে গেল সদানন্দ সুর (অসাধারণ অভিনয়ে রুদ্রনীল), রক্তাক্ত ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গেল দেহ। ব্যোমকেশ এরপর তার চিকিৎসা নিয়ে কথা বলল না একটাও? সোজা সদানন্দের বাড়ির মধ্যে ঢুকে গেল তদন্ত করবে বলে? এরপরের সিনে গ্রামের লোকজনের সঙ্গে এই দুর্ঘটনা নিয়ে কথা বলছে ব্যোমকেশ। বলতে বলতে হাঁটছে পুরো অন্য একটা পথে। কিন্তু রক্তমাখা দেহটা এখনও আগের রাস্তায় পড়ে আছে কিনা, সেই দেহে এখনও প্রাণ আছে কিনা, ডাক্তার কিংবা পুলিশে আদৌ খবর দেওয়া হল কিনা, হয়ে থাকলে ডাক্তার কিংবা পুলিশ আসবে কখন, সেসব নিয়ে একবার একটা শব্দও বেরল না ব্যোমকেশের মুখ দিয়ে?

এদিকে হেভি অ্যাকশন করবে আর ওদিকে জমিয়ে বাইজি বাড়ি যাবে, সে সব না হয় ঠিক আছে। আপডেটেড ভার্সনের গোয়েন্দা না হয় এরকম টাইপেরই হল। কিন্তু তাই বলে চোখের সামনে লোক মরতে দেখে জাস্ট এরকম ইনডিফারেন্ট হয়ে থাকবে?

সবসময় মাথায় আপনার ওই ট্রিবিউট দেওয়ার গল্পটা ঘুরঘুর করছিল বলে কিনা জানি না। পুরো ছবিটা দেখার পর মনে হচ্ছিল, সত্যজিৎ রায়কে ‘ট্রিবিউট’ দেওয়ার ফাঁকে সবচেয়ে বড় ট্রিবিউট বোধহয় পেয়ে গেলেন ব্যোমকেশের দুনিয়ায় যে ভদ্রলোক আপনার আর্চ-রাইভ্যাল, সেই অঞ্জন দত্ত নিজে!

কেন বলুন তো? আরে এটা মনে নেই, আপনার এই দু’ নম্বর ব্যোমকেশের মতো অঞ্জন দত্তও তার দু’ নম্বর ব্যোমকেশটা বানিয়েছিলেন এই নর্থ বেঙ্গলের পটভূমিতেই। এখনও অবধি তাঁর বানানো সবচেয়ে ঝুল ব্যোমকেশও ছিল ওটাই। নাম ছিল ‘আবার ব্যোমকেশ’।

সেবার ব্যোমকেশের চারণভূমি ছিল উত্তরবঙ্গের সামসিং। এবার ব্যোমকেশ সরাসরি সামসিং যায় নি ঠিকই, তবে খবরের কাগজে পড়লাম শুটিং নাকি হয়েছে সেই সামসিংয়েও। সেবারেও ব্যোমকেশের সঙ্গে ছিল বৌ আর অজিত, এবারেও ঠিক তাই। সে ছবিটায় স্টার অ্যাট্রাকশন বাড়াতে নেওয়া হয়েছিল স্বস্তিকাকে। আর এটায় সেই জায়গায় ঠাঁই পেয়েছেন সায়ন্তিকা।

উত্তরবঙ্গে তদন্ত করতে গেলেই কি মাথায় হ্যাট পরতে হয়... 'আবার ব্যোমকেশ'-এর পোস্টার
উত্তরবঙ্গে তদন্ত করতে গেলেই কি মাথায় হ্যাট পরতে হয়… ‘আবার ব্যোমকেশ’-এর পোস্টার

সবচেয়ে মোক্ষম হল যে দুটো ছবিতেই ব্যোমকেশের ‘লুক’টা খুব এক – ওকে গোয়েন্দাগিরি করতে হয় মাথায় বিদেশি একটা ‘হ্যাট’ চাপিয়ে, তবে! নর্থ বেঙ্গল গেলেই কি মাথায় এমন ‘হ্যাট’ পরতে হয়, দাদা? নাকি আপনার অবচেতনে অঞ্জন দত্তের ছবির ইমেজারিগুলো এমন করে গেঁড়ে বসেছিল যে সেটার থেকে বেরতেই পারলেন না আর?

'আবার ব্যোমকেশ'কে ট্রিবিউট দিতেই কি এই ছবিতেও ব্যোমকেশের মাথায় হ্যাট
‘আবার ব্যোমকেশ’কে ট্রিবিউট দিতেই কি এই ছবিতেও ব্যোমকেশের মাথায় হ্যাট

এবং এই অবধি তাও ঠিক আছে। এরপরেরটা যে জাস্ট আর নেওয়াই গেল না। সেই ‘আবার ব্যোমকেশ’ ছবিটায় ভিলেনের ভূমিকা করেছিলেন যে অভিনেতা (নামটা ইচ্ছে করেই ফাঁস করছি না), আপনার এই ছবিটাতেও ভিলেনের ভূমিকায় বেছে বেছে সেই অভিনেতাকেই নিলেন আপনি শেষে? কাস্টিং করতে বসেও শুধু সেই ছবিটার কথাই ভাবছিলেন নাকি স্যর?

ফিরে যাই দু’মাস আগের সেই সাহিত্য সভায় আপনার ভাষণ দেওয়ার মঞ্চে। সেখানে সেদিন আপনি আরও কী কী সব বলেছিলেন মনে আছে নির্ঘাত? বলেছিলেন আপনার এর পরের ব্যোমকেশ নাকি আরও মডার্ন হবে, সে নাকি এরপর অনেকটা ক্রিস্টোফার নোলানের সেই ‘ডার্ক নাইট’-এর মতোও হয়ে যেতে পারে!

মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন। আমি শুধু ছোট্ট সেই পুরনো কথাটাই আবার ক’রে বলি। ঈশ্বর, ব্যোমকেশ নিয়ে এই ‘ক্রিয়েটিভিটি’ ফাইনালি বন্ধ হবে কবে?

NO COMMENTS