বাংলালাইভ রেটিং -

তখন সবে সবে ধরা পড়েছেন ইন্দ্রাণী, ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ কাগজের প্রথম পাতায় বিরাট করে সেই কেচ্ছা শুরুর ব্যাকস্টোরি নিয়ে সুহেল শেঠ-এর মুচমুচে লেখা বেরল ২৭ অগস্ট ২০১৫। সুহেল লিখছেন, বছর পনের আগে ‘দ্য প্রেসিডেন্ট’ হোটেলের ‘দ্য লাইব্রেরি বার’ পানশালায় বৃষ্টিভেজা এক সন্ধেবেলার গপ্পো। স্টার ইন্ডিয়া’র সি.ই.ও. পিটার মুকেরজি আর স্টার-এর আরেক এক্সিকিউটিভ সুমন্ত্র দত্তের সেদিন ছিল সুহেলের কাছে মাল খাওয়ার নেমন্তন্ন। সবে সেই মালের আসর জমে উঠেছে, এমন সময় ওই পানশালাতেই অ্যাডগুরু অ্যালেক পদমসি’র বাহু আঁকড়ে পা রাখল লাস্যময়ী মেয়েটা।

Pix 2_Facebookইন্দ্রাণী।

চমক-ঠমকে একেবারে যেন ছম্মক ছাল্লু। পূর্ব ভারতের ছোট শহর গুয়াহাটি থেকে মুম্বই পৌঁছে তখন প্রাণপণে ওপরে ওঠার মই খুঁজছে কন্যেটি। আর তার জন্যে আঁজলা ভরে তুলে দিচ্ছে নিজেকেই। সেই স্কিমে ওই একটা সন্ধের মধ্যেই ‘বাবু’ বদলে ফেলল মেয়েটা। ‘বার’-এ ঢোকার সময় অ্যালেকের হাত আঁকড়ে ছিল, ‘বার’ থেকে বেরল পিটারের হাত জড়িয়ে ধরে। মোহিনী নেশার কড়া গমকে পিটারও তখন টলমল, নিজের বান্ধবী স্বপ্নাকে সুহেল আর সুমন্ত্রের জিম্মায় ছেড়ে যেতে বাধল না কিছু তারও।

তার দু’দিনের মধ্যে দুষ্টুমি করার মতলব এঁটে ইন্দ্রাণীকে ফোন করছে সুহেল আর কথা সেরে ফোন রাখতে না রাখতে সুহেল’কে রিংব্যাক করে পিটার শুনিয়ে দিচ্ছে ইন্দ্রাণী এখন তার জিম্মায়। দুজনের বিয়েটাও এই প্রায় ঠিক হল বলে। সুতরাং ওই মেয়ের দিকে ভুলেও যেন সুহেল আর দুষ্টু কু-নজর না হানে।

সুহেল নির্বাক। কেরিয়ারের মই বেয়ে এতো তাড়াতাড়ি উপরে উঠে পড়তে পারে এই সেদিন দেখা-মেয়েটাই, সেটা তখনও তার হজম হতে বোধহয় সময় লাগছিল বেশ।

মধুর ভাণ্ডারকরের বারো নম্বর ছবি ‘ক্যালেন্ডার গার্লস’-এর শুরু থেকে শেষ যেন একটা সুতোর মতো গেঁথে রেখেছেন ওই সুহেল শেঠ-ই। অবশ্য বলতে গেলে এখানেও তার প্রায় নির্বাক দশা, আর তার চোখের সামনে এখানেও কাঁচা কাঁচা সুন্দরীরা ছিবড়ে হচ্ছে বলিউডের গ্ল্যামার ইন্ডাস্ট্রিতে।

6এই ছবিতে সুহেল সেজেছেন ‘কুমার’ নামে এক শিল্পপতি। প্রায় ন্যাংটো যুবতী মেয়ের ছবি সাজিয়ে বছর-বছর ক্যালেন্ডার ছাপানোটা এই কুমারবাবুর প্যাশন। ঠিক এমন একটা হ্যাবিট কিংফিশার বিয়ার কোম্পানির মালিক বিজয় মালিয়া’রও আছে না?তবে ভারত জুড়ে ছড়িয়ে থাকা অগুন্তি কাঁচা বয়সের মেয়েদের মধ্যে সেরাগুলোকে বেছে নিতে যেভাবে ফি-বছর মহাসমারোহে ‘কিংফিশার ক্যালেন্ডার মডেল হান্ট’ আয়োজন করেন বিজয়বাবু, এই ছবির কুমারবাবুকে তেমন কিছু করে উঠতে আদৌ দেখি না।

ভারতের চার কোণা থেকে চারজন আর পাকিস্তান থেকে আরেকজন – মোট পাঁচটি মেয়েকে কী করে খুঁজে বের করা হল ক্যালেন্ডার শুটের জন্যে, সেটা নিয়ে এই ছবিতে মধুরের মুখ এক্কেবারে বন্ধ। ছবির গোড়াতে একবার সেই ‘কুমার’ নিজেও না শুধিয়ে পারে না ফটোগ্রাফারটিকে, খুঁজে পেলে কী করে মেয়েগুলোকে? আর ফটোগ্রাফার ছেলেটিও (‘ফ্যাশন’ ছবির মতো এই ছবিতেও এই ভূমিকায় রোহিত রায়) তখন দিব্যি ব্যাপারটাকে ‘বিজনেস সিক্রেট’ বলে মুচকি হেসে এড়িয়ে যায়।

মেয়ে খুঁজে বের করার প্রসেস নিয়ে বেশি ঘাঁটতে যাওয়াটা কি তার মানে খুব একটা সেফ ছিল না? বিজয় মালিয়ার সঙ্গে সুসম্পর্ক নষ্ট করতে চান না বলেই কি প্রায় ধরি-মাছ-না-ছুঁই-পানি গোছের সতর্কতা নিয়ে ছোট্ট স্ক্রিন লেংথে সেরে ফেলা হল ওই ‘কুমার’ ক্যারেকটারটা?

ভারতের অন্য শহর থেকে ছিটকে আসা মেয়েগুলোকে হাঙরের মতো কীভাবে টপ করে গিলে খায় মুম্বই নগরী, এর আগে একটার পর একটা ছবিতে লাগাতার সেই গল্পই দেখিয়ে গেছেন মধুর। উত্তরপ্রদেশের সীতাপুর থেকে এসে পৌঁছেছিল মুমতাজ (‘চাঁদনী বার’ ছবিতে তব্বু), বেঙ্গালুরু থেকে এসেছিল মাধবী শর্মা আর দিল্লি থেকে এসেছিল গায়ত্রী সচদেবা (‘পেজ থ্রি’ ছবির কঙ্কনা সেনশর্মা আর তারা শর্মা)। কলকাতা থেকে এসেছিল নিশিগন্ধা দাশগুপ্তা (‘কর্পোরেট’ ছবিতে বিপাশা বসু)। চণ্ডীগড় থেকে এসেছিল মেঘনা মাথুর (‘ফ্যাশন’ ছবির প্রিয়াঙ্কা চোপড়া)। আর দিল্লি থেকে মাহি অরোরা (‘হিরোইন’ ছবিতে করিনা কাপুর)।

4এতদিন ছবিগুলোতে একটা কি বড়জোর দুটো মেয়ের গপ্পোটা এবার এক ধাক্কায় যেন ‘চাক দে ইন্ডিয়া’ হয়ে গেল! পাঁচ-পাঁচটা মেয়ে একসঙ্গে। হায়দরাবাদ থেকে নন্দিতা মেনন, কলকাতা থেকে পারোমা (নামটা পরমা হলে ভালো হতো না?) ঘোষ, গোয়া থেকে শ্যারন পিনটো, রোহতক থেকে ময়ূরী চৌহান। আর সুদূর পাকিস্তানের লাহোর থেকে নাজনিন মালিক। এই যে দূর-দূর শহর থেকে অ্যাম্বিশাস সুন্দরী মেয়েগুলো এসে কসমোপলিটান বাণিজ্য-নগরীর অতল হাঁ-য়ে তলিয়ে গেল একের পর এক, ঘটনার বেসিক ধাঁচাটা একেবারে সেই ইন্দ্রাণী মুকের্জি মার্কা না?

গুয়াহাটি থেকে জীবন শুরু করেছিল ইন্দ্রাণী, এরপর ধাপে ধাপে কলকাতা হয়ে মুম্বই। গুয়াহাটিতে অফিসিয়াল বিয়ে একটা, তারপর অ্যাম্বিশনের তাড়নায় ডিভোর্স। কলকাতায় পরের বিয়েটা, ফের আরও উঁচুতে ওঠার ইচ্ছে আর ডিভোর্স। ফাইনালি মুম্বই পৌঁছে প্রায় ষোল বছর বড় একজনকে নিজের টোপে গেঁথে তোলা। তারপর কী হল, সেটা বলা তো কোর্টের এক্তিয়ারে।

এর পাশে এই ছবির নাজনিনকে (শতরূপা পাইন) রেখে মেলান। বাড়ি পাকিস্তানের লাহোরে, কিন্তু ছবির গোড়া থেকেই নাজনিন লন্ডনে। দেখেশুনে মনে হয়, পেশাদার মডেলিংয়ের আঁচে ওম পোয়াচ্ছে মেয়েটা। লক্ষ্য শুধু সাকসেস, আরও সাকসেস। বয়ফ্রেন্ডের বারণ না শুনে গ্ল্যামার-দুনিয়ার সিঁড়ি বেয়ে আরও ওপরে উঠবে বলে সেখান থেকেই জেদ করে এসে পৌঁছল মুম্বই। ক্যালেন্ডার শুটের অফার পেয়েছে না? শুট আবশ্য মুম্বইতে নয়, তার জন্যে ফের যেতে হবে বাইরে কোথাও। বাকি চারটে মেয়ের সঙ্গে এরপর তাই এই নাজনিন সোজা মরিশাসে।

5সেখানে দুরন্ত সাদা বালির বালুকাবেলায় নাজনিনের পরনে ফিতের মতো সরু বিকিনি। আমার চোখে তখন আবার ওর বিকিনি-পরা ছবিটার সঙ্গে ইন্দ্রাণীর বিকিনি পরা ছবিখানা মিলিয়ে-গুলিয়ে এক। ইন্দ্রাণীর ছবিটাও কোনও একটা বিদেশি সি-বিচেই তোলা। ৩১ অগস্ট’১৫ আনন্দবাজারে ছাপা সেই ছবিখানা দেখেছেন নিশ্চয়?

পাকিস্তানি হওয়ার কারণে ভারতে কাজ পাচ্ছে না নাজনিন, একটা সিনেমায় কাজের সুযোগ পেয়েও অফার বাতিল করে সাইনিং অ্যামাউন্ট ফেরত নিয়ে নিচ্ছেন নামী ডিরেক্টর। কিন্তু কেতার লাইফ-স্টাইল টিকিয়ে রাখতে হবে তো? নাজনিনের সঙ্গে দেখা হয়ে যায় দালাল অনন্যা-র (মিতা বশিষ্ঠ),আর সেই সূত্রে নাজনিন পেল ‘পাওয়ারফুল’ লোকজনদের রাতের বেলায় চুপি চুপি খুশি করে দেওয়ার কনফিডেনসিয়াল কাজ। ‘এসকর্ট গার্ল’ হয়ে নাজনিনের রোজগার দাঁড়ায় মাসে বিশ লাখের মতো।উচ্চাশার লকলকানো লোভে চুবনো নাজনিনের বিতর্কিত ডায়ালগখানা নতুন করে আর কী বলবো, সেটা তো নির্ঘাত ছবির ট্রেলর থেকেই শুনে ফেলেছেন আগে।

‘পাকিস্তানি লেড়কিয়া ভি উতনি হি বোল্ড কাম করতি হ্যায়, যিতনি বাকি লেড়কিয়া করতি হ্যায়। বলকে কভি কভি, উসসে জাদা ভি’।

এসকর্ট গার্লের গল্প আগেও শুনিয়েছিল বটে হিন্দি সিনেমা (‘লাগা চুনারি মে দাগ’, ২০০৭), কিন্তু এই পেশায় নেমে প্রথম চোটেই যে বাবার বয়সী লোকজনেদের শরীর গরম করতে হয়, মেনস্ট্রিম ছবিতে সেই কাদাটা বোধহয় মধুর ভাণ্ডারকর’ই প্রথম ঘাঁটলেন।

বাবার বয়সী লোকজনেদের শরীর গরম করার কাজ? হ্যাঁ, তা নয় তো কি মাসে বিশ লাখ এমনি এমনি আসবে? নিশুত রাতে হাই-প্রোফাইল বাংলোয় কালো কাঁচে ঢাকা গাড়িটা নাজনিনকে চুপি চুপি নামিয়ে দিয়ে গেল। একহাত পরপর সেখানে সিকিউরিটি দাঁড়িয়ে। লোকটা কে, মধুর খুলে বলছেন না, শুধু ‘ব্রোকার’ অনন্যার মুখ দিয়ে শুনিয়ে দিয়েছেন, এই লোককে খুশি করে দিলে এই ভারতবর্ষে আর কোথাও নাজনিনের কোন প্রবলেম হবে না।

নাজনিনের ট্র্যাকটায় চমকানো সব ডায়ালগ লিখে পাকিস্তানকে একহাত নিয়েছেন মধুর, এটা যাঁরা ভাবছেন, তাঁরা যে কত বড় ভুল, সেটা বোঝা যাচ্ছে এবার? গল্পের এই অংশে তো আসলে ভারতের গালেই নির্নিমেষ থাপ্পড়!

দোতলা থেকে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসে হাই প্রোফাইল কাস্টমার যখন নাজনিনের সামনে দাঁড়াল, তখন নর্থ কলকাতার সিনেমা-হল জুড়ে ‘দাদু এসেছে’ বলে খিল্লি। ভদ্রলোকের বয়স অন্তত ষাট হবে, নিজের মুখেই বলছেন বৌ আছে বটে, কিন্তু এতো মোটা হয়ে গেছে বৌ যে ওনার আর ‘ভালো’ লাগে না। বলে বউয়ের ওয়ারড্রোব হাট করে খুলে দিচ্ছেন নাজনিনের সামনে। ‘যা ইচ্ছে পরে নাও এখান থেকে’ নাজনিনের সামনে তখন অগুন্তি রিভিলিং আউটফিট। এরপর বাবা কিংবা দাদুর বয়সী লোকটা যখন ওর ঘাড়ে-গলায় ঠোঁট ঘষতে শুরু করলো, তখন ফের ওর গল্পটা অন্য কোন সাম্প্রতিক চেনা গল্পের সঙ্গে মিলে-মিশে গেল কিনা, সেটা না হয় আপনি বলুন, আমি না।

লাহোরের নাজনিনকে ছেড়ে আসুন কলকাতার পারোমা ঘোষের (অভনী মোদি) কাছে। গ্ল্যামার কুড়নোর তাগিদে হাফ-ন্যাংটো হয়ে ক্যামেরার সামনে পোজ দিয়ে দাঁড়াতে চায় শুনে বাড়ির লোক প্রায় ছিছিক্কার করে ঘর থেকে বের করে দিয়েছিল পারোমা’কে। বড় মুখ করে সেই সময় বাড়ির লোকগুলোকে শুনিয়ে এসেছিল পারোমা যে, একদিন সবাই তোমরা আমার জন্যে প্রাউড ফিল করবে, তোমাদের সবাইকে আমি ডেকে পাঠাবো মুম্বইতেই।

এরপর? ক্যালেন্ডারের বিকিনি শুটের পর পারোমা’ও টের পাচ্ছে তার হাতে আর জুৎসই কোন কাজ নেই। কিন্তু টাকার ফ্লো ঠিক না থাকলে গ্ল্যামার-দুনিয়ায় টিকবে কী করে? এই সময় পুরনো আশিক পিনাকী চ্যাটার্জির (কেইথ সিকোয়েরা) সঙ্গে নতুন করে মোলাকাত আর তার হাত ধরেই একটু একটু করে আই. পি. এল. ম্যাচ ফিক্সিংয়ের পৃথিবীতে পা রাখা। ক্রিকেটার আর আম্পায়ারদের টাকা দিয়ে কিনে নিয়ে অন্ধকার জুয়োর শুরু। শেষ পর্যন্ত পুলিশের হাতে যখন ধরা পরে যাচ্ছে পুরো র‍্যাকেটটা আর লেডি পুলিশেরা ধাক্কা দিয়ে সুন্দরী পারোমা’কে নোংরা হাজতে ঠেলে ঢুকচ্ছে, সিনেমার সেই দৃশ্যগুলো যে আরেক দফা মনে করিয়ে দিচ্ছে সেই ইন্দ্রাণীকেই, তা তো বুঝতেই পারছেন।

Pix 1_Facebookক্যালেন্ডার গার্লসের সবার জীবনেই যেন একটু একটু করে ইন্দ্রাণীর লোভ আর কেচ্ছা মেশানো আছে!

ইন্দ্রাণীর গল্পে এরপর কী হবে, সেটা এখনও জানা নেই, তবে মধুর দেখাচ্ছেন পারোমা’র গল্পটা এখানেই শেষ হল না। আত্মীয় স্বজনের মুখ পুড়িয়ে জামিনে রিলিজ পাওয়ার পর যখন চুপিসাড়ে বহুতলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ঝাঁপ দিতে যাচ্ছে পারোমা, ঠিক তক্ষুনি দরজায় বেল বাজলো তার। নামী একটা চ্যানেল থেকে কর্তাব্যক্তিরা পারোমা’র দোরগোড়ায় এসে হাজির! রিয়্যালিটি শো’র দুরন্ত অফার, পঞ্চাশ লাখ পারিশ্রমিক!

রিয়্যালিটি শোয়ের নামটা শোনাচ্ছেন না মধুর, তবে সংলাপে এটুকু বলা হচ্ছে, ‘একটানা দশ সপ্তাহ বন্ধ ঘরে থাকতে হবে, বাইরের কারুর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন না’। শুনে সিনেমা-হলে আমার পাশের লোকটি বিড়বিড় করছে শুনলাম, ‘ওহ, বিগবস’।

সত্যি! রাকেশ মারিয়াকে কুলোর বাতাস দিয়ে তাড়ানোর পরবাস্তবের পিটার-ইন্দ্রাণীরাও কোন শুভক্ষণে ‘বিগ বস’-এ চান্স পেয়ে যাবেন কিনা, কে বলতে পারে? মধুর কিন্তু বেশ ভূয়োদর্শী লোক!

পিটার-ইন্দ্রাণী দুজনে মিলে আস্ত একটা নিউজ চ্যানেল খুলেছিলেন, সেটা এতদিনে সবাই জানেন। এ ছবিতে ক্যালেন্ডার গার্লসদের নিজেরা কেউ নিউজ চ্যানেল খোলে না ঠিকই। কিন্তু গোয়া থেকে আসা শ্যারন পিনটো (কায়েরা ডাট) অ্যাডভারটাইজিং দুনিয়ার লোভী হাত ঘুরে এসে পৌঁছয় সেই নিউজ চ্যানেলের দরজাতেই। কাজ জোটে অ্যাঙ্করিংয়ের। সঙ্গে নামী জার্নালিস্টের সঙ্গে হালকা একটু ঈশক। তবে উৎপটাং কোন লোভ না করে পেশার কাজটুকু সিরিয়াসলি করতে থাকে শ্যারন। আর এর মুখ দিয়েই মধুর এই কথাটা শোনানোর একটা সুযোগ পান যে, ক্যালেন্ডারের মডেল হওয়ার মধ্যে খারাপ কিছু নেই, ভালো-খারাপ নির্ভর করে এই দুনিয়ায় তোমার বাছা চয়েসগুলোর উপর।

হায়দরাবাদের নন্দিতা মেনন(আকাঙ্ক্ষা পুরি) যেমন গোড়াতেই টের পেয়েছিল মডেলিংয়ের পৃথিবীতে টিঁকতে গেলে যে হারে মাংস বেচার দম লাগবে, সেই দম দেখানোর চেয়ে নামী-দামী বিজনেসম্যানের গলায় সাত তাড়াতাড়ি ঝুলে পড়াটা ঢের বেশি সেফ। ক্যালেন্ডার শুটের বিকিনি খুলে রেখে ও তাই দ্রুত শরীর ঢেকে নিয়েছিল জড়দগব শাড়ি-গয়নাতে। ‘ম্যায় মডেলিং ছোড় রহি হুঁ’ নারাং ফ্যামিলির সঙ্গে লাঞ্চ টেবিলে বসে ডিক্লেয়ার করেছিল নন্দিতা। ও এটা বলার পর ওর হবু শাশুড়ি যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন বলে মনে হল। হর্ষ নারাংয়ের সঙ্গে বিয়ের পরে নন্দিতা অবশ্য টের পেল, ওকে লুকিয়ে হর্ষ দুনিয়ার মেয়েদের সঙ্গে শুয়ে বেড়ায়। ঘটনাটা চরমে উঠলো সেদিন, যখন নন্দিতাকে লুকিয়ে ওর বন্ধু নাজনিনকেও রেপ করে দিল হর্ষ।

নন্দিতা খেলায় শেষ অবধি জিতল না হারলো? হর্ষের লাম্পট্য নিয়ে বড় মুখ করে শ্বশুর-শাশুড়ির কাছে বলতে গেছিল নন্দিতা। যে শাশুড়ি বিয়ের আগে নন্দিতাকে মডেলিং না ছাড়িয়ে হাঁফ ছাড়তে পারছিলেন না, তাঁর মুখ তখন পাথরের মতো স্থানু। আর শ্রদ্ধেয় শ্বশুরমশাই নন্দিতার গালে হাত ঘষতে ঘষতে বলছেন, কী বলবো বল, জানো তো আমরা নামী পরিবার, আর এই ব্যাপারটাও, কী যেন বলে, আমাদের পরম্পরার মতো! হাসো এবার? একটু হাসো?

নন্দিতার নরম গালে ওর শ্বশুরের আঙুলগুলো ঘুরছে, শাশুড়ি নিস্তব্ধ পাথর, আর আমি ভাবছি ভারতীয় সভ্যতার মুখটাতে ঠিক আর কতখানি জুতোবেন মধুর!

রোহতকের ময়ূরী চৌহান (রুহি সিং) এই পাঁচজনের মধ্যে বোধহয় সবচেয়ে দুরস্ত ছকবাজ। গুছিয়ে এমন এক পিস সেক্রেটারি জোগাড় করেছে, যে তাকে শোকসভা থেকে লোকসভা – সর্বত্র পয়সার বিনিময়ে ফিট-ইন করিয়ে দিতে পারে। দু’লাখ টাকা নিয়ে যখন এক সদ্যমৃতের বাড়ি ‘শোক মানাতে’ যাচ্ছে ময়ূরী, তখন জোর ধাঁধা লাগছে, বুঝতে পারছি না, সুন্দরী মডেলরা কি টাকার বিনিময়ে সত্যি এমন রুদালি-মার্কা কাজগুলোও করে নাকি? এই শোকসভাতেই আবার শোকজ্ঞাপনের অছিলায় ময়ূরীকে জড়িয়ে ধরছে জনৈক ‘শোকার্ত’ রিলেটিভ,আর মওকা বুঝে মিটার বাড়িয়ে সেক্রেটারি তুলে নিচ্ছেন দুই লাখের বদলে তিন লাখ!

তুখোড় নেটওয়ার্কিং ময়ূরীকে পৌঁছে দিচ্ছে ফিল্ম-স্টারডমে। নামী ডিরেক্টরের ছবিতে চান্স, তারপর অ্যাওয়ার্ড জেতা। তারপরের রাস্তাটুকুও একই রকম মসৃণ কিনা, সেটা জানার জন্যে তো মধুরের আগের ছবি ‘হিরোইন’ (২০১২) আছে। সত্যি কি ক্যালেন্ডার গার্লদের ভাগ্যে নামী সিনেমার ‘হিরোইন’ হওয়ার শিকে ছেঁড়ে? এক-আধজনের জীবনে তেমনটা যে হয় না, তা নয়। ২০০৬ সালের ক্যালেন্ডার গার্ল দীপিকা পাদুকোনের কথা যেমন আজ আর নতুন করে বলার কিছু নেই। কিংবা ২০১৩ সালের কায়েরা ডাট নিজেই তো এই ছবিটায় শ্যারন পিনটো’র ভূমিকায়।

এমন তপ্ত আগুন নিয়ে তৈরি ছবির গোলমালটা কিন্তু অন্যখানে। অ্যাদ্দিন অবধি তৈরি ছবিগুলোয় গ্ল্যামার ইন্ডাস্ট্রির পর্দা ফাঁস করতে বসে মধুর গল্পের সেন্ট্রাল ফোকাসটা ধরে রাখতেন একটা মেন ক্যারেকটারে। আর সেই চরিত্রে অভিনয় করতো হিট-হিট সব স্টার। ‘চাঁদনী বার’-এ তব্বু, ‘পেজ থ্রি’তে কঙ্কনা, ‘কর্পোরেট’-এ বিপাশা, ‘ফ্যাশন’-এ প্রিয়াঙ্কা, ‘হিরোইন’-এ করিনা। আর এসব চরিত্রের সূত্র ধরেই সেসব সিনেমার পরতে পরতে খুলতো আরও সব কেচ্ছা-ভরা সাব-ট্র্যাক আর উপকাহিনি।

এই প্রথমবার বোধহয় মধুরের সিনেমায় কোন স্টার নেই, আর একজনের বদলে পাঁচ-পাঁচজন প্রোটাগনিস্ট। এক ধাক্কায় আলাদা করে নিউকামার মেয়েগুলোর মুখ মনে রাখাটাও যে কী কঠিন! সিনেমা-হলের আলো নিভে যাওয়ার পর একদম অন্য ব্যঞ্জনায় টের পাচ্ছিলাম, এক পরত মেক-আপ আর কস্টিউম চাপিয়ে দিলে খেঁদি-পেঁচি-নুরজাহান, পর্দায় সবাই কেমন বেশ সমান আর এক রকম দেখতে হয়ে যায়।

মুশকিল কোথায় হচ্ছিল জানেন? পাঁচ-পাঁচটা ট্র্যাকে ছড়ানো গল্প ঠিকঠাক ফলো করতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছিলাম বারবার। মনে হচ্ছিলো, উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপিয়ে বসার কেস না হয়ে বসে শেষটা!মোটে নয় কোটি টাকা বাজেটের ‘ছোট ছবি’ বলে কোন স্টার নিতে পারেন নি বুঝলাম, কিন্তু স্ক্রিপ্টের সেন্ট্রাল ফোকাস পাঁচটা না করে, একটা রেখে আরেকটু গুছিয়ে বাঁধা যেত না গল্পটা, মধুর?

আপনারই মতো তিনিও একসময় ভিডিও ক্যাসেট লাইব্রেরিতে চাকরি করতেন, তারপর ফিল্মি দুনিয়ায় পা রেখে আপনারই মতো একটার পর একটা বোমা ফেলতে ফেলতে বলিউডের অনেক ব্যাকরণ নতুন করে লিখতে বাধ্য করেছিলেন আপনার একসময়ের ‘গুরু’ রামগোপাল ভার্মা। কিন্তু নিজেকে আপডেট রাখার তোয়াক্কা করেন নি কোনদিন, রিফ্রেশ বোতামে চাপ দেন নি একবারও, স্রেফ নিজের ‘সাকসেস ফর্মুলা’ রিপিট করে গেছেন বারংবার।

কী শোচনীয় ভাবে তারপর ফুরিয়ে গেছেন একসময়ে হৈ-চৈ ফেলে দেওয়া সেই রামবাবু, মধুর আপনি তো সে ইতিহাস ভালোই জানেন?

‘ক্যালেন্ডার গার্লস’ দেখে মন্দ লাগলো না, কিন্তু সঙ্গে এটাও বেশ টের পাচ্ছিলাম, এবার আপনারও কিন্তু নিজেকে রিফ্রেশ করে নেওয়ার সেই টাইমটা এসে গেছে। নাহলে, এক সাবজেক্ট কচলে কচলে এভাবে আপনারই বা আর কতদিন চলবে বলুন তো?

ভরসা একটাই, এই সার সত্য কথাটা আপনি নিজেও জানেন। পুরনো বিষয় নতুন বোতলে পুরে তৈরি ছবির ডুবে যাওয়ার চান্স খুব বেশি বলেই তো ছবি রিলিজের দিন আপনার ফেসবুক ভ’রে শুধু গণেশ-বন্দনার ছবি?

এবারটা গণেশ বাবাজী বাঁচিয়ে দেবেন কিনা জানি না। তবে জাতীয় পুরস্কারজয়ী দুর্দম পরিচালককে হাতি-মাথা ‘ভগবান’ আর ধর্মব্যবসা-র পায়ে মাথা ঠুকে ছবি বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা করতে দেখে আফশোস তো একটু হচ্ছে বৈকি!

‘ক্যালেন্ডার গার্লস’ জুড়ে যেন সেই পিটার-ইন্দ্রাণীর গোপন কেচ্ছা! on Sep 29, 2015 rated 3.0 of 5

NO COMMENTS

one × 1 =