চার দিন ধরে পুজোর পরে ঘরের মেয়েকে কি না জলে ফেলে দেওয়া বিসর্জনকেও এই বনেদি বাড়ি মনে করত অপরাধ | সেই পাপ খণ্ডনের জন্য দশমীতে নিরঞ্জনের পরে বলরাম দে স্ট্রিটের দত্তবাড়ির ঠাকুরদালানে পূজিত হতেন গোমাতা |  সেই রীতি আজ আর পালিত হয় না | তবে এই এক রীতি বিলীন হয়ে গেলেও অমলিন হয়ে আছে অন্যান্য প্রাচীন রীতি | যে রীতি জড়িয়ে আছে ১৩৩ বছরের সুপ্রাচীন এই দুর্গা পুজোয় |

এই বংশের গোড়াপত্তন হাটখোলায় | সেখানকার বিখ্যাত দত্ত পরিবারের একটি শাখা হল বলরাম দে স্ট্রিটের এই পরিবার | হাটখোলার বাড়ি থেকে এসে নীলামে এই বাড়ি কিনেছিলেন শ্যামলধন দত্ত | তিনি এই বংশের আদিপুরুষ | কলকতা হাইকোর্টের সলিসিটর শ্যামলধন তাঁর নতুন বাসভবনে থাকতে শুরু করেন ১৮৮০ সাল থেকে | দু বছর পরে সেই বাড়ির ঠাকুরদালানে সপরিবারে এলেন মা দুর্গা |

নজর কেড়ে নেয় এই বাড়ির একচালা প্রতিমার চালচিত্র | তিন ভাগে বিভক্ত এই চালচিত্রকে বলা হয় মঠচৌরি | সেখানে চিত্রিত হয়ে আছে পৌরাণিক বিভিন্ন আলেখ্য | রাধা-কৃষ্ণ‚ চণ্ডী রূপে মা দুর্গার নিশুম্ভ বধ‚ রাম-সীতা‚ বিষ্ণুর দশাবতার‚ কালী-লক্ষ্মী-শিব-সরস্বতী‚ সবাই শোভা পাচ্ছেন চালচিত্রের অঙ্গে |

দত্তবাড়িতে দুর্গাপুজো কার্যত শুরু হয় উল্টো রথে কাঠামো পুজোর সঙ্গে | কৃষ্ণা নবমী থেকে মহাষষ্ঠী অবধি সাত জন ব্রাহ্মণ চণ্ডীপাঠ করেন | মহালয়ায় চক্ষুদানের পরে মহাষষ্ঠীতে বোধন | সেদিনই প্রতিমার অঙ্গে শোভিত হয় সোনার গয়না | হাতে ওঠে রুপোর অস্ত্র | দশমীতে বিসর্জনের আগে খুলে নেওয়া হয় গয়না এবং আয়ুধ |

সপ্তমী থেকে দশমী‚ তিনদিনই সধবা এবং কুমারী পুজো হয় দত্ত বাড়িতে | অন্নভোগের পরিবর্তে থাকে লুচি-রাধাবল্লভী-লেডিকেনি-খাস্তা কচুরি-দরবেশ-গজা আর নারকোলের নাড়ু | শুধু ভোগ বানানোর জন্যই বসে আলাদা ভিয়েন |

দুর্গোৎসব আসলে এই বাড়ির সদস্যদের কাছে মিলনোৎসব | আশ্বিন-কার্তিকের শারদপ্রাতে শতাধিক বছরের প্রাচীন এই বাড়িতে জড়ো হন ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সদস্য-পরিজন | বাতাসে মিশে যায় ধূপ ধুনো কর্পূরের গন্ধ | ভিয়েন থেকে বাতাসে পাক খেতে থাকে ভোগের সুবাস |

পুজোর দিনগুলো‚ অন্য জায়গার মতো দত্ত বাড়িতেও যেন দ্রুত কেটে যায় | একদিন আসে বিষণ্ণতার দশমী | নীলকণ্ঠ পাখি আর ওড়ে না | থাকে মাটির নীলকণ্ঠ | তাদের সামনে রেখেই আবার এক বছরের প্রতীক্ষা শুরু করে দত্ত পরিবার |

আরও পড়ুন:  শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়দের এই সাবেক বাড়িতে প্রায়ই সপরিবারে পুজো দেখতে এসেছেন সৌরভ গাঙ্গুলি

NO COMMENTS