বাংলালাইভ রেটিং -

ফাঁকিবাজি বলে ফাঁকিবাজি! ওপরের এই শিরোনামটা লিখে ঠিক কী বলতে চাইছি, সেটা বুঝতে হলে চলুন সোজা ছবির সেকেন্ড হাফের একটা সিনে।

দৃশ্যটা একটা খবরের কাগজের অফিসের, সেখানে ডেস্কে বসে কাজ করছেন রিপোর্টার শান্তনু (অভিনয়ে কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়)। এই সিনে আপনি দেখতে পাবেন, রিপোর্টারের দু’দিকে দুটো কম্পিউটারের স্ক্রিন। আর দুটো স্ক্রিনেই খোলা রয়েছে ওই খবরের কাগজের দুটো আলাদা দিনের দুটো প্রথম পাতা। মজাটা হল, একই খবরের কাগজের দু’দিনের দুটো ফার্স্ট পেজে ওই কাগজের নামের লোগোটাই যে শুধু আলাদা তাই নয়, এমন কি কাগজের নামটা অবধি আলাদা!

বিষম খাবেন না, যা দেখেছি, সেটাই লিখছি। সিনেমায় দ্যাখান হচ্ছে, খবরের কাগজের নামটা নাকি ‘দিনক্ষণ পত্রিকা’। বেশ তো, সেটা নিয়ে বলার কিছু নেই! কিন্তু নামের বানানটা একটু ঠিক করে লিখবে তো কেউ, নাকি? একটা ফার্স্ট পেজে আপনি দেখবেন লেখা রয়েছে ‘দিনক্ষন পত্রিকা’ আর আরেকটায় লেখা আছে ‘দিনক্ষন প্রত্রিকা’। যারা ‘পত্রিকা’ শব্দটাকে অবধি ঠিকভাবে না লিখে সেটাকে ‘প্রত্রিকা’ বানিয়ে ছেড়ে দেয়, তাদের কাছে আর এইটে আশা করবেন কী করে যে ‘দিনক্ষণ’ বানানের ‘ক্ষণ’ অংশে ‘দন্ত্য ন’ না লিখে ‘মূর্ধন্য ণ’ লেখার মতো বুদ্ধি-শুদ্ধি তাদের আছে বলে!

গোটা শুটিং ইউনিটে মিনিমাম বাংলা জানা লোক একটাও ছিল না নাকি?

আর যা বলছিলাম, একই স্ক্রিনে পাশাপাশি দু’জায়গায় লোগোটা অবধি দু’রকমভাবে লেখা! একটা লোগো তো অনেকটা আনন্দবাজার পত্রিকার লোগো যে রকম ফন্টে লেখা থাকে, সেই রকম। আর অন্যটা দেখে মনে হয়, খুব আনাড়ি হাতে যেমন-তেমন করে বাংলা ফন্ট খুলে কেউ যেন নামটা জাস্ট লিখে দিয়েছে। আর এই জগাখিচুড়ি কারনামা স্রেফ একটা সিনের কাণ্ড নয় কিন্তু! এই কাগজটা আর কাগজের ওই সাংবাদিক ভদ্রলোক যে ছবির শুরু থেকে শেষ অবধি আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছেন গল্পে। আর যতবার গল্পে এঁরা আসছেন, একবার স্ক্রিনে আসছে এক টাইপের লোগো আর বানান, তো নেক্সট সিনেই আবার স্ক্রিনে আসছে আরেক টাইপের লোগো আর বানান।

ছবিটা তৈরি করতে কয়েক কোটি টাকা খরচ হয়ে গেছে বলে এখনও অবধি খবর। কিন্তু ছবির খুব গুরুত্বপূর্ণ ডিটেলিং-এর এই ছিরি দ্যাখার পর সত্যি কি আর এটা মনে হয় যে, লোকজন মন দিয়ে যত্ন নিয়ে তৈরি করেছে ছবিটা?

বাংলা ছাড়ুন, ইংরেজিতে ছবির হিরোর নামটা অবধি তো ঠিকঠাক কেউ লিখতে পারছে না স্ক্রিনে! ছবিতে হিরোর পদবী হল সান্যাল। সেই বানানটার শুরুতে এস-এর সঙ্গে আবার একটা এক্সট্রা এইচ জুড়ে দেওয়া! ‘এস এইচ’ দিয়ে সান্যাল লেখেন, এমন পাবলিক এই সিনেমা ছাড়া আর কোথাও আছে বলে জানেন আপনারা?

সব মিলিয়ে অ-শিক্ষার চরম!

ছবির শুটিংয়ে নায়িকার সঙ্গে ছবির চিত্রগ্রাহক সৌমিক হালদার। একমাত্র এঁর ক্যামেরার কাজ দেখার জন্যেই বোধহয় ছবিটা একবার হলেও দ্যাখা যায়।

কী জানেন, ছবিটা দেখতে লাগছে ঝকঝকে সুন্দর। কিন্তু একটু তলিয়ে দেখতে যান, দেখবেন ভেতরে যেন ফাঁকিবাজির চরম। যে লোকটা ক্যামেরা করেছে, সে লোকটাকে তো লাখো সেলাম। কী সব সিন তুলেছে গুরু! ভিএফএক্স-এর টিমটাও তো কাঁপিয়ে দিয়েছে জাস্ট। কিন্তু যে লোকটা স্ক্রিপ্ট সাজালো, ডায়ালগ লিখল, সে কি জাস্ট ফাঁকি দিয়েই কাটিয়ে দিল পুরো? যে ডিরেক্টর শুট করলো ছবিটা, ছবিটা দেখতে গিয়ে তাঁর নিজেরও কমন সেন্সেও কি টান পড়লো না কোথাও?

ছবির সেকেন্ড হাফের ওই সিনটায় চলুন। শিবাজী’র (অভিনয়ে দেব) মুখে শুনতে পাবেন, ওর কারখানায় নাকি লক আউট হয়ে গেছে। রগড় হল, এবার ক্যামেরা যখন গিয়ে পৌঁছবে সেই কারখানার গেটে, তখন দেখবেন, ও হরি, লক আউট কোথায়, এ তো মালিকের কাছে কী সব দাবি দাওয়া তুলে ধর্মঘট ডেকে বসেছে শ্রমিকেরা! কারখানার গেটে বিশাল করে সভা কাম আন্দোলন চলছে তাঁদের, অ্যাতোবড় করে ধর্মঘটের কথা লেখাও আছে ব্যানারে।

এখন আপনি বলুন, এই সিনটা দেখতে গিয়ে এটা মনে হবে না আপনার যে এ কোন নির্বোধে ছবির স্ক্রিপ্ট লিখল ভাই, যে কাকে বলে ‘ধর্মঘট’ আর কাকে বলে ‘লক আউট’, সেই মিনিমাম নলেজটুকুও নেই। আর শুধু একা স্ক্রিপ্ট রাইটারকেই বা বলছি কেন? গুণধর অভিনেতারা ডায়ালগ বলে গেল, নামী এডিটর গুছিয়ে এডিট করলো আর স্বনামধন্য পরিচালক তো ছিলেনই সবার অগ্রভাগে! এঁদের কারুর চোখে এই ভুলগুলো ধরা পড়লো না কোথাও?

এখন এটা যদি এরকম একটা সিনেমা হতো যে হিরো একটা ঘুষি মারছে, আর দশটা গুন্ডা ছিটকে যাচ্ছে শূন্যে, তো ওপরের এই কথাগুলো লেখার দরকার হতো না কোন। কারণ ওরকম সিনেমা দেখতে বসে তো যুক্তি-বুদ্ধিগুলো শিকেয় উঠিয়ে রাখতে হয় বলেই জানি। কিন্তু এই ‘চ্যাম্প’ ছবিটার গোত্র যে ঠিক সেই রকমের মার্কামারা নয়। এই ছবির হিরো যে মার খেয়ে কুপোকাত হয়ে পড়ে, রক্তে ভিজে যায় তার শরীর, পাঁজরের হাড় চুরমার হয় ভেঙে! আর এরপর ফের লড়াইয়ের ময়দানে যুদ্ধ করে উঠে দাঁড়াতে চায় সে। সব মিলিয়ে একটা যেন রিয়্যাল-রিয়্যাল ফিল! তা আপনি বলুন এই ছবিতে মিনিমাম ওই লজিকগুলো খুঁজতে যাওয়া কি ভুল?

আরও পড়ুন:  মিঠুনের ছেলে মিমো দেখা করলেন তাঁর প্রিয় পর্নস্টারের সঙ্গে!

ও হ্যাঁ, পাঁজর ভেঙে যাওয়ার কথাটা উঠলো বলে বলি। বারবার তো ছবিতে এটা শোনানো হচ্ছে যে পাঁজরের হাড় ভেঙে গিয়ে সেটা নাকি ফুসফুসটার ক্ষতি করে দিয়েছে বেশ। বলছেন এটা, অথচ, হাসপাতাল থেকে শিবাজী বেরচ্ছে আর্ম পাউচে নিজের ডান হাতটাকে ঝুলিয়ে রেখে! ভাই রাজ, এই সিন যখন শুট করেছিলেন, তখন ডাক্তারের সঙ্গে কনসাল্ট করেছিলেন তো? যে, পাঁজরের হাড় ভেঙে গেলেও ডান হাত পাউচে রাখতে হয়, নইলে পাঁজরের ভাঙা হাড় জুড়তে চায় না মোটে!

আরও দেখুন মজা। হসপিটাল থেকে বাড়ি ফেরার পর একটা সিনে হঠাৎ শিবাজী ক্ষেপে উঠে ঝোঁকের মাথায় দিল খুলে ফেলে সেই আর্ম পাউচটাকে। এর একটু পরেই শিবাজী কিন্তু বুঝতে পারবে যে সে ফিট হয় নি এখনও আদৌ, ডাক্তারের নিষেধ ভেঙে লড়াইয়ের ময়দানে এক্ষুনি ফিরতে পারবে না সে। কিন্তু যতই নিজেকে ‘আনফিট’ বলে বুঝতে পারুক না কেন, সেই খুলে ফেলে দেওয়া আর্ম পাউচটা এরপর কোনদিনও আর পড়তে হল না তাঁকে! দেখতে গিয়ে হতভম্ব হয়ে ভাবছিলাম, মেডিক্যাল ট্রিটমেন্ট নিয়ে বাংলা সিনেমার স্ক্রিনে কোন ফাজলামি শুরু হল নাকি!

কে বলবে এই সেদিন নাক দিয়ে গলগল করে রক্ত বেরিয়েছে এবং তার কোন চিকিৎসা হয় নি! শিবাজীর বিক্রমটা শুধু দেখুন!

শরীর স্বাস্থ্য নিয়ে চরম রগড় অবশ্য হল এর বেশ পরে। সিনেমা তখন শেষের দিকে প্রায়। নেতাজি ইনডোর স্টেডিয়ামে বক্সিংয়ের ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনাল। ঠিক তার আগে হঠাৎ ক’রে খাবার টেবিলে শরীর খারাপ হল শিবাজীর। বেসিনে উঠে গিয়ে চোখে মুখে জলের ঝাপটা দিতে লাগলো ও। নাক দিয়ে তখন ভলকে ভলকে রক্ত আসছে ওর! কী ভাবছেন, এবার তাহলে ফাইনাল খেলার তেরোটা বেজে যাবে? ও হরি, কোথায় কী! জাস্ট জল দিয়ে ব্লাড ধোয়ার পরেই শিবাজী সুপার ফিট! ওর নাক দিয়ে গলগল করে রক্ত বেরল কেন, তার কোন ব্যাখ্যা, কিংবা তার কোন ট্রিটমেন্ট, কোন কিছু নিয়ে একটা শব্দ এই ছবিতে নেই!

উলটে এরপর যেটা হল, সেটা দেখে ওই রক্ত বেরনোর সিনটাকে তো ভাঁড়ামি বলেই মনে হচ্ছিল, দাদা! কী হল, জানেন? শিবাজীর ছেড়ে রাখা সাদা জামা কাচতে গিয়ে সেখানে পুরনো রক্তের দাগ দেখে আঁতকে উঠল ওর বৌ জয়া (অভিনয়ে রুক্মিণী মৈত্র)। আর সেখানে বাসি রক্তের রংটা কোন রঙে দ্যাখান হল, জানেন? গোলাপি!

বাসি রক্তের রং কালচে না হয়ে গোলাপি বোধহয় শুধু এই লেভেলের বাংলা ছবিতেই হয়!

দ্যাখাচ্ছেন এক গরিব ছেলের যুদ্ধ করে বক্সার হওয়ার গল্প, সেখানে ঢপের পর ঢপ সাজিয়ে শুধু কেতা মেরে গেলে চলবে? গলির কোণে আবর্জনার স্তুপের থেকে বক্সিং গ্লাভস কুড়িয়ে পেয়ে ছোট্ট শিবাজী বক্সিংয়ের প্রেমে পড়ে গেল, ঠিক আছে! গ্লাভস দুটো নিয়ে দৌড়ে যখন বাড়িতে ফিরছে ও,তখন হেব্বি স্টাইল ক’রে আপনি পুরো ফ্রেমটাকে উলটে দ্যাখাবেন, ঠিক আছে না হয় সেটাও। কিন্তু সেই গ্লাভস পরে বাড়িতে বক্সিং করতে গিয়ে পাঞ্চিং ব্যাগ হিসেবে সে ইউজ করছে ঘরের ইলেকট্রিক বাল্বটা, আর নুন-আনতে-পান্তা-ফুরোয় বাড়িতে এভাবে মায়ের ভোগে যাচ্ছে একের পর এক বাল্ব, সিনেমার সিন হিসেবে এটা কিঞ্চিৎ ধ্যাস্টামি হয়ে গেল না দাদা? আজ মতি নন্দী বেঁচে থাকলে একটা মারও কিন্তু বাইরে পড়তো না!

তারপর ধরুন ওই সিনটা। সাইকেল চোরের পিছু পিছু ধাওয়া করেছে শিবাজী। সিনটা দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, এই যে পাড়া-গাঁয়ের গলি, কিংবা গ্রামের বাড়ির ভেতর-মহল দিয়ে সাইকেল চোর আর শিবাজী’র রেস চলছে তুমুল, এর বেশিরভাগ জায়গাগুলোই এরকম জনশূন্য কেন? সাইকেল চোরের পেছনে ধাওয়া করে যখন জোরসে দৌড় দিচ্ছে শিবাজী, তখন মুখে একবারও ‘চোর’ ‘চোর’ বলে চেঁচাচ্ছেই না বা কেন?

তারপর বুঝতে পারলাম কারণ। চেঁচাচ্ছে না কারণ সিনটা তো আসলে সেই ‘সুলতান’ ছবির ঘুড়ি কুড়িয়ে আনার জন্যে সলমনের দৌড় দেওয়ার সিনটা থেকে হুবহু টুকে মেরে দেওয়া সিন। অতি-চালাক স্ক্রিপ্ট রাইটার ঘুড়িটাকে সাইকেল চোর দিয়ে রিপ্লেস করে দিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু চোরের পিছু ধাওয়া করলে স্বাভাবিক রিফ্লেক্সে যে ‘চোর’ ‘চোর’ বলে চিৎকারটাও আসার কথা, সেটা অ্যাড করতে ভুলে মেরেছেন পুরো।

শরীরচর্চার সিন-টিনগুলো দেখতে গিয়ে তো স্পষ্ট মনে হবে, আরে ভাই, ‘সুলতান’ (২০১৬) দেখে ফেলেছি, ‘দঙ্গল’ (২০১৬) দেখে ফেলেছি, এরপর এগুলো দেখে নতুন আর পাবোটা কী শুনি? একটা নতুন ব্যাপার দেখলাম, বডি বানানোর জন্য শিবাজীকে রোজ আটটা করে ডিম খাওয়ার নিদান দিচ্ছে তার কোচ অমর বাগচী মশাই (অভিনয়ে চিরঞ্জিত)। আর অমনি কিনা ডিমের থালাটা টেনে ধরে খোসা ছাড়িয়ে ডিম খেতে শুরুও করছে শিবাজী।

আরও পড়ুন:  জীবনে একাধিক নারী – চির রোম্যান্টিক ওম পুরীর অজানা অতীত
বক্সিং নিয়ে কম বাজেটেও যে কী রকম দুর্দান্ত ছবি হতে পারে, দেখিয়ে দিয়েছিল এই সিনেমা

শুরুর থেকেই ছবির স্ক্রিপ্ট এগিয়েছে খোঁড়াতে খোঁড়াতে। কী হচ্ছে, কেন হচ্ছে, ভগবান জানেন ভাই! এই তো শুনছি শিবাজীর মতো নতুন ছেলেকে স্পনসর করার জন্য কুড়ি হাজার তো দূরের কথা, কুড়ি টাকাও কেউ দেবে না। তারপরেও এত ঠাটবাট এত খরচ করে ট্রেনিং হচ্ছে কী করে শুনি? আচ্ছা, রিংয়ে প্রতিপক্ষকে হারিয়ে দেওয়ার পরেও স্রেফ পলিটিক্সবাজির জন্যে ম্যাচ জিততে না পারার ব্যাপারটা পুরো ‘শালা খাড়ুস’ (২০১৬) ছবিটা থেকে কপি পেস্ট এখানে বসিয়ে দিয়েছেন, না? আরে ভাই, বেহুদা হয়ে না টুকে আরেকটু মন দিয়ে বরং দেখতে পারলেন না ছবিটা? সেটাও কিন্তু মেনস্ট্রিম বলিউড না, সুধা কোংগারা’র তৈরি আঞ্চলিক তামিল ছবি ‘ইরুধি সুত্রু’র হিন্দি ভার্সন মোটে। বক্সিং নিয়ে রিজিওনাল ফিল্ম যে কোন লেভেলে যেতে পারে, বছর দেড়েক আগে তো দেখিয়ে দিয়েছিল ওটাই! তা’ অমন টানটান একটা সিনেমা থেকে এদিক-ওদিক কপি না মেরে একটু তো বরং শেখার চেষ্টা করতে পারতেন যে কী করে লিখতে হয় এমন ছবির স্ক্রিপ্ট।

স্ক্রিপ্ট লেখার মিনিমাম সেন্সটুকু থাকলে প্রায় বুড়ো হতে বসা বাগচী স্যরের কি আর ভরযুবতী সুন্দরী বোন থাকে? সাথী (অভিনয়ে প্রিয়াঙ্কা সরকার) নামের ওই মেয়েটা নাকি আবার টালিগঞ্জের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে জুনিয়র আর্টিস্টের কাজ করে! এখন কাণ্ড দেখুন, ছবিতে তো দ্যাখান হল, যে সে যেন প্রায় রেডি হয়েই বসে ছিল, ঝুপ করে ওই শিবাজী সান্যালের প্রেমে পড়বে বলে! আর এই প্রেমের তড়কাও উঠলো এতদূর যে শিবাজীর জন্যে গিয়ে বলা নেই কওয়া নেই, নিজের গলার সোনার হারটা অবধি বেচে দিয়ে এল মেয়ে।

এবার শুনুন, একনিষ্ঠ এই প্রেমের জন্যে শিবাজী করলো কী। নিজে উপার্জন শুরু করার পর একটা সোনার হার গড়িয়ে দিয়ে চুকিয়ে দিল ঋণশোধের সেই ল্যাঠা! অবশ্য হবে না কেন বলুন, শিবাজীর মনে যে তখন আরও কমবয়সী, আরও সুন্দরী অন্য এক মেয়ের রং লেগে গেছে, ভাই!

হ্যাঁ, এবার সেই সেকেন্ড মেয়ে জয়ার কথায় আসি। ধনীর দুলালী জয়া শিবাজীকে প্রথম দেখল বক্সার প্রশান্ত সিংয়ের সঙ্গে মরণ-বাঁচন ম্যাচের দিনে, আরও হাজার লোকের ভিড়ে। আর দেখেই কিনা সঙ্গে সঙ্গে প্রেম! দেখে শুনে মনে হচ্ছিল, ওই সাথী বলুন কি এই জয়া, মাস্‌লওয়ালা ‘মাচো’ ছেলে দেখতে পেলে এঁদের মাথায় বোধহয় একটা নেশাই চাগিয়ে ওঠে শুধু!

আরও শুনুন, রিঙয়ের পাশে বসে গলা ফাটিয়ে সেদিন পুরো ম্যাচটা শিবাজীকে কিন্তু সাপোর্ট করলো সাথী! কিন্তু শিবাজী নাকি তার চিৎকারগুলো শুনতে পেল না মোটে! পেল শুধু গ্যালারির উঁচুতে বসা জয়া’র চেঁচানি শুনতে! আর তাই জয়া’র সঙ্গে প্রথম কথা বলতে গিয়ে এটা তো ও বলেও দিল যে, ওই ম্যাচে একমাত্র জয়া ছাড়া আর নাকি কেউ সাপোর্ট করে নি ওকে!

কি বলবেন এঁকে, উঠতি বক্সার নাকি নির্লজ্জ মেয়েবাজ, সেটা আপনি ঠিক করুন ভাই!

এতটা অকৃতজ্ঞ আর অসংবেদনশীল করে কি সত্যি এই শিবাজী ক্যারেক্টারটা আপনি বানাতে চেয়েছিলেন, দেব? যদি না চেয়ে থাকেন তো এই ভুলভাল কাগের ঠ্যাং বগের ঠ্যাং স্ক্রিপ্টকে প্রাইমারি লেভেলেই আটকে দেন নি কেন?

রাজ, আপনি ব্যক্তিগত লাভ-লাইফের কলরোল নিয়ে কি খুব বেশি জেরবার হয়ে আছেন? তাই গল্প সাজানো আর স্ক্রিপ্ট লেখার মোক্ষম সব ভুলগুলোও পুরো নজর এড়িয়ে গেল?

নাহলে এগুলো মানতে পারা কি ইয়ার্কি নাকি কোন? পুরুলিয়ার গ্রামের ছেলে শিবাকে তো পাত্তাই দিচ্ছিল না কেউ আগে! আর প্রফেশনাল বক্সার হয়ে, নিমেষে তাঁর বাজার দর পৌঁছে গেল পঞ্চাশ কোটি টাকায়?

এটা টাকা, নাকি খোলামকুচি, রাজ?

স্পনসরদের থেকে পুরো টাকাটা নাকি আবার অ্যাডভান্স নিয়ে খরচও করে ফেলেছে শিবা! অথচ কোথায় কী ভাবে খরচ হল, তার একটা কোন ব্যাখ্যা কোথাও নেই! দামি ফ্ল্যাট, দামি গাড়ির খাতে যে ওই টাকাটা যায় নি, সেটা তো আগেই শুনিয়ে দিয়েছেন ইনস্টলমেন্ট আর ই. এম. আই. দেওয়ার গল্প শুনিয়ে। টাকাটা তাহলে গেল কোথায় বলুন? আরও রগড় হল তখন, যখন দেখলাম, সেই পঞ্চাশ কোটি টাকা শোধার জন্য নিজের খাট বিছানা আর ঘরে সাজিয়ে রাখা ফটোফ্রেমগুলোও লোক ডাকিয়ে বেচতে হচ্ছে ওকে। এগুলো বেচে অর্থনীতির কোন হিসেবে পঞ্চাশ কোটি উঠতে পারে, বোঝাবেন একটু প্লিজ?

বাংলা ছবির ভিউয়ারদের কি গাধা ভাবেন নাকি?

শিবাজীর বৌ জয়া। ওর বাপের তো টাকার অভাব নেই কোন। অথচ শিবাজীর অবস্থা পড়ে যাওয়ার পর সেই ভদ্রলোক একটা কিছু হেল্প করলেন না কেন? জয়ার প্রসব-খরচ জোগাড় করতে শিবাজী তো প্রায় রাস্তার লোকের পা ধরতে যায়, অথচ একবারও নিজের শ্বশুরের কাছে যায় না কেন, ভাই? দেখছি আর ভাবছি, এসব স্ক্রিপ্ট আর সিচুয়েশনগুলো কি আদৌ সুস্থ মাথায় লেখা?

আরও পড়ুন:  কীভাবে নিরাপদ ও সুরক্ষিত হয়ে উঠবে আপনার দীপাবলি?
যখন মরিয়া হয়ে সফলতা খুঁজছে শিবাজী, ছবিতে তখন গান ‘জয়া তোমারই…’। নায়িকা জয়াকে নিয়ে এই গান শুনে মনে হতে পারে এ যেন আর পাঁচটা ছবির মতো হিরো হিরোই

জয়ার বাচ্চা হওয়ার জন্য লুকিয়ে লুকিয়ে হাসপাতালে কড়কড়ে বাহাত্তর হাজার টাকা শেষটা কে তুলে দিল জানেন? সেই সাথী নামের মেয়েটা। আচ্ছা, এরপর শিবাজী’র নিজের কোন কৌতূহল হল না, অতগুলো টাকা হাসপাতালে কে দিয়ে গেল, বলে? উলটে লাস্ট সিনে কী শুনতে পেলাম জানেন? শিবাজী ফের গব্বো করে বৌকে বলছে শরীর খারাপ নিয়েও যে ওকে ফাইনাল ম্যাচটা খেলতে হল, তার কারণ, সেটা না খেললে জয়ার বাচ্চা ডেলিভারির বাহাত্তর হাজার টাকা জোগাড় হতো কী ভাবে। অর্থাৎ শিবাজী জানেই না যে হাসপাতালের টাকাটা দিয়ে গেছে আর কেউ, বা জানলেও নিজে মুখে স্বীকার করে না সেটা, সব ক্রেডিট নিজে ঝেঁপে দিতে চায় জাস্ট!

বাংলা সিনেমায় এত বেহেড স্ক্রিপ্ট আর কবে হয়েছে বলুন! 

আর ছবিতে ইন-ফিল্ম প্রমোশন কিছু করেছেন আপনারা, ভাই! যেদিকে তাকাই, সেদিকেই দেখি ‘লাক্স কোজি’ দিয়ে মোড়া। দেব-এর গেঞ্জি থেকে শুরু করে বক্সিং রিঙয়ের থাম্বা অবধি সবকিছুতে শুধু ওই একটা লোগোর বন্যা। কত পয়সা ‘লাক্স কোজি’ আপনাদের পে করেছে জানি না, কিন্তু মনে রাখবেন, ছবিতে এই আদেখলা প্রমোশন দেখতে দেখতে একটা সময় লোকের ইরিটেশন চরম হতে পারে!

নিজের একটু নাম হয়ে যাওয়ার পর ব্র্যান্ড এনডোর্সমেন্ট করে বেড়ানটাই শিবাজীর ধ্যান-জ্ঞান হয়ে দাঁড়াচ্ছে, আর বক্সিং চলে যাচ্ছে ব্যাকসিটে, গল্পের মোচড় হিসেবে এটা বেশ ভাল। কিন্তু ধাক্কাটা ফের কোথায় গিয়ে লাগলো জানেন? ফস করে এসময় একটা মন্তাজের মধ্যে দ্যাখান হল, কোথায় একটা বসে শিবাজীর সঙ্গে মিটিং করছে ডিরেক্টর রাজ চক্রবর্তী আর নামী প্রোডিউসার মনি-শ্রীকান্ত! আমি তো দেখে থ! গল্পের সঙ্গে, সিনেমার সঙ্গে এই সিনটার যোগ কোথায়, মানেটাই বা কী?

মনে মনে তখন একবার এটাও ভাবছিলাম যে এবারেই গল্পটা অন্য দিকে টার্ন নেবে কিনা। কে জানে হয়তো এরকম কিছু দ্যাখান হবে যে, শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মসের কর্ণধারদের সঙ্গে দ্যাখা করে সেই অমর বাগচীর বোন সাথীর জন্যে কোন একটা ছবির চান্স জোগাড় করে দিতে চাইছে শিবাজী! কিন্তু ও হরি, তাও তো কিছু হল না, একবার সাকসেসের মুখ দেখবার পর সাথী নামের মেয়েটাকে তো আর মনেই পড়লো না শিবাজীর!

রগড় আরও তুঙ্গে উঠলো যখন ছবির শেষদিকের আর একটা সিনে সেকেন্ড বার ক্যামিও অ্যাপিয়ারেন্স হল রাজ চক্রবর্তীর। সিনটা এরকম, তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে, রাজের গাড়ি স্টার্ট নিচ্ছে না। শিবাজীর সেসময় চরম দুরবস্থা, বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতেই কোথায় যেন যাচ্ছে। তা’ রাস্তায় ওকে দেখে গাড়িটা একটু ঠেলে দেওয়ার রিকোয়েস্ট করলো রাজ। আর গাড়ি ঠেলে দেওয়ার বদলে রীতিমতো গাড়ির বনেট খুলে গাড়ি সারিয়ে দিল শিবাজী! গাড়ি ঠিক হয়ে যাওয়ায় রাজ আবার তখন গাড়ি সারানোর খরচ হিসেবে কটা টাকা গুঁজে দিতে চাইছে শিবাজীর হাতে।

আর আমি তখন ভাবছি, এটা কী হচ্ছে ভাই? ছবির ফার্স্ট হাফেই তো দেখেছিলাম রাজ চক্রবর্তীর সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছে, মিটিং করছে শিবাজী, আর এখন কেউ কাউকে দেখে চিনতে অবধি পারছে না?

মাথার এই সিঁদুর কি অভিনয়ের জন্যে পরা নকল সিঁদুর নাকি সত্যি জুনিয়র আর্টিস্ট সাথীর বিয়ে হয়ে গেছে ইন্ডাস্ট্রির নামী-দামি পরিচালকের সঙ্গে! ছবিতে এর

আর ওই বৃষ্টি ভেজা রাতে গাড়িতে ড্রাইভার-কাম-রাজের পাশের সিটে কে বসেছিল জানেন? সেই অমর বাগচী’র বোন সাথী! মানেটা কী দাঁড়াল তাহলে ভাই? ইন্ডাস্ট্রির জুনিয়র আর্টিস্ট সাথী বাগচি’র সঙ্গে প্রেম অ্যাফেয়ার বিয়ে হয়ে গেছে রাজ চক্রবর্তীর? নাকি জুনিয়র অ্যাক্টর মেয়েটার মাথার সিঁদুর জাস্ট কোন একটা ছবির জন্য দেওয়া নকল মেক-আপ, বিয়ে-টিয়ে কিস্যু হয় নি, পেটের দায়ে নানা জায়গায় নকল বিয়ের খেপ খেলে বেড়াতে হচ্ছে ওকে?

কোথাও এর কোন উত্তর নেই!

যা লিখলাম, তার থেকে এটা নিশ্চয় আঁচ করেছেন যে, গোটা সিনেমাটাই আসলে কেমন ঘোলাটে! ফার্স্ট টাইম প্রোডিউসার দেবের মাথায় টুপি পরিয়ে খুব দায়সারা ভাবে বানিয়ে দেওয়া আগা-মাথাহীন সিনেমা আসলে এটা। যেটা দেখতে বসলে ফার্স্ট হাফটা তাও কেটে যাবে, কিন্তু সেকেন্ড হাফে বারবার ঘড়ি দেখে ভাবতে হবে, এই ভ্যান্তারা থামবে কখন, ভাই?

এত টাকার বিনিয়োগ। এত স্বপ্ন দ্যাখা। বড় প্রোডিউসারের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে নিজের মতো ছবি বানানোর স্বপ্ন। কিন্তু ছবি তৈরির কারিগর যারা, তাঁরাই যদি ইচ্ছে করে দেব-কে সেমসাইড গোল খাইয়ে দ্যান, কী আর করবেন দেব?

শিরোনামটা ওই কারণেই অমন করে লিখেছি। এমন একটা সুযোগ ছিল, ফাঁকিবাজি না করে আরেকটু যত্ন নিয়ে কি বানানো যেত না ‘চ্যাম্প’? কে জানে, তাহলে সত্যি হয়তো বলার মতো ইতিহাস তৈরি হতো কিছু!

2 COMMENTS

  1. Vhai apnake je ki bolbo bujhe utthe parchi na.
    Just ato tukhuy bolbo ata film real noy.
    Akta kotha bolun dangale movie te just 5 minute gita boro kivebe hoye jhai..
    Atha to real story tahole movie ta 26 years long screen keno banalo na..