গায়ক, সুরকার, লেখক, সম্পাদক, চলচ্চিত্র পরিচালক…একটা লোক এত কিছু পারে! ভাবলে অবাক হাতে হয়| তাই অবাক হওয়ার চেয়ে বাক-আলাপটাই সহজ মানে হলো | নিজের দ্বিতীয় বায়োস্কোপ থেকে পরবর্তী কেরিয়ারস্কোপ – সব কিছু নিয়ে অকপট অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় | কথা বললেন তন্ময় দত্ত গুপ্ত |

 

আড্ডার ফাঁকে এক সময়ে  আমরা প্রজাপতি বিস্কুট খেতাম।সেই প্রজাপতি বিস্কুট কীভাবে সিনেমার বিষয় হয়ে উঠল?

অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় : প্রজাপতি, বিবাহর নির্বন্ধ রূপে আমাদের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

প্রজাপতি বিস্কুটে অনেক নতুন মুখের অভিনেতা রয়েছে।অভিজ্ঞতা কেমন?

অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় : আমার মনে হয় আমার ক্ষেত্রে তারকা নির্ভর ছবির থেকে বিষয় নির্ভর ছবি হওয়া ভালো।নতুনদের নিয়ে কাজ করলে একটা এ্যাডভান্টেজ থাকে।নতুনদের বিহেভরিয়ারাল প্যাটার্ন দর্শকদের কাছে অচেনা।ফলে ওদের অভিনীত চরিত্রই দর্শকদের কাছে রিয়াল মনে হয়।।সিনে তারকাদের ম্যানারিজম সকলের চেনা।দর্শকের কাছে সে সব প্রত্যাশিত।নতুন এবং কম বয়সীদের সঙ্গে কাজ করার আরো সুবিধা আছে।

সেগুলো কী?

অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় : তাদেরকে ইচ্ছে মতো তৈরি করা যায়।তারা সবটা শুনে চলে।

ওপেন টি বায়োস্কোপ’-এর সাফল্যের পরে ঠিক দুবছর গ্যাপ।দুবছর পরে আপনি প্রজাপতি বিস্কুট করছেন।এই গ্যাপটা কেন?

অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় : আমি কি ছবি করব এবং কাদের সঙ্গে ছবি করব—সেটা নিয়ে ভাবনা চিন্তা চলছিল।প্রাইম্যারিলি সুজিত সরকারের সঙ্গে আমার ছবি করার কথা ছিল।কিন্তু কপিরাইট বা অন্যান্য সমস্যা দেখা দিল।

প্রথম সিনেমা করার সময় প্রযোজক পেতে কতোটা অসুবিধা হয়েছিল?

অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় : প্রযোজককে পরিচালকের ওপর বিশ্বাস রাখতে হয়।ঠিক এই বিশ্বাসটাই একজন পাবলিশারকে লেখকের ওপর রাখতে হয়।সুজিত দাকে আমি প্রথমে একটা আইডিয়া শুনিয়েছিলাম।সেটা প্রাথমিক পর্যায়ে খুব কাঁচা ছিল।ওই আইডিয়াটাকে ডিভলাপ করতে হয়েছে।সুজিতদা অসম্ভব হেল্পফুল ছিলেন।

ওপেন টি বায়োস্কোপ’-এর  সাফল্য আপনার কাছে কি অপ্রত্যাশিত ছিল?

অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় : ছবি চলাটা অন্য কেমিস্ট্রি।ছবি বানিয়ে আমার ভালো লেগেছিল।‘প্রজাপতি বিস্কুট’ এখন আমি করছি।আমি জানি না ছবিটা কত জন দেখেবেন।আমি এটুকু বলতে পারি ছবিটা আমি ভালো করে বানানোর চেষ্টা করছি।ছবি দেখার মতো কিনা সেটা ছবি দেখার পর মানুষ বুঝবেন।

চন্দ্রবিন্দু থেকে আমরা আপনাকে চিনি।সেই সময় দিব্যি গান চলছিল।তারপর কর্মক্ষেত্রে সিনেমা ঢুকল কীভাবে?

অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় : সিনেমা করার ইচ্ছা অনেক আগে থেকেই ছিল।সিনেমা পরিচালনা, গান লেখা বা গান তৈরি করার মতো নয়।একটা সিনেমা করতে গেলে অর্থবলের প্রয়োজন।চন্দ্রবিন্দু করার ফলে আমার একটা ইমেজ তৈরি হয়েছিল।সেই ইমেজের ফলে প্রোডিউসার পেতে সুবিধা হয়েছে।সুজিতদা গান খুব ভালোবাসেন।তাই আমাদের দুজনের মধ্যে একটা সাংস্কৃতিক সম্পর্ক তৈরি হয়।

আরও পড়ুন:  কেন হঠাৎ সুশান্ত সিং রাজপুতের ওপর চটে গেলেন সলমন খান!?

কলেজ জীবনে সিনেমা সম্পর্কে আপনার ধারণা কী ছিল?

অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় : তখন অনেক রকমের রেট্রোস্পেকটিভ দেখতাম।সেই সময় আমি সিনে ক্লাবের মেম্বার ছিলাম।ডিসিকার ছবি,ফেলিনির ছবি,গোদারের ছবি দেখেছি।

ওই সমস্ত ছবি দেখে কখনও এক্সপিরিমেন্টাল ছবি করার কথা মনে হয়নি?

অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় : আমি সব সময় ন্যারেটিভ ছবি তৈরি করার চেষ্টা করেছি।এটার একটা বড় কারণ হলো  আমি আমার পয়সা দিয়ে ছবি করছি না।আমি নিজের পয়সা দিয়ে শর্ট ফিল্ম বানাবার চেষ্টা করতেই পারি।সেটা একদম আমার মতো ছবি হবে।প্রযোজক নির্মিত ছবিতে যদি অর্থ আসে তাহলে সেই প্রযোজক আবার ছবি করতে পারেন।আমাকে সেই দিকটা দেখতে হয়।

সেই দিকটা দেখলে আর নিজের মতো ছবি করা হয় না —তাই বলছেন তো?

অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় : না,এখন বাণিজ্যিক ছবিও বদলে গেছে।অনেক নতুন নতুন পরিচালক অন্যরকম কাজ করছেন।

নবাগতদের পাশাপাশি আপনি বর্ষীয়ানদের নিয়েও কাজ করেছেন।দুজনের অভিনয় ক্ষমতা নিয়ে ঠিক কী মনে হয়েছে?

অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় : আমি রজতাভ দত্ত,পরান বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো অভিনেতাদের সঙ্গে কাজ করেছি।এরা অত্যন্ত পাওয়ারফুল অভিনেতা।এদের অভিনয় ক্ষমতা সম্পর্কে আমার অগাধ বিশ্বাস।ওনারা পরিচালকের ভাষা বুঝেই অভিনয় করবেন।আমি ঠিক যে ভাবে একটা ছবি বানাতে চেয়েছি তারা ঠিক সেভাবেই সাহায্য করেছেন।

ওপেন টি বায়োস্কোপের’-এর সময় দেখেছি ঋতব্রত মুখোপাধ্যায়,ঋদ্ধি সেনের মতো অল্প বয়সী অভিনেতারা আপনার কাঁধে হাত দিয়ে বন্ধুর মতো রসিকতা করেছে।আপনি ওদের তুলনায় অনেক প্রবীণকিন্তু মেলামেশার ক্ষেত্রে দুই প্রজন্ম কী অনায়াসে মিশে গেছে কীভাবে এতো খোলামেলা থাকেন?

অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় : আমি অতীতে কি করেছি সেটা মাথায় রাখি না।সেটা মাথায় রাখলে আরকাজ করা যাবে না।আমিও চলচ্চিত্রে নতুন।আমিও নিজেকে ট্রেনি মনে করি।এখানে বড় ছোটর কোনও ব্যাপার নেই।তাই আমার কোনও অসুবিধা হয়নি।যাদেরকে আপনি অল্পবয়সী বলছেন আমি তাদের কাছ থেকেও সাজেশন নিই।

সাংবাদিকতার জীবন,গানের জীবন,অভিনয় জীবন কি আপনার মেন্টাল মেনিফেস্টো তৈরি করছে?

অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় : হ্যাঁ, করছে।এগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক আমি খোঁজার চেষ্টা করেছি। কিন্তু অভিনয় করার ইচ্ছে আমার খুব একটা হয়নি।ঋতুদার ‘শুভ মহরত’-এ অভিনয়ের সময় আমি হাতেকলমে কাজ শিখতে চেয়েছিলাম।ক্যামেরাম্যান অভীক মুখার্জীর সঙ্গে আমি অনেক সময় কাটিয়েছি।হয়ত এর ফলে সিনেমার কারিগরি দিক সম্পর্কে একটা ধারণা হয়েছিল।

আরও পড়ুন:  করিনার ইচ্ছে একদিন একসঙ্গে কাজ করবে তৈমুর ও আব্রাম

 প্রথম ক্যামেরা ফেস করার সময় নিজেকে কীভাবে প্রস্তুত করেছেন?

অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় : আমাকে কেউ যখন কাস্ট করেছেন তখন আমাকে ভেবেই কাস্ট করেছেন।মানে আমি যা তাই আমাকে করতে বলা হয়েছে।আমাকে এমন কোনও চরিত্র দেওয়া হয়নি যেটা আমার থেকে সম্পূর্ণ অন্যরকম।

অভিনয়,গান,সাংবাদিকতা,পরিচালনা —সবটাই কি ইনফরমাল ভাবে হয়েছে?

অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় : সাংবাদিকতা তো আমি কলেজে পড়ার সময় থেকেই করছি।আজকে যারা নাম করা সাংবাদিক তারা কোনও না কোনও ভাবে আমার সাথে কাজ করেছেন।আমি ‘আজকাল’-এ প্রায় তিন বছর কাজ করেছি ।‘সংবাদ প্রতিদিন’-এ কাজ করছি।গান যখন আমি  শুরু করেছি তখন ওই ধরনের গানের কোনও ফরমাল ইন্সটিটিউট ছিল না।আমার ধারণা একটা ফরমাল ট্রেনিং নিয়ে কাজ করা ভালো।সেই পূর্ব প্রস্তুতি যদি না থাকে তাহলে আরো বেশি করে পরিশ্রম করে কাজটা শিখতে হবে।আসলে কি জানেন কোনওটাই সহজ নয়।স্টেজে গান গাওয়া থেকে শুরু করে সিনেমা পরিচালনা, সব কিছুর পেছনে পরিশ্রমের প্রয়োজন।

বাংলা আধুনিক গানের একটা অতীত আছে।সেই দিক থেকে আজও ওই ধারার গান অনেকেই করেন।আবার ওই ধারা অনুযায়ী নতুন গান তৈরি হচ্ছেকিন্তু আপনার কথা অনুযায়ী চন্দ্রবিন্দুর গানের স্ট্রাকচারের কোনও পূর্বসুরি ছিল না।সেক্ষেত্রে সোর্স অফ ইন্সপিরেশন কী?

অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় : কলেজে আমরা অনেকরকম গান করতাম।তারপর গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের গান শুনে বুঝলাম যুগোপযোগী আধুনিক গানের ধরন।এরপর সুমনের গান আমাদেরকে খুব প্রভাবিত করল।আমি ভেবেছিলাম যে আমি যদি সুমন, নচিকেতার মতো গান করি তাহলে আমি নিজের জায়গা পাবো না।চন্দ্রবিন্দুর গানে আমরা অনেক রকমের এক্সপিরিমেন্ট করতে পেরেছিলাম।

সাংবাদিকতা,পরিচালনা, গান — সব কিছুর মধ্যে নিজের কথা কোথায় মুক্ত কণ্ঠে বলতে পেরেছেন?

অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় : আমি লেখায় নিজের সম্পর্কে বলতে পেরেছি।নিজেকে খুঁজে পেয়েছি।দে’জ পাবলিকেশন থেকে আমার “নিরুদ্দেশ সম্পর্কে ঘোষণা” বইয়ের লেখাগুলো একটু অন্যরকম ফরম্যাটে লেখা।আমি জানি না আপনি লেখাটা পড়েছেন কিনা।ওই বইতে যেমন পাড়া কালচারের কথা আছে তেমনই সোভিয়েত ইউনিয়ন নিয়ে লেখা আছে।

আরও পড়ুন:  ব্রুস লী'র বায়োপিক বানাচ্ছেন শেখর কাপুর

ফিল্মমেকার হিসেবে আপনার নিজস্ব সিগনেচার কী?

অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় : ‘ওপেন টি বায়োস্কোপ’-এ আমি একটা পাড়ার কথা বলেছি।একটা জনজীবনকে ধরার চেষ্টা করেছি।মানে নব্বইয়ের দশকের পাড়াকে কেন্দ্র করে মানুষের বেঁচে থাকা,ভালো লাগা,মন্দ লাগা।একটা পাড়ার সঙ্গে একটা ছেলের সম্পর্ক এবং যৌথ জীবনের মধ্যে সেই ছেলের ব্যক্তিগত লড়াইয়ের বিষয়টা ‘ওপেন টি বায়োস্কোপে’-এ বলা হয়েছে।সমগ্রের মধ্যে একটা মানুষ কোথাও হেরে যাচ্ছে।কোথাও আবার নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে।এই ছায়া ‘প্রজাপতি বিস্কুটের’ মধ্যেও রয়েছে।একজন তার চারপাশটা কীভাবে দেখছে এবং সময় পরিবেশের সঙ্গে সেই মানুষটার ইন্টার‍্যাকশান আমার কাছে খুব ইন্টারেস্টিং  সাবজেক্ট।

আপনি ফিল্ম রিভিউও করেছেন।ফিল্ম রিভিউয়ের সময় আপনি কি একজন চিত্র পরিচালকের দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে চলচ্চিত্র সমালোচনা করেন?

অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় : না, না।আমি ছবি পরিচালনায় আসার পর থেকে আর রিভিউ করিনি।আমি আমার সতীর্থদের ছবি নিয়ে কাটা-ছেঁড়া করতে চাই না।

দিনান্তে বাড়ি ফিরে আসার পর ঠিক কী ভাবনা থাকে মনের মধ্যে?

অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় : প্রত্যেকের একটাই জীবন।সেই জীবনে ভালো ভাবে বাঁচার একটা রাস্তা হলো কাজ।সেই কাজ বাদে পরিবারের সঙ্গে, বন্ধু বান্ধবের সঙ্গে সময় কাটাতে ভালোবাসি।তারা আমাকে আলাদা বা বিশেষ অনিন্দ্য চ্যাটার্জী হিসেবে ভাবে না।

ভবিষ্যতে অনিন্দ্য চ্যাটার্জী নিজেকে কীভাবে দেখতে চায়?সাংবাদিক,গায়ক, না পরিচালক?

অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় : আমি সংবাদপত্রে সম্পাদনার কাজও করি।কুড়ি বছর ধরে গানও গাইতে পেরেছি।ছবি করছি।আমি সব রকম অপশন খোলা রাখতে চাই।সব রকম কাজের মধ্যে দিয়ে যেতে চাই।দেখা যাক কী হয়।

প্রজাপতি বিস্কুটের পর আর কোনও ভাবনা আছে?

অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় : নিশ্চয়ই আছে।

 কী ভাবনা?

অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় : সেটা এখন বলা যাবে না।

আপনি প্রজাপতি বিস্কুট নিয়েও বিশেষ মুখ খুললেন না।কারণ কী?

অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় : প্রত্যেকটা সিনেমার একটা ডেফিনিট বিষয় থাকে।সেটা বলে দিলে ইন্টারেস্ট থাকে না।এখন প্রায় প্রত্যেকেই পরকীয়ার কথা বলে।কিন্তু বর বউয়ের ফ্যান্টাসি, প্রেমের কথা কেউ বলে না।ছবির বাকি কথা বাকি থাক।

NO COMMENTS