বাংলালাইভ রেটিং -

শিরোনামে এই কথাগুলো এভাবে লিখতে আমার ভাল লাগছে না ঠিকই। কিন্তু সত্যি কথাগুলো না লিখে থাকবোই বা কী করে?

প্রযোজনা সংস্থা সুরিন্দর ফিল্মস-এর তরফে ছবির অফিশিয়াল ট্রেলার ইউটিউবে আপলোড করা হয়েছিল অল্প কয়েকদিন আগে, ১১ আগস্ট। সেই ট্রেলার দেখতে গিয়ে তখনই আমি চমকে গেছিলাম খুব। চোখ কচলে ভাবছিলাম যা দেখছি সেটা ঠিক দেখছি কিনা।

সিনটা ছিল এরকম যে, ঘন জঙ্গলের মধ্যে দুধ সাদা একটা গাড়ি, সেই গাড়ির মধ্যে কোয়েল আর ঋত্বিক বসে। আর সেই গাড়ির ওপরে বিশাল একটা বাঘ!

হ্যাঁ, ঠিক পড়ছেন আপনি!

বাঘকে নিয়ে ট্রেলারে এক নম্বর শট

২ মিনিট ১৭ সেকেন্ডের ট্রেলারে বাঘকে নিয়ে মোট তিনটে শট। প্রথমটা ১ মিনিট ৩৭ সেকেন্ডের মাথায়। ক্যামেরা এখানে গাড়ির সামনে। বাঘটা উঠে দাঁড়িয়েছে গাড়ির বনেটের ওপর, আর বাঘের দিকে আতংক নিয়ে তাকিয়ে রয়েছে গাড়ির ড্রাইভার (জিতু’র ভূমিকায় ঋত্বিক চক্রবর্তী) আর ড্রাইভারের পাশের সিটে বসা বাংলা ছবির সুপারস্টার হিরোইন (রাই চ্যাটার্জির ভূমিকায় কোয়েল মল্লিক)।

সত্যি সত্যি বাঘ নিয়ে এরকম শুটিং করা ভারতে সম্ভব নয় জানি। এরকম লেভেলের জন্তু জানোয়ার দ্যাখানো মানেই যে সেটা অ্যানিমেশনের লীলা, সেটাও এতদিনে সবার জানা। কিন্তু মেশিনে আঁকা হোক আর যাই হোক, বাঘটা খুব জীবন্ত লাগছিল দেখতে।

বাঘকে নিয়ে ট্রেলারে দুই নম্বর শট

এর ঠিক পরের শটটা গাড়ির ভেতর থেকে নেওয়া, যেখানে ক্যামেরা রাখা আছে গাড়ির পেছনের সিটে। এই শটে গাড়ির বনেটের ওপর দাঁড়ানো বাঘের মুখ দ্যাখা যাচ্ছে পরিষ্কার।

আর ১ মিনিট ৫০ সেকেন্ডের মাথায় যে শটটা আছে, সেটা হল বনেট ছেড়ে গাড়ির একেবারে মাথায় চড়ে বসেছে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার! সিনেমার পরিভাষায় এটা হচ্ছে লং শট, অর্থাৎ ক্যামেরা রয়েছে গাড়ি থেকে বেশ কিছুটা দূরে, আর ফ্রেমে একসঙ্গে ধরছে গাড়ি, বাঘ, জঙ্গল, এই সব কিছু।

হতভম্ব হয়ে ভাবছিলাম, মানুষে মানুষে সম্পর্ক আর সেই সম্পর্কের ক্ষয় যাঁর ছবির মুখ্য বিষয়, সেই কৌশিক গাঙ্গুলীর ছবিতে এরকম হিংস্র বাঘের ভূমিকাটা ঠিক কী হতে পারে!

বাঘকে নিয়ে ট্রেলারে তিন নম্বর শট

মূল ছবিটা দ্যাখার পর আমি আরও চমকে চৌদ্দ, কারণ ছবিতে এই তিনটে শটের একটা শটও নেই! জিতু ড্রাইভ করে রাই’কে নিয়ে ঘন জঙ্গল টপকে যাচ্ছে এক গোপন ঠিকানার খোঁজে, এই সিকোয়েন্সটা আছে। সেকেন্ড কয়েকের জন্যে একটা প্যাঁচা দেখতে পাওয়া গেছে ছবিতে, আর আছে হাতির পিঠে চাপার সিন। ঘোড়ার পিঠে চাপার শটও আছে, আছে গুলি চালানোর শট আর খুব ইন্টারেস্টিং একটা স্বপ্ন-দৃশ্য। কিন্তু জঙ্গলের মাঝখানে বাঘ এসে লাফিয়ে উঠছে রাইয়ের গাড়ির মাথায়, এরকম কোন সিন এই ছবিতে নেই!

ট্রেলারে দ্যাখান এরকম জমকালো একটা সিন গোটা ছবি থেকেই হাওয়া হয়ে যাবে, বাংলা ছবির ইতিহাসে আর কখনও এটা হয়েছে কিনা জানি না। আর শুধু বাংলা সিনেমা কেন? গোটা পৃথিবীর সিনেমার ইতিহাসেই কোনদিনও এরকম কিছু হয়েছে কি?

নিজের চোখকে বিশ্বাস হচ্ছিল না, ভাবছিলাম ভুলটা ছবির নির্মাতাদের, নাকি আসলে আমার? এমন কি হতে পারে না যে, কোথাও সিনটা আছে, কিন্তু দ্যাখার সময় চোখ এড়িয়ে গেছে আমার? রিলিজের প্রথম চারদিনের মধ্যে কলকাতার দু’প্রান্তের দুটো আলাদা হল-এ ‘ছায়া ও ছবি’ দু’বার দেখে ফ্যালার পর কিন্তু এখন জানতে চাইছি একটাই কথা যে, ট্রেলারে ওই মিথ্যে দৃশ্যগুলো রাখার কারণটা ঠিক কী?

ছবির বিজ্ঞাপনে হঠাৎ এরকম একটা কাণ্ড কৌশিক করতে গেলেন কেন, অনেক ভেবেও যে বুঝতে পারছি না সেটা। ভাসা ভাসা একটা উত্তর খাড়া করার চেষ্টা করছি যে, বাঘটা আসলে সত্যি নয়, ওটা আসলে মনের মধ্যে লুকিয়ে থাকা পৃথিবীর হিংস্র সব আগ্রাসনের প্রতীক। কিন্তু তারপরেও তো এই অঙ্কটা মিলছে না যে, ওই প্রতীক যদি ট্রেলারে ইউজ করা হবেই তো মূল ছবিটায় কোথাও সেটা রাখা হল না কেন।

নাকি এটা যে করে হোক, পাবলিককে হল-এ নিয়ে আসার মরিয়া একটা চেষ্টা? 

আরও পড়ুন:  জেনে নিন কীভাবে সেলিব্রেট করা হলো শাহিদ-মীরার মেয়ে মিশার প্রথম জন্মদিন

সিরিয়াস ছবির চেয়ে বিনোদনমূলক ছবিই এখন বেশি বানাবেন কিনা, দিন কয়েক আগে কৌশিকের কাছে জানতে চেয়েছিলেন খবরের কাগজের সাংবাদিক। কৌশিকের উত্তর ছিল, ‘‘সিনেমাওয়ালা’-র পরে আমার ভাবগতিক কিছুটা বদলেছে। প্রথমত, আমি বুঝতে পেরেছি, সিরিয়াস ভাবনার ছবি ঘন-ঘন করা সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত, রেভিনিউ আর্নিংয়ের দিকে একটু বেশি মন দেওয়া দরকার। কারণ, ছবি যদি দর্শকগ্রাহ্য না হয়। আরও ছবি কীভাবে তৈরি করব?’ (বিনোদন ক্রোড়পত্র, আজকাল, ১৯ আগস্ট)।

বুঝলাম। কিন্তু ছবির ট্রেলারে আলগা গিমিক দিয়ে কার্যত লোক ঠকাতে শুরু করলে ছবির রেভিনিউ আর্নিং বেড়ে যাবে, এরকমটা ভাববেন না কখনও কৌশিক, প্লিজ।

আপনার ছবির টার্গেট ভিউয়ার কিন্তু পুরো আলাদা। তাঁদের খুশি করতে হলে স্ক্রিনে বাঘ-সিংহ দ্যাখাতে হবে বা সিনেমার নায়িকাকে গাড়ির ছাদে চড়িয়ে তাঁকে দিয়ে গান গাওয়াতে গাওয়াতে দার্জিলিং নিয়ে যেতে হবে, এটা কে বলে দিল আপনাকে? ‘ছায়া ও ছবি’ তো অসম্ভব রিয়্যালিস্টিক ছবি। তার মধ্যে ওরকম হঠাৎ হঠাৎ গান কতটা তাল কেটে দিতে পারে, তার কিছু আইডিয়া আছে আপনার?

ছবির শুরুতে ক্রেডিট টাইটেল দ্যাখাতে দ্যাখাতে যখন অমন কাণ্ড করছিলেন আপনি, তখন মহা-বিরক্তি লাগছিল আসলে। ‘আর একটু উঠলেই ঠাণ্ডা বাড়বে – বলে দিলাম / আমি ভয় পেলাম’ গানটা শুনতে শুনতে একবার ভাবছিলাম কী রকম বাচ্চামো হচ্ছে রে বাবা এটা! আরেকবার মনে হচ্ছিল গানটা থামবে কখন।

ঠিক এক ভুলটা আপনি ‘জ্যাকপট’-এও (২০০৯) করেছিলেন। যখন তখন লারেলাপ্পা গান। বাংলা সিনেমার দুনিয়ায় কৌশিক গাঙ্গুলী যে স্পেশ্যাল একটা ব্র্যান্ড আর সেই ব্র্যান্ডের সঙ্গে হঠাৎ হঠাৎ গাছের ডাল ধরে নাচ-গানগুলো যে আদৌ যায় না, সেটা বোঝার মতো ম্যাচিউরিটি তখন আপনার ছিল কিনা, জানি না – তবে এখন নিশ্চয় আছে।

শুধু তো দার্জিলিং যাওয়ার সময়েই গান নয়। এরপরেও তো এ সিনেমায় আরও বেশ কয়েকটা গান। যে গানগুলো আবহ হিসেবে নেপথ্যে ইউজ হচ্ছে, সেগুলো তাও ঠিক আছে। কিন্তু ছবিতে যাঁকে দ্যাখাচ্ছেন বাংলা সিনেমার সুপারস্টার হিরোইন বলে, সে যদি সবে আলাপ হওয়া গাড়ির ড্রাইভারের অনুরোধ ফেলতে না পেরে নিশুত রাতে খোলা প্রান্তরে তাকে গান শোনাতে বসে, তখন একটু কেমন কেমন লাগে না? আরও মজা দেখুন, ড্রাইভারের অনুরোধ ছিল মোটে দু’কলি গান শোনানোর। রাই দেখলাম নিজের কোন একটা ছবির হিট গান ‘একলা ভালই আছি সরে সরে’ পুরোটা শোনাতে শুরু করলো ড্রাইভারটিকে। সঙ্গে নিখুঁত যন্ত্রানুষঙ্গ তো আছেই!

আপনি নিজেই বলুন, রিয়্যালিস্টিক ছবিতে এইসব জোর-করে-দেওয়া মশলাগুলো হজম করা সহজ কিনা আদৌ।

দার্জিলিংয়ের পটভূমিকায় সত্যজিতের ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ মনে করে দেখুন একবার। সম্পর্কের কেমিস্ট্রি আর ক্ষয় নিয়ে সেটা তো চরম একটা ছবি। এত বাজনা সহযোগে কটা গান ছিল সেটাতে, বলুন?

কোন ছবির সঙ্গে তুলনা করলাম, সেটা দেখে নিশ্চয় বুঝতে পারছেন, আপনার ছবির থেকে এক্সপেকটেশন কী রকম। তা সে যতই আপনি এর আগে ‘ব্রেকফেল’ (২০০৯) বা ‘বাস্তুশাপ’-এর (২০১৬) মতো ঝুল সিনেমা বানিয়ে থাকুন না কেন।

‘ছায়া ও ছবি’ দেখতে দেখতে তো মনে হচ্ছিল, শুটিং করতে গিয়ে হাতে গরম যে সব অভিজ্ঞতা হয়েছে, সেগুলোই স্ক্রিনে গেঁথে দেখিয়ে দিচ্ছেন আমাদের। আপনার নিজস্ব সেই অভিজ্ঞতার শরিক হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন বলে থ্যাংকস আপনাকে, কৌশিক! বাংলার টপ দুই হিরো-হিরোইনকে নিয়ে পাহাড়ের পটভূমিতে সবে গত বছরই একটা ছবি শুট করে উঠলেন না আপনি? ওঁদের নামগুলো আর লিখছি না এখানে, থাক! কারণ এই ‘ছায়া ও ছবি’র কিছুটা স্টোরি তো মনে হচ্ছে ওই ভদ্রজনেদেরই লাইফ থেকে নেওয়া।

এখানে আপনি যে গল্পটা বলেছেন, সেটাও তো পাহাড়ের পটভূমিতে টপ দুই নায়ক-নায়িকাকে নিয়ে সিনেমা শুটের গল্প! সেই দুই নায়ক-নায়িকার নিজেদের পার্সোনাল লাইফে আবার রোমান্স আর বিয়ে-শাদির রিলেশনও নাকি পাকা! আপনি দ্যাখাচ্ছেন, এরপরেই শুরু হচ্ছে আসল মজা, কারণ দিন যত গড়াচ্ছে, একটু একটু করে রং খসে পড়ছে ইন্ডাস্ট্রির সাজানো সেই সব দেব-দেবীদের একের পর এক।

আরও পড়ুন:  স্বামীর বিরুদ্ধে অস্বাভাবিক যৌন আচরণ ও নির্যাতনের অভিযোগ আনলেন ববি ডার্লিং
তেমন একটা মুহূর্ত – যখন দুজনের মধ্যে খুব ভাব

এই গল্পেই আবার কায়দা করে পাঞ্চ করে দিয়েছেন ডিমনিটাইজেশন-এর বিছুটি। একেকবার তো মনে হচ্ছিল, সিনে-দুনিয়া নিয়ে ছবি বানাতে বসে পৃথিবীতে যার ওপর যত ক্ষার আছে, আপনি বোধহয় এই সুযোগে সেটা ঝেড়ে নিতে চান। শুটিং করতে এসে যে অ্যাকট্রেস শুধু প্যাক আপ কখন হবে, সেই অপেক্ষায় থাকে, তাকেও যেমন ছাড়ছেন না। সেরকম চিনুক-না-চিনুক, যার-তার সঙ্গে সেলফি তুলতে হামলে পড়া আদেখলা পাবলিকেরও আপনার হাত থেকে এবার ছাড়ান নেই – এ ছবিটায় সবাই আপনার টার্গেট।

আর প্রোডিউসার-কুলের কথা তো ছেড়েই দিচ্ছি। তাঁদের উদ্দেশ্যে এ ছবিতে আপনার অমৃতবাণী হল এইটে যে, ‘ব্ল্যাক মানি দিয়ে ছবি বানাবে, তার আবার বড় বড় বাতেলা’! সত্যি তো, মুখে ভালমানুষির ভান দেখিয়ে এই ইন্ডাস্ট্রির কেষ্ট-বিষ্টুরা ভেতরে ভেতরে যে হারামিপনাটা করে, সেটা আপনার চেয়ে বেশি ভাল আর কে জানবে, বলুন?

ছবির ট্রেলার যতই মিসলিডিং হোক আর শুরুতে গানবাজনার বাড়াবাড়িটা যতই আনইম্প্রেসিভ হোক। ছবির ভেতরে ঢোকার পর এরকম একেকটা মুহূর্তে বলতে ইচ্ছে হচ্ছিল, সাবাশ কৌশিক সাবাশ।

ছবির গল্পে দেখছি, হঠাৎ করে পাঁচশো আর হাজার টাকার নোট অচল হওয়ার ফলে হিরোইনের পেমেন্ট জুগোতে হিমশিম খাচ্ছে ইন্ডাস্ট্রিতে নতুন আসা এন.আর.আই. প্রোডিউসার। কাঁচুমাচু মুখের সেই প্রোডিউসার জয়ব্রতের (অভিনয়ে বরুণ চন্দ) মুখের ওপর নামী নায়িকা রাই যখন সপাটে বলে যে ‘আমার আবার টাকা না পেলে কাজে মন বসে না একদম’ তখন মনে হয়, বাঃ এই তো সুন্দরী মেয়ের দাঁত নখও বেশ বেরতে শুরু করেই দিয়েছে তাহলে।

কিন্তু অমন টাকা-অন্ত-প্রাণ মেয়েটাকেও যে কী অসহায়ভাবে কারুর হাতের পুতুল হয়ে নাচতে হয়, সেটা আবার বুঝিয়ে দিচ্ছেন ছবির সেকেন্ড হাফে এসে।

তেমন একটা মুহূর্ত – যখন দুজনের মধ্যে সন্দেহের বিষ

নিজের কেরিয়ারে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে একের পর এক ছবি বানিয়েছিলেন ঋতুপর্ণ ঘোষ, আর তার বেশিরভাগগুলোতেই উদোম করে ছেড়েছিলেন এই দুনিয়াটাকে। এটায় আপনিও দেখলাম সেই কাজটাই করলেন। প্রোডাকশন ম্যানেজার ডাবলুদা (চিত্রভানু বসু) বলুন, কিংবা স্টার হিরো অরিন্দম (আবীর চ্যাটার্জি)। উঠতি অ্যাকট্রেস মৌমিতা (প্রিয়াঙ্কা সরকার) বলুন কি ফার্স্ট টাইম ডিরেক্টর মায়া (চূর্ণী গাঙ্গুলী)। বা শুটিং পার্টির খুচরো অন্য যত ক্রু মেম্বার আছে। সবার টুকরো টুকরো সংলাপে দেখলাম নিখুঁত ভাবে ধরা পড়ছিল নিজের নিজের ন্যাংটো ইন্টারেস্টগুলো।

লাস্ট আধ ঘণ্টা ছবিটা এমন দিকে বাঁক নিচ্ছিল, যেটা হয়তো খুব নতুন কিছু নয়, ঠিকই। কিন্তু সত্যি সত্যি চোখের সামনে ওই ক্লাইম্যাক্স ঘটতে দ্যাখার অভিঘাতটা আমার অন্তত তুমুল রকম হল।

একেকবার মনে হচ্ছিল ইচ্ছে করে যেন সেই ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’র (১৯৬২) একটা পার্ট-টু বানিয়ে দিলেন আপনি। মনীষা নামের সেই মেয়েটার এক্সটেনশন যেন এই সিনেমার রাই! মনীষা যে বাধাটা ওখানে লাস্ট সিনে চেষ্টা করেও পুরোপুরি টপকে যেতে পারে নি, আপনার সিনেমায় রাই তো সেটা টপকে গেল প্রায়! শেষ সিনটা দেখতে দেখতে গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল আমার আর বুঝতে পারছিলাম না ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’র পাশাপাশি ‘ছদ্মবেশী’ (১৯৭১) সিনেমার সেই ‘কেয়া শরম কি বাত’ গানটাও এ সিনেমার রাইয়ের মধ্যে ইন্সপিরেশন হয়ে কাজ করছে কিনা।

থাক, এর বেশি আর এন্ডিং নিয়ে কিছু বলতে চাই না আমি।

তবে ছবি দ্যাখার অভিঘাত যতই স্ট্রং হোক না কেন, এটাও বলে রাখি যে, খুব ইনটেন্স একটা গল্প একটানে বলতে গিয়ে, প্রেম যৌনতা আর নষ্টামি নিয়ে থ্রিলারের আবহ বানাতে বানাতে কোথাও কোথাও সংলাপ আর সিচুয়েশনের লাগাম যেন কৌশিক, আপনার হাত থেকে বেরিয়ে গেছে ছিটকে!

ছবিটা সেকেন্ড টাইম দেখতে যান, যখন সব কটা ক্যারেক্টারের হদ্দ-মুদ্দ আপনার জানা। তখন দেখবেন কোন কোন সিনে গিয়ে খটকা লাগছে একটু।

উদাহরণ দিচ্ছি, দেখুন।

হবু বৌকে লোকেশন থেকে সরিয়ে দিয়ে অন্য মেয়েকে বিছানায় নিয়ে তোলাটা যদি আগের থেকেই প্ল্যান করে সাজানো থাকবে, তাহলে অন্য মেয়েটির সঙ্গে একান্তে বলা কথাগুলোও তো অন্যরকম হওয়া উচিৎ, তাই না? এ ছবিতে সবসময় সেটা মেনটেন্‌ড হয়েছে কি?

আরও পড়ুন:  অভিনেত্রী টিউলিপ জোশীকে মনে পড়ে? তিনি এখন কোটিপতি ব্যবসায়ী!
ছবির শুটিংয়ে আবীর এবং কোয়েলের সঙ্গে ছবির পরিচালক

নিশুত রাতে হোটেলের বারান্দার সিনটা ধরুন। ত্রিসীমানায় অন্য কেউ নেই, অরিন্দম রেলিংয়ের সামনে দাঁড়িয়ে ড্রিংক করছে, একটু দূরে মৌমিতা এসে দাঁড়াল। অরিন্দম কিন্তু তখন মৌমিতাকে নিজের দিকে ডাকে নি, আমরা তো দেখলাম একটু আগের কথা-কাটাকাটির জের টেনে মৌমিতাই নিজের থেকে কাঁদতে কাঁদতে এসে মুখ ডুবিয়ে দিল অরিন্দমের বাহুতে।

দুজনের মধ্যে সব সেটিং আগের থেকেই হয়ে থাকলে নিভৃতে এসব ঢংয়ের কী মানে বলুন?

অরিন্দমকে তো উলটে এটাও তখন বলতে শুনলাম, ‘যাও ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়, কাল সকালে কলটাইম আছে’। আপনি বলুন, সিনেমার লাস্ট সিনে যৌন-দোষের ম্যাক্সিমামটা অরিন্দমের ঘাড়ে ফেলতে হলে, এই সিনটার প্রেজেন্টেশন অন্যরকম হওয়ার কথা ছিল কিনা?

এছাড়া ছবির শুরুতে তো এটাও দ্যাখাচ্ছেন যে দার্জিলিংয়ে শুটিং শুরু হয়ে গেছে আগের থেকেই, আর অরিন্দম-মৌমিতাসহ পুরো টিম সেখানে শুটও করছে চুটিয়ে। আর সেখানে কিন্তু অরিন্দম একাই আছে, ওকে চোখে-চোখে রাখার জন্যে রাই সেখানে নেই। রাই সেই টিমের সঙ্গে এসে জয়েন করলো শেষের কয়েক দিনের জন্যে। ওই শেষ দিন তিন-চারের মধ্যে আবার একটা রাত রাইকে সরিয়ে দেওয়ার জন্যে এত কাণ্ড করে প্ল্যান বানানোটা আদৌ বাস্তবসম্মত কিনা, ভাবনাচিন্তা করে না হয় নিজেই বলুন সেটা।

ওটাও দেখে খুব অদ্ভুত লাগলো যে শুটিং স্পটে নিজেদের গোপন লীলার সময় তোলা সেলফি আর মেসেজগুলো অরিন্দমকে মৌমিতা দ্যাখাচ্ছিল অন্য ক্রু মেম্বারদের চোখের সামনে। খুঁটিয়ে ফ্রেমগুলো দেখলে বুঝতে পারবেন, কী বলতে চাইছি আমি। বাংলা ছবির লায়ক-লায়িকারা নিজেদের গোপন কেচ্ছাগুলো ইউনিটের বাকিদের এভাবে দেখিয়ে দেখিয়ে চালাচালি করে কিনা, সেটা অবশ্য আমার থেকে বেটার বলতে পারবেন আপনি।

গল্পের আরেকটা দুর্বলতা কোথায় দেখতে পেলাম, বলি। ওই সময়টার কথা ধরুন, যখন সামনে রাইয়ের চরম বিপদ বলে হাতে-নাতে অকাট্য প্রমাণ পেয়েই গেছে তাঁর ড্রাইভার জিতু।

তখন রাইকে সাবধান না করে, সুখিয়াপোখরিতে নিজের ঘরে একলা বসে শুধু মদ খেয়ে যাবে ও? মনের মধ্যে ওর অনেক মান-অভিমান জমেই ছিল জানি। কিন্তু মোমেন্টটাও তো এমন ছিল যে অভিমান চেপে বসে থাকলে ঘোটালাগুলো বাড়ত বই কমতো না!

কী হতো বলুন, যদি অন্য ড্রাইভারকে দিয়ে ড্রাইভ করিয়ে দার্জিলিং থেকে দূরে সুখিয়াপোখরিতে সেই রাতে জিতু’র বাড়ি গিয়ে পৌঁছনোর খেয়াল না চাপতো কলকাতার নামী হিরোইন রাইয়ের মাথায়? উলটে যেত না পুরো ছবিটার গল্প?

তবে সবচেয়ে বেশি খারাপ লাগলো অন্য একটা ব্যাপারে। ছবির শেষে গিয়ে দেখি হিরোইন রাই চ্যাটার্জিকে মন শক্ত করার জন্যে অ্যাগেটওয়ালা আংটি ধারণ করতে বলছে ডিরেক্টর মায়া! মানেটা কী কৌশিক? মনের জোর বাড়াতে গেলে আঙুল জুড়ে রত্ন-সাজানো আংটি পরতে হবে, এই নিদান আপনার থেকে অন্তত আশা করি নি যে আমি, স্যর।

ভাল লাগাগুলো তো লিখেইছি কিন্তু ছবির ভুল-ত্রুটি আর খারাপ লাগাগুলোও চাঁচাছোলা ভাবে বলছি, কারণ আপনার কাছে বাংলা সিনেমার আশাটা যে পুরোপুরি অন্য লেভেলের, দাদা!

দার্জিলিংয়ে ছবির শুটিংয়ে কোয়েল, ঋত্বিক এবং পরিচালক কৌশিক গাঙ্গুলী

আগের ছবি ‘বিসর্জন’এ চমকে দিয়েছিলেন আপনি। ফের একবার চমকে দিলেন এটাতেও। আর অবাক কাণ্ড, কী ‘বিসর্জন’ বলুন আর কী এটা, পিঠোপিঠি দুটো ছবিতেই দেখছি আপনি লিখেছেন বিয়ে রিলেশনের আড়ালে লুকিয়ে লুকিয়ে দাম্পত্যের সঙ্গীটিকে ঠকিয়ে দেওয়ার গল্প!

ছবি দেখতে দেখতে তাই এটাও মনে হচ্ছিল যে, এখন আপনার মনের মধ্যে স্পেশ্যাল কোন ফেজ চলছে কিনা, যে কারণে ছবির গল্পগুলো সব হয়ে দাঁড়াচ্ছে এই রকম।

আরও ভাল ভাল ছবি বানান আপনি, আপনার ছবি আরও ত্রুটিহীন হোক, এই শুভেচ্ছা তো থাকলোই। এর সঙ্গে বাড়তি এবার এই শুভেচ্ছাও থাকল যে ছবির বাইরে নিজের জীবনেও খুব খুব ভাল থাকুন আপনি।

 

NO COMMENTS